The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
পাঁচ
দুর্যোগের মুখোমুখি
আলেক্সিওসের অধীনে বিকশিত বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য শুধু কোমনেনো পরিবার বা তাদের আশেপাশে থাকা ক্ষমতাধর মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হচ্ছিল না, বরং সাম্রাজ্যের শুরু সময় থেকেই তিনি নিজের হাতে রাষ্ট্র চালনার সমস্ত উপকরণ, ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের রাশ নিয়ে আসায় তার হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হতে থাকে। আলেক্সিওস স্বয়ং সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতেন, পদে নিয়োগ করতেন, পদন্নোতি ঘটাতেন, উপঢৌকন দিতেন, বা শত্রুদের ধ্বংস করার পরিকল্পনা করতেন। সামরিক, প্রশাসনিক এমন কী আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করেন, তার তুলনীয় কোনও উদাহরণ আমরা তাঁর পূর্বজদের কাজকর্মে পাই না। এই রণনীতিতে আলেক্সিওস নিজের ভাবমূর্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বাইজান্টিয়ামকে গড়ে তুলছিলেন।
সম্রাট যাদের সঙ্গে কাজ করা পছন্দ করতেন তাদের পদোন্নতি ঘটত — তারা পরিবারিক সদস্যই হোক অথবা পারিবারিক বৃত্তের বাইরের লোকই হোক – ফলে বাইজান্টাইনের অধিকাংশ অভিজাত হঠতই একদিন দেখলেন তারা অনেকেই ক্ষমতার বৃত্ত থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছেন। সম্রাটকে ঘিরে সমস্যার বৃত্তটা তৈরি হতে শুরু করলে অভিজাতরা আভিজাত্যচ্যুত, ক্ষমতাচ্যুত হতে লাগলেন। আমলাতন্ত্রের সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয়টা ছিল কন্সট্যান্টিনোপলে উচ্চপদাধিকারীদের বার্ষিক বেতন প্রদান। কেন্দ্রিয় তোষাখানা থেকে বিপুল পরিমান অর্থ নানান গোষ্ঠীর প্রশাসনিক, সামরিক আমলাকে বিতরণ করা হত। এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে শুধুই বিরক্তি উতপাদন হত তাই নয়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশাল আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হত। আলেক্সিওসের পূর্বসূরী, তৃতীয় নিকেফোরোস বোটানিয়াটিস সাম্রাজ্যের ব্যয় হ্রাস করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যের আমলাদের মাইনে কমিয়ে দেন। আলেক্সিওস এই পদক্ষেপকে আরও গভীরে নিয়ে গিয়ে শুধু বেতন হ্রাসই করলেন না, ভেঙে পড়া অর্থনীতি বাঁচাতে বহু দপ্তরের বেতন বন্ধ করে দিলেন। কঠোর পদক্ষেপগুলি স্বাভাবিকভাবে অভিজাতদের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠল। বিশেষ করে সাম্রাজ্যের রোজগার বাড়ানোর বাহানায় আলেক্সিওসের বিরোধী অভিজাতদের সম্পত্তি সরকার বিরোধিতার অভিযোগে দখল নেওয়া শুরু হল। তাছাড়া বেতন দেওয়ার সময় সম্রাট মূল্যহ্রাস করা মুদ্রা ব্যবহার করতেন আর রাজস্ব আদায়ের সময় পুরোনো মূল্যযুক্ত মুদ্রা আদায় করার যে পরিকল্পনা তিনি চালাচ্ছিলেন, তাতে সমস্যা আরও ঘোরালো হচ্ছিল (১৮)।
বাইজান্টিয়ামের মারমুখী প্রতিবেশীদের রুখতে যে ব্যয় হচ্ছিল, সেগুলি মেটাতে গিয়ে আলেক্সিওস অর্থনৈতিকভাবে কোমর বাঁধার পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। ১০৮১-র পর দীর্ঘ এক দশক ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখায় বেতন, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদের পিছনে প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবেও ব্যয় ক্রমশ বাড়তে থাকে, বিশেষ করে চাষীদের বাহিনীতে নিযুক্ত করাবার ফলে কৃষি উৎপাদনে শ্রমশক্তির অভাব ঘটল, স্বাভাবিকভাবে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিও কমল, রাজস্ব কমল কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি হয়ে উঠোল আকাশছোঁয়া। ১০৮০-র দশকে পেচেনেগ এবং সুলতানদের রাজস্ব প্রদানের চুক্তি করায় সেখানেও বিনিয়োগ করতে হচ্ছিল এবং সাম্রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় অবস্থার উন্নয়নেও বিপুল অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল। নরমানদের বিরুদ্ধে জার্মানির চতুর্থ হেনরির সঙ্গে জোট করাও খুবই খরুচে ঝামেলা ছিল – বাইজান্টাইনেরা বিপুল পরিমান ৩ লক্ষ ৬০ হাজার সোনার মুদ্রা দেওয়ার অঙ্গীকার করে – কিন্তু শর্ত ছিল সেগুলি নতুন ছাপা মুদ্রা হবে না(এবং মূল্যমান কমানো), কিন্তু গুণমানে উচ্চমানের হতে হবে (১৯)।
রাষ্ট্রের রোজগার বাড়ানোর প্রভূত প্রচেষ্টা চালালেন। ১০৮২-তে নরমান এবং ডাইরাক্ষিয়ন আক্রমনের জন্যে বিনিয়োগের অর্থ খুঁজতে তিনি যে চার্চের অর্থ লুঠ করেছিলেন, সেটা ভবিষ্যতে আর করবেন না এমন শপথ তিনি প্রকাশ্যে গ্রহণ করেন। কিন্তু তিন বছর পরে শপথ ভেঙ্গে তিনি চার্চের দামি আধ্যাত্মিক নানান দ্রব্য দখল নিলেন। শপথ ভঙ্গ করার জন্যে চার্চের পক্ষ থেকে সম্রাটকে তীব্র স্বরে ঝাঁঝালো ভাষায় তিরস্কার করা হল। এই ধরণের প্রচার কার্যে খুবই দক্ষ ছিলেন চ্যালেডনের বিশপের নেতৃত্ব। যদিও আন্না কোমনেনে বিশপের বিরুদ্ধে লিখেছেন তিনি ‘পরিষ্কারভাবে নিজের ভাবনা ভালভাবে প্রকাশ করতে পাররেন না, কারন তাঁর যুক্তিবাদে বিন্দুমাত্র শিক্ষা ছিল না (২০)’। আলেক্সিওস এই বিতর্কটা কিছুটা প্রশমিত করলেও, তৃতীয়বারেও সম্রাট ১০৯০-এর দশকের শুরুতে চার্চের সম্পত্তি দখল নেওয়ায় এন্টিওকের প্যাট্রিয়ার্ক সম্রাটের তীব্র সমালোচনা করলেন (২১)।
রাজস্ব আদায় এবং খরচের মধ্যে তালমিল না রাখতে পারায় রাজস্ব হার বেড়েই চলতে থাকে। বাইজান্টাইন সমীক্ষকের বক্তব্য অনুসারে বলা যায় আমলাদের রাজস্ব আদায়ে নিযুক্ত করা হত মানুষের ওপরে কাল্পনিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে। এই কাল্পনিক বরাদ্দ আদায় না হলে সম্পত্তি দখল করা হত (২২)। বৃদ্ধি পেতে থাকা রাজস্বের প্রভাব হল মারাত্মক। রাজস্ব আদায়ের হার আকাশ ছোঁয়ায় মৃত্যু, মন্বন্তর, জনসংখ্যা হ্রাস এবং গৃহহীনতা বাড়তে থাকে। এন্টিওকের প্যাট্রিয়ার্ক সূত্রে জানা যাচ্ছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ভুক্তোভুগী মানুষেরা ‘খ্রিষ্টজনগন হত্যাকারী বর্বরদের দলে গিয়ে ভিড়ত, তারা মনে করত আমাদের সঙ্গে থেক মরে যাওয়ার থেকে বর্বরদের কাছে দাস হয়ে থাকা অনেক ভাল (২৩)।’
এমন কী মাউন্ট এথোসের সন্তদের ওপর অর্থ-বুভুক্ষু সম্রাটের নজর পড়ল। এথোসে বহু ধর্মাচারী সমাজের বাস ছিল এবং সন্তরা রাজস্ব এবং অন্যান্য ছাড়ের সূত্রে বিপুল পরিমান সম্পদ এবং ভূসম্পত্তি এবং স্থাবর সম্পত্তি তৈরি করেছিল। যে জমি তাদের অধিকারে ছিল, সেগুলির ওপর সাম্রাজ্যের লোলুপ দৃষ্টি থাকলেও, সে সব নরমান, পেচেনেগ বা তুর্কিদের দৃষ্টির বাইরে ছিল। এই অঞ্চলের আরেকটা বিশেষত্ত্ব হল অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলের জমির উতপাদনশীলতা একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেও কমে নি। ১০৮৯-এ আলেক্সিওস অর্থ আদায়ে সেদিকে দৃষ্টি দিলেন। তিনটে সনদে যে এপিবোল তৈরি করা হল, তাতে নতুন অর্থ আদায়ের দাবি উঠে এল। অপারগ বা অনিচ্ছুকদের মধ্যে ছিল ২০ হাজার একর ভূমির অধিকার বিশিষ্ট মাউন্ট এথোসের ইভিরন মঠ। এরকমভাবে বহু এই ধরণের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ করে নেওয়া হল (২৪)।
১০৯০এর দশকের শুরুতে যখন এশিয়া মাইনরের অবস্থা পতন ঘটতে শুরু করেছে, আলেক্সিওসের অবস্থা শোধরানোর আর অন্য কোনও বিকল্প অবশিষ্ট ছিল না। মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস আর করা সম্ভব ছিল না, কেন্দ্রিয় সরকার অর্থ সাশ্রয়ের জন্য সাম্রাজ্য জুড়ে যা কিছু করণীয় করে ফেলেছে। খারাপ অবস্থা আরও খারাপ করে ভূমধ্যসাগরীয় দুটি বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ক্রিট এবং সাইপ্রাস ১০৯১-এর শুরুতে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং কন্সট্যান্টিনোপল থেকে কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অতিরিক্ত করাধান ছিল বিদ্রোহের অন্যতম কারন (২৫)। উত্তর পশ্চিম সীমান্তে উপর্যুপরি আক্রমন সাম্রাজ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং বাইজান্টিয়ামের সম্পদ সংগ্রহে আরও দুর্দশা তৈরি করে (২৬)।
১০৯২-এর শুরুতে আলেক্সিওস এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন যা পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের ইতিহাসের ওপর বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করবে। ১০৮০-র দশকে নরমান আক্রমনের সময় সম্রাট ভেনিস প্রশাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জোটবদ্ধ হয়ে অগ্রিম নগদ মুদ্রার বিনিময়ে আড্রিয়াটিক সাগরে ভেনিসের জাহাজগুলিকে টহল দেওয়ানোর মাধ্যমে দক্ষিণ ইতালিতে আক্রমণকারী নরমানদের কাছে রসদ পৌঁছানোয় বাধা তৈরি করছিলেন (২৭)। ১০৮১-৮৫-র মধ্যে নতুন করে নরমান আক্রমন ঘটায় আবার তিনি বহু অর্থ দান, ডজ ইত্যাদি উপাধি দান এবং ভেনিসিয় প্রশাসনকে আড্রিয়াটিক এবং ডালমেশিয়ায় অনেক বেশি অধিকার দেওয়ার বিনিময়ে নরমানদের বিরুদ্ধে কাজে লাগালেন (২৮)।
আলেক্সিওস মনে করলেন সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নের জন্যে একটাইমাত্র পথ বাকি, সেটা হল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরাসরি আমন্ত্রণ জানানো। ১০৯২-এর বসন্তে তিনি সুদূরপ্রসারী সনদ জারি করে ভেনিসিয়দের বহু সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন (২৯)। ভেনিসের শাসক ১০৮০-তে ডজ অব ভেনিস এবং ডালমেশিয়া এবং সাম্রাজ্যের দেওয়া প্রোটোসেবাস্টো উপাধি ব্যবহার করতেন; ১০৯২-এর পরে তাকে কন্সট্যান্টিনোপলের পক্ষে ক্রোয়েশিয়ার দখল নিশ্চিত করে ভেনিসের পরোক্ষ শাসনে নিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়া হল। এছাড়াও এদের দয়া ডজ এবং অন্যান্য উপাধিও বংশপরম্পরায় ব্যবহার করারও অনুমতি দেওয়া হল (৩০)। একই সঙ্গে ভেনিসের সেন্ট মার্ক সহ অন্যান্য চার্চ বিপুল পরিমান সাহায্য পেল এবং ১০৯০ থেকে চার্চটি বড়ভাবে পুনর্গঠনেও হাত খোলা সাহায্য পায়। তাছাড়া কন্সট্যান্টিনোপলের কিছু রাস্তা, হিব্রু দরজা থেকে ভিগলা বুরুজ অবদি অঞ্চল ভেনিসিয় ব্যবসায়ীদের জন্যে সংরক্ষিত করা হল। একই সুবিধে দেওয়া হল সাম্রাজ্যের এন্টিওক, লাওডেকিয়া, টারসোস, মামিস্ত্রা, আট্টালেইয়া, এথেনস, করিন্থ, থিবেস, থেসালোনিকি এবং ডাইরাক্ষিয়ন বন্দরেও (৩১)। এর ফলে অন্যান্য ইতালিয় শহর রাষ্ট্রের তুলনায় ভেনিস পূর্ব ভূমধ্যসাগর এলাকায় অনেকটা সুবিধাপ্রাপ্ত শহর হয়ে উঠল। (চলবে)