The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম ক্রুসেডের আসল ঘটনা বিকৃত করে পোপ কেন্দ্রিকতায় ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টার দুটো সম্ভাব্য উদ্দেশ্যপূর্ণ কারন আমি দেখতে পাচ্ছি। জেরুজালেম দখল করার পরে পশ্চিমের বেশ কিছু শক্তিশালী পঞ্জিকাকার, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ পুরোহিত এবং সন্ত, তাদের স্বার্থপূরণে এই দীর্ঘ অভিযানের পোপকেন্দ্রিক বয়ান তৈরি করলেন। তাদের বক্তব্য ছিল পোপই অভিযান ভাবনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। এই বয়ান আরও শক্তিশালী হল লেভন্ট এলাকায় বেশ কয়েকটা ক্রুসেডার রাষ্ট্র যেমন জেরুজালেম, এডেসা, ত্রিপোলি এবং আরও বড়ভাবে আন্টিওক তৈরি হওয়ার পরের সময়ের ঘটনাবলীতে। এই রাষ্ট্রগুলোর পশ্চিমি নাইটদের হাতে নিয়ন্ত্রিত, এমন গল্প বর্ণনা করার জরুরি চাহিদা তৈরি হল সে সময়ে। ক্রুসেড শুরু হওয়া এবং তার পরের সময়ে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য এবং প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোকে কেন্দ্রিয় ভূমিকায় স্থাপন করা পশ্চিমিদের পক্ষে খুবই সমস্যার ছিল, যদিও অধিকংশ ক্রুসেডের সাফল্যের রসায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কিন্তু পূর্ব রোম সাম্রাজ্য। অতীত কাল থেকেই পশ্চিমি ঐতিহাসিকদের পক্ষে অভিযানকে মূলত পোপ এবং খ্রিষ্টিয় নাইটদের উদ্যম হিসেবে দেখিয়ে পূর্বের সাম্রাজ্যকে একধারে সরিয়ে রাখার একটা প্রবণতা কাজ করেছে।
ক্রুসেডকে শুধুই পশ্চিমের উদ্যম হিসেবে দেখানোর দ্বিতীয় কারন হল ঐতিহাসিক সূত্র নির্ভরতা। প্রথম ক্রুসেডের ল্যাটিন সূত্র খুবই জনপ্রিয় এবং রসালোভাবে লেখা আর দারুন ব্যবহারযোগ্যও বটে। অনামা লেখকের লেখা জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামেতে (ফরাসিদের কৃতি) একদিকে বোহেমোঁদের ব্যক্তিগত নায়কোচিত শৌর্য প্রচারের পাশাপাশি হতভাগা সম্রাট আলেক্সিওসের অসৎ পরিকল্পনা, তার ধূর্ততা, জালিয়াতি, আর যে সব পরিকল্পনা নির্ভর করে ক্রুসেডারদের দমন করা ইত্যাদির একবগগা তথ্য উল্লিখিত হয়েছে। সে সব তৈরি করা তথ্য হাতের কাছে পাওয়া যায় সহজেই, ফলে সে সব অনৃত তথ্য দশকের পর দশক ব্যবহার হয়েছে অবলীলায়, কোনও প্রশ্ন না তুলেই। আগুলিয়ার্সের রেমঁদ, আচেনের এলবার্ট, চারত্রেসের ফুলচের প্রথম অভিযানের অসম্ভব জীবন্ত কিন্তু একপেশে বয়ান দিয়েছেন। অথচ আমরা দেখছি নেতারা তাদের অহং ভর্তি হৃদয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হচ্ছেন এবং এই অভিযানে নাইট নেতাদের ছলনা, কপটতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা খুবই দিনদৈনন্দিনের বিষয় হয়ে ওঠে। তারা এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন যেখানে সাফল্য — দুর্দশা আর ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে; শহর দখলের সময় শত্রুর হাতে ধরাপড়া নাইটের মাথা কাটার খবরে অভিযাত্রী শিবির শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ছে; তারা দেখিয়েছেন পুরোহিতদের দেহ পিটিয়ে মেরে হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ করে শহরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পশ্চিমিদের শত্রুমনোভাবাপন্ন করে তোলার জন্যে; তারা বলেছেন অভিজাতরা মহিলা বন্ধুদের নিয়ে ফলের বাগানে প্রেম করার সময় তুর্কি বাহিনী আক্রমন করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।
উল্টোদিকে ক্রুসেড নিয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রাথমিক সূত্র বেশ সমস্যার। তথ্যের পরিমান নিয়ে নয়, প্রচুর তথ্য রয়েছে হিসাবনিকাশ, চিঠিপত্র, বক্তৃতা, সমীক্ষা এবং অন্যান্য ধরণের বিষয় গ্রিসিয়, আর্মেনিয়, সিরিয়, হিব্রু এবং আরবি ভাষায়। এসবের মধ্যে দিয়ে আমরা ক্রুসেডের ঠিক পূর্বের সময়ের বর্ণনা পাচ্ছি। সমস্যা হল, ল্যাটিন সূত্র নির্ভর করে যত গবেষণা হয়েছে, তার তুলনায় পূর্বের সূত্রগুলি খুব বেশি গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হয় নি।
পূর্বের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং দুরুহ তথ্যের ভাণ্ডার হল আলেক্সিয়াদ। দ্বাদশ শতের মাঝখানের সময়ে সম্রাট আলেক্সিওসের বড় মেয়ে আন্না কোমনেনে বাইজাটাইন সাম্রাজ্যের বিশদ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। সেই পঞ্জিকাটিকেও যেমন অপব্যবহার করা হয়েছে, তেমনি এটিকে ভুলও বোঝা হয়েছে। অলঙ্কারপূর্ণ প্রাচীন গ্রিসিয় ভাষায় লেখা সাহিত্যতে এত বেশি সূক্ষ্ম মানে, সাংকেতিকতা এবং সান্ধ্যভাষার প্রয়োগ হয়েছে যে, একে অধিকাংশ গবেষক ক্রুসডের পূর্ব দেশের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করার দায় সাধারণভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। তাছাড়া লেখক ঘটনার যে কালক্রম দিয়েছেন সেটির ওপর সম্পূর্ণ আস্থা পেশ করা খুব সমস্যাজনক বিষয় হয়ে ওঠে — ঘটনাগুলি ভুলভাবে উল্লিখিত হয়েছে, একটার ঘাড়ে অন্যটাকে ফেলা হয়েছে, একটা ঘটনাকে দুটো হিসেবে অথবা কয়েকবার ঘটেছে এমনভাবে দেখানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটার পাঁচ দশক পরে লিখতে বসে আন্না কোমনেনে যদি ঘটনার ক্রমে বেশ কিছু ছোটখাট ভুল করেই থাকেন তাহলে সেই প্রচেষ্টাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই যায় — বিশেষ করে এই বিষয়টা লেখক নিজে তার লেখায় উল্লেখও করেছেন ‘আমি যখন এই শব্দগুলি উপস্থাপন করছি, তখন আলোজ্বালাবার সময় হয়ে গিয়েছে; কাগজের ওপর আমার কলম সরে সরে যাছে, আমার হৃদয়ের মধ্যে থেকে শব্দগুলো বেরিয়ে আসায় আমার ঘুম ঘুম পাছে। আমাকে বর্বরদের নাম নিতে হবে এবং আমি এমন কিছু ঘটনাজাল বর্ণনা করছি, যেগুলি খুবই দ্রুত ঘটেগিয়েছিল। ফলে মূল ইতিহাসের বয়ান এবং ক্রমাগত বর্ণনা করে যাওয়ার সময়ের প্রতিবন্ধকতার দরুন ঘটনাগুলি বেশ কিছু ক্ষেত্রে তথ্যবিচ্যুত হয়েছে। যারা এই লেখাটি পড়ছেন তারা আশাকরি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন না (২৫)’।
সাদা কাগজের ওপর মধ্যরাত্রিকালে ঝুঁকেপড়ে মোমের আলোয় লিখে চলা ঐতিহাসিকের ছবি খুবই আবেগপূর্ণ মনোমুগ্ধকর; কিন্তু লেখকেরা নিজের লেখায় তথ্যের ভুলের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, এই ধরণের মানক সতর্কীকরণ সুদূর ধ্রুপদী অতীত থেকে তারা যেভাবে উল্লেখ করে আসছেন, সেটাই আলেক্সিয়াদ লেখক অনুসরণ করেছেনমাত্র। বাস্তবে আন্না কোমনেনের কাজ কিন্তু প্রচুর চিঠিপত্র, সরকারি নথিপত্র, অভিযানেরকালের লিখিত মন্তব্য, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য লিখিত নথি অনুসরণ করে অসামান্য এক গবেষণাকর্ম হিসেবে চিহ্নিত হওয়া উচিৎ ছিল, দুঃখের বিষয় সেটা খুব বেশি হয় নি (২৬)।
গবেষকেরা ইতিমধ্যে আলেক্সিয়াদের বেশ কিছু সময়ক্রম বিষয়ক সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু বয়ানে এখনও কিছু কিছু ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ফলে প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোর রাজত্বকালের সময়ক্রম বুঝতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি তৈরি হয়েছে। সব থেকে বড় সমস্যাটি হল ক্রুসেডের ঠিক আগে এশিয়া মাইনরের অবস্থা বোঝা বিষয়ক সমস্যাজনক কাজ হয়ে থাকল। আন্না কোমনেনে বাবার নেতৃত্বের সাম্রাজ্যের যে ছবি উপস্থাপন করেছেন সেই বর্ণমা বেশ বিভ্রান্তিকরও বটে; বাস্তবে, আমরা যদি সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলি, তাঁর লেখা, আলেক্সিয়াদের পাশাপাশি রেখে যত্নশীল দৃষ্টিতে পুণর্মূল্যায়ন করি, তাহলে বেশ কিছু অত্যাশ্চর্য সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব যেটা এতদিনের আলোচনার সম্পূর্ণ বিপরীত মত হয়ে উঠবে বলেই আমার বিশ্বাস। আমরা ধারনা করে নিয়েছিলাম অতীতের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য পশ্চিমের থেকে যে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেছে, সেই সুচতুরভাবে পশ্চিমি বাহিনীকে ব্যবহার করে এশিয়া মাইনরের ওপরে তার উচ্চাভিলাষী এবং সুবিধাবাদী বিজয় হাসিল করেছে, তার রাষ্ট্রীয় নড়বড়ে অবস্থান পোক্ত করেছে। তার সাহায্যের মরিয়া আবেদন আদতে এক নড়বড়ে করে চলা এবং ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক শাসকের সাম্রাজ্য সামলানোর ধূর্ত দাবার চালমাত্র।
এটা স্পষ্ট যে অতীতে ক্রুসেড শুরু হওয়ার ঠিক আগে এশিয়া মাইনরের অবস্থা বোঝা নিয়ে খুব বেশি উদ্যম নেওয়া হয় নি, এবং ক্রুসেড আলোচনায় এই তথ্যটা মাথায় থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ চলক। নাইটেরা পূর্বের দিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে হাঁটুগেড়ে বসিয়ে দেওয়া অসামান্য শক্তিশালী তুর্কদের বিরুদ্ধে অভিযান করছে। আরব ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ক্যাস্পিয়ান সমুদ্রের পূর্ব পাড়ের ওগুজ আদিবাসী গোষ্ঠীকৌমের অন্যতম অংশ, তুর্করা মূলত স্তেপের অধিবাসী, যাদের অসীম সামরিক ক্ষমতা দশম শতকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বাগদাদের খেলাফতের ওপর ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। তুর্করা ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার খুব পরে নয়, ১০৩০-এর মধ্যে এই অঞ্চলে খুবই প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠে। এর এক প্রজন্মের মধ্যেই তুর্কিরা বাগদাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করবে নেতা তুঘ্রিল বেগের নেতৃত্বে। তিনি সুলতানকে খলিফার প্রশাসনিক শক্তি অর্পণ করে আরও শক্তিশালী করলেন।
তুর্কিরা নিরন্তর পশ্চিমের দিকে এগোতে থাকে। এশিয়া মাইনরের ককেসাস আক্রমন করে স্থানীয় সমাজকে ধ্বংস এবং মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে দেয়। তুর্কি ঘোড়সওয়ারেরা অসামান্য দ্রুততায়, আক্রান্তদের পিছু নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সামরিক অভিযান সফল করায় দক্ষ্রা উর্হন করেছিল, তারা মধ্য এশিয়ার যে ঘোড়া চড়ত সেগুলির শক্তি আর টিকে থাকার দক্ষতা ছিল চূড়ান্ত রকমের এবং সেগুলো যেমন স্তেপের উপত্যকাতেও কার্যকর ছিল তেমনি পাহাড়ি চড়াইউতরাইতেও অসামান্য উপযোগী ছিল; একটি সূত্রে পাচ্ছি ‘তারা ঈগলের মত ক্ষিপ্র, অশ্বের ক্ষুর ছিল পাথরের মত শক্ত’। নেকড়েরা যেমন করে খাদ্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক যেইভাবে তুর্কিরাও শত্রুর ওপর আঘাত হানত (২৭)। (চলবে)