The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
ক্লেরমঁর আরবানের হাড়ে হিম ধরানো বক্তৃতা একলহমাতেই বিপুল ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, ভয়ের সেই বার্তা ছড়িয়ে দিল ইওরোপজুড়ে জনপদে জনপদে। অস্ত্র হাতে অসংখ্য তীর্থযাত্রী ডাক পেলে জেরুজালেম যাত্রায় তৈরি হয়ে থাকলেন। একই বার্তা ছড়িয়ে দিলেন আরবিসেলের রবার্টের মত উৎসাহী পুরোহিত, তাঁকে লোরি উপত্যাকায় প্রচারে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এবং যেখানে যাত্রা করতে ইচ্ছুক অভিজাতর সংখ্যা খুব কম ছিল না (১৪); জিয়নের সেন্টি-বেনিনের এবট জারেন্তোকে পাঠানো হল প্রথমে নরম্যান্ডি এবং তার পরে ইংলন্ডে দক্ষ উৎসাহী জোগাড় করতে (১৫)। ফ্রান্সের লিমুজিন হয়ে উঠল অভিযান উতসাহীদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম ঘাঁটি, এখান থেকেই বিপুল উৎসাহে ক্রুসেড যাত্রার বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যম নেওয়া হল (১৬)।
প্রত্যেক অঞ্চলের পুরোহিতেরা পোপের ভাষণ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠলেন, এবং তাদের ওপরে নির্দেশ জারি করা ছিল, যে শব্দগুলি লিখিত হয়েছে সেগুলোই একমাত্র অক্ষরে অক্ষরে বয়ান করতে, অন্য কোনও ফুলোনো ফাঁপানো শব্দ, বাক্য যোগ করা যাবে না। এত সব উদ্যম, উদ্দীপনা সত্ত্বেও আমরা দেখব অভিযান সফল করার জন্যে জনসমর্থন জোগাড়ের মূল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন পোপ স্বয়ং (১৭)। জনগণের হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাকের পরের মাসগুলোয় পোপ ফ্রান্সেই রইলেন, এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে ঘুরতে লাগলেন চরকি কেটে। ১০৯৫ এবং ১০৯৬ জুড়ে তিনি সমর্থন জোগাড়ের জন্যে ঘুরে ঘুরে বিশ্বাসী অভিজাতদের অনুপ্রাণিত করলেন, প্ররোচিত করলেন এবং একই সঙ্গে এই মহৎ কাজ সফল করতে কী কী করতে হবে, সে উপদেশ দেওয়ারও কাজে নিজেকে ব্রতী করলেন। বড়দিনের আশেপাশের সময় তিনি লিমোজেসে, ১০৯৬-এর বসন্তে এঞ্জিআর্সে এবং লে ম্যানসে, দক্ষিণে যাওয়ার আগে বর্দুঁ, তুলোউসি, এবং মন্টিপিলারে আর জুলাইতে নিমেসে চার্চ কাউন্সিলে বক্তৃতা করলেন। পোপ এক শহর থকে অন্য শহর, এক চার্চ থেকে অন্য চার্চে ঘুরে বেড়াবার প্রবণতা দেখে স্থানীয় পঞ্জিকাকারেরা আন্দাজ করতে পেরেছিল পোপের আসার মূল উদ্দেশ্যটি। লে ম্যানসে আরবান পৌঁছনোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনৈক পঞ্জিকাকার লিখলেন, ‘তিনি শুধুই জেরুজালেমের যাত্রার বার্তাই দিলেন এবং আমাদের অঞ্চলে এসেইছিলেন শুধু এই কথাই বাখান করতে (১৮)’। মারসিনির একটি চার্চে পোপের দানের বছরটি চিহ্নিত হয়েছে এইভাবে ‘যে বছর মহামান্য পোপ একুইটাইন এসে পূর্বের হিংস্র বিধর্মীদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টদের সেনা বাহিনী তৈরি করার নির্দেশ দিয়ে যান (১৯)’। ইওরোপ বিশ্বজুড়ে মন্থন চলছিল, জেরুজালেমে যাত্রার মন্থন (২০)।
আরবান যে সব জায়গায় ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছতে পারলেন না, সেখানে তার চিঠি পৌঁছল। তিনি ফ্লান্ডারসে গেলেন না কারন ১০৯০-এর দশকে এই অঞ্চলে আলেক্সিওস সদাসর্বদা যোগাযোগ রেখেগিয়েছিলেন। তবুও তিনি ফ্লান্ডারসের পুরোহিত, রাজা এবং সাধারণ মানুষের কাছে চিঠি পাঠিয়ে, পূর্বের দেশগুলিতে যেভাবে খ্রিষ্টিয়রা দলিত নিপীড়িত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তিনি কী কী উদ্যম নিচ্ছেন, আর তাদের কাছে তিনি কী কী সাহায্য প্রত্যাশা করছেন সেসব কথাবার্তা বর্ণনা করলেন। তারা ততদিনে জেনেগেছে পূর্ব দেশগুলিতে বর্বরেরা কীভাবে ধ্বংসকার্য চালাচ্ছে, ‘দুর্দশার মাত্রায় চিন্তা প্রকাশ করে এবং এবং পবিত্র উদ্বেগে’ আরবান লিখলেন, ‘আমরা গল অঞ্চল ভ্রমণ করে সেই অঞ্চলের রাজা এবং তাদের প্রজাদের অনুরোধ করেছি পূর্ব দেশের চার্চগুলিকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে। এই বিষয়ে অভার্নের কাউন্সিলে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলি তাদের অবগত করিয়েছি এবং তাদের পাপ ক্ষমা করার জন্যেও উদ্যম নিতে বলেছি (২১)’।
অভিযানে অংশ নেওয়ার অন্যতম প্রাপ্তি জমে থাকা পাপ থেকে মুক্তি, এই বার্তা ক্রুসেডে অংশ নেওয়ার উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সপ্তম গ্রেগরির অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার অতীতের ডাক, যা আদতে প্রথম আলেক্সিওসের ডাক ছিল এবং অত্যাচারের মুখোমুখি হওয়া খ্রিষ্টিয়দের সাহায্যের দাবিতে অন্য খ্রিষ্টিয় মানুষদের পাশে দাঁড়াবার যে দায় দেখাবার যুক্তি ছিল তার বাইরে পোপ আরও বড়, আরও শক্তিশালী উপাদান জুড়ে দিলেন — অভিযানে যারা অংশ নেবেন তারা চিরতরে মুক্তি,মোক্ষ অর্জন করবেন।
আরবান বার বার অভিযানের আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জনের যুক্তি দিচ্ছিলেন। বোলোনায় অনুগামীদের চিঠি লিখে জনালেন, আমি জেনে অবাক, উদ্বেলিত হয়েছি, জনগণের বিশাল অংশ জেরুজালেমের অভিযানে অংশ নিতে উৎসাহী। ‘তোমাদের জানা উচিত কেন তোমাদের এই অভিযানে অংশ নেওয়া শুধু ঐহিক কারনের জন্যেই জরুরি নয়, এতে তোমরা অংশ নেবে, তোমাদের আত্মার পরিত্রাণের জন্যে এবং চার্চকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য পূরণে (২২)’। অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা গেল জেরুজালেম অভিযানে অংশ নেওয়ার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য হল প্রত্যেকেরই জীবনজুড়ে জমা হওয়া বিপুল পাপ ধুয়ে ফেলার উদগ্র বাসনা সক্রিয় হয়ে উঠছে। এক পঞ্জিকা লেখ সূত্রে জানতে পারছি, আরবান মন্তব্য করেছিলেন ‘নির্দিষ্ট কিছু ফরাসী রাজা, তাদের নিজেদের প্রজার বিরুদ্ধে যে বিপুল পাপ করেছেন, এবং তারা যেহেতু সেই পাপের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত করতে পারেন নি’, তাঁরা প্রত্যেকেই এই মুক্তি অভিযানে যাত্রা করার শপথ গ্রহন করার মাধ্যমে অনুতাপের উপযুক্ত মাধ্যম খুঁজে পাবেন এবং বিপুল বিশাল অবর্ণনীয় আধ্যাত্মিক অর্জন নিয়ে আসবেন (২৩)।
বেসালু, এম্পুরিয়াস রুসিলন এবং সারদানার ক্রুসেডে মোক্ষের গাজর ঝোলানো হল। কাউন্টদের লেখা চিঠিতে পোপ বললেন ‘সর্বশক্তিমান এবং তার ভায়েদের প্রতি ভালবাসার অভিযানে যারা প্রয়াত হবেন, সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন চিত্তে তারা জেনে রাখুন, প্রত্যেকেই আবশ্যম্ভাবীভাবে পাপমুক্ত হবেন এবং আমাদের সর্বশক্তিমানের দয়ায় অনন্ত জীবন লাভ করবেন’ (২৪)। ক্রুসেড অংশগ্রহণে মোক্ষলাভের এত জোরদার প্রচার সত্ত্বেও শাহাদাত এবং মোক্ষের ধারণাটি সম্ভাব্য ক্রুসেডারদের মনে পুরোপুরি গাঁথানো কষ্টকর হচ্ছিল। সম্ভবত এই ধারণা পরের দিকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তুলে আনা হল, বিশেষ করে ১০৯৮-এর এন্টিওকের অভিযানে ক্রুসেডে যাওয়া সেনাবাহিনীর ওপরে যে গভীর দুর্যোগের ঘণঘটা নেমে আসে — বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে গিয়ে বহু হাজার মানুষ যে চরম মূল্য দিতে বাধ্য হলেন, তারই প্রেক্ষিতে আগামী অভিযান সফল করার কাজে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্যে তাদের বিশ্বাস দৃঢ় করতে, ক্রুসেডের ডাক দেওয়া ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ মানুষের মনে চিরস্থায়ী মোক্ষের ধারণা বদ্ধমূল করতে ব্রতী হলেন (২৫)। সাধারণ মানুষ কোন উদ্দীপনায় ক্রুসেড অভিযানে অংশ নিয়েছিল, সে সব বিষয় যে নথিতে উল্লিখিত হয়েছে, সেখানে আমাদের আলোচ্য পুরষ্কার, অর্থাৎ মোক্ষ বা আত্মমুক্তি অর্জনের বিষয়টা কিন্তু উল্লিখিত হচ্ছিল না। সাইনিস প্রদেশের দুই ভাই গাই এবং জিওফ্রে সাধারণভাবেই জানিয়েছেন তারা অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্যে তোড়জোড় করছেন কারন ‘যে বিপুল শয়তানি এবং আকাশ ছোঁয়া উন্মাদনায় পাগানেরা অসংখ্য খ্রিষ্টিয় জনগণের ওপর অত্যাচার চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের কয়েদ করেছে অথবা বর্বর মানসিকতায় খুন করছে সেই মানসিকতাকেই তাদের উৎখাত করতে চান (২৬)’।
খ্রিষ্টজনগণের দুখ দুর্দশা, আধ্যাত্মিক অর্জন এবং জেরুজালেম যাত্রা নিয়ে আরবান যে আলঙ্কারিক ঝাঁঝালো অনুপানীয় রসায়নটি তৈরি করছিলেন, সেটি যথেষ্ট পরিমানে উন্মাদক ছিল (বা নেশাগ্রস্ত করানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল।) ঠিকই, কিন্তু তার আস্তিনে আরও একটা লুকোনো হাতিয়ার রাখা ছিল। পোপ হিসেবে তিনি ফ্রান্সে ঘোরার সময় তিনি যে সব চার্চের বেদীতে যান যেমন ভেন্ডোমের ট্রিনিটি চার্চ, মার্মোতিয়ের এবং মোইজাকের আবি চার্চ (২৭), সেদবের অধিকাংশ চার্চকে তিনি পবিত্র ক্রসের অংশাবশেষ দিলেন (২৭)। জেরুজালেম উদ্ধারের সঙ্গে ক্রুসের থেকেও বড় কোনও আবেগপ্রবণ স্মৃতিবস্তুর কল্পনা করা যায় না; অথবা ক্রুস নির্ভর জীবন পাওয়া জন্যে যে অভিযান, যার নাম ক্রুসেড, সেই অভিযানের চিহ্ন তৈরি হল কাপড়ে ক্রুসচিহ্ন সেলাই করার মাধ্যমে (২৮)। (চলবে)