The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
বিশাল সুরক্ষিত দেওয়ালের পিছনে অসীম নিরাপত্তায় মোড়া নিকাইয়া শহর দখলের উদ্দেশ্যে দেওয়ালের কিছু দুর্বল অংশ বেছে নিয়ে ক্রমাগত আঘাত হানা শুরু করল ক্রুসেড বাহিনী, বিশেষ করে যে অঞ্চলে গোনাতাস বুরুজটার অবস্থান ছিল। অভিযাত্রীরা শুনেছিল দীর্ঘ এক শতক আগে শহরে যে বিপুল বিদ্রোহ হয়, তাতে বুরুজের সঙ্গে লাগোয়া দেওয়ালের বেশ কিছু অংশ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বুরুজটা দৃশ্যত তখনও বেঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অভিযানের নেতারা বুঝলেন শহরের নিরাপত্তায় এটিই একমাত্র দুর্বলতম অঞ্চল (১৫) যেখানে ক্রমাগত আঘাত করলে বিজয় সম্ভব। তুলোসির রেমঁদের আবিষ্কৃত নতুন ধরণের অবরোধ ভাঙ্গা যন্ত্র দিয়ে বুরুজ লাগোয়া দেওয়ালে নিশানা করলেন ক্রুসেডারেরা। যন্ত্রটা গোলাকার, চামড়ায় মোড়া অদ্ভুত দর্শন কল, যার ভেতরে ঢুকে থাকা মানুষদের কাজকর্ম খালি চোখে দেখা যায় না। এটিকে দেওয়ালে ঠেসে দিয়ে রাস্তা তৈরির কাজে থাকা সেনারা লোহার হাতিয়ার নিয়ে বুরুজের তলার ভিত্তির অংশের পাথর তুলে, সেখানে কাঠ বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। যদিও গোনাতাস বুরুজটা এই ধাক্কায় সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে পড়ল না, কিন্তু ক্রুসেডারেরা বুঝতে পারছে, তারা যে ধরণের আক্রমন শানাচ্ছে, তাতে দেওয়ালে বিলক্ষণ ক্ষতির চিহ্ন ফুটে উঠছে। শহরের অধিবাসীরাও বুঝলেন কী দুর্বিপাক ঘটতে যাচ্ছে — নিকাইয়াজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল (১৬)।
তুর্কিদের বাড়তে থাকা উদ্বেগ কাজে লাগাতে উদ্যমী হলেন আলেক্সিওস স্বয়ং। সম্রাট, পিলেকানোস এলাকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন যেখান থেকে তিনি পুরো ঘটনাক্রমের ওপর নজরদারি এবং নির্দেশ জারি করতে পারেন। নিকাইয়ার ওপরে প্রথম আক্রমন শুরু হওয়ার মধ্যেই, সম্রাটের পক্ষে পশ্চিমি ক্রুসেডারদের অন্ধকারে রেখে গোপনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে ম্যানুয়েল বুটুমাইটস শহরে ঢুকলেন এবং তিনি শহরবাসীদের মনে করিয়ে দিলেন সম্রাট অতীতে তুর্কিদের বিরুদ্ধে কী ধরণের উদারতা দেখিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ভাবতে বললেন ক্রুসেডারেরা দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলার পরেও কী কী ঘটতে পারে, সেটাও যেন তাদের মাথায় থাকে। ম্যানুয়েল লিখিত জামিনে বললেন শহর যদি নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা হবে (১৭)।
তুর্কিরা সমঝোতা প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। আতঙ্ক ক্রমশ ঘিরে ধরলেও, তারা নিকাইয়ার সুরক্ষায় তখনও অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী। তাদের কাছে খবর এল বিপুল বিশাল বাহিনী শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিকাইয়ার দিকে এগিয়ে আসছে। অবরোধের শুরুর দিকে আক্রমনে ফল না ফলায় ক্রুসেডারেরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে থাকে। খ্রিষ্ট তীর্থযাত্রী সেজে পশ্চিমি বাহিনীতে ঢুকেপড়া গুপ্তচরদের পিটিয়ে উদ্বিগ্ন ক্রুশেডারেরা খবর পেল বড় বাহিনী নিকাইয়া উদ্ধার করতে এগিয়ে আসছে এবং নিকাইয়া শহরে অবরোধে বসে থাকা সেনা বাহিনী বাইরের জগতের সঙ্গে খুবই সহজে যোগাযোগ করতে পারছে (১৮)। এবারে দীর্ঘ অবরোধের পরিকল্পনায় না গিয়ে দ্রুত শহরের নিরাপত্তা ভাঙা আর আত্মসমর্পণ করানোর পরিকল্পনায় রসদের গুদাম শহরের কাছাকাছি নিয়ে আসা হল এসকানিয়ন হ্রদ পার করিয়ে।
আক্রমনের পরিকল্পনা সাবধানে সাধন করতে শহরে যে আক্রমন চলছিল সেটাকে বাড়িয়ে তার মধ্যেই লেক অবরোধ করতে জাহাজগুলো গালফ অব নিকোমিডিয়া থেকে সড়ক পথে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করলেন সম্রাট। বাইজান্টাইন ধনুকধারীদের যতটাসম্ভব দেওয়ালের কাছে এনে নিরন্তর তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দিলেন যাতে নিকাইয়া শহরে একজনও সেনা মাথা তুলে দেখার ফুরসৎ না পায়, দেওয়ালের ওপাশে কী ঘটে চলেছে। সাম্রাজ্যের বাহিনী যুদ্ধভেরী বাজিয়ে যুদ্ধের শব্দকে তুঙ্গে তুলে বোঝাতে চেষ্টা করল যে বিপুল আক্রমন ঘটতে যাচ্ছে। দূর থেকে সাম্রাজ্যের বাহিনীগুলির নিশান অগ্রসর হওয়ার মধ্যে দিয়ে বোঝা গেল শহর আক্রমনে ক্রুসেডারেরা আরও বড় বাহিনীর আবির্ভাব ঘটাচ্ছে (১৯)।
আলেক্সিওসের পরিকল্পনা ছিল বিশাল বাহিনী জুতে আক্রমনে নামিয়ে এনে নিকাইয়াকে ক্রুসেডারদের শর্তে আত্মসমর্পণ ঘটানো। নতুন করে ম্যানুয়েলকে গোপনে শহরে পাঠানো হল। সঙ্গে সম্রাটের স্বর্ণ স্বাক্ষরে শর্ত লেখা ক্রাইসোবুল ফরমানে বলা হল আত্মসমর্পণে কীভাবে ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে এবং ‘ব্যতিক্রম ছাড়া নিকাইয়ার সব বর্বরকে’ হাতখুলে অর্থ দেওয়া হবে (২০)। এবারেও সম্রাটের উদ্দেশ্য ছিল চতুরভাবে তুর্কিদের আত্মসমর্পণে রাজি করানো।
এটা ছিল আলেক্সিওসের গোপন অভ্যুত্থান পরিকল্পনা। উচ্চাকাঙ্ক্ষী তিনি কেন নিকাইয়া দখলে পশ্চিমের সাহায্য চেয়েছিলেন সেটা তার এই রণনীতি থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। হাতে বিপুল সেনাবাহিনী থাকলেও তিনি অবস্থা সাবধানে নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষপাতী। পশ্চিমি নাইটেরা শর্তাধীন আত্মসমর্পণে বিরূপ হতে পারে আশংকা করে সম্রাট শহরের নিরাপত্তা বেষ্টনী, দেওয়ালে ‘আক্রমন’ বাড়াবার নির্দেশ দিলন। উদ্দেশ্য ছিল একটা ধারণা তৈরি করা যে ক্রুসেডারেরা নয় বাইজান্টাইন বাহিনী দেওয়ালের নিরাপত্তা ভেঙ্গে শহর দখল করেছে।
১০৯৭-এর ১৯ জুন। পশ্চিমি ক্রুসেড বাহিনী তখনও জানেনা শহরের সঙ্গে সম্রাটের গোপন চুক্তির কথা, তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ শানিয়ে চলেছে শহরের ওপর। হঠাত দেখাগেল হ্রদের দিক থেকে নিকাইয়া শহরের দেওয়াল বেয়ে এক দল বাইজান্টাইন সেনা উঠে শহরের মাথায় সাম্রাজ্যের পতাকা তুলছে। দেওয়ালের ওপরে বিপুল যুদ্ধ ভেরী আর শিঙ্গা বেজে উঠলে সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোর বাহিনীর হাতে নিকাইয়ার পতন ঘোষিত হল (২১)।
নিকাইয়ার পতন সংবাদে ভয়ের তরঙ্গ ছড়িয়ে গেল মুসলমান বিশ্বজুড়ে। দামাস্কাসের সমসাময়িক জনৈক লেখক লিখলেন, ‘একের পর এক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে কন্সট্যান্টিনোপলের দিকের সমুদ্র থেকে বিপুল সংখ্যক ফরাসী বাহিনী উপস্থিত হয়েছে … পতনের সংবাদ মুখে মুখে খবর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে (২২)’। অবরোধের সময়ে নিকাইয়া শহরের সমাধি অঞ্চলের পাথর তুলে নিয়ে গিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত দেওয়াল মেরামতের পরেও শহরের নাগরিকদের স্নায়ু বিকল হয়েই রইল, তারা বুঝতে পারছিলেন না বিপুল বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনরে পশ্চিমিরা কী ধরণের অবস্থা তৈরি করবে (২৩)।
নিকাইয়ার পতন বিভিন্নরূপে বিভিন্নস্তরে ধাক্কা দিচ্ছিল ক্রমাগত। ক্রুসেডারেরা মনে করছিল তাদের জেরুজালেম অভিযানে এই জয় ঐশ্বরীয় আশীর্বাদ। নিকাইয়া পতনের সময় শহরের ভেতরে এবং বাইরে গ্রিক এবং ল্যাটিন সেনা যৌথভাবে ‘সর্বশক্তিমানের নাম উজ্জ্বল হোক!’ জয়ধ্বনি দিচ্ছিল (২৪)। নিকাইয়ার পতনে নাইটেরা ভাবল তারা সর্বশক্তিমানের কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছে; এবং ভবিষ্যতের অভিযানে যখন সাফল্য মাঝেমধ্যেই দূরগামী হবে তখন সকলে নিকাইয়া বিজয় স্মরণ করে উজ্জীবিত হবেন। ল্যাটিন শক্তি মনে করল তারা যেহেতু সর্বশক্তিমানের নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে আছে তাই আগামী দিনে তাদের কোনও বাধাই বাধা হয়ে উঠবে না।
নিকাইয়া উদ্ধার আলেক্সিওসের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল। একইসঙ্গে পশ্চিমি নাইটেরা যেভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, গতিতে এবং সংকল্পে যুদ্ধ করেছে সেটাও তিনি গভীর নজরদারিতে লক্ষ্য রাখছেন। ১০৯৭-এর জুনে নিকাইয়া শহর উদ্ধার থেকে আরেকটা বিষয় প্রমান হল, সম্রাট যে উদ্দেশ্যে পশ্চিমের সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন সেই পরিকল্পনাটা যথার্থ ছিল। আলেক্সিওসের কাছে এটা চরম বিজয়ের সামিল।
আরেকটা বিষয়, খুব কম রক্তপাতে নিকাইয়া দখল হওয়াটা সম্রাটের সামনে আরও কিছু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। এই অনায়াস জয় তাঁকে তুর্কিদের বন্ধু আর রক্ষক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ করে বার্তা দিল তিনিই তাদের নাগরিকদের নাইটদের গণহত্যা থেকে বাঁচাতে সক্ষম শাসক। নিকাইয়ায় বসবাসকারী তুর্কিদের প্রতি সম্রাট এই অভিপ্রায়টি প্রকাশ করবেন — তাদের জন্যে সাম্রাজ্যের নানান সেবা উন্মুক্ত হয়ে গেল এবং তিনি অধিবাসীদের হাত খুলে উপহারও দিলেন এবং তিনি আরেকটি পদক্ষেপ নিলেন সেটি হল তিনি তাদের নিরাপদভাবে শহর ত্যাগ করার সুযোগ করে দিলেন(২৫)। বিজয় হাসিল করার জন্যে ক্রুসেডারদেরও প্রচুর উপহার দেওয়া হল — সোনা, রূপো, দামি আংরাখা দেওয়া হল অভিযানের নেতাদের এবং নিম্নস্তরের সেনারা শহর জয়ের উদ্দীপনায় তামার মুদ্রা পেল (২৬)। (চলবে)