The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
আট
সাম্রাজ্যের শহর
দেখাগেল আলেক্সিওস হয়েউঠলেন অসামান্য দিলখোলা অতিথি সেবক। তিনি পরম ঔদার্যে আর জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব, অনুষ্ঠান আয়োজন করে পশ্চিমি রাজনেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে খুশি করেদিলেন। সাম্রাজ্যের রাজধানীতে তাদের কীভাবে সম্মান জানানো হয়েছিল, তার বিশদ বিবরণ ব্লোয়িসের স্টিফেন লিখলেন তার স্ত্রী, উইলিয়াম দ্য কনকারারের কন্যা আদেলাকে। তিনি বললেন ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে সম্রাট, তার রাজত্বে আসা প্রত্যেক নেতৃত্বকে বিপুল উপঢৌকনে ভরিয়ে দিয়েছেন, এবং উপঢৌকন যাতে শুধু ওপরেরস্তরের নেতা ছাড়াও, সেনা থাকবন্দীর সাধারণ নাইটদের কাছে পৌঁছয় সেটাও তিনি নিশ্চয় করলেন। ব্লোয়িসের স্টিফেন লিখছেন ‘আমার মনে হয়, এই সময়ে কোনও রাজার তার মত সততা আর ব্যতিক্রমী চরিত্র নেই। তোমার পিতা আমায় ভালবাসতেন, প্রভূত উপহারও দিয়েছেন, কিন্তু তিনি এই দিলখোলা মানুষটার কাছে সে সব উপহার অতীব তুচ্ছ। তার সম্বন্ধে আমি কয়েকটা শব্দ তোমায় লিখছি কারন যে মানুষটা আমায় আনন্দ দিয়েছেন, তিনি কী রকম চরিত্রের সে সম্বন্ধে তুমি যাতে একটা ধারনা তৈরি করতে পার (৪৯)’।
স্টিফেনের চিঠি থেকে পরিষ্কার তার প্রতি সম্রাট আলেক্সিওস কী পরিমান পরিচর্যা বর্ষণ করেছিলেন — সম্রাটের প্রাসাদে তিনি যে দশ দিন ছিলেন, প্রত্যেক দিন তাকে নানান উপহারে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং স্টিফেনকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার পুত্রকে কন্সট্যান্টিনোপলে পাঠিয়ে দিতে যাতে তিনি তাকেও ‘সম্মানিত করতে পারেন’। এই পরিচর্যা প্রভাব চোখে দেখাগেল। স্টিফেন শুধু আলেক্সিওসকে অসামান্য মানুষ হিসেবেই গণ্য করলেন না, তিনি তাঁকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্বীকার করলেন এবং তাঁকে পিতার স্থান দিলেন (৫০)।
সম্রাটের সঙ্গে ক্রুসেডারদের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকার আগে এই চিঠি স্টিফেন তার স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন, যদিও পরের বহু চিঠিতে আলেক্সিওসের উন্মুক্ত হৃদয়ের বেশ কিছু প্রমান পাচ্ছি। ক্রুসেডের অন্যতম অংশিদার চাত্রেসের ফুলচারকে সম্রাট বিপুল পরিমানে মুদ্রা এবং অসম্ভব দামি আর অভিজাতদের পরিধানযোগ্য রেশমের পরিধেয় উপহার দিলেন (৫১)। জনৈক প্রত্যক্ষ্যদর্শী আলেক্সিওসের ঔদার্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে গিয়ে বললেন পশ্চিমিদের বলা হল সোনা, রূপো, দামি পাথর এবং পরিধেয় বিষয়ে চাহিদা জানান দিতে (৫২)। যদিও সম্রাট তাদের সবকটি অনুরোধ রাখেন নি, কিন্তু অভিযানে আসা নেতৃত্বের সমর্থন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে তিনি হাত খুলে যত আর যে ধরণের উপহার বিলিয়েছেন তার কোনও হিসেব নেই আর তার মূল্যও অসীম।
অন্য সূত্র থেকে পাওয়া সংবাদে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাঁর রাজ্যে পদার্পণের পর বিখ্যাত ক্রুসেডারদের সম্রাট আলেক্সিওসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে হয়েছে। অতীতের বাইজান্টাইন সার্বভৌমরা যেভাবে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক আর দৌত্য করেছেন, এটা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মধ্য দশক শতকে কিয়েভের শাসক পরিবারের রাজকুমারী ওলগা রাজধানীতে এলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সম্রাটের সঙ্গে মিষ্টিমুখ করতে (৫৩), একই সময়ে জার্মান সম্রাটের পাঠানো দূত বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে দেখা করার জন্যে বহু দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল (৫৪)।
দশম শতে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হওয়াটাই বিশদ আর বিরাট ব্যাপার ছিল। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী লিখছেন, ‘সম্রাটের সিংহাসনের সামনে ব্রোঞ্জের গিলটি করা তিনটে গাছ রাখা ছিল, তার ডালপালাগুলিও গিলটি করা ব্রোঞ্জের তৈরি এবং সেই সব পাতায় বসা বিভিন্ন আকারের পাখি নিজস্ব সুরে গান গাইত …বিশাল আকারের সিংহ (সেটি কাঠের, না তামার সে তথ্য পরিষ্কার নয় — কিন্তু সোনার চাদর দিয়ে মোড়া) সম্রাটকে পাহারা দিত এবং মঝেতে লজ নাড়ত, সেটি মুখ খুলে জিভ বার করে চিৎকার করত। দুই খোজার কাঁধে ভর দিয়ে আমি সম্রাটের দিকে এগিয়ে গেলাম।’ এই সময় সিংহাসন থেকে একটা যান্ত্রিক বস্তু ছাদ অবদি উঠে গিয়ে সম্রাটের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে আসা মানুষটার মধ্যে ব্যবধান তৈরি করে, দূরে রাখত (৫৫)।
ক্রুসেডারদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে আলেক্সিওস যে পথ অবলম্বন করেছিল, সে পথ হয়ত তার পূর্বজদের অনুমোদন পেত না, বরং তাদের বিক্ষুব্ধ করে তুলত। সম্রাট অনানুষ্ঠানিক ব্যবহার করে পশ্চিমি নেতাদের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন। কেউ কেউ ভেবেছিল আলেক্সিওস বাড়াবাড়িই করছেন; একবার দেখাগেল দরবারে উপস্থিত নাইটদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি সিংহাসন ফাঁকা রেখে উঠে এসেছেন এবং সেখানে একজন আত্মবিশ্বাসী নাইট বসে পড়েছে। তার সাথী তাকে বকা দিলে তিনি সম্রাটের নাম ধরে ডেকে উঠলেন এবং তিনি নাকি বলে ওঠেন ‘অসামান্য উপহার!’ আলেক্সিওসকে যখন মন্তব্যগুলি অনুবাদ করে শোনানো হচ্ছিল তিনি অসীম ঔদার্যে বিষয়টা গ্রহন করলেন এবং নাইটকে মনে করিয়ে দিলেন আগামী দিনে তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষেত্রটি এর থেকে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে (৫৬)।
পশ্চিমি নেতাদের সমর্থন পাওয়ার জন্যে তাদের সঙ্গে আলেক্সিওস যে ব্যবহার করলেন, সেটা খুবই আশ্চর্যের, বিশেষ করে বোহেমোঁর সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরির পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বোহেমোঁ খুবই আকর্ষণীয় চরিত্রের মানুষ এবং ক্রুসেডারদের মনে স্বাভাবিক আনুগত্য তৈরি করতে অনবদ্য ছিলেন। তাঁর ছিল আকর্ষণীয় শস্রুগুম্ফহীন চেহারা। যে বিশ্বে মানুষ বড় দাড়ি ঝুলো গোঁফ যোদ্ধা চেহারা আশা করত, সে সময়ে এধরণের চেহারা মানুষকে তীব্র আকর্ষণ করেছে (৫৭)। আন্না কোমনেনে বলছেন, ‘রোমক ভূমিতে, বর্বরই হোক বা গ্রিক, তিনি আলাদাভাবে নিজেকে উপস্থিত করতে চাইতেন। তার উপস্থিতিই আনুগত্য দাবি করত, তার নামে আতঙ্ক ছড়াত।’ আলেক্সিয়াদ বলছ, তার উপস্থিতি খুবই আকর্ষণীয় ছিল ‘এই আকর্ষণ অন্যান্যদের ম্লান করে দিত, তার হাসির আওয়াজ অন্যান্যদের মনে আতঙ্ক ছড়াত।’ তিনিই আগামী দিনে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এবং আলেক্সিওসের বিপর্যয় রূপে পরিগণিত হবেন।
১০৮০-র দশকে এই দুই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করেছেন, দুজনই দুজনের শক্তি আর দুর্বলতা খুব ভালভাবে জানেন। তিনি কন্সট্যান্টিনোপলের কাছে যত আসছিলেন, বোহেমোঁ নিশ্চিত জানতেন না সম্রাটের উপস্থিতিতে তাকে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। কিন্তু দুজন মুখোমুখি হলেই শুরু হল অতীতচর্চা। বোহেমোঁ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বললেন ‘আমরা অতীতে পরস্পরের শত্রু ছিলাম আর প্রতিপক্ষও ছিলাম, কিন্তু আমি কিন্তু বর্তমানে স্বইচ্ছেয় মহামহিমের বন্ধুরূপে উপস্থিত হয়েছি’। প্রথম আলোচনায় আলেক্সিওস দ্বন্দ্বের আবহাওয়াকে খুব বেশিদূরে গড়াতে দিলন না, তিনি উত্তর দিলেন, ‘অনেক দূর যাত্রা করে আপনারা ক্লান্ত হয়ে এসেছেন, এখন বিশ্রাম নিন। আগামীকাল আমরা বিশদে আলোচনা করব (৫৮)’।
সম্রাটের প্রাক্তন শত্রুকে আপ্যায়ণ করতে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বোহেমোঁ জন্যে কোসমিডিয়নে যে প্রাসাদ ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার একটা টেবলে নানান ধরণের খাদ্য বিছানো ছিল। রাঁধুনি রান্না না করা পাখি এবং অন্যান্য মাংস এনেছিলেন। তারা বলল, ‘আমাদের মত প্রথাগতভাবে তৈরি করে টেবলে খাবার সাজানো হয়েছে, সেগুলি যদি আপনার পছন্দ না হয়, আপনার জন্যে রান্না না করা মাংস নিয়ে এসেছি, আপনি যেমন চান রেঁধে দেব (৫৯)’। আলেক্সিওস জানতেন বোহেমোঁ খাওয়ার নিয়ে সন্দেহ করবে — নরমানেরা বাইরের খাবার স্পর্শ করে না — যদিও তিনি দাবি করতেন সাথীরা তাঁকে রেঁধে দিতেন। পরের দিন যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল কেন তিনি কোনও খাবার ছোঁন নি, তিনি দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল সে আমার খাওয়ারে বিষ মিশিয়ে হত্যার চক্রান্ত করছে (৬০)’।
আলেক্সিওস বোহেমোর প্রাসাদ এবং প্রাসাদে টাল করে কম দামি কাপড়, সোনা রূপো মুদ্রা উপঢৌকন এমনভাবে রেখেছিলেন যাতে কারোর পক্ষে সেগুলো না ঠেলে ঢোকা অসম্ভব হয়। বোহেমোঁ সঙ্গে থাকা মানুষটিকে তিনি বিশেষ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে দরজা খুলতেই বোহেমোঁ উপহার দেখে অবাক হয়ে যান। সত্যকারের বোহেমোঁ অবাকই হয়েহিলেন, তার সঙ্গে থাকা মানুষটি তাঁকে বলল, ‘এগুলো সব আপনার, সম্রাটের পক্ষ থেকে উপহার (৬১)’। (চলবে)