The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
ছয়
পূর্বের ডাক
কিন্তু গ্রেগরির পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাক্রম এগোল না — অবশ্যই মানুষের উৎসাহ ছিল; পোপের সরব আবেদন পশ্চিমের বেশ কয়েকজন প্রখ্যাতর অনুভূতিকে স্পর্শও করেছিল। একুইটিনের ডিউক পোইটুর কাউন্ট, উইলিয়াম, জানালেন সন্ত পিটারের নির্দেশক্রমে খ্রিষ্টদের শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে প্রস্তুত (৬৫)। টাস্কানির কাউন্টেস, বিয়াত্রিচে আর বাউলিয়নের গডফ্রেও যাত্রা করতে প্রস্তুত ছিল বলে জানিয়েছিলেন (৬৬)। সমস্যা হল গ্রেগরির সঙ্গে দরকষাকষি চলার সময় ১০৭৪-এ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য, নরমান নেতা রবার্ট গিসকার্ডের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করে (৬৭)। এই রাজনৈতিক পালা বদলের ফলে পোপ গ্রেগরি ইতালিতেই শুধুই একা হয়ে পড়েন তাই নয়, পশ্চিমি আর পূর্বের চার্চের মধ্যে যে সংযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে নাইটদের কাছে যুদ্ধ আবেদন করা হয়, সেই সামগ্রিক ব্যবস্থাটাই সমস্যায় পড়ল। গ্রেগরিকে বাধ্য হয়ে বিব্রতকর পরাজয় মেনে নিতে হল। পোইটুর কাউন্ট বা অন্যান্যরা পোপের ডাকে যে পূর্বদিকের অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সে সব নিয়ে আর কারোর মাথাব্যথা রইল না। পোইটুর কাউন্ট লিখলেন, ‘গুজব উঠেছে সমুদ্র পারে সর্বশক্তিমানের সদিচ্ছায় খ্রিষ্টিয়রা পাগানদের বর্বরতা রুখে দিয়েছে, আমরা এখনও অবদি আরও কী করতে পারি, সে সব নির্দেশের জন্যে সর্বশক্তিমানের আদেশের অপেক্ষা করছি (৬৮)’। ১০৭৪-এ এশিয়া মাইনরে কোনও সামরিক সাফল্য আসে নি, এবং সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক অবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটা নিয়ে পোপ যে দাবি করেছিলেন তার কোনও সারবত্তা ছিল না। গ্রেগরি যতটা পারা যায় ঘটনার ওপর পর্দা ফেলার কাজে মনোনিবেশ করে চলছিলেন।
১০৯৫-তে আলেক্সিওস তার পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যে সময় পোপের কাছে রাজকীয় দূত পাঠানোর মাধ্যমে আলাপআলোচনার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চাইছিলেন, সে সময়ই দুটো ঘটনা ঘটল। প্রথমত কন্সট্যান্টিনোপলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা অস্বাভাবিকভাবে খারাপ হতে চলেছে। সপ্তম গ্রেগরিকে যে বার্তা আলেক্সিওসের পূর্বজ সম্রাট পাঠিয়েছিলেন তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইতালির রাজনীতিতে বাইজান্টাইনদের নষ্ট অবস্থানকে সারাই করা, কিন্তু দ্বিতীয় আরবানকে আলেক্সিওস যখন বার্তাটি পাঠালেন তখন তার সসেমিরা অবস্থা। ১০৯৫এর মার্চে তাঁর দূতেরা পোপকে পিয়াসেঞ্জায় চার্চ কাউন্সিলের সম্মেলন স্থলে দেখা করেন। তিনি সেখানে ঘোষণা করেন ‘কন্সট্যান্টিনোপলের দূত এই সিনোডে এসেছেন এবং মহামহিম পোপ এবং খ্রিষ্ট অনুগামীদের অনুরোধ করেছেন পবিত্র চার্চের নিরাপত্তা বিধানে তাঁকে সাহায্য করতে এবং সেই অঞ্চলে চার্চগুলি বিধর্মীদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে, তারা কন্সট্যানন্টিনোপলের দেওয়ালে এসে প্রায় ধাক্কা মারছে (৬৯)’। দুদশক আগে যে বার্তা এসেছিল, এবারের বার্তাটার গুরুত্ব অনেক বেশি, কারন বার্তাটি এশিয়া মাইনরে তুর্কি আক্রমনের তীব্রতা এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অক্ষম প্রতিক্রিয়ার বাস্তব ঘটনার ওপর নির্ভর করে পাঠানো হয়েছিল। আলেক্সিওসের দূত পোপকে যে বার্তা দিয়েছিল, বাস্তব ঘটনা তার থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে ছিল; সম্রাটের দূত ১০৯৪-এর ডাওজেনিসের চক্রান্ত নিয়ে একটাও শব্দ খরচ করেন নি। বলা যেতে পারে এই সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঁশপাতার মত কাঁপছিল।
দ্বিতীয় পার্থক্যটা হল পোপ সপ্তম গ্রেগরি নিজেকে খ্রিষ্ট জগতের উদ্ধারকারী হিসেবে উপস্থিত করে যে সুযোগটা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, ১০৯০-এর মাঝখানের সময়ে, ঠিক একই রাস্তা ধরে দ্বিতীয় আরবান মরিয়া হয়ে বাইজান্টাইনের অবস্থাকে নির্ভর করে তার রাজনৈতিক অবস্থা জোরদার করার চেষ্টা করছিলেন। তার পূর্বের পোপ শুধু দুটি চার্চ পক্ষকে জোড়ার চেষ্টায় ছিলেন এবং সেটা করলে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতমাত্র, কিন্তু আরবানের ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি অস্তিত্বরক্ষাকারী ছিল শক্তিশালী বিরুদ্ধপক্ষ এবং প্রতিযোগী পোপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটা অভিযানকে সফল করে দেখানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল। সময়টা তার পক্ষেও ছিল। বাইজান্টিয়াম ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মুখে দাঁড়িয়ে আলেক্সিওস সাহায্যের মরিয়া আবেদন করছেন, ইতালির রাজনৈতিক অবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটছে, একইসঙ্গে চতুর্থ হেনরির স্ত্রী এবং পুত্রের মত উচ্চক্ষমতাশালীদের পক্ষ পরিবর্তন ঘটছে। নতুন রাজনৈতিক অবস্থায় আরবান সাফল্যের মুখ দেখতে উত্তেজিত হয়ে ঈঠেন এবং তার এই উত্তেজনার ফলশ্রুতিতে আলেক্সিওস দীর্ঘজীবন লাভ করবেন।
পোপ বুঝতে পারলেন তার সামনে আচম্বিতে ঘুরে দাঁড়াবার অসামান্য এক সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে। তার রাজনৈতিক অবস্থা ক্রমশ জোরদার হতে শুরু করায় তিনি ফ্রান্স ভ্রমণে বেরোবার পরিকল্পনা করলেন। পিয়াসেঞ্জায় সম্রাটের দূতের হাতে বাহিত বার্তায় পোপকে যে সক্রিয় হওয়ার আবেদন ছিল, সে বিষয়ে তিনি দ্রুত এবং স্পষ্ট পক্ষ নিলেন, ‘Our Lord Pope called on many to perform this service, to promise by oaths to betake themselves [to Jerusalem] by God’s will and to bring the emperor the most faithful assistance against the heathen to the limits of their ability (৭০)’। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নীতি, কাজের বর্ণনা ইত্যাদি দিয়ে চিঠি না লিখে পূর্ব ভূমধ্যসাগর এলাকার অবস্থা বদলানোর জন্যে মানুষদের উতসাহিত করতে তিনি নিজে সশরীরে অবতীর্ণ হবেন। তিনি কী করতে চাইছেন, স্পষ্টভাবে জানেন। সে সময়ের এক পঞ্জিকাকার লিখছেন, ‘তিনি যখন শুনলেন রোমানিয়ার অক্ষহৃদয় তুর্কিরা দখল করেছে এবং খ্রিষ্টিয়দের ওপরে হিংসক আক্রমন নেমে আসছে, আরবান দয়ার্দ্র হৃদয়ে এবং সর্বশক্তিমানের ভালবাসার ওপর নির্ভর করে পাহাড় পেরিয়ে গল অঞ্চলে উপস্থিত হলেন এবং ক্লেরমঁর ওভের্ন অঞ্চলে সমবেত হলেন (৭১)’।
এই সেই মুহূর্ত যখন পোপের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ঘোষিত হবে। পোপের মানসিক শক্তি, ফ্রান্স জুড়ে নানানস্তরের নেতৃত্বকে বুঝিয়ে উদ্যমী করে তোলার ক্ষমতা এবং বাইজান্টিয়াম অভিযানের জন্যে বাহিনী তৈরি করানোর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। (চলবে)