The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রায় ছবির মত বিস্তৃত বক্তৃতা-বর্ণনায় পোপ, জনসভায় উপস্থিত হওয়া তাঁর হাজারো ধর্মীয় অনুগামীকে জানালেন, পূর্ব দেশের পারসিকেরা — আজকে যাদের আমরা তুর্কি নামে জানি, অমানুষিক অত্যাচার চালাচ্ছে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের ওপর। ‘তারা উপাসনাবেদীতে নোংরা লাগিয়ে ধ্বংস করছে, খ্রিষ্টিয়দের খৎনা উতসারিত রক্ত উপাসনা বেদীতে লেপে দিচ্ছে, অথবা সে সব baptismal vesselsএ রাখছে। কাউকে অসীম অত্যাচারে ভীতিপ্রদভাবে হত্যা করার পরে যখন তারা দেখল ব্যক্তিটি মারা গিয়েছে, তার নাভি ছিদ্র করে নাড়ি বার দণ্ডতে বেঁধে পেটাতে থাকে যতক্ষণনা ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে মল বেরিয়ে আসছে। কাউকে খুঁটিতে বেঁধে তাকে তাক করে তার দেহ লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছে, অন্যরা খোলা তরোয়ালকে ধার দিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে বেঁধে রাখা মানুষটার এক কোপে ধড় থেকে মাথা নামানো যায় কী না। মহিলাদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার নিয়ে আর কী বলব, এ বিষয়ে কিছু বলার থেকে নিস্তব্ধ থাকা মঙ্গলজনক(৩)!’
পোপ দ্বিতীয় আরবানের মূল উদ্দেশ্য ছিল না পূর্ব দেশগুলোয় কী ঘটছে সে সব ঘটনা বিস্তারে জানানো, বরং জনগণকে তীব্রভাবে যুদ্ধ করতে যাওয়ার জন্যে উত্তেজিত করা, ‘আমি বলছি না, খ্রিষ্টিয়দের আর্তি শুনতে, কিন্তু সর্বশক্তিমান তোমাদের মত সর্বস্তরের মানুষ, নাইট থেকে পদাতিক, গরীব থেকে ধনী, নির্দেশ দিচ্ছেন, এই শয়তান জাতিকে পূর্ব দেশের জমি থেকে উৎখাত করে, নির্দিষ্ট সময়ে খ্রিষ্টিয় মানুষের সাহায্যে অগ্রসর হতে(৪)।’
‘ইওরোপিয় নাইটদের যিশু খ্রিষ্টের সেনানী হিসেবে উদ্বুদ্ধ হয়ে, দৃঢ় পদক্ষেপে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পূর্ব দেশের চার্চগুলোর নিরাপত্তাবিধানে অগ্রসর হতে হবে। খ্রিষ্টিয় নাইটদের জেরুজালেমের দিকে যাত্রার যুদ্ধ বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি তৈরি করতে হবে যাতে তুর্কিদের খুব সহজেই উৎখাত করা যায়। যে শহরে খ্রিষ্ট প্রাণ দিয়েছেন, সেই শহরে প্রাণ উৎসর্গ করার মত পবিত্র সুন্দর মহান আর কিছুই হতে পারে না(৫)। সর্বশক্তিমান ইওরোপিয় নাইটদের যুদ্ধের জন্যে অসামান্য শক্তি, অসামান্য সাহস এবং জোর দিয়েছেন’। তিনি উত্তেজিত অনুগামীদের বললেন, ‘সময় এসেছে, ইওরোপিয়রা তাদের যুদ্ধ-সামর্থের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করুক, এবং পূর্বের খ্রিষ্টিয় জনগণের দুঃখ দুর্দশা বিনাশ করুক এবং বিশ্বাসীদের হাতে পবিত্র সেপুলচারের অধিকার ফির যাক(৬)’।
ক্লারমঁতে আরবানের বক্তৃতা ছিল অসামান্য, সেরাতম, সম্মোহনী, সমস্ত ধর্মীয় অনুষঙ্গ সুচিন্তিতভাবে তুলে আর তুর্কিদের অত্যাচারের ভয়ঙ্করতম উদাহরণগুলো নিখুঁতভাবে বেছে নিয়ে অনুগামীদের যুদ্ধ-যাত্রার জন্যে উত্তেজিত করে তোলার মুখড়া(৭)। তিনি প্রায়-সম্মোহিত হাজারো কালো মাথার উদ্দ্যেশ্যে ছুঁড়ে দিলেন যুদ্ধে গেলে মোক্ষের বিষয়টি। স্পষ্ট জানালেন যারা তুর্কিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে, তারা কী পুরষ্কার পাবে – যারা পূর্ব দেশগুলির অভিযানে যাবে, প্রত্যকেই সর্বশক্তিমানের অন্তহীন আশীর্বাদ অর্জন করবে। উপস্থিত প্রত্যেককে তিনি সর্বশক্তিমানের প্রেরিত আদেশটি মাথায় তুলে নিতে নির্দেশ দিলেন। দুর্বৃত্ত এবং তস্করদেরও ‘খ্রিষ্টের সেনানী’ হয়ে উঠতে আহ্বান জানালেন আর যারা নিকট অতীতে তাদের ভাই আর আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও লড়েছেন, তাদের বলা হল আইন মোতাবেক বর্বরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হতে। এই যাত্রা কিন্তু অর্থ এবং সম্মানের জন্যে নয়, প্রত্যেকেই আত্মনিবেদনের উতসাহেই যাবে এবং তাদের কৃতকর্মের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যাবে। জনৈক পর্যবেক্ষকের ভাষায় ‘মোক্ষলাভের নতুন রাস্তা উদ্ভাবিত হল(৮)।’
আরবানের বক্তৃতার প্রতিক্রিয়া হল ভাবাবিষ্টময়। উপস্থিতদের মধ্যে থেকে গর্জন উঠল ‘Deus vult! Deus vult! Deus vult!’ সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! আরবান বলতে শুরু করলে উত্তেজিত জনগণ আবার চুপ করে পোপ আর কী বলেন শুনতে উৎসুক হল – ‘এটাই তোমাদের যুদ্ধ-গর্জন হয়ে উঠুক, কারন আমিই ঈস্বর-প্রেরিত দূত, আমার স্বর সরাসরি ঈশ্বরের দান। যখনই তোমরা পূর্বের দেশে শত্রুকে আক্রমন করতে উদ্যত হবে, সর্বশক্তিমান যে গর্জন তোমাদের এক্ষুণি দান করেছেন, সেটা সক্কলের কণ্ঠে উঠে আসবে – শুধুই সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা!(৯)’
যারা পোপের বক্তৃতা শুনতে আসা প্রায় প্রত্যেকেই যুদ্ধের ডাকে আবিষ্ট হয়ে বাড়ি পৌঁছনীওর আগেই পূর্ব দেশগুলোয় অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেদিলেন। পুরোহিতেরা পোপের বক্তব্য সমাজের আরও গভীরে ছড়িয়ে দিতে জনবসতিগুলোতে ছড়িয়ে পড়লেন। তাদের মূল লক্ষ্য হল পোপের বাণী প্রচার। আরবান নিজেকে চরম ব্যস্ত রাখলেন এই কাজে। তিনি অভিজাতদের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ-যাত্রার আলাপ আলোচনা শুরু করলেন। পূর্ব দেশের অভিযান বাস্তবে রূপায়িত করতে তিনি ফ্রান্সের প্রায় প্রত্যেক অঞ্চল চরে বেড়ালেন, যে সব অঞ্চলে যেতে পারলেন না সেখানে তিনি বার্তা লিখে অনুগামী পাদ্রিদের পাঠালেন। ফ্রান্স জুড়ে ক্রুসেড জ্বর ছড়িয়ে পড়ল। প্রখ্যাত অভিজাত এবং নাইটেরা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন চরম উত্তেজনায়, নিজেদের প্রজাদের খেপেয়ে দিয়ে। ইওরোপের ক্ষমতাশালী এবং ধনীদের মধ্যে অন্যতম তুলোসির রেমঁদ প্রথম অভিজাত জমিদার হিসেবে যুদ্ধে যেতে রাজি হলেন। একইভাবে লোরেইনের ডিউক গডফ্রে যুদ্ধে অংশ নিতে এতই উদগ্রীব ছিলেন যে তিনি godefridus ierosolimitanus বাক্যবন্ধ অর্থাৎ ‘জেরুজালেমের তীর্থযাত্রী গডফ্রে’ ছাপানো মুদ্রা তৈরি করে ফেললেন(১০)। জেরুজালেম অভিযানের মহামারীর জ্বরের মত অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ল ফ্রান্সজুড়ে(১১)। শুরু হয়ে গেল প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধযাত্রা ব্যবস্থাপনা করার উত্তেজনা।
চার বছর পর ১০৯৯এর জুলাইতে ক্ষতবিক্ষত, কলঙ্কিত কিন্তু অত্যাশ্চর্যভাবে উদ্বুদ্ধ নাইটদের দল জেরুজালেমের দেওয়ালের বাইরে অবরোধ শুরু করলেন। খ্রিষ্টিয় সেনা খ্রিষ্ট বিশ্বের পবিত্রতম ভূমি আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে, তাদের বাঞ্ছিত অঞ্চল মুসলমানেদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে। অবরোধের সমস্ত ব্যবস্থা তৈরি এবং বাহিনী আক্রমণোদ্যত। বাহিনীর মধ্যে উপাসনা শুরু হয়েছে। ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণতম বিজয় পাওয়ার জন্যে নাইটেরা প্রস্তুত।
প্রথম ক্রুসেডের উচ্চাকাঙ্ক্ষারস্তর সামগ্রিক উদ্যমের বিস্তৃতি আলোচনা করলেই আন্দাজ করা যাবে কীভাবে অতীতে সেনাবাহিনী দূরের যুদ্ধে গিয়েছে, নানা বাধা অতিক্রম করে বিপুল জয় পেয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই আলেকজান্ডার, সিজার অথবা বেলিসারিয়াসের মত প্রখ্যাত সেনানায়ক দেখিয়েছেন কীভাবে, কোন রণকৌশলে দূরদেশের বিপুল পরিমান ভূমি, পরিকল্পিত এবং শৃংখলাবদ্ধ বাহিনী নিয়ে জেতা যায়। এসব বিজয়ের তুলনায় ক্রুসেড চরিত্রগতভাবে আলাদা। কারন এই প্রথম পশ্চিমি সেনা নিজের স্বার্থপূরণে যুদ্ধ জয়ের অভিযানে যাচ্ছে না, তারা বিধর্মী কবলিত ভূমি-মুক্তির অভিযানে অংশ নিতে যাচ্ছে। ক্লারমঁতে আরবান ইওরোপিয় নাইটদের অভিযাত্রা করে পূর্বের এলাকা দখল করে সেই এলাকা বিজয় করে লাভবান হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন না, বরং তিনি তথাকথিত পাগানদের কবল থেকে জেরুজালেম আর পূর্বের চার্চ মুক্ত করার নির্দেশ দিচ্ছেন(১২)।
তবে ঘটনাক্রম সফল করে তোলা খুব সহজ ছিল না। হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে যে ব্যাথা আর যন্ত্রণার যাত্রা শুরু হল, তাতে বিপুল মানুষ প্রাণ দিলেন, বিপুল মানুষ আত্মোতসর্গ করলেন। পোপের ডাকে তৈরি হওয়া ৭০০০০-৮০০০০ হাজার খ্রিষ্টিয় সেনার এক তৃতীয়ংশের বেশি জেরুজালেমের দোরগোড়াতেই পৌঁছল না। ক্রুসেড নেতাদের সঙ্গে যাত্রা করা আরবানের দূত ১০৯৯তে রোমে বার্তা পাঠিয়ে বললেন যাত্রার মাঝে যুদ্ধ এবং রোগেভুগে মোট বাহিনীর দশ শতাংশেরও কম সেনা পবিত্র শহরের দেওয়াল অবদি পৌঁছতে পেরেছে(১৩)।
ক্রুসেড ব্যবস্থাপনায় এই লোকগল্পগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে – রাজা পিটারের ভাই পয়েন্টিয়াস রাইনো (Pontius Rainaud) যখন উত্তর ইতালি থেকে ডালমেশিয়ান উপকূল হয়ে যাচ্ছিলেন, সে সময় তারা ডাকাতের হাতে প্রাণ হারান, তারা জেরুজালেমে পৌঁছবার অর্ধেক পথও পেরোতে পারেন নি। ভারভা’র ওয়াল্টার সিডনে (আজকের লেবানন) খাওয়ার পথ খুঁজতে কয়েকজন নাইটের সঙ্গে বেরিয়েছিলন। তিনি আর ফিরে আসেন নি। এমনও হতে পারে তাকে আক্রমন করে খুন করা হয়েছিল, অথবা তাকে বন্দী করে মুসলমান দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি; হয়ত তার মৃত্যু খুবই সাধারণ ঘটনায় ঘটেছিল, পাহাড়ি রাস্তায় বর্ম পরা নাইট ঘোড়ার রেকাবে পা ফসকে খাদেও পড়ে যেতে পারেন (১৪)।
গোডেভেরে নামক এক অভিজাত মহিলার নাম পাচ্ছি, যিনি তার স্বামী বাউলিয়নের বল্ডউইনের সঙ্গে পূর্বের অভিযানে এসেছিলেন। তিনি মারাশের (আজকের তুর্কি) কাছে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুত তার অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ তিনি মৃত্যুর দিকে এগোতে এগোতে মারাই গেলেন। এই অভিজাত মহিলাকে, বাড়ি থেকে বহু দূরে এশিয়া মাইনরের এক গ্রামে, যে গ্রামের নাম তিনি বা তাঁর পূর্বজ কেউ কোনও দিন শোনেনি, কবর দেওয়া হল(১৫)।
এছাড়াও ছিলেন চারত্রেসের যুবা নাইট রাইমবোল্ড ক্রেটনস। তিনি জেরুজালেমে পৌঁছেছিলেন, শহরের যুদ্ধে অংশও নিয়েছিলেন। দেওয়ালে মই লাগিয়ে শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে ঢোকা প্রথম নাইট তিনি। কিন্তু যারা জেরুজালেমের প্রতিরক্ষায় ছিলেন তাদের একজন প্রথমে এক হাত পরে আরেক হাত কেটে দেন। শেষ অবদি রাইমবোল্ড জেরুজালেমের পতন দেখা অবদি বেঁচেছিলেন(১৬)।
শেষে আমরা বলব যাদের জীবন গৌরবে শেষ হয়েছিল, প্রথম ক্রুসেডের সব থেকে বড় সেনাপতিরা যেমন বোহেমঁদ, তুলোসির রেমঁদ, বাউলিয়নের গডফ্রে এবং বল্ডউইন, ট্যাঙ্করিড এবং উপস্থিত অন্যান্যদের চেষ্টায় পবিত্র শহর জেরুজালেমের পতন ঘটলে এদের নাম ইউরোপের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল মুক্তিদূতের মত করে। তাদের অবদান উল্লিখিত হয়েছে ইতিহাসে গানে কবিতায় এবং নতুন ধরণের সাহিত্য — মধ্যযুগের প্রেমগাথায়। তাদের সাফল্য পরের ক্রুসেডগুলোর জন্যে গজকাঠি হয়ে দাঁড়াল, যে উচ্চতার সাফল্য বারবার অনুসরণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। (চলবে)