The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
ক্রুসেডের ভিত্তিভূমি গড়ে উঠল নিরবিচ্ছিন্ন আবেগ, চূড়ান্ত ধর্মীয় উদ্দীপনা আর দুঃসাহস দেখিয়ে দেওয়ার সক্রিয় কাঠামো রূপে। ক্রুসেডের অভিযানে যোগ দেওয়া অধিকাংশ অভিযাত্রীর মনে কাজ করেছে পোপ দ্বিতীয় আরবান বর্ণিত খ্রিষ্টিয়দের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা এবং আত্মমুক্তির আশা। তাছাড়া যে দ্রুততা আর উদ্যমে ক্রুসেডের অভিযান শুরু হল, সেটিকে মহান, স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান ছাড়া অন্য কোনও অভিধা দেওয়া আজ আর সম্ভব নয়। তাসত্ত্বেও বলতে হবে ক্রুসেডের পিছনে ছিল বিস্তৃত সুচারু পরিকল্পনা — পশ্চিমকে জাগিয়ে তোলার আলঙ্কারিক বাক্যবন্ধ এমন সুচতুরভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে যোগ্য সামরিক এবং সামাজিক যোগাযোগওয়ালা ক্রুসেডার পাওয়া সহজ হয়েযায়; একই সঙ্গে অভিযানের খুঁটিনাটি বিষয় মাথায় রেখে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হল, যাতে পবিত্র ভূমিতে অভিযানের জন্যে নিয়মিত সেনা যোগানের প্রক্রিয়া শুকিয়ে না যায়। আরবান খুবই কঠিন কাজ সাধন করছিলেন — বাইজান্টাইন সামরিক উদ্দেশ্যপূরণে দক্ষ, নিয়ন্ত্রণযোগ্য সেনাবাহিনী তৈরি করতে চূড়ান্ত গণউদ্দীপনা তৈরি করা। পশ্চিমের সেনাবাহিনী তৈরি করার উদ্যম আদতে একটি অসামান্য রাজনৈতিক এবং রসদ সরবরাহ প্রক্রিয়া জটিলতা (logistical intricacy) — এটি এমন এক জটিল তুল্যমূল্য ভারসাম্য রাখার কাজ, যে প্রক্রিয়া শেষ অবদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশংকা শতগুণে ক্রিয়াশীল থাকে।
দক্ষিণ ফ্রান্সে আরবান পৌঁছলেন ১০৯৫-এর জুলাইতে। পরের মাস জুড়ে তিনি সেখানে থানা গেড়ে অভিযানের ভিত্তিভূমি তৈরি করার কাজে সময় ব্যয় করবেন। দেশজুড়ে বিখ্যাত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈঠকের পর বৈঠক চলল, প্রত্যেক বৈঠকে পোপ তার চাহিদা বার বার উল্লেখ করলেন — প্রথমত তুর্কিদের খ্রিষ্টিয় এলাকা থেকে বার করে দেওয়ার কাজ সম্পাদন করা তারপরে পূর্বাঞ্চল এবং শহর জেরুজালেমে খ্রিষ্টিয় জনগণের মুক্তি দান। পূর্বাঞ্চলের খ্রিষ্টিয় জনগণের মুক্তি বলতে বাস্তবের মাটিতে কী বোঝায় সে বিষয়টা বিশ্লেষণ করা তো দূরস্থান, অভিযানের কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায় কিছুই আলোচনা হচ্ছিল না (১)।
ক্লেরমঁর কাউন্সিল বৈঠকের পূর্বে, বৈঠকে এবং পরের সময়ে আরবানের আবেদন এতই ওপর ওপর ছিল যে তার বক্তব্যের ভিত্তিভূমি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সেটা গুরুত্ব পাচ্ছিল না। জেরুজালেমে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে তীর্থ করতে যাওয়াকে খ্রিষ্টিয় জনগণের বিশ্বাসের কাজ হিসেবে বলা হল ঠিকই কিন্তু এটা যে পুরোদস্তুর পরিকল্পনামাফিক সামরিক অভিযানের অংশ সেটা কোনওভাবেই প্রত্যক্ষ্যভাবে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসছিল না। নাইটেরা মুক্তি দেওয়ার উদ্যমে অংশ হতে এলেন সর্বশক্তিমানের প্রতি নিবেদনে জীবনজোড়া জমে থাকা পাপ ধুয়ে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় ইত্যাদির ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রাখার রাজনৈতিক কারন একটা ছিল, এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কন্সট্যান্টিনোপলের সম্রাট স্বয়ং নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। আলেক্সিওস চেয়েছিলেন পোপের প্রাথমিক কাজ হোক প্রাথমিকভাবে বিপুল বিশাল সামরিক দিক থেকে কার্যকর সেনা বাহিনী তৈরি করা যে বাহিনী তুর্কিদের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য লড়াই করতে পারবে, তার পরের বিষয় যেমন সেনা অভিযানের পরিকল্পনা, রসদ সরবরাহের খুঁটিনাটি ভাবনাচিন্তা ইত্যাদি সম্রাটের ওপর অর্পিত হোক।
ইতালির নাটকীয় পটপরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবান ঠিক করলেন, তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হবে ক্রুসেডের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বাছাই করা, যাদের দেখে অন্য [নাইট, প্রভাবশালী, জমিদার] অনুগামী হিসেবে অভিযানে জুড়ে যাওয়ার প্রণোদনা অর্জন করবে। ১০৯৫-এর গ্রীষ্মজুড়ে তিনি প্রত্যেকজন বিখ্যাতর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করলেন। তিনি লেপুইএর প্রভাবশালী এবং উচ্চমহলে যোগাযোগওয়ালা মন্টেইলের আধিমারের সঙ্গে বৈঠক করলেন। মন্টেইলের আধিমার, পোপের শ্রীমুখ থেকে জেরুজালেম যাত্রার প্রস্তাব শুনে সম্মতি না দিয়ে পারলেন না। আরবান বৈঠক করলেন বারগান্ডির অডিস এবং লিয়ঁর ক্ষমতাশালী আর্চবিশপ হিউএর সঙ্গে; অসম্ভব পরিশ্রম করে তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সের ভ্যালেন্স, লেপুই, সেন্ট-জিলেস এবং নিমেসের বৈঠক সেরে উত্তরের পানে চললেন তার অভিযানের পরিকল্পনা প্রচারে (২)।
আরবান তুলোসির কাউন্ট রেমঁদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করলেন, তার অধিকারে ছিল দক্ষিণ ফ্রান্স আর প্রভেন্স এলাকার মধ্যেকার বিপুল ভূখণ্ড। তিনি বংশ পরম্পরায় পোপের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাওয়া উচ্চকোটির পরিবারের মানুষ এবং জেরুজালেম শহরেও তার গভীর সংযোগ ছিল। রেমঁদের বড় ভাই উইলিয়াম, জেরুজালেমে তীর্থে যান ১০৯০-এর দশকের প্রথম দিকে। হয় তিনি সেখান থেকে ফিরতে পারেন নি অথবা তাঁর শেষ জীবনটা পবিত্র শহরে কাটানোর মানসিকতায় সেখানেই সমাধিস্থ হলেন (৩)। রেমঁদ তীব্রভাবে ধর্মবিশ্বাসী অভিজাত — তিনি একদল পুরোহিত নিয়োগ করেছিলেন, যাদের কাজ ছিল, তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন রোজ তার হয়ে প্রার্থনা করবেন এবং ভার্জিন মারির মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখবেন (৪)। ১০৮০-র ব্রিক্সেনের কাউন্সিল সম্মেলনে এন্টিপোপ নির্বাচনের সময় চার্চ ভাগ হয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সেই সমস্যার সমাধানে চতুর্থ গ্রেগরি সর্বপ্রথম রেমঁদের স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন (৫)।
আরবান জানতেন তাঁর তৈরি এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনায় রেমঁদের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি বার্তা দেবে। রেমঁদের অংশগ্রহণে একটা বিষয় পোক্ত হবে যে এই অভিযান ভাবনার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক মানুষজন রয়েছেন, এবং তার নামেই অন্যান্য চুম্বকীয় ব্যক্তিত্ব এই অভিযানে অংশ নিতে এগিয়ে আসবেন। এই রণনীতি ফ্লান্ডারসের রবার্টএর সঙ্গে জোট তৈরি করার সময় সম্রাট আলেক্সিওসের মাথায় ছিল; তিনি ভেবেছিলেন রবার্ট রাজি হলে অন্যান্যদের এই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসা সময়ের ব্যাপারমাত্র হবে। আরবানের ডাকে তুলোসির কাউন্টের সদর্থক প্রতিক্রিয়া দেওয়া, পোপের টুপিতে আরেকটা বড় সাফল্যের পালক হল। এই উদ্যম ভরসা যোগাল আররেকটা কারনেও — বিশ্বাসীদের রক্ষাকারী হিসেবে তিনি যত জোট সঙ্গীর সংখ্যা বাড়াবেন, সামগ্রিক চার্চ রাজনীতিতে তার অবস্থান ততই শক্তপোক্ত হবে।
১০৯৫-এর মাঝামাঝি সময়ে মহান পোপ ক্লুনির এবির সঙ্গে বৈঠক করলেন — বিশালাকার এবি চার্চ তৈরি হচ্ছে, তিনি সেখানে হাই অন্টার তৈরি দেখার জন্যে এক সপ্তাহ কাটালেন (৬)। ততদিনে জেরুজালেম যাওয়ার পোপের উদ্দীপনাময় বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে (৭)। এখান থেকেই পোপ বার্তা দিলেন তিনি বিশ্বাসীদের জন্যে আলাপচারিতা করতে ক্লেরমঁর মাঠে কাউন্সিল সম্মেলন আহ্বান করছেন। এই সম্মেলনে তিনি কাম্ব্রির বিশপ, রাইমসের আর্চবিশপকে তাদের ডায়সেস থেকে ‘বিখ্যাততম ব্যক্তিত্ব, শক্তিশালী রাজকুমারদের’ সঙ্গে নিয়ে আনার প্রস্তাব দিলেন (৮)।
ক্লেরমঁর কাউন্সিল বসল ১০৯৫-এর নভেম্বরে এবং শেষ হল এশিয়া মাইনরের দুর্দশা নিয়ে পোপ আর্বানের হাড়ে কাঁপন ধরানো প্রকাশ্য বক্তৃতায়। পোপ যে বার্তা প্রকাশ্যে দিয়েছেন, সেটি যতই ভীতিপ্রদ হোক না কেন, সেটি যে দুঃখজনকভাবে সত্য, এই বার্তা পূর্ব দেশ থেকে ফেরা মানুষদের থেকে এর আগে পোপের শ্রোতারা কখোনো না কখোনো শুনেছেন। পোপ প্রকাশ্য সমাবেশে বললেন, গ্রিক সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখে, তুর্কিরা এত বিশাল এলাকা দখলে রেখেছে যে, সে এলাকা পেরোতে দুমাস সময় লেগে যায়। আরবান তার শ্রোতাদের সক্রিয় হতে অনুরোধ করে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে সব দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নাও, ঝগড়া শান্তিতে রূপান্তরিত হোক, যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং সমস্ত রকম বিরোধ বিতন্ডা মিটে যাক। রাস্তায় নেমে পবিত্র সেপুলচারের দিকে অগ্রসর হও এবং শয়তান জাতির কবল থেকে দেশটা উদ্ধার করে আন (৯)’। পোপের এই ডাকে সম্মতি প্রদান করা মানুষদের নির্দেশ দেওয়া হল রেশমি কাপড়ে সোনার সুতোয় ক্রুসের চিহ্ন বুনে নিজেকের পরিধেয়তে জুড়ে রেখে জনগণকে বোঝাতে তারা সর্বশক্তিমানের সেনা, তারা তারই ইচ্ছেয় উদ্দিষ্ট কর্ম সম্পাদন করার জন্যে প্রস্তুত (১০)।
পোপের বক্তৃতা শেষ হওয়ামাত্রই লেপুই-এর বিশপ ‘উচ্চতম অভিজাতদের মধ্যে অন্যতম, হাসি মুখে [আরবানের সামনে নাটকীয় ভঙ্গীমায়] এগিয়ে গেলেন এবং হাঁটুমুড়ে বসে যাত্রা করার অনুমতি চাইলেন এবং তাঁর আশীর্বাদ ভিক্ষা করলেন (১১)’। লেপুই-এর সামাজিক গুরুত্ব আমরা আন্দাজ করতে পারি, যখন পোপ ফ্লান্ডারসের বিশ্বাসী সমর্থকদের প্রতি এই ঘটনার কিছু পরে লিখলেন, ‘যাত্রা শ্রমের দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে আমাদের প্রিয়তম পুত্র লেপুই-এর বিশপ আধিমিরকে নিযুক্ত করলাম (১২)’। আরবানের বক্তৃতার পরের দিন তুলোসির কাউন্টের দূত জানিয়ে গেলেন রেমঁদ অভিযানে অংশ নিতে সম্মত হয়েছেন (১৩)। আরবান যেভাবে উচ্চপদস্থ অভিজাত মানুষগুলিকে বক্তৃতার পর পরই অভিযানের কাজে সামিল করাতে সক্ষম হলেন, তার ফল হিসেবে যাত্রা প্রকল্পের শুরুর সময়টা উচ্চগ্রামে বেঁধে গেল। (চলবে)