The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
এশিয়া মাইনরের দিকে ক্রুসেড বাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার পরের সময়ে একদিকে যেমন বাহিনীর জন্যে চরম বিজয়ের আখ্যান রচিত হল জেরুজালেমের পতনে, একই সঙ্গে বাহিনীকে মধ্যকালীন বহু সময়ের যুদ্ধের ফলে কখনও ধ্বংসের মুখোমুখি হওয়া, কখনও বাহিনীর নেতাদের মধ্যে তীব্র হিংসা আর অহং-এর লড়াইএর গাথাও নথিবদ্ধ হচ্ছিল। রাজধানীর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্যে আলেক্সিওসের পক্ষে সাম্রাজ্যের অক্ষহৃদয় ছেড়ে দূরের অভিযানে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তিনি দূর থেকেই ক্রুসেড অভিযান নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন। ক্রুসেড যাত্রার ডাক দিয়ে তিনি বড় ঝুঁকির রণনীতি নিলেও, ক্রুসেডের প্রথম বছরেই তার নেওয়া আক্রমনের রণনীতি সফল হল।
১০৯৭-এর বসন্তে কিবোতোস শিবিরে পশ্চিমি নেতাদের অবাক করা সংখ্যায় সেনা জড়ো হয়; তাদের নিয়মিত রসদ সরবরাহ করা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কাছে পরম চ্যালেঞ্জ। কিবোতোস শিবির ব্যবস্থাপনায় সম্রাটের চরম পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে ব্লোয়িসের স্টিফেন এতই চমৎকৃত হয়েছিলেন যে তিনি ক্রুসেডারদের জন্যে বিপুল পরিমান খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিস জড়ো করার সাম্রাজ্যের ক্ষমতা এবং দক্ষতা বিষয়েও স্ত্রীকে বিশদে চিঠিতে বর্ণনা দেবেন (১)। শহরে ঘাঁটিগাড়া সেনাবাহিনীর হাতের কাছে বিপুল পরিমান সাধারণ ভোগ্যপণ্যের সহজে পাওয়ার সুযোগ এবং পশ্চিমিদের ভোগের জন্যে সওদাগরদের পক্ষ থেকে জড়ো করা পাহাড় প্রমান গম, মদ্য, তেল, চিজ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সমাহার, বিষয়েও বহু পশ্চিমী লেখক লিখেছেন (২)।
বল্কানও সম্রাট যে নীতি নিয়েছিলেন, ঠিক সেই নীতি অনুসরণে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে, বাজারের শক্তির হাতে অথবা সওদাগরদের ইচ্ছের ওপর পণ্যের দর নির্ধারণের ক্ষমতা, অন্তত এই টুকু সময়েজন্যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছেড়ে দেয় নি। প্রথম পশ্চিমি সেনা দল কিবোতোতে পৌঁছনো মাত্র সেনারা একে অপরকে বলেছে আমাদের নিত্যদিনের সেবার জন্যে যেমন বিপুল পরিমান পণ্য মজুদ করা আছে, একইসঙ্গে সে সব পণ্য যাতে আমাদের কেনার ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তার জন্য সাম্রাজ্যের পক্ষে সেসব পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে (৩)। বিপুল পরিমান পণ্য সরবরাহ সূত্রে পশ্চিমের ক্রুসেডিয় বাহিনী বুঝল আগামী দিনের অভিযানে রসদ বিষয়ে অন্তত তিক্ত অভিজ্ঞতা হবে না, সম্রাটের ওপরে নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। সম্রাটের রসদ বিষয়ে সফল উদ্যম বাহিনীর মনোবল তুঙ্গে রাখল; তাছাড়া সম্রাটের পক্ষ থেকে বাহিনীকে বজ্র মুষ্টিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের দক্ষতাও ক্রুসেডের যাত্রায় নামা সেনাদের মনোবল বাড়িয়ে দিল। জড়ো হওয়া বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত অর্থ বন্টনের ফলে সাম্রাজ্যের সহৃদয়তা এবং পৃষ্ঠপোষণার ধারণা ছড়িয়ে যায় এবং নিকাইয়া আক্রমনে যাওয়ার সংকল্প বাড়িয়ে দেয় (৪)। তাছাড়া তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিজয় পেলে এবং শহর দখল করতে পারলে সেনাদের সোনা রূপো ঘোড়া ইত্যাদি উপহার দেওয়ার আলক্সিওসের উদার ঘোষণা বাহিনীকে আরও দ্রুত অভিযানে যেতে প্রণোদনা দেয় (৫)।
১০৯৭-এর গ্রীষ্মের শুরুতে ক্রুসেডারেরা নিকাইয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে। শহরের উপান্তে পৌঁছয় মে মাসে। দৃঢ় সুরক্ষিত দেওয়ালের সামনে তাঁবু ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল বাহিনী শহর দখল নিল খুব সহজেই। বাহিনীর সাফল্যে আলেক্সিওস অবাক হলেন, তাঁর বহুকালের ধারণা ছিল নিকাইয়াকে খুব সহজে শুধুই সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে কাবু করা যায় না (৬)। ১০৯০-এর দশকের প্রথমের দিকে নিকাইয়ায় সামরিক অভিযানে সাম্রাজ্য বাহিনীর ব্যর্থতায় তিনি পশ্চিম থেকে বাহিনী চেয়েছিলেন। এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর ধারণা হয়েছিল, নিকাইয়া দখলের জন্যে প্রয়োজন হবে বিপুল সামরিক শক্তি আর দীর্ঘ অবরোধ; আলেক্সিওসের এই তত্ত্বের পরাজয় ঘটল ক্রুসেডিয় বাহিনীর হাতে।
শহরের চারপাশ ঘিরে ধরে ধীরে ধীরে নিকাইয়ার ওপরে অবরোধ চাপিয়ে, যুদ্ধের চাপ বাড়ানোর বদলে ক্রুসেডার বাহিনী নিকাইয়ার সামরিক দুর্ভেদ্যতা আর নিরাপত্তার স্তরের মাত্রা বুঝে সরাসরি দেওয়াল ভাঙার পরিকল্পনা করল। বহু বড় নেতা শহরের আশেপাশে পৌঁছবার আগেই অগ্রগামী বাহিনী শহর দখল নিল; নরমান্ডির রবার্ট এবং ব্লোয়িসের স্টিফেন যখন নিকাইয়ায় পৌঁছে দেখলেন, ক্রুসেডারদের আক্রমনের ধার তুঙ্গে উঠেছে (৭)।
বিপুল উদ্যমী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শুরুর দিকে পশ্চিমের সামরিক সাফল্য নিকাইয়া দখলে খুব একটা দাঁত ফোটাতে পারছিল না। জনৈক ক্রুসেডার বলছেন নিকাইয়ার নিরাপত্তার দেওয়াল এত উঁচু এবং প্রভাবশালী ছিল যে, নাগরিকেরা তাদের শহরের নিরাপদ চরিত্র জানত এবং নাগরিকেরা কোনও আক্রমণকেই গুরুত্ব দিয়ে পাত্তা দিত না। আমরা কিছু আগে শহরের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় দেখেছি নিকাইয়ার পশ্চিমে ছিল একটি প্রাকৃতিক হ্রদ এবং অন্যান্য স্বাভাবিক সুরক্ষা কবচের সমাহার (৮)। শহরের নিরাপত্তা বেড়াজাল ধ্বংস করতে নাইটেরা পাথর ছোঁড়া যন্ত্র আবিষ্কার করে। এই যন্ত্র ব্যবহার করে প্রায়অভেদ্য দেওয়ালের নিরাপত্তা চূর্ণ করার কাজ শুরু করল স্যাপারেরা [রাস্তা তৈরি এবং পরিষ্কার করা বাহিনী — অনুবাদক]। তারা দেওয়ালে ভাঙ্গা অংশ বেছে নিয়ে, সেখানে একের পর এক পাথরের গোলা দেগে আঘাত করে চলল অবিরাম। তুলোসির রেমঁদের বাহিনী দেওয়ালের নিরাপত্তার একটা অংশ ভেঙ্গে ফেলায় ক্রুসেডারদের মধ্যে শহর দখল নেওয়ার উৎসাহের পারদ চড়তে শুরু করে। কিন্তু অভিযাত্রীদের হতাশ করে সারা রাতের প্রচেষ্টায় শহরবাসীরা ধ্বংস হওয়া এলাকাগুলো সারিয়ে ফেলছিল (৯)।
শুরুর ব্যর্থতা, যুদ্ধে মৃত্যু সত্ত্বেও ক্রুসডারেরা যুদ্ধ জয়ের আশায় শহরের নিরাপত্তা ভাঙার প্রচেষ্টায় লেগে রইল, হতোদ্যম হল না। বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত নাইট মারা গেলেন শহরের মূল প্রবেশ দরজা ভাঙার চেষ্টায়, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্যালডারনের বল্ডইইন। শত্রুর ছোড়াঁ বিশাল পাথরে তিনি ঘাড় মটকে যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেলেন। আরও কয়েকজন নাইটেরও পতন হল – যেমন ঘেন্টের বল্ডউইন; তিনি তীর বিঁধে মারা যান। এছাড়াও রোগের ঘাক্কা তো ছিলই, বিভুঁইতে রোগভোগ সামলাতে পারছিল না ক্রুসেডারেরা, পসেসির গাই এবং আরও বেশ মানুষ মারা গেলেন রোগে ভুগেই (১০)।
নিকাইয়া শহরের দেওয়ালের মধ্যে বাস করা প্রজারা আক্রমনকারীদের থেকে রণনৈতিকভাবে অনেকটাই সুবিধের অবস্থানে ছিল। শহরের ভিতরের বুরুজ আর দেওয়ালের আড়াল থেকে আক্রমণকারী ক্রুসেডারদের দেখতে পাচ্ছিল তারা, ফলে সুবিধে মত রণনীতি পাল্টাতে পারছিল বিপক্ষের আক্রমনের ধাক্কা আন্দাজ করে। উঁচু জায়গা থেকে তীর এবং অন্য ক্ষেপণাস্ত্র, নিচে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে লড়াই করা সেনানীদের তাক করে ছুঁড়ে ছিল নিকাইয়ার সেনারা। তাছাড়া শহরের তুর্কিদের ভাঁড়ারে সম্পদ বা রসদের অভাব ছিল না – পাঁচিল বা বুরুজ থেকে তারা জ্বলন্ত আগুন, পথ পিচ্ছিল নানা বস্তু, গলন্ত পিচ ইত্যাদি দূরের এবং দেওয়ালের কাছাকাছি চলে আসা শত্রু বাহিনীর ওপর ব্যবহার করছিল (১১)। তুর্কিরা জানত কিবোতোয় ক্রুসেডারেরা ১০৯৬-এর গ্রীষ্ম থেকে নিজেদের তৈরি করেছে নিকাইয়া আক্রমণের উদ্দেশ্যে এবং সেটা বুঝেই তারা বিপুল পরিমান যুদ্ধ রসদ গুদামজাত করেছে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ চলার আশংকা মাথায় নিয়েই। শহর পতন না হওয়া নিয়ে এতই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে অবরোধের সময় শহরের প্রশাসক কিলিজ আরসালান শহরে না থেকে দূরে এশিয়া মাইনরে ছিলেন (১২)। আলেক্সিওসের মতই নিকাইয়ার অধিবাসীরা বিশ্বাস করত শুধু আক্রমন করে শহরের নিরাপত্তা ভেদ করা যায় না।
তাদের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ পাচ্ছিল শত্রুর সঙ্গে ব্যবহারে। নরমান্ডির নাইট রবার্ট দল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তাকে খুন করে দেহ লোহার খাঁচায় ভরে লোহার শৃংখল দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিল শহরের নিরাপত্তার দেওয়ালের বাইরের দিকে যাতে আক্রমণকারীরা মৃতদেহটা সহজে দেখতে পায়। বার্তা পরিষ্কার — নিকাইয়ায় যে অবরোধ তৈরি হয়ছে, সেটি সময় নষ্টের সামিল এবং এই কাজে মানুষকে বলি দেওয়া ছাড়া আক্রমনকারীদের কোনও কিছুই লাভ হবে না (১৩)।
ক্রুসেডারেরাও পালটা চাপ দিল। তুর্কিরা তাদের অবরোধক্লিষ্ট শহরের জন্যে নানান এলাকার জন্যে নতুন বাহিনী পাঠাচ্ছিল, সেই দলেরে কয়েকটাকে রাস্তায় নিকেশ করে কাটা মাথা বর্শার মাথায় আটকে দেওয়ালের সামনে প্যারেড করাল ক্রুসেডারেরা। আন্না কোমনেনে বলছেন এই প্রতিশোধ নেওয়া হল ‘যাতে বর্বরেরা দূর থেকে বুঝতে পারে কী ঘটনা ঘটছ এবং এই তাদের সঙ্গে ক্রুসডারদের যে যুদ্ধ চলছে, সেটির সম্ভাব্য হারের ভারে তারা মুষড়ে পড়ুক, ভেঙ্গে পড়ুক, আর যেন তারা ভবিষ্যতে যুদ্ধ করার খোয়াব না দেখে (১৪)’।
নাইটেরা শহরের ওপর চাপ বাড়িয়েই চলল। পশ্চিম ইওরোপের বাহিনীগুলো একাদশ শতকজুড়ে অবরোধ যুদ্ধের প্রযুক্তি খুব দ্রুত গতিতে বিকাশ ঘটাচ্ছিল। দক্ষিণ ইতালির নরমানেরা খুবই সুরক্ষিত শহরগুলির অবরোধ করে ধীরে ধীরে পতন ঘটানোর প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত নিরাপত্তা ভাঙতে চরম পারদর্শী হয়ে ওঠে। ১০৫০ এবং ১০৬০-এর দশকে তাদের হাতে দ্রুত আপুলিয়া, ক্যালাব্রিয়া, সিসিলির মত সুরক্ষিতম দুর্গ শহরের পতনে বিকশিত নতুন প্রযুক্তির বড় ভূমিকা ছিল এবং তারা সুরক্ষা ভাঙতে নতুন নতুন উদ্ভাবনা করতেই থাকল। অবরোধ তোলার যন্ত্রাদি তৈরি করে নিকাইয়ার সুরক্ষার ওপর প্রয়োগের চেষ্টা চলতে লাগল। (চলবে)