The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
আট
সাম্রাজ্যের শহর
সম্রাটের অমিতব্যয়ী উদারতা বিস্তৃত হয়েছিল ক্রুসেডে আসা বাহিনীর নিম্নস্তরের সেনানীদের প্রতিও। ব্লোয়িসের স্টিফেন বলছেন, ‘আলেক্সিওসের উপহার নাইটদের প্রবাস জীবন সহজ করতে সাহায্য করেছিল, নিচুস্তরের সেনারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হচ্ছিল সম্রাটের মহানুভবতায়। তাঁর আয়োজিত ব্যাঙ্কোয়েটে গরীব সেনানীরা খুবই উতসাহ নিয়ে যোগদান করত (৬২)’। প্রতি সপ্তাহে বাউলিয়নের গডফ্রের কাছে, হয়ত অন্য বিখ্যতদের শিবিরেও চারজন করে দূত পাঠাতেন, সেনাবাহিনীর নানানস্তরের পদাধিকারীর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমানে সোনার মুদ্রা বিলোবার জন্যে (৬৩)।
ক্রুসেডারদের প্রতি আলেক্সিওস এত যত্ন আত্তি করা সত্ত্বেও অগ্রিম পরিকল্পনা অনুযায়ী সব ঘটনা ঘটছিল না। ১০৯৬-এর বড় দিনের মুখোমুখি সময়ে বাউলিয়নের গডফ্রে কন্সট্যানিনোপলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে ঘটনাক্রম সম্রাটের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে থাকে। লোরেইনের ডিউককে বসফরাস প্রণালী পেরোনোর জন্যে বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি সম্রাটকে চিন্তার সমুদ্রে ডুবিয়ে বসফরাস প্রণালী পেরোতে অস্বীকার করলেন। সম্রাটের অস্বস্তির কারন ছিল রাজধানীর কাছাকাছি দলবেঁধে অসামান্য সব নামী, অভিজ্ঞ, যুদ্ধদক্ষ পশ্চিমি নাইটদের উপস্থিতি (৬৪)। গডফ্রেকে প্রণালী পেরোবার সমস্ত পরোক্ষ চাপ ব্যর্থ হলে সরাসরি সম্রাটের জামাই নিকেফোরোস ব্রায়েন্নিওসের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী পাঠালেন তাকে চাপ দিয়ে শহর থেকে দূরে বসফরাস প্রণালীটির পূর্বাংশে পার করিয়ে তার নামে তৈরি উদ্দিষ্ট শিবিরে পৌঁছে দেওয়ার কাজে তাকে বাধ্য করতে (৬৫)।
দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে ছোটখাটো যুদ্ধ শুরু হল। ‘সিংহের মত তুমুল গর্জন করতে করতে’ স্বয়ং ডিউক সাম্রাজ্য বাহিনীর সাতজনকে হত্যা করলেন। অন্যদিকে ব্রায়েন্নিওস এমন তীরান্দাজি করলেন তাকে যেন তার স্ত্রীর ভাষায় স্বয়ং এপেলোর মত লাগছিল। মাথায় রাখা দরকার, যুদ্ধের গুরুত্ব দুপক্ষের লড়াইএর গুণাগুণ বিচার করা নয়, একটা বিষয় পরিষ্কার, ক্রুসেডে যোগ দেওয়া নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে অলেক্সিওসকে বলপ্রয়োগও করতে হচ্ছিল (৬৬)।
গডফ্রেকে বসফরাস পার করানোর চেষ্টা কাজে লাগল না। কন্সট্যান্টিনোপল শহর, শহরের লাগোয়া প্রচুর সাজানোগোজানো সাম্রাজ্য কাঠামো ধ্বংস করল গডফ্রের সাথী আর সেনাবাহিনী (৬৭)। সামরিক সমাধান ব্যবহার করেও কাজ না হওয়ায় আলেক্সিস ক্রমাগত গডফ্রেদের বরাদ্দ রসদ বন্ধ করে দিলে, ‘শুরুতে তাদের বার্লি আর মাছ বিক্রি বন্ধ করা হল, তারপরে রুটি বন্ধ হল; উদ্দেশ্য ডিউক কে সম্রাটের সঙ্গে বৈঠকে রাজি করানো (৬৮)’। এটা খুবই কঠোর এবং একইসঙ্গে সাহসী পরিকল্পনা বলা যায়। এরত ফলে হয়ত অবস্থা আরও বিগড়োতে পারত। কিন্তু শেষমেশ এই চাপ তৈরির রণনৈতিক পরিকল্পনা শান্তি আনতে কাজে দিল। গডফ্রে পিছু হঠে আলেক্সিওসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মোলাকাতে রাজি হলেন। আলেক্সিওস দশ বছরে পা না দেওয়া পুত্রকে জামিনে রেখে, গডফ্রে মন পেতে বৈঠক আয়োজন করলেন (৬৯)।
গডফ্রে আর তার সঙ্গীরা তাদের ক্ষমতা আর পদমর্যাদা প্রকাশ করা টকটকে লাল আর সোনালি আংরাখা পরে দারুন সেজে বৈঠকে গেলেন (৭০)। দুপক্ষের মধ্যে শর্ত নির্ধারিত হল, গডফ্রের বাহিনী নিয়ে বসফরাস পেরিয়ে ক্রুসেডের বাহিনীর জন্যে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি হওয়া কিবোতোসে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে নিজেদের জন্যে বরাদ্দ শিবিরে যোগ দেবেন, তার বদলে তাঁকে বিপুল পরিমানে সোনা, রূপো, লাল রঙের আংরাখা, খচ্চর আর ঘোড়া দিতে হবে (৭১)। আলেক্সিওসের চাহিদা পূর্ণ হল। জাঁকজমক দেখানো, ঘুষ দেওয়া, বলপ্রয়োগ করা, রসদ সরবরাহ আটকে দেওয়া ইত্যাদি চাপ তৈরির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের ওপরে আলেক্সিওস তার সুযোগ্য নেতৃত্ব চাপিয়ে দিলেন। এক পশ্চিমি অকপটে লিখছেন, ‘সম্রাটের সঙ্গে সব ক্রুসেডারের বন্ধুত্ব সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি ছিল, কারন তার সাহায্য এবং পরামর্শ ব্যতিরেকে এই জটিল আর গুরুত্বপূর্ণ অভিযান সফল হওয়া সম্ভব নয়; আর যারা আমাদের অনুসরণ করে পিছনে পিছনে আসছে তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায় (৭২)’। খবর পাঠাবার একটা সক্রিয় উপায় ছিল রসদ বরাদ্দ সাময়িকভাবে আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা (৭৩)।
ক্রুসেডার নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ব্যবহার ছিল সাম্রাজ্যের শেষতম হাতিয়ার; অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০৯৬-৯৭তে সাম্রাজ্য প্রশাসন খুবই সফল পদ্ধতিতে ক্রুসেডে আসা বাহিনীর জন্যে ব্যবস্থাপনা করেছে এবং পশ্চিমি নাইটদের উপস্থিতিতেই এই ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া শান্ত এবং মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়। এই কাজটায় সম্রাট সম্ভব হলেন তার বড় কারন হল ক্রুসেডে আসা নেতৃত্বের প্রতি সম্রাটের প্রসারিত অতিগভীর হৃদরবত্তা এবং অখণ্ড মনোযোগ দেওয়া। রাজধানীকে ক্রুসেডারদের আঘাত থেকে বাঁচাতে সম্রাটের প্রসাসনের পক্ষ থেকে কিছু বাস্তবজনোচিত পদক্ষেপ নেওয়া হল। উদাহরণস্বরূপ পশ্চিমিদের জন্যে শহরে প্রবেশ করার বিষয়ে প্রভূত কড়াকড়ি করা হল — শহরের মূল প্রতিরক্ষা দেওয়াল পেরোনোর অধিকার সকলের ছিল না, ছোট ছোট দলে তাদের প্রবেশের অধিকার দেওয়া হল। একটা সূত্র বলচ্ছে, পরিকল্পনামাফিক ঘন্টায় মাত্র পাঁচ থেকে ছজন শহরে প্রবেশ করতে দেওয়া হল ক্রুসেড বাহিনীর সদস্যদের (৭৪)।
নাইটদের বসফরাস প্রণালী পার করে দিয়ে তাদের কিবোতোসে পৌঁছে দেওয়া ছিল আলেক্সিওসের প্রাথমিক অগ্রাধিকার। তিনি যেহেতু বিপুল সংখ্যক মানুষকে আহ্বানা জানিয়েছেন তাই তাদের চাহিদা পূরণের জন্য সেখানে বিপুল পরিমান রসদ জোগাড় করা ছিল। বাউলিয়ানের গডফ্রের উদাহরণে পরিষ্কার রসদের জোগাড় করাটা ছিল প্রাথমিক জরুরি কাজ। আমরা আগেই দেখেছি, ক্রুসেডারদের বিশাল বাহিনী কন্সট্যান্টিনোপলের দিকে এগিয়ে আসার সংবাদে অনেক নাগরিকই ধরে নিয়েছিলেন বাহিনীর উদ্দেশ্য জেরুজালেম উদ্ধার নয় বাইজান্টাইনের রাজধানী দখল। আন্না কোমনেনে লিখলেন ‘ক্রুসেডারদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল কন্সট্যান্টিনোপল দখলের স্বপ্ন পরিপূর্ণ করা, এটাই তাদের যৌথ উদ্দেশ্য ছিল, আমি আগেও বহুবার একথা বলেছি – তারা দেখাচ্ছিল জেরুজালেমে তীর্থযাত্রায় যাছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের ভাবনা ছিল সম্রাটকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজ্য দখল করা (৭৫)’। কন্সট্যান্টিনোপল দখল ছিল বিদেশিদের গোপন এজেণ্ডা, এই সন্দেহ শুধু বাইজান্টাইন প্রশাসকদের কুরে কুরে খাচ্ছিল না, অন্য লেখক, যেমন সিরিয়ার মাইকেল সাম্রাজ্যের সীমান্তে বসে পঞ্জিকা লিখতেন, তিনিও বিশ্বাস করতেন নাইটেরা বাইজান্টিয়ামে ছোটখাটো লড়াই ঝগড়া করে থেমে যাবে না, কন্সট্যান্টিনোপল দখল করতে পূর্ণশক্তি নিয়ে ঝাঁপাবে (৭৬)। (চলবে)