The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
ছয়
পূর্বের ডাক
ফলে দিনের পর দিন পশ্চিমি তীর্থযাত্রীদের কাছে পবিত্র ভূমি যাওয়ার পথ আরও সমস্যাসঙ্কুল হয়েছে। দশম এবং একাদশ শতাব্দে জেরুজালেমে পশ্চিম থেকে তীর্থযাত্রার প্রবণতা বাড়তে থাকে। তার একটা বড় কারন হল পারিবারিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি, তীর্থক্ষেত্রে বৌদ্ধিক আকর্ষণ এবং মধ্যযুগে যাত্রা করার যে সব সমস্যা এবং বাধা ছিল, সেগুলি আরও বেশি বেশি করে সরে যেতে থাকা (২৩)। কিন্তু তীর্থ যাত্রীদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে এশিয়া মাইনর এবং লেভন্ট অঞ্চলে হিংসা বাড়তে শুরু করায়। পবিত্র ভূমি নিয়ে বহু বেদনাদায়ক গল্প ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং বলা হল তীর্থযাত্রীদের ওপর অত্যাচার, হিংসা নামিয়ে আনা হচ্ছে ব্যাপকভাবে আর অত্যাচারী তুর্কিরা তীর্থযাত্রীদের থেকে বিপুল জরিমানা আদায় করছে (২৪)। চুম্বকীয় ব্যক্তিত্বের ধর্মপ্রচারক পিটার দ্য হারমিট আতঙ্কগ্রস্ত জনগণের সামনে ছবির মত বুঝিয়ে বললেন কীভাবে তাঁর জেরুজালেমের পথের যাত্রার দিনগুলো তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হয়েছে (২৫)। এর সবের মধ্যেও সক্কলে যাত্রা বাতিল করেন নি। ফোইক্সের রজার ১০৯৫-তে পবিত্র শহরে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন এবং একবছর পরে ফিরে এসে দক্ষিণ ফ্রান্সের তার জমির দখল চাইলেন (২৬)। নরমান্ডির আরেকজন নাইট, এই ঘটনার গায়ে গায়ের সময়ে ফিরে এসে জুমিয়েজেসের এবিকে দান দিলেন (২৭)। কিন্তু তারা সংখ্যা লঘিষ্ঠ; জনৈক পঞ্জিকাকার লিখলেন ১০৯০-এর দশকজুড়ে তীর্থ যাত্রার পথের অবস্থা এতই খারাপ হতে থাকে যে, একের পর এক মানুষ তীর্থে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে থাকেন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে (২৮)।
পশ্চিম ইওরোপজুড়ে জেরুজালেম নিয়ে সে দুশ্চিন্তার পরিবেশ তৈরি হল, আলেক্সিওস সেই আতঙ্কের পরিবেশকে নিজের সমস্যা উদ্ধারে কাজে লাগালেন। একাদশ শতকে বহু পশ্চিম দেশের মানুষ কন্সট্যান্টিলোপলে বসবাস শুরু করেছেন, এর মধ্যে সাম্রাজ্যের সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের বহু উচ্চপদস্থ আমলাও রয়েছেন। পবিত্র শহর নিয়ে মানুষের মনে আবেগী মানসিক চাঞ্চল্য তৈরি হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া কী ঘটতে পারে, সেটা সম্রাট জানেন না এমন নয়। ফলে ১০৮৩-তে বাইজান্টিয়ামে প্রথম নরমান আক্রমন চূর্ণ করার প্রেক্ষিতে ‘ভয়ানক ফরাসি’দের সঙ্গে যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছিল সে বিষয়ে তিনি জেরুজালেমের বোহেমিয় প্যাট্রিয়ার্ক ইউথিমিওসকে নজরদারি করতে আমন্ত্রণ জানান। প্যাট্রিয়ার্কের উপস্থিতি জরুরি ছিল তার কারন তিনি দেখাতে চেয়ছিলেন এই ঘটনাটা তার সাম্রাজ্যের পক্ষে খুবই জরুরি এবং খ্রিষ্টিয় বিশ্বের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ একজন উপস্থিত থাকছেন (২৯)।
আরেকটা উদাহরণ পাচ্ছি সেসময়ের একটি স্লাভ লেখা থেকে। ১০৯১-এর শুরুতে ক্রোয়শিয়ার রাজা জভনিমিরের দরবারে আলেক্সিওস এবং দ্বিতীয় আরবান যৌথভাবে দূত পাঠান আঠারো মাস আগে কন্সট্যান্টিনোপলে অনুষ্ঠিত গ্রিক এবং ল্যাটিন চার্চের জোট তৈরি হওয়ার প্রেক্ষিতে। জভনিমিরের দরবারে পাঠানো রাজদূত ছবির মত বর্ণনা দিয়ে বলতে থাকে কীভাবে জেরুজালেম এবং পবিত্রভূমি উগুলি বিধর্মীদের হাতে পতন ঘটছে, সে সব এলাকার পবিত্র ক্ষেত্রগুলি অপবিত্র এবং ধ্বংস করছে। ‘খ্রিষ্ট জগতের পবিত্রতম সম্রাট, আমাদের ভ্রাতা জভনিমির, আমরা আপনাকে করজোড়ে প্রশ্ন করছি এবং অনুরোধ করছি খ্রিষ্টের এবং চার্চের প্রতি ভালবাসায়, আপনি আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন (৩০)’।
ফ্লান্ডারসের রবার্টকে ১০৯০-এর শুরুতে আলেক্সিওস যে বিতর্কিত চিঠিটি পাঠান তাতে তিনি মরিয়া হয়ে খুঁচিয়ে জেরুজালেম সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ করেন এই উদ্দেশ্যে যাতে পশ্চিম তার পরিকল্পনামত প্রতিক্রিয়া দেখায়। যদি খ্রিষ্টদের রাজধানী তুর্কদের হাতে পতন ঘটে তাহলে পবিত্র সেপুলচার চিরতরে হাতছাড়া হবে (৩১)। বাইজান্টিয়ামের রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপল এবং পবিত্র শহরের ভাগ্য একসাথে জড়িয়ে গিয়েছে সেটা আমরা জানতে পারি দ্বাদশ শতকের শুরুর সময়ের ইওরোপিয় পঞ্জিকায়। সন্ত রবার্ট লিখলেন ‘জেরুজালেম এবং কন্সট্যান্টিনোপল শহর থেকে খুবই ঝঞ্ঝাটময় খবর আসছে। পারস্য জাতি, বিদেশি এবং সররবশক্তিমান যাদের পরিত্যাগ করেছে… খ্রিষ্টিয় ভূমিতে সেনা অভিযান করেছে, সেই সব এলাকায় জনসংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে তাদের খুন, লুঠ, অপহরণ এবং অত্যাচার করে, অনেককে তাদের এলাকায় ধরে নিয়ে যাচ্ছে (৩২)’। এই বক্তব্যটা আমরা কন্সট্যাটিনোপলের সম্রাটের বার্তাতেও দেখেছি।
আলেক্সিওস জেরুজালেমকে সামনে রেখে পশ্চিমকে উদ্দীপ্ত করতে লড়াই চালালেন, সেটা তার ধূর্ত পরিকল্পনা। ইওরোপের খ্রিষ্টিয় নাইটদের উত্তেজিত করে তুলে প্রত্যাশামত প্রতিক্রিয়া তৈরি ভাবনায় জারিত। মাথায় রাখতে হবে ইওরোপের নাইটেরা ক্রমাগত প্রচারের ধাক্কায় ধর্ম সেবা এবং উপাসনা ইত্যাদি বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন। রবিবার, ফিস্টের দিনে এবং ছুটির দিনে যুদ্ধ বন্ধ রাখার যে ফতোয়া চার্চ দিয়েছিল তার ফলে নাইটদের মনোজগতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং দেশ জয়ের কার্যকলাপে খ্রিষ্টিয় নৈতিকতা প্রাধান্য পেতে শুরু করে (৩৩)। যদিও আলঙ্কারিক বক্তৃতা এবং বাস্তবতার মধে বিপুল ফারাক থাকে যেমন আমরা দেখেছি [ফ্রান্সের] চাত্রেসের [বিশপ] আইভোর ফতোয়া, যাকে বুধবার সূর্যাস্ত থেকে সোমবার সূর্যোদয় অবদি হিংসা ছড়াতে দেখা যাবে তাকেই চার্চ বহিষ্কার করবে — অবশ্যই এই ঘোষণা খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল — তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন এবং অধার্মিক জীবনে নির্দিষ্টভাবে প্রভাব ফেলার যে চেষ্টা চার্চ করে চলছিল তার প্রভাব ব্যক্তি ছাড়িয়ে সমাজে তীব্রভাবে পড়তে শুরু করে (৩৪)।
এরই প্রেক্ষিতে পূর্বদেশগুলোর দুর্দশার বার্তা প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জেরুজালেমের ঘটনাচক্র নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করাটা একাদশ শতকের শেষে একটা বিকারগ্রস্ততার পর্যায়ে পৌঁছে যায়; নানান ধরণের কথিত আসন্ন সর্বনাশ আর বিশ্ব ধ্বংসের বার্তার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছিল পবিত্র ভূমির ওপর আঘাত আর খ্রিষ্টজনগণের ওপরে আক্রমনের ভয়ের পরিবেশ। বন্যা, মন্বন্তর, গ্রহানুপাত, বিপুল বর্ষা, গ্রহণের মত দুর্যোগের ইঙ্গিতকে একযোগে বিশ্ব ধ্বংসের অমঙ্গলের ভাবনায় ইওরোপিয় জনগণ এমনিতেই প্রবলভাবে ধুঁকছিল (৩৫)। পোপ পশ্চিমি নাইটদের পূর্বের চার্চ রক্ষা করতে আহ্বান জানালে, এই সুযোগে পশ্চিমি নাইটেরা আরেকটা যুদ্ধের বাহানা তৈরি করে ফেলল। পূর্বের দেশে বিশ্বাসীদের রক্ষা করতে এবং একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক উপঢৌকন অর্জন করতে যে প্রস্তাবনা চার্চ থেকে ঘোষিত হল, তার থেকে বেশি একজোট হওয়ার উত্তেজকর এবং প্ররোচনামূলক আহ্বান আর কোনও কিছুতেই হতে পারত না।
আলেক্সিওস কন্সট্যান্টিনোপল এবং জেরুজালেমকে ঘিরে যে পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন আর পবিত্র শহর এবং তার সাম্রাজ্যের রক্ষক রূপে তিনি যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন কর চলছিলেন সেটা সে সময়ের দক্ষিণ ইতালিতে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। একটি পঞ্জিকা, আজকের গবেষণায় যেটির লেখক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে লুপুস প্রোটোসপাথারিয়াসকে, সেই নথি থেকে জানতে পারছি পশ্চিম ইওরোপ থেকে ১০৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পূর্বের দিকে রওনা হওয়ার অন্যতম বড় কারন হল, ‘পাগানদের বিরুদ্ধে সম্রাট আলেক্সিয়াসের যুদ্ধে সহায়তা করা এবং একই সঙ্গে হয়ত জেরুজালেমের পবিত্র সমাধি অবদিও পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার উদ্যম (৩৬)’। মোনসের গিলবার্ট একইভাবে লিখছেন পবিত্র শহরের দুর্দশায় কন্সট্যান্টিনোপল থেকে বিভিন্ন রকম দূতিয়ালি সাহায্য পাঠানো হত (৩৭)। পরের দিকের এক লেখক জানাচ্ছেন আলেক্সিওস জেরুজালেমের সমস্যাকে যে নিজের স্বার্থপূরণে কাজে লাগিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর কোনও সন্দেহ নেই। ত্রয়োদশ শতকের থিওডোর স্কুটারিওটিস জনাচ্ছেন, ‘তিনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে ইতালিয়দের বন্ধুত্বের বাঁধনে বেঁধে নিতে হবে এবং তার জন্যে তিনি যথেষ্ট চালাকি করেছেন’। সম্রাট জানতেন পশ্চিম ইওরোপে জেরুজালেম নামটির বিপুল প্রতিপত্তি রয়েছে এবং তিনি সেটার সুযোগ নেবেন ‘এই কারনে, তাদের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ আয়নিয়ান সমুদ্র পেরিয়ে খুব দ্রুত কন্সট্যান্টিনোপলে পৌঁছে যান (৩৮)’। (চলবে)