The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
আরও যথাযথভাবে বললে প্রায় প্রত্যেকেই জানেন যে পোপ যে ক্রুসের নানান অংশ উপহার হিসেবে বিতরণ করছিলেন বিভিন্ন চার্চকে তাঁর ক্রুসেডের পরিকল্পনা সফল করতে, সেই ক্রুশটা তো কন্সট্যান্টিনোপলে সংরক্ষিত থাকার কথা। চতুর্থ শতাব্দ থেকে এই পবিত্র ক্রুশ সাম্রাজ্যের দূতিয়ালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। স্বয়ং মহান কন্সট্যান্টাইন এই ক্রসের কিছু অংশ রোমের সেসরিয় প্রাসাদকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের আন্তর্জাতিক দূতিয়ালিতে পবিত্র ক্রুশ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে (২৯)। তবে এ সম্ভাবনা অস্বাভাবিক নয়, পোপের সম্পদ ভাণ্ডার থেকে সংগ্রহ করে যে ক্রুশের নানান অংশ আরবান উপহার হিসেবে দিচ্ছেন, অসম্ভব নয় সেই স্মৃতিবস্তুর খণ্ডগুলো নিশ্চই আরবানকে কন্সট্যান্টিনোপল থেকে আলেক্সিওস সরবরাহ করে থাকবেন।
ঢাকঢোল পিটিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক স্মৃতিবস্তগুলোকে পোপের মাধ্যমে বিভিন্ন চার্চে উপহার হিসেবে পৌঁছে যাওয়ায় ফ্রান্স জুড়ে অভিযান উন্মাদনার রেশ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল তীব্র আকারে এবং পোপ নিরবিচ্ছিন্ন অপরিশ্রান্তভাবে ‘আমাদের জনগণকে কন্সট্যান্টিনোপল এবং জেরুজালেমে গিয়ে খ্রিষ্টিয় শহর, এবং ভূমিখণ্ড দখল করে রাখা পাগানদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করার জন্যে উদ্দীপ্ত করতে লাগলেন (৩০)’। শুধু পবিত্র ক্রুসের খণ্ডগুলোই নয়, ক্রুসেড যাত্রার সমর্থন আদায় করার জন্যে যতদূরসম্ভব অন্যান্য স্মৃতিসম্পদও ব্যবহার করা হচ্ছিল নিরবিচ্ছিন্নভাবে। একাদশ শতকের শুরুতে পবিত্র সেপুলচার চার্চটির ধ্বংসের নথি ব্যবহার করা হচ্ছিল শুধু জেরুজালেমের ঘটনা নিয়ে মানুষের রাগ দাউদাউ করে জ্বালিয়ে তুলতেই নয়, আরও গভীরে বললে খ্রিষ্টিয়দের ওপরে ঘটমান অত্যাচারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে মুসলমানদের যোগ প্রমান করতে (৩১)। এই প্রক্রিয়ায় বাইজান্টিয়ামকে সামরিক সাহায্য করার বিষয়টাযে সব সময় খুব একটা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে এমন নয়, বরং যাদের সঙ্গে অভিযান নিয়ে আলাপ আলোচনা চলত, তারা জেরুজালেমের নামটা শুনেই তীব্রভাবে উদ্দীপ্ত হত, কিন্তু অভিযানের বিশদ পরিকল্পনার খুঁটিনাটি বিষয়ে তাদের খুব একটা মাথা ব্যথা ছিল বলে মনে হয় না।
নাইটেরা প্রয়োজনীয় তৈয়ারি করতে উঠেপড়ে লাগল। মঁমারলের আচার্ডই সবার আগে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন, মোট ২০০০ [সোনার মুদ্রা] এবং চারটি খচ্চরের বিনিময়ে ক্লুনির মঠকে নিজের সব জমি বাঁধা দিলেন। তিনি জানতেন শুধু এই সম্পদেই যাত্রার কাজ সমাধা হবে না, জেরুজালেমের দীর্ঘ অভিযান সফল করতে পথে আরও প্রভূত সম্পদ প্রয়োজন। তাই তিনি মঠকে বললেন, ‘তিনি যদি শহীদ হন বা না ফেরার ভাবনা ভাবেন তাহলে তার জমির বংশগত অধিকার ক্লানি এবং মঠের প্রখ্যাত মানুষদের অধিকারে যাবে।’ অতিরিক্ত অর্থ আয়োজনের চুক্তিতে উল্লখ করা হল, ‘কারন আমি যেহেতু সম্পূর্ণভাবে অস্ত্রসাজে সজ্জিত হয়ে জেরুজালেমে খ্রিষ্টিয় জনগনের সঙ্গে সর্বশক্তিমানের পক্ষের লড়াইতে অংশ নিতে অসামান্য এক অভিযানে যাচ্ছি (৩২)’।
১০৯৫ এবং ১০৯৬-তে অনেকেই একই রকমভাবে উদ্যমী হয়ে তাদের জমি বা সম্পত্তির ফেরতযোগ্য বন্ধকীর বিনিময়ে ঋণ নিয়ে যাত্রার প্রস্তুতির রসদ তৈরি করার কাজ চালিয়ে গেলেন। সূত্রগুলো থেকে পরিষ্কার উদ্যমীদের মূল উদ্দেশ্য এবং প্রণোদনা ছিল জেরুজালেম যাত্রা, ধরাধামের যে ভূমিখণ্ডে স্বয়ং যিশু পদচারণা করেছেন (৩৩)। সেখানে গিয়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হওয়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করার যে ডাক পোপ দিলেন, সেটি এতই প্রভাবশালী ছিল, মধ্য বারগান্ডির দুই ভাই ঠিক করল ‘তারা অন্যদের সঙ্গে পাপ মোচনের জন্যে জেরুজালেমের অভিযানে অংশ নেবে (৩৪)’।
অনেকেই অনুশোচনার পালা শুরু করে দিলেন যাত্রার বহু আগে থেকেই। হিউ ব্রোকার্ড, তুরনাসের নাইট সন্ত ফিলিবার্ট চার্চ থেকে বলপ্রয়োগে বিপুল জমি দখল করেছিলেন। অনুশোচনীয় আবহাওয়ায় মনে হল তিনি সে কাজটা মোটেই পবিত্র মনে করেন নি বরং সেটা সত্যিকারের অবিবেচনাপ্রসূত পাপ কাজ ছিল। এবং এই একটি পাপ কাজের সঙ্গে আরও হাজারো পাপ জুড়ে সব পাপ একসঙ্গে মোচন করতে চাইলেন (৩৫)। তার অনুশোচনা হল, তিনি হঠাতই মনে করতে শুরু করলেন, যে মানুষটা চার্চের জমি দখল করেছে, সেই পাপীর পক্ষে কপালে নির্দিষ্ট চিহ্ন এঁকে বা টিউনিকে ক্রুস চিহ্ন সিবন করে চার্চের মুক্তির অভিযানে অংশ নেওয়া অসমিচীন হবে (৩৬)।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কয়েকজন নাইটকে যাত্রায় অংশ নিতে নিরুৎসাহ করা হল। পনস, পিটার আর বারনার্ড মেজেঙ্কের চিহ্নিত গণ্ডগোলের ইতিহাস থাকা তিন নাইট, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল অভির্নের লে শ্যাফায়ার মঠের প্যারিসিয়দের ওপরে অত্যাচারের অভিযোগ ছিল, তারা অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্যে ইচ্ছে প্রকাশ করলেও মঠের সন্তরা অত্যাচারী নাইটদের জনগণের সামনে পাপস্থালন করার উদ্যমকেও খুব একটা যথেষ্ট শর্ত বলে মনে করলেন না এবং তাদের এই অভিযানে আদৌ নেওয়া হবে কী না, সেই উপদেশ চেয়ে তারা লে মেন্দে এবং লেপুইএর বিশপের দ্বারস্থ হলেন। বিশপেরা এই তিনজনের দুষ্কর্মের খতিয়ান নিয়ে আর ‘হিংস্রতার প্রাবল্যে স্রেফ অবাক হলেন; তারা যেহেতু অনুশোচনা প্রকাশ করে অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই তাদের তারা ক্ষমা প্রদর্শন করে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল (৩৭)’। অধিকাংশই এই সিদ্ধান্তে অখুশি। উদাহরণটি থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, জেরুজালেমে যাওয়ার উদ্দীপনা এবং উচ্চাশা এতই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে চার্চ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে কারা অভিযানে যেতে পারবে আর কারা নয়।
চার্চের ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধির আরও একটা কারন হল পূর্বদেশে যাওয়ার জন্যে ক্রমাগত এবং যথেষ্ট পরিমান অর্থ সংকুলান হতে থাকা। সশস্ত্রই হোক বা সাধারণ, তীর্থযাত্রা খুবই খরচ সাপেক্ষ বিষয় ছিল। দূরদেশে যাত্রায় বড় খরচ হত খাদ্য, বাহন, অস্ত্র এবং অন্যান্য রসদ ইত্যাদিতে এবং সঙ্গে যত মানুষ জুড়ে যেত, পথের খরচ ততগুণে বৃদ্ধি পেত। আমরা মঁমারলের আচার্ডএর উদাহরণে দেখলাম যাত্রার বিনিয়োগের অর্থ আসছে মঠ, বিশপারি এবং পারিসিয়গুলিতে প্রচুর নগদ সঞ্চিত অর্থ থেকে। তারা সেগুলিকে বিনিয়োগ করছিল যাত্রার নানান কাঠামো তৈরির ব্যয় মেটাতে। চার্চের নিয়ন্ত্রণে যেহেতু বিপুল পরিমান জমি ছিল তাই সে স্বাভাবিকভাবে এই কাঠামোর যেমন সম্ভাব্য ক্রেতা তেমনি বিনিয়োগকারীও বটে। ১০৯৯-তে জেরুজালেম দখল হওয়ার পরের প্রথম রাজা বাউলিয়নের গডফ্রে, যাত্রার অর্থ তোলার উদ্যোগ নিলেন চার্চের কাছে সম্পত্তি বিক্রি কোবলা দিয়ে। তিনি ভারদুম প্রদেশ এবং মোজাই, স্টিনাই এবং মঁফিউকন-এন-আরগন্নির প্রাসাদ প্রদেশের বিশপ রিচিয়ারের কাছে বিক্রয় করলেন। অন্যান্য জমি এবং তাঁর সম্পওলি নেভেলির কনভেন্টকে বিক্রি করা হল। আরও ১৫০০ মার্ক এল লয়েজির বিশপের থেকে ঋণ হিসেবে। স্থাবর সম্পত্তিকে নগদ অর্থে রূপান্তর করার উদ্যমে গডফ্রে বিপুল অর্থ জোগাড় করলেন (৩৮)। উইলিয়াম দ্য কনকারারের পুত্র নরম্যান্ডির ডিউক রবার্ট, ১০ হাজার অঙ্কের বিশাল অর্থ ব্রিটিশ রাজা উইলিয়াম রুফুসের থেকে ধার করলেন। এর অর্থ রবার্টকে ক্রুসেড অভিযানের প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ে বিপুল ডিউকিয় জমি পরিবারের বাইরে বিক্রি করতে হল না (৩৯)।
বিপুল খরচ ছাড়াও যাত্রার সঙ্গে জড়িয়েছিল রসদ ইত্যাদি পরিকল্পনার জটিল ব্যবস্থাপনা এবং রাস্তায় অদেখা ভয়ঙ্করতা, তবুও পোপের ডাকে অভূতপূর্ব সাড়া পড়ল। ফ্রান্সজুড়ে অসংখ্য মানুষ পূর্বের দিকে যাওয়ার জন্যে উন্মাদ হয়ে উঠলেন। বড় বাহিনী নিয়ে যোগ দিলন নরমান্ডির রবার্ট, শালা ব্লয়িসের স্টিফেন এবং তুলোসির রেমঁদ। এছাড়া বড় বাহিনী তৈরি করলেন বুলিয়নের গডফ্রে, ভাই বল্ডউইন, ১০৯৩-তে বাবার অবর্তমানে সিংহাসনে বসা ফ্লান্ডারসের কাউন্ট দ্বিতীয় রবার্ট। (চলবে)