The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
পাঁচ
দুর্যোগের মুখোমুখি
এলেক্সিওসের সুযোগ সুবিধে, ছাড় ইত্যাদি দেওয়ার চক্কর এখানেই থেমে থাকল না, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ভেনিসিয় ব্যবসায়ীদের আরও বেশি বিনিয়োগ করার জন্যে বহুমুখী ছাড় দেওয়ার ঘোষণা করলেন। তাদের যে সব সম্পত্তি দেওয়া হল, সে সব সম্পত্তির ওপরে সম্পত্তির মালিকের দাবি অগ্রাহ্য করার ঘোষণা করা হল (৩২)। ভেনিসিয় জাহাজে যত পণ্য আমদানি রপ্তানি হল, সব আমদানি কর মুক্ত হল (৩৩)। সম্রাট ভেনিসকে বাইজান্টিয়ামে যে বাণিজ্য সুবিধে এবং বিনিয়োগের সুযোগ দিলেন, সেই সুবিধে আমালফি, পিসা এবং জেনোয়া এবং অন্যান্য শহর রাষ্ট্রের বণিকেরা পেলনা, ভেনিস তার প্রতিযোগীদের থেকে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে থাকল এই ছাড়ের সুবাদে। বিষয়টা এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল যে ১০৯২-তে কন্সট্যান্টিনোপল ভ্রমণে গিয়ে, গারডোর প্যাট্রিয়ার্ক, ভেনিসের চার্চ প্রধান স্বয়ং, যে ব্যবসা সুবিধে বণিকেরা পাচ্ছে সেগুলি ব্যক্তিগত স্তরে দেখতে গেলেন (৩৪)।
আলেক্সিওসের এই পরিকল্পনা অনেকটা ফাটকা খেলার মত ছিল। অন্যান্য শহর রাষ্ট্র তাদের ব্যবসায়িদের জন্যে কন্সট্যান্টিনোপলের থেকে একই সুযোগ দাবি করার কথা ভাবছিল কী না জানি না। আগামী দিনে এই যে বিশাল বিনিয়োগ হয়েছে, তাকে কিছুটা পরিবর্তন বা এক্কেবারেই বাতিলের কোনও ভাবনা তিনি ১০৯২-এর শুরুতে মাথায় রাখেন নি। সমস্যা হল, খুবই ছোট সময়ের জন্যে ভেনিসিয় ব্যবসায়ীদের কাছে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে গেল, এবং ভেনিসিয়রা যে ছাড়ের সুযোগ পেল তাই দিয়ে তারা স্থানীয়ভাবে স্থানীয় প্রতিযোগীদের বাজার থেকে হঠনোর জায়গায় চলে এল।
এই যে অনুদান সম্রাট ভেনিসিয়দের দিলেন, তার পরিমাপ করা খুবই কঠিন, কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, ব্যবসায় ছাড় দেওয়ার পরে পরেই আলেক্সিওস বাইজান্টাইনের মুদ্রা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে সংশোধন করবেন সেটা মোটেই কাকতালীয় উদ্যম ছিল না। ১০৯২-এর গ্রীষ্মে মুদ্রাগুলির মধ্যে পরস্পরের সঙ্গে মূল্যমান স্থাপন করে হাইপারপাইরন (আক্ষরিক অর্থে ‘পরিশুদ্ধ সোনা’) নামে নতুন উচ্চমূল্যের মুদ্রার সঙ্গে সঙ্গে খুচরো মুদ্রাতেও তিনি জারি করলেন। শুরুতে যদিও খুবই কম সংখ্যায় মুদ্রা জারি করা হল, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যে বার বার একই মূল্যমানের মুদ্রা ছাপিয়ে চলা স্থিতিশীল বাণিজ্য পরিচালনার প্রাথমিক শর্ত, কারন বিশ্ব বাণিজ্যে সফল হতে স্থিতিশীল মুদ্রা ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান উপাদান। প্রায় মূল্যহীন হতে চলা মুদ্রাগুলোকে পুনর্ব্যবহার্য করার মধ্যে, বার বার মুদ্রার মূল্য হ্রাস করার মাধ্যমে মুদ্রার আসল মূল্য সম্বন্ধে গ্রাহকদের সন্দিহান হয়ে ধ্বংস হতে বসা অর্থনীতির পুনর্জাগরণের একটা সুযোগ তৈরি হল। সম্রাটের এই উদ্যম স্বাস্থ্য হারানো সাম্রাজ্যের অভিজাতদের আদৌ উদ্ধার করতে পারিল কী না সেটা অন্য বিষয়।
আশ্চর্যের যে আলেক্সিওস কোমনেনোর শাসনের প্রথম দশকটিতে তার বিরুদ্ধে খুব কমই বিরোধিতা দেখা গিয়েছে। প্রতিবেশীদের বিপুল চাপ এবং অর্থনৈতিক বিশৃংখলা আর পতন সত্ত্বেও কন্সট্যান্টিনোপলের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার ওপরে খুব বেশি চাপ তৈরি করা যায় নি। ১০৮২-তে ডাইরাক্ষিয়নের পতনের পরে তার বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে, তাকে সিংহাসন থেকে নামানোর উদ্যমে পরিণত করা যায় নি। খুব বেশি হলে ১০৮৩-তে রাজধানীতে সম্রাটের বিরুদ্ধে চক্রান্ত আয়োজনের একটা গুজব ছড়ানো গিয়েছিল মাত্র (৩৫)। অথবা ড্যানিউব অঞ্চলের সর্বনাশা অভিযানে অথবা কয়েক বছর পরে যুদ্ধে আহত সম্রাটকে তার প্রিয়তম ধ্বংসাবশেষ ভারজিন মেরির গুহায় ঢুকে পেচেনেগেদের হাত থেকে বাঁচতে বন্য ফুলের বিছানায় শুয়ে লুকিয়ে থাকলেও তার কয়েক বছর পরও তার বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহ আয়োজন করা যায় নি (৩৬)।
যখন সাম্রাজ্যের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতগতিতে, গৃহযুদ্ধে যখন সাম্রাজ্য টলোমলো করছে, যখন চুম্বকীয় ব্যক্তিত্বরা সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে উঠে আসছেন দ্রুতলয়ে, সেই সময় ১০৮০-র দশকজুড়ে কন্সট্যান্টিনোপলের শাসক অভিজাতদের অতিরিক্ত নিষ্ক্রিয় থাকার প্রচেষ্টা দুর্বোধ্য হেঁয়ালিতভরা। অনেকের দাবি যে অভিজাতদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বৈগুণ্য এই দুর্ভাগ্যজনক নিষ্ক্রিয় অবস্থা তৈরি হওয়ার জন্যে অনেকাংশে দায়ি। বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাইজান্টাইন প্রতিবেশীদের নিয়মিত আক্রমনের ফলে অভিজাতদের জমি থেকে উদ্বৃত্ত রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, এবং একইসঙ্গে অস্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা সাম্রাজ্যের অভিজাতদের ক্ষমতার দাপট অনেকটাই শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু আলেক্সিওসের বিরুদ্ধে অভিজাতদের চ্যালেঞ্জ জানানোর ব্যর্থতার জন্যে দায়ি কিন্তু নতুন সম্রাটের কঠোর মুষ্ঠিতে রাজ্য শাসনের প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট কিছু অভিজাতর সম্পত্তি দখল করে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন সম্ভাব্য বিদ্রোহীদের রেয়াত রা হবে না এবং বিদ্রোহের জন্যে তাদের প্রত্যেককে উচ্চমূল্য চুকোতে হবে। যে সব অভিজাতর সম্ভাব্য চালচলন তার শাসনের পক্ষে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন মনে হচ্ছিল, প্রত্যেকের ওপর নির্মমভাবে অত্যাচার নামিয়ে আনা হল; আলেক্সিওসের শাসন কালের শুরুর তিন বছরে দুজন প্যাট্রিয়ার্ককে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তে পরিষ্কার হয়ে যায় নতুন সম্রাট বিদ্রোহ বা অনানুগত্য সহ্য করছেন না।
১০৯০-এর শুরুতে আলেক্সিওসের কাজকর্মগুলো, নিয়মিত প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিচ্ছিল রাজ্যের অধিবাসীদের। তারা মোটামুটি বুঝতে পারছিল সম্রাট সাম্রাজ্যকে পিছিয়ে দিচ্ছেন। সঞ্চিত দুর্লভ সম্পদ সব শেষ হয়ে যেতে বসেছে, ক্রিট এবং সাইপ্রাসে চাপিয়ে দেওয়া আকাশ ছোঁয়া রাজস্ব হার বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে এবং কন্সট্যান্টিনোপলের বজ্রমুষ্ঠি বহু বিদ্রোহ সংগঠন রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। ভেনিসের বণিকদের যে একতরফা অনুদান দেওয়ার বিরোধিতা হয়েছিল; পাল্টা আবেদনের অধিকার কেড়ে, বিন্দুমাত্রও ক্ষতিপূরসুযোগ না রেখে, যে প্রক্রিয়ায় দেশিয় প্রজা আর গির্জার সম্পত্তি ইতালিয়দের হাতে তুলে দেওয়া হল, তাতে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হলেন (৩৭)।
একই সঙ্গে এশিয়া মাইনরে তুর্কি শক্তির অগ্রগমন আটকানোর সমস্ত ব্যর্থ চেষ্টা আলেক্সিওসের নীতির সীমাবদ্ধতা তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলল। উপকূল অঞ্চল দখলে রাখতে ব্যর্থ হলেন, নিকাইয়া নিয়ে তার উদ্যম অকার্যকর প্রমানিত হল। আলেক্সিওসের শাসন যখন দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাছে, সে সময় স্বয়ং তিনি বিকল্প খোঁজায় প্রণোদিত হলেন।
আশ্চর্যজনক হল, সম্রাটকে সিংহাসনচ্যুত করার উদ্যম কিন্তু ১০৮১-র কোমনেনের বিদ্রোহের ফলে ক্ষমতা, মর্যাদা, পদ হারানো অভিজাত অথবা তুর্কিদের আক্রমনে এশিয়া মাইনরের জমি হারানো ভূস্বামী ইত্যাদিদের মত চেনাশোনা সূত্র থেকে উঠে এল না। অথবা সাম্রাজ্যের বাইরের মানুষদের উচ্চপদ দেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অভিজাতরাও বিদ্রোহী হল না — এদেরই একজন সম্রাটের বিদেশিদের কাজ দেওয়া নীতি বিষয়ে তীব্র তিক্ততায় বলছেন, ‘বিদেশের অজানা উচ্ছৃঙ্খল মানুষকে আদর করে প্রিমিকারিওস উপাধি দিয়ে সেনাপতির পদে বরণ করছেন, আপনি রোমকদের আর কোন যোগ্য পদ দেওয়ার জন্যে রাখলেন? আপনি রোজ একজন রোমককে শত্রু বানাচ্ছেন (৩৮)।’ সম্রাটের চূড়ান্ত বিরোধিতা এসেছিল তার সব থেকে ক্ষমতাবান সমর্থকদের বৃত্ত — তার নিজের পরিবারের মধ্যে থেকে।
১০৯৪-এর বসন্তে আলেক্সিওস যখন বার বার সার্বিয়দের বাইজান্টাইন সীমান্তে ঢুকে আসা রোখার উদ্দেশ্যে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন, সে সময় ভুক্তোভুগী মানুষোদের বিক্ষোভ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। এটাই ছিল তার সাম্রাজ্য রক্ষার ক্ষেত্রে শেষতম ধাক্কা। যখন রাজধানীর কাছে এশিয়া মাইনর বিদেশি আক্রমনে থরথর করে কাঁপছে, সে সময় সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সম্পূর্ণ সুরক্ষা না দিয়ে দূরের সীমান্তে তুলনামূলক অগুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত রক্ষার জন্যে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা সম্রাটের বিচার বিবেচনার ওপর চূড়ান্ত প্রশ্ন তুলে দিল। এবার থেকে মোটামুটি বিদ্রোহীরা ঠিক করে নিল, সম্রাটকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। (চলবে)