The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
অস্বীকার করা উপায় নেই, বিশ্ব ইতিহাসে ক্রুসেড অভিযানগুলোর মধ্যে, প্রথম ক্রুসডই সব থেকে বেশি আলোচিত অভিযান এবং প্রথম ক্রুসেড নিয়েই হাজারো কাব্যকথা তৈরি হয়েছে হাজার বছর ধরে। নাইটেরা অস্ত্র নিয়ে একের পর এক অঞ্চল পেরিয়ে জেরুজালেম মুক্ত অভিযান করছেন, ধর্মভীরু ইতিহাসকারেরা এই উদ্দীপনাময় ঘটনা বর্ণনা করতে অসামান্য উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, এবং স্বাভাবিকভাবে এই লিখন কাজে তারা পাঠকদেরও অভূতপূর্ব সঙ্গ পেয়েছেন। ১০৯৯-তে তীর্থযাত্রার অভিযানে, ইওরোপিয় বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি সত্ত্বেও, তার পূর্ব দেশগুলো পেরিয়ে জেরুজালেম শহরে পৌঁছে তুর্কি মুসলমানেদের সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি যুদ্ধ সংগঠিত করে খ্রিষ্টিয় জনগণের রক্তপাত বন্ধ করানোর চরমতম বীরত্বের গল্পগাথা রচনার উদ্যম পশ্চিমি সমাজে হাজার বছর ধরে গীত হবে। ক্রুসেডের নানান অনুষঙ্গ, ছবি, গল্প, গাথা ইত্যাদি ইওরোপিয় সঙ্গীত, সাহিত্য এবং শিল্পকে বারবার উদ্বুদ্ধ করেছে নিত্য নতুন শিল্পকর্ম রচনায়। এমন কী ক্রুসেড নামক শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ক্রুস নির্ভর জীবনযাত্রা, সেই সীমিত অর্থের বিস্তৃতি ঘটাল মন্দের বিরুদ্ধে ভালর জয় সূচিত করার অসীম বিপজ্জনক এবং শেষ অবদি সফল অভিযান।
প্রথম ক্রুসেড পশ্চিম ইওরোপিয় জনগণের কৌম স্মৃতি আর জনপ্রিয় আমকল্পনালোককে চরম আন্দোলিত করেছিল, তার বড় কারন হল এই দুর্গম অভিযানের সঙ্গে জুড়ে থাকা বিপুল ঘণ-নাটকীয়তা এবং অসীম হিংসার সমাবেশ। অভিযান কী শুধুই কী নাটকীয় ছিল বলে, সেই অভিযানের গল্পকথা হাজার বছরের বিস্তৃত আয়ু অর্জন করল? বিশ্ব ইতিহাস বদলে দেওয়া এই অভিযান পশ্চিম ইওরোপকে আন্দোলিত করল তুমুলভাবে, ইওরোপিয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা আর সমাজ অন্যান্য বহু সাফল্যের সূচনা-দ্যোতক হয়ে উঠতে পারল বলেই — এই প্রথম সফল যুদ্ধ সংগঠিত করায় ইওরোপজুড়ে পোপের ক্ষমতা সীমাহীন হয়ে উঠল, দ্বিতীয়ত ইসলাম এবং খ্রিষ্ট ধর্মের মধ্যে সংঘাতের পরিবেশের সূচনা ঘটাল, তৃতীয়ত ধর্মযুদ্ধের ধারণা তৈরি হল, চতুর্থত ইওরোপিয় সমাজে নায়ক নাইট বন্দনা এবং জনগণের ধার্মিক আত্মনিবেদনের যুগের সূচনা ঘটল, পঞ্চমত ইতালিয় সমুদ্র যুদ্ধ-ব্যবসা নির্ভর শহর রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটল, ষষ্ঠত মধ্যপ্রাচ্যে ইওরোপের উপনিবেশ তৈরি হল — এই সব সাফল্য-ক্রিয়ার শেকড় গজাল কিন্তু প্রথম সফল ক্রুসেড অভিযান (১৭)।
এই সাফল্যই ইওরোপজুড়ে বিপুল ক্রুসেড সাহিত্যের বিকাশ ঘটিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আধুনিক ঐতিহাসিক, পণ্ডিত বিগত কয়েক শতাব্দ অসামান্য মৌলিক গবেষণায় ব্রতী হয়েছেন। ক্রুসেড বাহিনীর গতি কী ছিল, বাহিনী দূর প্রদেশে কী কী এবং কীভাবে রসদ আহরণ করেছে অথবা কী ধরণে মুদ্রা ব্যবহার করেছে, এই সব বিষয় নিয়ে কাজ হয়ে চলেছে আজও (১৮)। পশ্চিমি সূত্র নির্ভর করে বেশ কয়েকটা মূল বয়ানের সঙ্গে নানান আন্তসম্পর্কযুক্ত বেশ কিছু বিষয় খুব সম্প্রতিককালে উঠে আসছে বারবার (১৯)। বিগত কয়েক বছর জেরুজালেম অভিযান আর সাধারণভাবে মধ্যযুগের প্রথম দিককার রহস্যময়তা বুঝতে পণ্ডিতেরা বিপুল সময় ব্যয় করছেন (২০)।
ক্রুসেড বুঝতে নিত্য নতুন বেশ কিছু উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন গবেষকেরা – নাইটদের মনোবিশ্লেষণ থেকে আজ নতুনভাবে বুঝতে পারছি, তাদের জেরুজালেম অভিযান তৈরি হয়েছিল, অবদমিত যৌন উত্তেজনা দূর করতে, এবং এইজন্যে তারা পূব দেশে সামরিক অভিযানের কথা ভাবছিল; আবার অন্যদিকে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন একাদশ শতকের শেষের দিকে যোগান চাহিদার অসমতার কথা; অর্থনীতিবিদদের বিশ্বাস এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মধ্যযুগের শুরুর সময়ে ইওরোপ আর ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সম্পদ দখল আর সংগ্রহ করা (২১)। জিনতাত্ত্বিকেরা দক্ষিণ আনাতোলিয়ার জনগণের মাইটোকন্ড্রিয়াল সূত্র থেকে একাদশ শতকের শেষের দিকে জনঅভিবাসন নিয়ে কাজ করছেন (২২)। জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন বিংশ শতকের আগের সময়ের তুলনায় ক্রুসেডের সময়েই একমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় জিডিপি বৃদ্ধির হার (২৩)।
প্রথম ক্রুসেড নিয়ে ইওরোপিয় চিরন্তন মুগ্ধতা সত্ত্বেও কেন প্রথম ক্রুসেডের মত একটা সমস্যাসঙ্কুল অভিযান আয়োজিত হল, সে বিষয়ে গবেষকদল খুব একটা নজর দেন নি এত দিন, এটা অনেকটাই পিছনে চলে গেছে। বিগত দশ শতাব্দ ধরে অধিকাংশ পণ্ডিতের নজর নিবদ্ধ ছিল পোপ দ্বিতীয় আরবানের ওপরে, ক্লারমঁয় তার উত্তেজনাময় উদ্দীপ্তকরণের বক্তৃতা, ইওরোপে নাইটদের সম্মানবৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে তারা বেশিই উতসাহী হয়েছেন। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে জেরুজালেম অভিযানের সূত্রপাত হয় নি পোপ দ্বিতীয় আরবানের উদ্যমে অথবা এই অভিযানের প্রাথমিক অনুঘটকও কিন্তু পোপ আরবান ছিলেন না, বরং ঘটিয়ে তুলেছিলেন অন্য, অনন্য এক ঐতিহাসিক চরিত্র। আরবান যে বিশ্ব ব্যবস্থা বদলের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে সমসাময়িক আমইওরোপিয়কে কঠোর নির্দেশ দেবেন, সেই ডাক আদতে পূর্ব দেশের এক সম্রাট কন্সট্যান্টিনোপলের আলেক্সিওস কোমনিনোসের সকরুণ আহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল।
রোমের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে চতুর্থ শতাব্দে যাত্রা শুরু করেছিল কন্সট্যান্টিনোপল; এই রাজধানী মার্ফৎ সুবিশাল ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা শাসন করত রোমক সাম্রাজ্য। পূর্ব দেশের নতুন রোমক রাজধানী শহরের নামকরণ হল শহর প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট কন্সট্যান্টাইনের নামে। বসফরাস প্রণালীর পশ্চিম তীরের কন্সট্যান্টিনোপল ক্রমশ ইওরোপের সব থেকে বড় শহরে পরিণত হয়ে উঠবে; কন্সট্যান্টাইন খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরে শহর সাজানো হল বিশাল বৃহৎ বিজয়ের তোরণে, বিশাল বিশাল প্রাসাদে, সম্রাটদের মূর্তি দিয়ে এবং হাজারো চার্চ এবং মঠ তৈরি করার মাধ্যমে।
রোমের পূর্বাঞ্চলের সাম্রাজ্য স্বচ্ছল থেকে স্বচ্ছলতর হতে শুরু করার মধ্যেই কিন্তু পশ্চিম সাম্রাজ্যকেন রোম ক্রমশ অস্তাচলে যাবে; পঞ্চম শতে পুরোনো পশ্চিমের রোমের পতন ঘটল। ১০২৫ নাগাদ কন্সট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্য অধিকাংশ বল্কান, দক্ষিণ ইতালি, এশিয়া মাইনর, ককেসাসের বেশ বড় অংশ আর উত্তর সিরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং সিসিলি দখলের পরিকল্পনা ভাঁজতে থাকে। সত্তর বছর পর দখলদারির এই সামগ্রিক চিত্রটাই তুমুভাবে বদলে যাবে। তুর্কি দখলদারেরা আনাতোলিয়ায় দঙ্গল বেঁধে ঢুকে পড়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ শহর ধ্বংস করে এবং প্রদেশগুলোর সমাজে বিশৃংখলা তৈরি করে। কয়েক দশক ধরে বল্কানে নিরিবিচ্ছিন্ন আক্রমণ ঘটতে থাকায় এই অঞ্চলগুলোর ওপরে বিশৃঙ্খল প্রভাব পড়তে থাকে। আপুলিয়া এবং ক্যালাব্রিয়া আর সাম্রাজ্যের অংশ রইল না, এগুলিকে নরম্যান অভিযাত্রীরা, দুদশ পরে দক্ষিণ ইতালি আক্রমন করে দখল করল।
যে মানুষটা সাম্রাজ্য পতন আর মুক্তির মাঝে অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর নাম সম্রাট আলেক্সিওস কোমেনোস। অসামান্য যোগ্যতাসম্পন্ন যুবা সেনাপতি আলেক্সিওস কিন্তু বংশের নামে বা উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসন লাভ করেন নি, সেনা অভ্যুত্থান আর বিদ্রোহ আয়োজন করে সিংহাসন দখল করেন ১০৮১-তে ২৫ বছর বয়সে। ক্ষমতা দখলের প্রথম দিকে নিজের রাষ্ট্র প্রধান অবস্থান সুদৃঢ় করতে মানিয়ে নেওয়ার বছরগুলো তীব্র অস্বস্তিতে কাটতে থাকে তাঁর। তাঁকে একই সঙ্গে বাইজান্টিয়ামের ভিতরের আর বাইরে, উভয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হছিল। তিনি যেহেতু উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসন পান নি, তাই বহিরাগত দখলদার হিসেবে সিংহাসন দখলের মান্যতা নিয়ে সমস্যা তৈরি হল রাজপরিবারে। আলেক্সিওস নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রথাগত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিলেন যেমন ক্ষমতা কেন্দ্রিভবন করলেন, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বাইজান্টিয়ামের নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালেন ইত্যাদি। এত সব কিছু সত্ত্বেও ১০৯০-এর মাঝামাঝি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নড়বড় করতে থাকে এবং বাইজান্টাইন সব দিক থেকে চরম বহিরাক্রমনের শিকার হয়।
১০৯৫-তে আলেক্সিওসের সিংহাসন নড়বড় করতে থাকায়, তিনি বুঝলেন, তার পিঠ বাঁচাবার একটাই পথ, পোপের স্মরণাপন্ন হয়ে, তার নিজের আর সাম্রাজ্যের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। তিনি পোপ দ্বিতীয় আরবানকে দূত পাঠালেন জীবন বাঁচাবার জরুরি বার্তা দিয়ে। পোপ ইতালির পিয়াকেঞ্জায় সম্রাটের হাতে লেখা বার্তা পেলেন ‘মহামান্য মহোদয়কে স্বয়ং রাষ্ট্র প্রধান এবং খ্রিষ্টের সমস্ত বিশ্বাসী মানুষের পক্ষ থেকে ডাক পাঠাচ্ছি, বিধ্বংসী বিধর্মীদের বিরুদ্ধে পবিত্র চার্চ রক্ষার উদ্দেশ্যে সাহায্য পাঠানো হোক, এই অঞ্চলে চার্চগুলি ধর্মদ্রোহীরা প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে, তারা কন্সট্যান্টিনোপল শহরের দেওয়ালের বাইরে কড়া নাড়ছে [যে কোনও মুহূর্তে শহর দখল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে] (২৪)’। আরবান বুঝেগেলেন এই মুহূর্তটি পোপের সক্রিয় হয়ে ওঠার সময় তৈরি করছে; তিনি মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে নিলেন, অন্য কাজে সময় ব্যয় না করে তাঁকে যতশীঘ্র সম্ভব উত্তর ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতে হবে যাতে তিনি সম্রাটের সুরক্ষা আর সাহায্যের জন্যে জনবাহিনী তৈরি করে পূর্ব দেশে পাঠানোর পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। এরপরেই আলেক্সিওসের আবেদনে এবং পোপের সক্রিয়তায় প্রথম ইওরোপিয় ক্রুসেডের ডাক দেওয়া হয় এবং সেই অভিযান আয়োজিতও হয়। (চলবে)