The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
সম্রাটের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ক্রুসেড যাত্রা সফল করার জন্যে [পোপের মাধ্যমে] বেশ বড়সড় বাহিনী তৈরি করিয়ে নেওয়া। শুভেচ্ছা বার্তা নয়, আলেক্সিওসের জরুরি প্রয়োজন ছিল সামরিক সমর্থন। তাঁর চাহিদা হল তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে মহড়া নিতে পারার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নেতৃত্ব। বিষয়টা পোপ পশ্চিম ইওরোপে তার জনসংযোগ যাত্রায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে বলে গেছেন। সে সময়ের এক পুরোহিত লিখছেন, ‘আমি নিজের কানে স্বয়ং প্রভু পোপ আরবানের বার্তা শুনেছি, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষকে জেরুজালেমে তীর্থযাত্রায় উদ্বুদ্ধ করছেন আর সন্তদের স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহ করছেন (৫৪)’। জনৈক পঞ্জিকাকার লিখলেন, ‘তিনি বলেছেন, যারা এই অভিযানে অংশ নেবেন অথচ যুদ্ধে অপারগ, তারা শেষ পর্যন্ত মূল কাজের অন্তরায় হবেন, কোনও বাস্তবিক কাজে না লেগে বোঝা হয়ে দাঁড়াবেন (৫৫)’।
আরেক নথিতে বলা হল, ‘খ্রিষ্টিয় জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় এবং ব্যাপক উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ার’ মধ্যে থেকেও পোপ অক্লান্তভাবে চেষ্টা করে গেছেন অভিযানের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠা মানুষদের সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে (৫৬)। তাঁর এই ভাবনা বিশদ বর্ণনা করে ১০৯৬-এর বসন্তে ভাল্লাম্ব্রোসার মঠের সন্তদের লিখলেন, ‘আমরা শুনেছি তোমাদের কয়েকজন পবিত্র উদ্দেশ্যে নাইটদের সঙ্গে মিলে খ্রিষ্টীয়দের উদ্ধার করতে জেরুজালেমে যাত্রা করার পরিকল্পনা তৈরি করেছ। তোমাদের এই ভাবনা প্রভুর প্রতি, ধর্মএর প্রতি অসামান্য আত্মনিবেদনের উদাহরণ হলেও, যে কাজের জন্যে বাহিনী তৈরি হচ্ছে, সেই কাজ সম্পূর্ণ করার জন্যে তোমরা যোগ্য মানুষ নও। আমরা অভিযান সফল করার জন্যে মূলত নাইটদের মনে উদ্দীপনার বোধ জাগাতে চাইছি, কারণ একমাত্র নাইটেরাই সারাসিনদের বর্বরতা টেক্কা দিতে পারবে এবং হারিয়ে যাওয়া মুক্তিখানি খ্রিষ্টিয়দের ফিরিয়ে দিতে পারবে (৫৭)’। এই চিঠির কিছু দিন আগে বোলোনার জনগণের উদ্দেশ্যে লেখা বার্তায় প্রায় একই কথা লিখে পাঠান তিনি (৫৮)।
প্রবীন পুরোহিতেরা পোপের বক্তব্যকে বাস্তব রূপায়িত করতে থাকলেও, তাদের বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। তাঁরা তুলোসির বিশপ, বিপুল সম্পত্তির অধিকারিনী আলতিয়াসের এমারিকে অভিযানে অংশ নিতে নিরুৎসাহ করতে পারছিলেন না। তিনি যাত্রা করতে বদ্ধ পরিকর হয়েই জানালেন ইতিমধ্যে ‘নিজের কাঁধে ক্রুস তুলে নিয়েছেন’ এবং জেরুজালেমে পৌঁছবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন। খুবই অনিচ্ছায় তিনি যাত্রা থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হলেন। তবে এই সিদ্ধান্ত নিতে বিশপকে প্রচুর সময় দিয়ে তাঁকে বোঝাতে হয়েছিল অভিযানে অংশ নেওয়ার থেকে গরীবদের জন্যে একটা হসপিস তৈরি করা কম গুরুত্বের কাজ নয় (৫৯)।
আলেক্সিওসের হাতে কার্যকর যুদ্ধ বাহিনী তুলে দেওয়া একইসঙ্গে বাহিনীর আকার নির্ধারণ করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যম ছিল। বিপুল সংখ্যক মানুষকে খুব কম সময়ের মধ্যেই কন্সট্যান্টিনোপলে জায়গা দেওয়ার আগেই যথেষ্ট কার্যকর কাঠামো এবং রসদ সরবরাহের রাস্তার যোগাড়যন্ত্র করা সাম্রাজ্যের অন্যতম বড় মাথা ব্যথা ছিল। সাম্রাজ্য কর্তৃপক্ষ জানত বাইজান্টিয়ামে আগত বাহিনীকে স্বাগত জানানো, রসদ জোগাড় এবং পথ দেখাবার ব্যবস্থার জন্যে কেন্দ্রিয়স্তরে নিখুঁত পরিকল্পনা বাঞ্ছনীয় কাজ। পোপ এই তত্ত্বটা স্পষ্টভাবে জানতেন বলেই তিনি প্রথম থেকেই অভিযানে অংশ নেওয়া মানুষদের নৈষ্ঠিকভাবে শপথ নেওয়ানোর কথা বারবার বলে আসছিলেন। পিয়াসেঞ্জায় বাইজান্টিয়াম দূতের থেকে বার্তা পাওয়ার পরেই ‘এই সেবায় এবং সম্রাটের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে যারা তাকে সাহায্য করার কাজে অংশ গ্রহণ করবে, সেই সব বিশ্বাসীদের আহ্বান করে আমাদের প্রভু পোপ, অভিযান বিষয়ে এবং সর্বশক্তিমানের কাজ হিসেবে বিধার্মিকদের ক্ষমতা রোধ করতে এবং উৎখাত করতে শপথ নেওয়ানোর ব্যবস্থা করেন (৬০)’। বার্তাটা নতুন করে ক্লেরমঁতে পোপ আরবান উপস্থিত মানুষদের কাছে আরও উদ্দীপ্তভাবে তার বক্তব্যে তুলে ধরবেন (৬১)। যারা অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা চিন্তা করবেন, তাদের প্রতি ভয়াবহ পরিণতির হুমকি আর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হল, তারা সর্বশক্তিমানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে, ‘যারা শপথ নিয়েছেন, দুই কাঁধের মাঝে ক্রুস তুলে নিয়েছেন তারা যদি শপথ ভাঙেন… এবং তারা আমায় [উপাসনার] যোগ্য হবে না (উদা ম্যাথু ১০:৩৮) (৬২)’।
কতজন অভিযানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কাঁধে ক্রুস, হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, সে সংখ্যার কোনও পঞ্জীকৃত নথি নেই, এবং এ ধরণের কোনও সংখ্যায় উপনীত হতে পারার সম্ভাবনাও নেই বলা যায়। তবুও একটা বিষয় পরিষ্কার বিশাল সংখ্যক মানুষ অভিযানে যাওয়ার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দেওয়া যাক ফ্রান্সে স্বয়ং আরবান নাইট নির্বাচন করে সেনাবাহিনী তৈরির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। বেশ কিছু জায়গায় অংশগ্রহণকারীদের শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগতভাবে তিনি যোগ দেন (৬৩)। তিনি যখনই প্রখ্যাতদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, ক্রুসেডের মূল বিষয়টা তাদের বোঝাবার উদ্যোগ নিয়েছেন — যেমন লিমোজেস, এঞ্জার্স, লে ম্যানস এবং ট্যুর্স, নিকেস এবং আরও অন্যান্য স্থানেও তিনি যদিও সংখ্যার পরিমান বলছেন না, কিন্তু বিপুল বিশাল বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের তার ভাবনা জানিয়েছেন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং আশাবাদী পোপ এবং কন্সট্যান্টিনোপলে প্রায় অবরোধের মধ্যে বাস করা সম্রাট – দুজনেই আশা করছিলেন, অস্ত্রধারণের যে ডাক দেওয়া হয়েছে তার একটা প্রভাব জনগণের মধ্যে তো পড়বেই, কিন্তু তারা ভাবতে পারেন নি যে তাদের ডাক এত বড় আকার ধারণ করবে। জেরুজালেমের ডাকেও তিনি উদ্দীপনার নানান মালমশলা উপস্থাপন করেছেন, একই রকম উদ্দীপনা তিনি ১০৮০-র শেষে ১০৯০-এর প্রথমের দিকে স্পেন অভিযানেও ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু ইবারিয় উপদ্বীপে অভিযানে যাওয়ার মত যথেষ্ট নাইট তিনি জোগাড় করতে পারেন নি (৬৪)। কিন্তু সেই ঘটনার বিপরীতে জেরুজালেমে যাওয়ার জন্যে যে প্রথম ক্রুসেডের আহ্বান জানানো হল এবং তার প্রতিক্রিয়ায় যে বিপুল উদ্দীপনা তৈরি হল, তার জন্য দায়িছিল একটি বিশেষ ঘটনা, পূর্বের খ্রিষ্টিয় দেশগুলির পতনের বিশদ খবর, বিশেষ করে এশিয়া মাইনরের হাত বদল।
অভিযানের অংশ নেওয়া মানুষের পরিমানের খবর, যদিও সংখ্যায় নয়, সম্রাট আলেক্সিওসকে নিয়মিত অবগত করানোর উদ্যম নেওয়া হয় কারন তাকেও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করার প্রস্তুতি নিতে হবে। ক্রুসেডারেরা বাইজান্টাইনের দিকে যেতে শুরু করলে তাদের রসদ দেওয়ার জন্যে রাস্তায় বেশ কিছু জায়গায় শিবির করে জানিয়ে দেওয়া হল তাদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে সম্রাট যত্নসহকারে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। সাম্রাজ্যে প্রবেশের দ্বারগুলিতে এবং কন্সট্যান্টিনোপলে যাওয়ার রাস্তাগুলির মুখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছে।
অংশত এই ব্যবস্থাপনাটা সফল হয়েছিল, তার কারন অভিযানের পরিষ্কার সময় সারনি শুরুতেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পোপ যাত্রা শুরুর দিন নির্ধারণ করেছিলেন ১৫ আগস্ট — গ্রীষ্মকালে প্রবেশের প্রথম পবিত্র ফিস্ট অব দ্য এজাম্পশনের দিন। তারিখটা নির্ধারণ করা হয়েছিল অংশত আগামী যাত্রার কাঠামো তৈরি করতে অংশত বাইজান্টাইমে সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার জন্যেও। গ্রীষ্মে যাত্রার দিন স্থির হল ক্লেরমঁর আরবানের বক্তৃতার পাক্কা ন’ মাস বিলম্বে যাতে পশ্চিমীরা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলে তাদের জন্যে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ করা যায়।
অন্যান্যদের তুলনায় আলেজান্দ্রিয়ায় কিবোতোসের (সাম্রাজ্যের সেনা ছাউনি — অনু) ব্যবস্থাপনা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলেক্সিওস প্রথম থেকেই এখানে পশ্চিমি নাইটদের ছাউনি ফেলার পরিকল্পনা ছকে রেখেছিলেন। খুবই জটিল একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল এই বিশ্বাসে যে হাজারো সেনানী এখানে থাকবেন — খাদ্য গুদাম, অন্যান্য সরবরাহ এবং সওদাগরদের তৈরি রাখা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক সেনানী এবং ঘোড়া রাখার জন্যে (৬৫)। সঙ্গে একটা ল্যাটিন মঠও তৈরি হল যাতে আগন্তুকেরা তাদের আধ্যাত্মিক চাহদা পূরণ করতে পারেন — এর ধরণের পরিকল্পনা থেকে রোমিয় আচার আচরণ বিষয়ে আলেক্সিওসের মুক্ত চিন্তার ইঙ্গিত মেলে (৬৬)। (চলবে)