The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
সাত
পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
১০৯৬-এর দ্বিতীয় পাদে আরও বিপুল সংখ্যায় মানুষ অভিযানে অংশ নিতে এগিয়ে আসবেন। প্রত্যেক অভিযাত্রীদলকে বলে দেওয়া হয়েছিল কন্সট্যান্টিনোপল ছিল তাদের প্রথম বিরতিস্থল। মোটামুটি আন্দাজ হল, প্রথম ক্রুসেডে খুব কম করে ৮০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন (৭৫)। এর আগে ইওরোপে সঙ্গঠিতভাবে এত কম সময়ের আয়োজনে এত বেশি দূরত্ব পূরণ করতে এত বেশি মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস নেই বলা যায়। ফলে পশ্চিম ইওরোপের নানান অঞ্চল থেকে জড়ো হল, এর ফলে অভিযানে অভিযানে অংশ নিতে চাওয়া মানুষদের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা বিশেষ করে ভাষার সমস্যা দেখা দিল। চার্টারের ফুলচের লিখলেন ‘…পশ্চিমের দেশ থেকে বিপুল মানুষ সংখ্যক ছোট ছোট ভাগে দিনের পর দিন অভিযানের অংশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায়, একটা বিপুল কলেবরের সেনাবাহিনী তৈরি হল। এই বাহিনীতে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের, ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে একসঙ্গে দেখতে পাছি (৭৬)’। অভিযানে অংশ নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন এলাকার মানুষের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি, ‘কে ভেবেছিল কোনও এক বাহিনীতে এত পরিমান ভাষিক মানুষ অংশ নেবে? ফরাসি, ফ্লেমিং, ফ্রিসিয়, গল, এলোব্রোজেস, লোথারিঞ্জিয়ান, আলেমান্নি, বাভারিয়, নরমান, ইংরেজ, স্কট, একুইটানিয়ান, ইতালিয়, ডাচ, আপুলিয়, ইবেরিয়, ব্রেটন, গ্রিক এবং আরমেনিয় যোগ দিয়েছিল। যদি কোনও ব্রেটন বা টিউটন আমায় কোনও কথা জিজ্ঞেস করে, আমি উত্তরই দিতে পারব না [তাদের কথা বুঝতেই পারব না] (৭৭)’।
অভিযান আদতে খ্রিষ্টিয় একতার একটা উদাহরণ পেশ করল এমন এক সময়ে, সে সময় চার্চের মধ্যে বিভেদ, আঞ্চলিক চরিত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতা বা আধ্যাত্মিক লড়াই তুঙ্গে উঠেছে, অথচ মানুষজন এ সব উপেক্ষা করলেন, কোনও বাধাই কার্যকর বাধা হিসেবে গণ্য হল না। সব থেকে বড় বিষয় হল, এই বাহিনী তৈরির মধ্যে দিয়ে রোম আর কন্সট্যানটিনোপলের মধ্যে নতুন এক বোঝাপড়া আর আশাবাদের সময়ের শুরু হল। ১০৯৮-তে বারির কাউন্সিল বৈঠক, পূর্ব এবং পশ্চিমের চার্চগুলির মধ্যে চলতে থাকা শতাব্দব্যাপী বিভেদ মিটে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে এবং রোম স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে পরের বছরগুলিতে সমস্ত সমস্যা সমাধানে আগ্রসর হবে। সব কিছু ঠিকঠাক চলতে শুরু করলে পশ্চিমিদের সহায়তায় বাইজান্টিয়াম এশিয়া মাইনরে তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইতে অগ্রসর হওয়ার জন্যে কোমর বাঁধছে। এই অভিযানে অধিকাংশ অংশ নেওয়া সেনা পবিত্র শহরে পৌঁছবার আশা করে অধীর আগ্রহে ইওরোপে বসে আছে। ইওরোপজুড়ে বিপুল আশা জাগিয়ে প্রথম ক্রুসেড যাত্রা, শুরু হওয়ার মুখোমুখি।
ক্রুসেডের ব্যবস্থাপনা থেকে আলেক্সিওস এবং আরবান দুজনেই প্রচুর সাফল্যের আশা তো করছেনই, কিন্তু তাদের সামনে বিপদের হাতছানিও খুব কিছু কম ছিল না — ক্রুসেড অভিযানের যে বিপুল বাহিনী তৈরি হল, সেটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারত। আন্না কোমনেনে এই দ্বন্দ্বকে কয়েকটিবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিম থেকে অগণিত বাহিনী বাইজান্টিয়ামের দিকে অগ্রসর হওয়ার সংবাদে সম্রাট খুবই চিন্তিত হয়ে উঠলেন (৭৮) — ‘উদ্দীপ্ত উৎসাহে আর শক্তি নিয়ে তারা প্রত্যেকটি রাজপথ ভরিয়ে ফেলল, এবং এই যোদ্ধা বাহিনীতে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ হাতে পাম কাঠ আর কাঁধে ক্রুস নিয়ে যোগ দিলে তাদের সংখ্যা সমুদ্র তটের বালুকার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়, স্বর্গের তারার সংখ্যা হারিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে দেশ ছেড়ে বাহিনীতে যোগ দেওয়া মানুষদের মধ্যে মহিলা আর শিশুও ছিল। শাখা নদী যেভাবে সব দিক থেকে জল বহন করে নিয়ে এসে মূল নদীকে পুষ্ট করে, তারাও ঠিক সেইভাবে মূল বাহিনীর আকারকে বৃদ্ধি করতে শুরু করে (৭৯)’। সম্রাট কী এই ধরণের অপেশাদার অকার্যকর বাহিনী চেয়েছিলেন? তাহলে সমস্যা কোথায় দেখা দিল?
আট
সাম্রাজ্যের শহর
আলেক্সিওস এবং আরবান এক যোগে বিশাল বড় একটা বিপজ্জজনকতম খেলা খেলতে নেমেছিলেন। ক্রুসেডে অংশ নেওয়ার যে বার্তা তারা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন পশ্চিম ইওরোপের প্রত্যেকটি অঞ্চলে, তাতে যে হিংসাত্মক আবেগ উথলে উঠছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ কাজ ছিল না; প্রত্যেক যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন পরিকল্পনা এবং সূক্ষ্ম রাজনৈতিক অঙ্কের মাঝেও ক্রুসেড বিষয়ে যে জৈবিক উৎসাহ উথলে উঠছিল, সেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সোজা কাজ ছিল না। মুসলমান হিংসা এবং তাদের ছড়িয়ে পড়ার পোপের যে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছিল পশ্চিমজুড়ে, তার ফলে বড় বড় দলগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা স্রেফ অসম্ভব পর্যায়ে পৌঁছে যায় – তাছাড়া শুধুই পোপ আরবান চুম্বকীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না যিনি একা ১০৯৫-৯৬-তে জেরুজালেমে অভিযানের ডাক দিচ্ছিলেন। পোপের ডাকে পূর্বদেশের খ্রিষ্টিয়দের ওপর হিংসা নিবারণ অভিযানের জন্যে যে ফ্রান্স জুড়ে চরম উদ্দীপনা আর ক্রোধের পরিবেশ তৈরি হল, তাকে অনেকেই নিজের স্বার্থে উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহার করতে শুরু করে। আন্না কোমনেনের বর্ণনায় পাচ্ছি উত্তর ফ্রান্সের এমিয়েন্সের পিটার দ্য হারমিট একটা বিপজ্জনক বিশৃঙ্খল ক্রুসেড বাহিনী তৈরি করলেন। পশ্চিমের এই বাহিনী মহান কন্সট্যান্টিনোপল শহরের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল, আলেক্সিওসের পক্ষে সেই বাহিনীর ওপর তার কর্তৃত্ব জাহির করা জরুরি ছিল। মাথায় রাখতে হবে জনগণের ক্রুসেডের প্রতিক্রিয়া, আনুগত্যের নেটওয়ার্ক আর ক্রুসেডিয় বাহিনীর নেতৃত্বের বিষয়ে সম্রাটের প্রতিক্রিয়ার ওপরে নির্ধারণ করবে ক্রুসেডের ভবিষ্যৎ।
সমসাময়িকদের ভাষায় পিটার দ্য হারমিট ছিলেন ‘অতি প্রখ্যাত সন্ত, সাধারণ মানুষ তাঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে; তাছাড়া জনগণ পিটারের অদ্ভুত ধর্মচর্চার কারনে, তাঁকে ক্রিষ্টিয় পুরোহিত আর এবটদের ওপরে তাঁকে স্থান দিতেন; তার একটা বড় কারন ছিল তিনি রুটি বা মাংস সেবন করতেন না — কিন্তু মদ্য বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য গ্রহনে তার অসম্মতি ছিল না আর আনন্দ গ্রহণে তিনি খুব একটা উৎসাহীও ছিলেন না (১)’। খালিপায়ে হাঁটা পিটার, পোপের দৃষ্টির বাইরে থাকা, চতুর্থ হেনরির অঞ্চল হিসেবে রাইনল্যান্ড জুড়ে নিজের আনন্দে শিক্ষা দান করে বেড়াতেন (২)। পিটারের কাজ ছিল পূর্ব দেশগুলোয় খ্রিষ্টদের ওপর অত্যাচারের ভয়াবহ গল্প-সল্প ছড়িয়ে বেড়ানো, তবে অধিকাংশ সময়ে উপস্থিত জনগণকে তিনি চোখে জল এনে বলতেন সাম্প্রতিক সময়ে জেরুজালেমে তীর্থযাত্রায় গিয়ে তিনি স্বয়ং কীভাবে তুর্কিদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন তার বাখান। তবে মনে হয় পবিত্র ভূমিতে কোনও দিনই যান নি, কিন্তু দাবি করেছেন ফেরার পথে তিনি পোপের সঙ্গে মোলাকাত করে এসেছেন এবং তিনিই স্বয়ং জেরুজালেমের প্যাট্রিয়ার্কের বার্তা বহন করে এনেছেন। আরবানের মত তার বার্তাও উর্বর খ্রিষ্টিয় ভূমিতে বিপুল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল (৩)।
কিন্তু পোপ যে বাঁধনে তার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার তুলনায় পিটারের ছড়িয়ে দেওয়া বার্তায় বাঁধনও ছিল না, ধরাবাঁধা কাঠামোও ছিল না। আরবান সাবধানে ক্রুসেডের পরিকল্পনা ছকছিলেন — বড় বাহিনী তৈরি করার ক্ষমতাওয়ালা গুরুত্বপূর্ণ অভিজাতদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্দেশ দিচ্ছিলেন যুদ্ধ অভিজ্ঞতা না থাকা মানুষদের অভিযান থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যম নিতে এবং যাত্রায় অংশ নিতে আবশ্যিক শপথ গ্রহন নিশ্চয় করার — পিটার এসব কোনও সাবধানতাই অবলম্বন করছিলেন না। তিনি যাত্রার দিনক্ষণও যেমন তৈরি করেন নি, তেমনি যোগ্যদের অংশ নেওয়ার বিষয়ে তার কোনও বার্তা ছিল না। এর ফল হল যাদের মন চাইল, তারা প্রত্যেকে ক্রুসেডে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল। সমসাময়িক এক লেখক লিখলেন, ‘[পিটারের] ডাকের প্রত্যুত্তরে প্রাথমিকভাবে বিশপ, এবট, ক্লারিক, সন্তরা, তাদের সঙ্গে সাধারণ অভিজাত, বিভিন্ন রাজ্যের রাজা, এবং বাছাবাছি না করা পাপী সাধারণ মানুষ থেকে পবিত্র ধর্মাত্মা, ব্যাভিচারী, খুনি, চোর, মিথ্যাবাদী, ডাকাত — বলা দরকার খ্রিষ্টিয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী প্রত্যেকে — এমন কী পাপ থেকে মুক্তি চাওয়া মহিলারাও আনন্দ সহকারে যাত্রায় অংশ নিলেন (৪)’। (চলবে)