The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
অন্য বহু প্রখ্যাতও জেরুজালেম অভিযানে অংশ নেওয়ার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন ফ্রান্সের প্রথম ফিলিপের ভাই ভারমান্ডোয়িসের হিউ। তিনি যাত্রায় যাওয়ার বিষয়ে প্রভাবিত হলেন একটি প্রাকৃতিক ঘটনায়, ১০৯৬-এর চন্দ্রগ্রহনে চাঁদের রঙ লাল হয়ে যাওয়ায় এবং তার মনে হল প্রাকৃতিক এই ইঙ্গিত তার যাত্রার ঐষী নির্দেশক (৪০)। কিন্তু ফিলিপকে তীর্থ যাত্রার অনুমতি দেওয়া হল না। ব্যাভিচারের অভিযোগে ১০৯৫-তে তার সঙ্গে চার্চ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। ক্লেরমঁতে নতুন করে চার্চের এই নিদানকে মান্যতা দেওয়া হল। স্ত্রীর দৈহিক স্থূলত্ব, সৌন্দর্যের অভাব আর আলাপ চালানোর সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে উপপত্নী মঁফোর্টের বারত্রাদার সঙ্গে থাকতেন। এই ইল্লুতে কাণ্ডের জন্যে চার্চ ফিলিপের জন্যে প্রকাশ্যে শাস্তি ঘোষণা করে (৪১)। ইতিমধ্যে ফ্রান্সজুড়ে অভিযান উন্মাদনার পারদ চড়তে শুরু করলে ফিলিপের প্রজারা চার্চের সঙ্গে রাজামশাইএর সম্পর্ক শোধরাবার জন্যে চাপ দিতে থাকে। রাজা পথ খুঁজতে অভিজাতদের বৈঠক ডাকেন, ১০৯৬-এর গ্রীষ্মে তিনি আরবানের সমর্থন লাভের জন্যে বাত্রাদার সঙ্গে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করার প্রস্তাব দেন। এইভাবে ক্রমশ পশ্চিম ইওরোপে পোপের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল দ্রুতলয়ে (৪২)। যদিও শেষ অবদি ফিলিপ ক্রুসেডে অংশ নিতে পারলেন না, কিন্তু তার ভাই স্বেছায় ফ্রান্সের রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযানে অংশ নেন — এটা [রাজপরিবারের মধ্য বিভেদ আনতে পারা] পোপের পরিকল্পনার আরেকটা সাফল্য।
রবার্ট গিসকার্ডের পুত্র বোহেমোঁ আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যিনি যাত্রার জন্যে প্রতিশ্রুতি দান করলেন। জেস্তা ফ্রাঙ্কোরামের অনামা লেখক সূত্রে জানতে পারছি, বোহেমোঁ, জেরুজালেম অভিযানের কথা প্রথম জানতে পারেন যখন তিনি আমলফি অবরোধ করেন। তিনি দেখলেন দক্ষিণ ইতালির বন্দরের দিকে যাত্রা করা মানুষেরা চিৎকার করে সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা! বলতে বলতে মিছিল করে যাচ্ছে। লেখক বলছেন, ‘বোহেমোঁ সেখানে পবিত্র আত্মার প্রতি প্রত্যায়িত হলেন এবং বহু আগে তৈরি তার সব থেকে দামি আংরাখাটি দিয়ে ক্রুস বানানোর নির্দেশ দিলেন এবং আমালফির অবরোধে সামিল হওয়া নাইটেরা এক মুহূর্তে তার সঙ্গে যাত্রায় সামিল হওয়ার মানসিকতা তৈরি করল (৪৩)’। বোহেমোঁ আর আর তার দলবল মিলে বিশাল বাহিনীতে পরিণত হল, ‘তাদের বুকে আটকানো ধাতুর চাদর, শিরস্ত্রাণ, হাতে তাদের রোদের রশ্মি পড়ে চকচক করা ঢাল (৪৪)’।
লেখক যাই বলুক না কেন, আমরা আজ স্পষ্ট জানি বোহেমোঁর কাজকর্ম রেঊপায়নে খুব যে পরম স্বতস্ফূর্ত (বা বিশ্বাসযোগ্য) ছিল এমন কথা খোলা গলায় বলা যাবে না — বারি অঞ্চলে বোহেমোঁর ডান হাত ফ্লেমেঙ্গাসকে তিনি ১০৯৬-এর শুরুতে প্রচুর জমি বিক্রি করার নির্দেশ পাঠান এবং তার মধ্যেই বোহেমোঁ অভিযান করার জন্যে অর্থ জোগাড়ের কাজ করা শুরু করেন (৪৫)। যে দ্রুততায় তিনি আমলফির অবরোধ তুলে নিলেন, যাত্রা করার জন্যে আরও মানুষ নিয়োগ করলেন এবং পূর্ব দেশগুলির পানে চলতে শুরু করলেন, সে সব থেকে পরিষ্কার এই যাত্রার ভাবনা হঠাৎ সিদ্ধান্তের পরিণতি নয় বরং অনেক সময় ধরে সুপরিকল্পিত ভাবনাচিন্তার ফসল।
বোহেমোঁ খুবই আগ্রাসী চরিত্রের, ডাকাবুকো চেহারার এবং নানা বিষয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীওয়ালা মানুষ — সে যুদ্ধ পরিকল্পনাই হোক অথবা চুলের আঙ্গিক তৈরি করাই হোক — তিনি সে সময়ে পশ্চিম ইওরোপিয় সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া পুরুষদের সাজসজ্জার অঙ্গ, কাঁধ অবধি মাথার চুল নামাতেন না, চুল কানের কাছেই কেটে ফেলতেন (৪৬)। তিনি যে অসামান্য সেনানায়ক, সে তত্ত্ব ১০৮২-৮৩-এর বাইজান্টিয়াম অভিযানে প্রমানিত হল; তিনি যেমন অহংকেন্দ্রিক তেমনি তার কুঁড়েমিও বিখ্যাত — তার বাহিনী যখন লারিসা আক্রমন করছে তিনি তখন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নদীর তীরে বসে আঙ্গুর খাচ্ছেন (৪৭)। অভিযানে তাকে ঢুকিয়ে নেওয়ার যুক্তি হিসেবে পোপের ভাবনা ছিল দক্ষিণ ইতালি থেকে অন্তত একজন বিখ্যাত নরমান অভিযানে অংশ নেওয়ানো গেল। তবে অন্যদের অভিযানে অংশ নেওয়ানো অত সোজা কাজ হয় নি — সিসিলির রজার যেতে রাজি হন নি কারন সেই অঞ্চলে বিপুল মুসলমানের বাস (৪৮)। ১০৮৫-তে আপুলিয়ার ডিউক হওয়া রজার বরসা অভিযানে অংশ নেওয়ার উৎসাহই দেখান নি। পিতা রবার্ট গিসকার্ডের মৃত্যুর পরে বিপদে পড়া তার বড় সৎভাই বোহেমোঁ পড়ে পাওয়া সুযোগ লুফে নিলেন এবং পূর্ব দেশের অভিযানে যাওয়ার জন্যে তৈরি করতে শুরু করলেন।
নানাভাবে আরবানের জেরুজালেম যাত্রা পরিকল্পনা চমৎকার বুদ্ধিমন্তভাবে রূপায়িত হচ্ছিল — অভিযানে অংশ নিতে পশ্চিম ইওরোপের নানান স্তরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে রাজি করানো জরুরি ছিল যাতে তাদের টানেই তাদের তলার থাকবন্দীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষজন যোগ দেন। একে বাস্তবায়িত করতে পোপ নাইটদের নিয়ে জনআন্দোলন শুরু করলেন। হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাক বিপুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হল এবং বার্তাগুলো যাতে বাস্তবে রূপায়িত হয়, তার ওপরেও গভীর নজরদারি চালানো হল। কিন্তু আরবানের বেশ কিছু পরিকল্পনায় গলতি ধরা পড়ছিল খালি চোখে। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নটা নিয়ে খুব বড়ভাবে চিন্তাভাবনা করেন নি তিনি — অংশ নেওয়া প্রায় প্রত্যেক বিখ্যাতরই ধারণা ছিল তারাই ক্রুসেডে যাওয়া বাহিনীর সেনানায়ক নির্বাচিত হবেন। শুরুর দিকে পোপের ভাবনা ছিল লেপুই-এর বিশপ সমগ্র বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন (৪৯)। প্রত্যেক বিখ্যাতই নিজেকে খ্রিষ্টিয় নাইটদের নেতার যায়গায় বসিয়ে নিচ্ছিলেন। তুলোসির রেমঁদ তাঁর নেতৃত্বে ক্রুসেডে যাওয়া বিশাল বাহিনীর জেরুজালেম উদ্ধারের স্বপ্ন দেখতে লাগলেন দিনে-রাতে (৫০)। ভারমন্ডিউসের হিউও নিজের সম্বন্ধে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন এবং পোপের ব্যানার বহন করে বোঝাতে চাইতেন এই কাজে তিনিই একমাত্র পোপের প্রতিনিধি (৫১)। কেউ কেউ মনে করতে থাকল, যেমন ব্লোয়িসের স্টিফেন ‘সমগ্র বাহিনীর যে কাউন্সিল তৈরি হবে, তিনি তার নেতা হবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন (৫২);’ তিনি নিজেও যে এটা ভাবতেন এবং উইলিয়াম দ্য কনকারারের কন্যা এবং তাঁর স্ত্রী এডিলাকে লেখা চিঠিতে লিখছেন তার সঙ্গী রাজারা তাঁকে সামগ্রিক বাহিনীর নেতৃত্বপদে বেছে নিয়েছেন (৫৩)।
বাস্তবে কিন্তু, পূর্বদেশে বাহিনী যে কঠিন যাত্রায় চলছিল, সেই যাত্রাপথ থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষ উঠে এলেন। নেতৃত্ব এবং নেতাদের অহংএর প্রতিযোগিতার ঠোকাঠুকি লাগা বিষয়ে নিশ্চই আরবান কিছু না কিছু ভেবেছিলেন, এবং বাহিনীতে ইওরোপের সব থেকে কর্তৃত্বপূর্ণ মানুষের সমাহার ঘটেছিল, এবং তারা প্রত্যেকেই পোপের প্রতিনিধি হিসেবে মান্যতাপ্রাপ্ত; তাছাড়া নেতৃত্ব নিয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছনোর আরও একটা বড় কারন ছিল পশ্চিমি বাহিনী বাইজান্টিইয়ামে পৌঁছনোর পরেই সেই বাহিনীর নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার কথা স্বয়ং সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনের। তাই আরবান যাত্রা আয়োজনের শুরুতেই নির্দিষ্ট রণনীতি আর বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করে নেতৃত্ব বিষয়ে খোলাখুলি কিছু না বলে নেতৃত্ব দানের বিষয়টা অন্তরলীন করে রেখেছিলেন — আরেকটা বিষয়ও মাথায় রাখতে হব বাইজান্টাইন সম্রাট পোপের বাহিনী তৈরি এবং তার রণনীতি বিষয়ে ঘনিষ্ঠ নজরদারি চলাচ্ছিলেন।
যদিও ক্রুসেড বিষয়ে পোপের লক্ষ্য বেশ পরিষ্কার — পূর্বের খ্রিষ্টিয় চার্চ রক্ষা করা, তুর্কি বিধর্মীদের এলাকা ছাড়া করানো, এবং শেষ অবদি বাহিনী নিয়ে জেরুজালেম পর্যন্ত পৌঁছানো — কিন্তু নেতৃত্বের ধোঁয়াশার মতই নির্দিষ্ট সামরিক উদ্দেশ্য নিয়েও ঘোমটা টানা ছিল। পবিত্র শহর দখল মুক্ত করার পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে কথা হয় নি — অর্থাৎ জেরুজালেমে পৌঁছে তারা কী করবে, বাহিনীকে তার নির্দেশ দেওয়া ছিল না। তাছাড়া তুর্কিদের সেই অঞ্চল থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে কোন কোন শহর, অঞ্চল, প্রদেশে তাদের বিজয়লাভ করতে হবে, সে সম্বন্ধেও কিছু বলা হয় নি। কন্সট্যান্টিনোপল নিয়েও কোনও কথা হয় নি। আলেক্সিওস নিজে রণনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করবেন — নিকাইয়া, তারসোস, এন্টিওক এবং অন্যান্য বাইজান্টাইন শহর তুর্কিদের হাতে পতন ঘটেছে এবং এগুলি উদ্ধার করা বাইজান্টাইনদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য — এবং ক্রুসেডারদের এই সব এলাকা দখল মুক্ত করানোর জন্যে রাজিও করাতে হবে। কিন্তু বাহিনী জোগাড় করার সময় রাজনীতি সচেতন পোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রণনীতির গুরুত্ব তার কাছে খুবই কম ছিল। (চলবে)