The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
ছয়
পূর্বের ডাক
ফ্লান্ডারসের কাউন্ট, রবার্টও এই ধরণের চিঠি পাচ্ছিলেন। প্রতিদিন নিরন্তর সম্রাটের থেকে এ ধরণের জরুরি বার্তা আসছে, সে বার্তায় লেখা থাকছে [সেখানে] অগণন খ্রিষ্টাবলম্বী মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে; যুবা থেকে বৃদ্ধ, অভিজাত থেকে কৃষক, পাদ্রি থেকে সন্ত তুর্কদের হাতে বিকৃতকামের পাপে নিমজ্জিত হচ্ছে; অন্যদের বাধ্য করা হচ্ছে সুন্নত করতে; অভিজাত কন্যা আর বয়স্কা মহিলাদের ধর্ষণ করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আলেক্সিওসের চিঠিতে বললেন, গ্রিসিয় খ্রিষ্টদের সব থেকে পবিত্র সাম্রাজ্য চতুর্দিক থেকে পাগানের দল ঘিরে ধরেছে (৯)।
তুর্কিদের অত্যাচারের বর্ণনা এবং খ্রিষ্টিয় জনগণের দুর্ভোগ স্বাভাবিকভাবে পশ্চিম দেশগুলোজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিচ্ছিল। ১০৯০-এর প্রথমের দিকে যখন নিকোমিডিয়া আক্রমনের মুখোমুখি হচ্ছে, আলেক্সিওসের বার্তায় আরও বহু জরুরি কথা লেখা থাকছিল। তিনি ‘কান্না ভেজা গলায়, দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, হাত জড়ো করে, চোখে জল এনে খ্রিষ্টিয় ভাইদের বাঁচাবার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখে সম্রাট সম্ভাব্য সব জায়গায় দূত পাঠালেন’ এবং সে সব চিঠিতে চার্চ গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং দীক্ষা বেদী অপবিত্র করা শয়তানদের সবক শেখানোর আহ্বান জানালেন। আমরা এর আগে দেখেছি ফ্লান্ডার্সের রবার্ট একটা পশ্চিমি বাহিনী তৈরি করে আরম অব সেন্ট জর্জের থেকে বহুদূরে শহর নগর উদ্ধার করেছিলেন এবং সেই উদ্ধারকর্ম বিস্তৃত হল গালফ অব নিকোমিডিয়া অবদি (১০)।
পবিত্র সন্তদের দৌত্য বাহিত হয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য পতনের সংবাদ ইওরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল দ্রুতলয়ে (১১)। সে সময়ের পূর্বের দেশগুলোয় বাস করা খ্রিষ্টিয়দের আপাদমস্তক চেনা এক পঞ্জিকাকার লিখলেন, ‘বলা দরকার গ্রিক আর আরমেনিয়রা তুর্কিদের হাতে কাপ্পাডোসিয়া, রোমানিয়া [বাইজান্টিয়াম] এবং সিরিয়ায় বিপুল এবং তীব্র নিপীড়নের সম্মুখীন হচ্ছে (১২)’। অন্যান্য সমীক্ষা অত্যাচারের কথা আরও নির্দিষ্টভাবে বলছিল। সমকালীন এক লেখক লিখলেন, তুর্কিরা প্যালেস্টাইন, জেরুজালেম, পবিত্র সেপুলচারে প্রবেশ করেছে, আরমেনিয়া, সিরিয়া এবং গ্রিসের একাংশ দখল করেছে (১৩)। পশ্চিম এটাও জানত যে ভূস্বামীরা জমি হারানোর ফলে খুবই বিপদে পড়েছে (১৪)।
বাইজান্টিয়ামে ঘটেচলা বাস্তব ঘটনাবলী আরও বেশি বেশি করে মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়ার গতি বাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে ইওরোপে, ঠিক যখন দ্বিতীয় আরবান ১০৯৫-এর শীতে ক্লেয়ারমঁতে তার বক্তৃতাটা দেবেন এবং উপস্থিত জনারণ্যের জন্যে যে বক্তৃতার বিষয় নিয়ে আদৌ ভূমিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। তার বক্তৃতার একাংশের একটা সংস্করণ বলছে ‘তোমার পূর্ব দেশের ভায়েদের জন্যে নিশ্চই তোমরা সাহায্য নিয়ে যেতে প্রস্তুত, এবং তোমাদের সেই সাহায্য তারা প্রার্থনা করছে। পারসিক তুর্কিরা তাদের আক্রমন করেছে, তোমাদের অধিকাংশ জেনে গিয়েছ ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের যে অংশটাকে আর্ম অব সেন্ট জর্জ বলা হয়, সেই রোমক অংশ অবদি তারা ঢুকে এসেছে। তারা খ্রিষ্টান জননগণের একের পর এক জমি দখল করছে, সাতটা যুদ্ধে তারা খ্রিষ্টিয়দের হারিয়েছে, বহু মানুষকে খুন করছে, গ্রেফতার করেছে, চার্চ ধ্বংস করেছে, এবং সর্বশক্তিমানের রাজত্ব ধ্বংস করছে (১৫)’। পূর্বের সাম্রাজ্যের খুবই দ্রুত পতন ঘটতে থাকা এবং অন্যান্য যুদ্ধ সংবাদ পশ্চিমে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম উপাদান ছিল ১০৯০-এর দশকজুড়ে পশ্চিমের সাহায্য পাওয়ার আশা করে আলেক্সিওসের নিরন্তর পাঠানো হাজার হাজার চিঠি।
পশ্চিমে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগেই তথ্য আসছিল না, একাদশ শতকের শেষের দিকে ইওরোপ থেকে যে সব মানুষ বা দল জেরুজালেম বা কন্সট্যান্টিনোপলে তীর্থ করতে যাচ্ছে, তারাও পূর্ব দেশের খবরের অন্যতম সূত্র হয়ে উঠল। ১০৮৯-এ ফ্লান্ডার্সের রবার্ট দল নিয়ে পবিত্র ভূমি থেকে ফেরার সময় নিজের চোখে কিছু ধ্বংসক্রিয়া দেখেছেন। আপুলিয়ার উইলিয়াম, একাদশ শতাব্দের শেষে দক্ষিণ ইতালিতে তিনি যখন লেখালিখি করছেন সে সময় চার্চ ধ্বংস অথবা খ্রিষ্টানদের ওপর অত্যাচার ইত্যাদির নানান সংবাদ তাঁর কাছে নিয়মিত আসছে, কিন্তু তিনি মনে করছেন এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বাইজান্টাইন সম্রাট, তিনি নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্যে তুর্ক ইত্যাদি সাম্রাজ্যের সঙ্গে এত বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছিলেন সে সেই জট থেকেই বক্ষ্যমান সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছিল (১৬)। সুলেইমানের সঙ্গে এবং বিশেষ করে আলেক্সিওস মালিক শাহের সঙ্গে জোট তৈরি করার পর থেকে ইওরোপে এই ধরণের ভাবনা চিন্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু ইওরোপে, পূর্বের সাম্রাজ্যের যে সার্বিক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল তার থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার পূর্ব থেকে প্রবাহিত সংবাদ সূত্রগুলির প্রবাহ শুধুই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আর ছিল না।
কন্সট্যান্টিনোপল আর পবিত্র ভূমিতে তীর্থযাত্রীরা সঙ্গে করে হাহাকার আর দুর্দৈবের ঘটনাক্রম বয়ে নিয়ে এলেও, সে সব তথ্যর ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতি থেকে পরিষ্কার সার্বিকভাবে, বিপুল দক্ষতায় দক্ষতায় কোনও এক কেন্দ্র থেকে সংবাদ বিস্তারের নেওয়া হচ্ছিল এবং সেই উদ্যমের ফল ফলছিল। এগুলির বিষয়, আর্তি এবং বার্তার সাযুজ্য লক্ষ্যণীয় — পূর্ব দেশের চার্চ ধ্বংস হচ্ছে; খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা, বিশেষ করে পুরোহিতদের ওপর বিপুল অত্যাচার নেমে আসছে; এশিয়া মাইনর পতনের মুখে, তুর্কিরা আরম অব সেন্ট জর্জের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে; এবং এই বার্তাগুলোর সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা জরুরি বার্তা যাচ্ছিল যে বাইজান্টাইন কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করছেন। কেন্দ্রিয়ভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য একই বার্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমের দেশগুলিতে তার মত করে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, জেরুজালেমের অবস্থা ক্রমশ দুর্বিসহ হয়ে ওঠার তথ্য জুড়ে থাকত বার্তাগুলির মধ্যে। একাদশ শতকের শেষে প্যালেস্টাইন এবং পবিত্র শহরের অবস্থা বিপজ্জনক অবস্থার দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। শুরুর দিকে যদিও তুর্কিরা অমুসলমান জনগণের ওপর যথেষ্ট সহনশীলতা দেখানেও, ১০৭০-এ কায়রোর ফাতিমিয়দের হাত থেকে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার সুন্নি তুর্কি আর ফাতিমিয় শিয়াদের মধ্যে বিবাদ বাড়তে থাকে। ১০৮৯-এ ফাতিমিয়রা উপকূল অঞ্চলে অভিযান করে বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে এবং ১০৯১-এর যুদ্ধে জনৈক তুর্কি সেনানায়কের মৃত্যু ঘটলে উদ্বেগ আরও বেড়ে চলে। এই দ্বন্দ্বগুলি স্থানীয় জনগণের ওপরে বিপুল প্রভাব ফেলে (১৭)। সংবাদে জানা যায় এন্টিওকে গ্রিসিয় এবং আর্মেনিয়দের বলপ্রয়োগে ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়, জেরুজালেমে খ্রিষ্টিয়দের ওপরে করভার বাড়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল অত্যাচারও (১৮)। ইহুদিদেরও নিশানা করা হচ্ছিল। ১০৭৭-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনাগগ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই সময়ের একটামাত্র পঞ্জিকৃত নথি পাওয়া গিয়েছে (১৯)।
সাম্প্রতিক কালের গবেষণায় আমরা আন্দাজ করতে পারি ১০৭০ এবং ১০৮০-র দশকে এই অঞ্চলের অমুসলমানের জীবন কী সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠছিল। আরবি সূত্র থেকে প্রথম ক্রুসেড শুরু আগেই জেরুজালেম, এন্টিওক এবং পবিত্র ভূমিতে দ্বন্দ্বের খবর পাঅয়া যাচ্ছে (২০)। দ্বাদশ শতকের আলেপ্পোর আরবি পঞ্জিকাকার লিখছেন, ফরাসি এবং বাইজান্টাইন তীর্থযাত্রীদের ‘সিরিয় জনগণ জেরুজালেম যেতে বাধা দিচ্ছে। তার মধ্যে যারা বেঁচে ফিরছে, তারা এই খবর নিজের দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেশগুলি সামরিক অভিযানের জন্যে নিজেদের তৈরি করতে শুরু করেছে (২১)’। আরেকজন লেখকের আন্দাজ, এন্টিওকের নতুন মনোনীত প্রশাসক ইয়াঘি-সিয়ানের খ্রিষ্ট জনগণের ওপর দুর্বব্যহার সুস্পষ্ট, এবং সেই কাণ্ডগুলোর নিশ্চিত প্রত্যাঘাত জরুরি হয়ে উঠছে (২২)। (চলবে)