The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
পাঁচ
দুর্যোগের মুখোমুখি
খুব কম প্রবীণ আমলা এই উথালপাথাল থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন। জর্জ প্যালাইওলোগোস এবং জন ডাউকাসের সাম্রাজ্য সেবায় আরও কিছু দেওয়ার ছিল। জর্জ, ক্রুসেডের সময় ক্রুসেডারদের সঙ্গে যে দরকষাকষি চলছিল, সেই কাজে সম্রাটের দক্ষিণহস্ত হিসেবে তিনি আবির্ভূত হলেন এবং উৎসাহী হয়ে সম্রাটের স্বার্থ রক্ষার কথা বলবেন এবং কন্সট্যান্টাইন ডালাসিনোসের সাথে পশ্চিম এশিয়া মাইনর (৭৩) উদ্ধারে বড় ভূমিকা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন (৭৪)। কিন্তু প্রবীন আমলাদের সরিয়ে দেওয়া খুবই ঝুঁকির কাজ হল। যারা ডাওজেনিসের বিদ্রোহে সরাসরি বা পরোক্ষে সমর্থন মদদ দিয়েছে, বা যারা প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, তাদের সক্কলকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই ঝুঁকির কাজ ছিল। আমরা দেখলাম বিদ্রহে যুক্ত সক্কলকে এক ঝটকায় সরিয়ে না দিয়ে সময় নিয়ে খেপে খেপে আমলাদের সরানো হল। উদাহরণস্বরূপ নিকেফোরোস মেলিসেনোসকে বিদ্রোহের পরেও ১০৯৫-এর বসন্তে তাকে দেখা গেচ্ছে স্তেপের কুমান যাযাবরদের বিরুদ্ধ অভিযানে, সেই অভিযানে তিনি সারাক্ষণ নতুন সেনানায়কদের নজরদারিতে ছিলেন এবং তার পরে আর তার কোনও খবর আর পাওয়া যায় না (৭৫)।
এতসব প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়ে আলেক্সিওস বিপজ্জনকভাবে ক্ষমতায় টিকে রইলেন। তার বিপদ আরও বাড়ল, শোনা গেল ১০৯৫-তে কুমান সর্দার বিধ্বংসী টোগোরটক ডানিয়ুব অতিক্রম করে সাম্রাজ্য আক্রমনে অভিযান করবেন। আরও গুজব ছড়িয়ে পড়ছিল, কুমানদের সঙ্গে রয়েছে সম্রাট চতুর্থ রোমানসের অন্যতম পুত্র লিও ডিওজেনিস। সাম্রাজ্যে যে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং তার ভাই নিকেফোরোস ডিওজেনিস বিদ্রোহের দরজা খুলে দিয়ে দিয়েছে, তাই সুকলে যৌথভাবে সাম্রাজ্যের সেই সব ফাটল অবলম্বন করে আক্রমন শানাবে। থ্রাস নামক শহর বহুকাল অবরোধ করা এদ্রিয়ানোপল যেমন কুমানদের এই সাম্রাজ্য অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তেমনি যাযাবরেরা বল্কানের অন্যান্য এলাকায় আক্রমনের ধার বাড়াচ্ছে (৭৬)।
তখনও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল এশিয়া মাইনর নিয়ন্ত্রণে রাখা, বিশেষ করে নিকাইয়া উদ্ধার। এর আগে এলেক্সিওসের পক্ষে নিকাইয়া শহর বল প্রয়োগে, ঘুষ দিয়ে বা নিরাপত্তায় ফাঁকফোঁকর খুঁজে দখল করার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে (৭৭)। তার হাতে একটাই সমাধান বাকি আছে — দীর্ঘকালীন অবরোধ। কিন্তু তার জন্যে বিপুল পরিমান সৈন্য প্রয়োজন, বিশেষ করে সেই সব সেনা, যাদের এই ধরণের বিপুল বিশাল সুরক্ষিত শহরের নিরাপত্তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। সেই ধরণের উদ্যমী মানুষ আর প্রযুক্তি খুঁজে বার করার একটা সূত্র আলেক্সিওসের জানা ছিল।
ছয়
পূর্বের ডাক
প্রথম ক্রুসেডের পূর্ব দশকগুলিতে খ্রিষ্টিয় একতার উত্তুঙ্গ বোধ তৈরি হচ্ছিল, একই সঙ্গে খ্রিষ্টিয় ইতিহাসের সঙ্গে অংশভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা ছিল এবং যে নিয়তি পূর্ব আর পশ্চিমকে মেলায় সে সবের প্রতি আকুল আকর্ষণ বোধ করছিল। এই ঘটনাগুলি ঘটছিল কারন ইওরোপজুড়ে অভিবাসন এবং চলাচল বেড়ে চলছিল দ্রুতবেগে এবং একই সঙ্গে বাইজান্টাইন প্রচারাভিযানও এই ধারণাগুলি তৈরিতে খুবই সাহায্য করছিল।
এই সবের মধ্যে প্রধান উদ্যম ছিল পূর্ব-পশ্চিমের মিলনের আকুতি, কিন্তু বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্মদ ইচ্ছা ছিল পশ্চিমি নাইটদের কন্সট্যান্টিনোপলে আকর্ষণ করা এবং এই আদানপ্রদান একাদশ শতাব্দে অনেক বেশিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছিল। যে সব ব্যক্তির উদ্দেশ্য যশ কামানো আর অর্থ রোজগার, তাদের এই ধরণের উদ্যমে আকর্ষণ করতে লন্ডনে কর্ম খুঁজে দেওয়ার আপিসও তৈরি হয়। বাইজান্টাইন কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, যোগ্য মানুষকে কন্সট্যান্টিনোপলে যথেষ্ট রসেবশে রাখা হবে (১)। সম্রাটের খিদমতে আসা ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা করার জন্যে দোভাষী রাখা হল কন্সট্যান্টিনোপলজুড়ে (২)।
পশ্চিমে কখোনো কখোনো এমনও অবস্থা উদ্ভুত হতে শুরু করল যে ক্রুসেডে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করা দুঃসাহসিক অভিযাত্রীসুলভ মানুষের সংখ্যা সীমিত করা যাচ্ছিল না, বরং ক্রুসেডে অংশ নিতে ইছুক মানুষের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়তে শুরু করছিল দ্রুত গতিতে। একাদশ শতকের শেষের দিকে নরম্যান্ডির প্রভাবশালী বিক মঠের এবট এবং পরে ক্যান্টাবেরির আর্চবিশপ, আনসেল্ম উইলিয়ম নামক জনৈক যুবা নাইটকে চিঠি লিখে ইঙ্গিত দিলেন সকলেই মনে করছে বাইজান্টিয়াম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে খুবই লোভনীয় পুরষ্কার অপেক্ষা করছে। আনসেল্ম তাকে পরামর্শ দিয়ে লিখলেন, বাছা হে, এই উদ্যম কোনওরকম লোভনীয় প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হওয়ার নয়, সর্বশক্তিমান তোমার জন্যে যে পরিকল্পনা এবং লক্ষ্য স্থির করে রেখেছেন, সেই সত্যকারের ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে নিজের জীবন সাজাও, এবং [পূর্বে যাওয়ার নাইট না হওয়ার পরিকল্পনা করে] সন্ত হও। উইলিয়াম হয়ত তাঁর পরামর্শ অনুসরণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু যতদূর সম্ভব সে এবটের সন্ত হওয়ার অনুরোধ মানে নি — একই চিঠিতে আমরা জানতে পারি তার দাদা কন্সট্যান্টিনোপলের দিকে যাত্রা করে, হয়ত উইলিয়ামও তার পদচিহ্ন অনুসরন করে (৩)।
আলেক্সিওস সিংহাসনে আরোহন করার আগেই বাইজান্টিয়ামে পশ্চিমি নাইটদের বৃহত্তরভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সেনা বাহিনীতে বিপুল সংখ্যায় পদাতিক বাহিনী ছিল, কিন্তু সেই অঞ্চলে পশ্চিমি যুদ্ধ প্রকরণ এবং অশ্বারোহী সেনার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। পশ্চিমে বর্ম বিষয়ক প্রযুক্তির বিকাশের ফলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিশাল ভারি বর্ম তাকে আরও ক্রিয়াশীল প্রভাবী হয়ে উঠতে খুবই সাহায্য করবে। এছাড়াও যুদ্ধ বিষয়ক নিত্য নতুন রণনীতির বিকাশ ঘটায়, অশ্বারোহী বাহিনী ব্যুহ রচনা করে সারিবদ্ধভাবে এগোনো বা পশ্চাদপসরণ অথবা বিরাপত্তা বিধান করা যুদ্ধের ফলাফলকে অনেক বেশি প্রভাবিত করতে শুরু করে (৪)। যুদ্ধক্ষেত্রে পশ্চিমিদের নিয়মানুবর্তিতা, দ্রুতগামী পেচেনেগ এবং তুর্কিদের হতভম্ব করে দেয় কারন যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের মৌল উদ্দেশ্য সাধারণত বিপক্ষকে ভাগ করে ফেলে মূল বাহিনী থেকে যারা ছিটকে পড়ে তাদের আক্রমন করা।
কিন্তু কন্সট্যান্টিনোপলের জনগণ বিদেশ থেকে আগত উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনা দলের মানুষদের সুনজরে দেখছিল না। ১০৫০-এর দশকে হার্ভে ফ্রাঙ্কোপোলাস (আক্ষরিক অর্থে ফ্রাঙ্কের [ফরাসী] পুত্র) এশিয়া মাইনরে তুর্কি আক্রমন সফলভাবে রুখে দেওয়ায় পুরষ্কারস্বরূপ সম্রাটের পক্ষ থেকে হাত খুলে ভূসম্পত্তি, উপাধি এবং অন্যান্য উপহার ভরিয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এতই উচ্চগ্রামে প্রতিবাদ হয় যে শেষ অবদি তাকে গলায় পাথর বেঁধে ভূমধ্যসাগরে আত্মাহুতি দিতে বাধ্য হতে হয় (৫)। রবার্ট ক্রিসপিন আরেক পশ্চিমি, যার তীব্র সফলতা বাইজান্টিয়াম অভিজাতদের কাছে অপ্রিয় করে তোলে — তিনি প্রাণ হারান তুর্কদের বিপক্ষে যুদ্ধের মাঠে নয়, বরং কন্সট্যান্টিনোপলের ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বীর তরোয়ালের ঘায়ে এবং সে সময় ইওরোপজুড়ে অন্তত তাকে হত্যা করার গুজবটাই দাবানলের মত ছড়িয়ে যাছিল (৬)।
একাদশ শতকের শেষের দিকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটতে থাকলে, আলক্সিওস আরও বেশি বেশি করে সাম্রাজ্যের বাইরে থেকে পশ্চিমি শক্তির দিকে সাহায্যের আশায় হাত বাড়াতে থাকেন। ১০৯০-এর দশকে ইওরোপের সমসাময়িকেরা কন্সট্যান্টিনোপল থেকে নিয়মিত ছড়িয়ে দেওয়া তীব্র উদ্বেগী আহ্বান পাচ্ছিলেন। অরার এক্কেহার্ডের সূত্র থেকে জানতে পারছি, ‘কাপ্পাডোসিয়া থেকে সমগ্র রোমানিয়া এবং সিরিয়ায়’ যে তীব্র গোলোযোগ শুরু হয়েছে, তার থেকে উদ্ধার পেতে নতুন সেনা নিয়োগের আহ্বান জানিয়ে মরিয়া আলেক্সিওস ‘নিজের চোখে দেখা’ দূতেদের এবং চিঠিপত্র পাঠাতে শুরু করেছিলেন (৭)। আরেকজন সমসাময়িক বিষয়ে প্রভূত জ্ঞানওয়ালা পঞ্জিকাকার লিখলেন ‘শেষ অবদি কন্সট্যান্টিনোপলের আলেক্সিওস নামে এক সম্রাট, বিধর্মীদের নিরন্তর আক্রমনে তীব্রভাবে কাঁপতে থাকলেন এবং তার সাম্রাজ্যের একাংশ ধ্বংস হয়ে গেল এবং তিনি ফ্রান্সে চিঠি পাঠিয়ে রাজাদের বিপন্ন গ্রিসকে উদ্ধার করতে আগ্রহী কর তোলেন (৮)’। (চলবে)