The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
সম্রাটের উদারতায় সকলেই যে খুশি হল, এ কথা বলা যাবে না। আলেক্সিওসের ভূমিকা নিয়ে নানা রকম গুজব ছড়াতে লাগল। কেন পশ্চিমি ক্রুসডারদের দক্ষতা আর শক্তি, সম্রাট আর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থে কাজে লাগানো হচ্ছে, এই প্রশ্ন ক্রুসেড দলের কোনও কোনও মহল থেকে তুলে দেওয়া হল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষায়। রাইমসের আর্চবিশপ দ্বিতীয় মানাসেসের উদ্দেশ্যে অভিযানের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্লারিক, নিকাইয়া বিজয়ের কয়েক মাস পরে লিখলেন ‘সম্রাট বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এলে সেনাবাহিনীর রাজপুত্রদের অনেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন। সম্রাটের থেকে অমূল্য উপহার পেয়ে অনেকেই তাঁর প্রতি নরম হল, তবে কেউ কেউ অখুশিও হল (২৭)’। একটা বিষয় পরিষ্কার, আলক্সিওসের হাত খুলে উপহার দেওয়ার উদারতা নাইটদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করছিল। নাইটেরা মনে করছিলেন, তাঁরা সর্বশক্তিমানের ইচ্ছাপূরণে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নাইটকে যেভাবে বাইজান্টাইম সাম্রাজ্য পুরষ্কৃত করলেন, সেই বিষয়টা তাঁরা মেনে নিতে পারেন নি।
নিকাইয়ায় নতুন করে শপথ নেওয়ার প্রস্তাব নতুন করে উঠে আসায়, নাইটদের মধ্যে আবার দ্বন্দ্ব শুরু হল। আন্না কোমনেনের দাবি তার পিতার কাছে যারা ১০৯৭-এর জুন শপথ না নিয়ে ভবিষ্যতে শপথ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাদের থেকে তিনি নতুন করে শপথ নেওয়ার দাবি জানালেন, যদিও ল্যাটিন সূত্রগুলি এই দাবিটিকে সমর্থন করছে না। সম্ভবত যে সব নাইট এর আগে শপথ নিতে দোনোমোনা করছিলেন, নিকাইয়া পতনের সাফল্যে তাদের ওপর শপথের দাবি চাপিয়ে দিতে চাইলেন আলক্সিওস। কন্সট্যান্টিনোপলে কিছু কিছু মানুষ ব্যাপারটা সফলভাবে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। যেমন বোহেমোঁর ভাইপো — তিনি চুপ করে থেকে, কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখয়ে শপথ নেওয়া আর সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টা সফলপভাবে এড়িয়েছিলেন। দ্বাদশ শতকের জীবনীকারের মতে তিনি এটিকে দাসপ্রথার সঙ্গে তুলনা করছিলেন (২৯)। নিকাইয়া দখলের পরে টানক্রিডকে এই বিষয় নিয়ে চাপ দেওয়া হলে, তিনি শপথ নেওয়ার বিনিময়ে রজতমুদ্রায় বিদায় চাইলেন — অন্যান্যরা যত পরিমাণ পেয়েছেন সেটা তো তাকে দিতেই হবে, তাঁর দাবি তার সঙ্গে আরও কিছু বেশি। তিনি গর্বিত ভঙ্গীতে শপথ নেওয়ার সঙ্গে রজতমুদ্রারকে জুড়ে দেওয়ার বিতর্ক শুরু করলে ক্ষুব্ধ এক বাইজান্টাইন আমলা তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুজনকে খুব কষ্টে আলাদা করা হয়। আবার দৃশ্যপটে মোহেমোঁর আবির্ভাব ঘটল, তিনিই ঝামেলা মিটিয়ে টানক্রিড শপথ নিতে রাজি করালেন (৩০)।
নিকাইয়া বিজয়ের পরে পরেই অভিযানে তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিতে সম্রাট ঠিক করলেন পরিকল্পনা পাল্টাবেন, এশিয়া মাইনরে বাহিনীর সঙ্গে তিনি থাকবেন না — হয়ত কিছু সময়ের জন্যে। আমরা দেখেছি নিকাইয়ায় বাহিনীর সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবেই ছিলেন এবং যুদ্ধ বিষয়ে বেশ কিছুটা সিদ্ধান্তও নিয়েছেন, শহরের পতন দেখেছেন, কিন্তু তিনি আনাতোলিয়ার ভিতরে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ক্রুসেডের ঠিক আগে চরম বিপদ থেকে তিনি উদ্ধার পেয়েছেন। সেই ঘটনাটা তার মাথায় সব সময় কাজকরছিল। তিনি বিশ্বাসী এবং পূর্বের অভিযানে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ সেনাপতির অধীনে পশ্চিমি ক্রুসেড বাহিনীকে আনাতোলিয়ার দিকে রওনা করানোর পরিকল্পনা করলেন। নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে বাছলেন তার বয়সী বন্ধু টাটিকিওসকে। জেদী এবং যুদ্ধাভিজ্ঞ টাটিকিওস সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের প্রমান এর আগে বহুবার দিয়েছেন, বিশেষ করে ডাওজেনিসের চক্রান্ত বিফল করার ক্ষেত্রে তিনি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। টাটিকিওসের নাকটা কাটা ছিল এবং সেই কাটা জায়গাটা নকল সোনার পরত দিয়ে ঢাকা থাকত — হয়ত এই উপহার তিনি সম্রাটের থেকে পেয়েছিলেন ১০৯০-এর মাঝামাঝি সময়ের বেশ কয়েকটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার উপহার হিসেবে (৩১)। ঠিক হল টাটিকিওস এশিয়া মাইনর অবদি অভিযানে যাওয়া ক্রুসেডারদের বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন এবং জেরুজালেমের পথে যে কটা শহর দখল হবে তিনি সব কটা নিজের অধীনে রাখবেন (৩২)।
ক্রুসেডের আগে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে উদ্ভুত যাওয়া সঙ্কটের প্রেক্ষিতে, আলেক্সিওসের অভিযানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকটা যুক্তিযুক্ত ছিল। তুলোসির রেমঁদকে বলেছিলেন, তিনি নাইটদের সঙ্গে জেরুজালেমে যেতে অপারগ কারন, ‘তিনি যদি তীর্থযাত্রায় বাহিনীর সঙ্গী হন, তাহলে তার ভয় আলেমান্নি, হাঙ্গেরিয় এবং কুমান আর অন্যান্য বর্বর গোষ্ঠী তাঁর সাম্রাজ্য আক্রমন করে তছনছ করবে (৩৩)’। কুমানদের প্রায়সফল আক্রমনে সাম্রাজ্যে এতই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে ১০৯৫-এর বসন্তে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছ গিয়েছিল এবং অথচ আতঙ্ক অবস্থা এমন অবস্থায় চলেগিয়েছিল যে তিনি সরাসরি আক্রমনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হচ্ছিলেন। আতঙ্কিত সম্রাট হাগিয়া সোফিয়াতে বিশদ উপাচার আয়োজন করে, তার বেদীতে দুটি টেবিল বসিয়ে লটারির ব্যবস্থা করলেন — একটি টেবিলের উপাচারের নির্দেশ হলে তিনি যাযাবরদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাবেন, অন্য টেবিলের নির্দেশ হলে তিনি অভিযানে যাবেন না; বাকি কাজমর্ম সর্বশক্তিমানের হাতে ছেড়ে দেবেন (৩৪)।
১০৯৭-তে সামাজ্যের ভেতর এবং বাইরে থেকে যে আক্রমনের হুঁশিয়ারিগুলো আসছিল, সেসব মাথায় রেখে তার পক্ষে অভিযাত্রী বাহিনীকে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়া খুবই অসমীচীন হত বলেই মনে হয়। এবং আমরা এক বছর পরে দেখব, এন্টিওকে চরমে বিপদে পড়া অভিযাত্রী বাহিনীর নেতৃত্ব দল সম্রাটের কাছে মরিয়া বার্তা পাঠিয়ে তাকে সাহায্যের জন্যে পূর্বের দিকে যেতে অনুরোধ করলেও, তিনি কিন্তু তাদের সাহায্য করতে বাহিনীতে যোগ দিতে পারলেন না। তিনি দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থায় ছিলেন বলেই তাকে পশ্চিমের কাছে বাহিনীর সাহায্যের অনুরোধ করতে হয়েছিল। প্রথম ক্রুসেড আয়োজনের প্রধান কারনই ছিল আলেক্সিওসের টিকে থাকার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে নিশ্চিত করা — জেরুজালেম মুক্ত করার অভিযান নয়। যাইহোক ১০৯৭-তেও আলক্সিওস অভিযানের নিয়ন্ত্রণেকের ভূমিকায় ছিলেন; যদিও নিকাইয়ার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বেশ কিছু নাইট অভিযান শুরু করতে চাইছিলেন, কিন্তু সম্রাটের অনুমতি পাওয় গেল জুনের শেষে, তারপরে ক্রুসেডারদের বাহিনী অভিযানে যেতে পারল (৩৫)।
সম্রাট এশিয়া মাইনরের উত্তরাঞ্চলেই রইলেন। তিনি বাইজান্টিয়ান বাহিনীর উপমহাদেশের নদী উপত্যকা এবং পশ্চিম উপকূল উদ্ধারের যুদ্ধ নজরদারি করছিলেন সে সময়। নিকাইয়া নিরাপদ হতে সেটির প্রশাসন তিনি জন ডৌকাস এবং কন্সট্যান্টাইন ডালাসেনোসের হাতে তুলে দিয়ে নির্দেশ দিলেন স্মিরনায় চাকা’র শিবিরে আঘাত হানতে। সেখান থকে তারা তুর্কিদের হাত থকে উপকূলের নানান শহর উদ্ধার করবে; ডাউকাস মায়ান্দার উপত্যকায় যাবেন এবং তাকে সেনা বাহিনী নিয়ে পাশে থেকে সাহায্য করার জন্যে ডালাসেনোস উত্তরর অঞ্চলের এবিডোসে পৌঁছবেন। উদ্দেশ্য পশ্চিম এশিয়া মাইনরের হাতছাড়া হওয়া একটা বড় অংশ উদ্ধার করা (৩৬)।
সম্রাটের ইছে শিরোধার্য করে টাটিকিওস নিকাইয়া থেকে ক্রুসেডারদের বাহিনী নিয়ে পূর্বের দিকে বেরোলেন ১০৯৭-এর জুনের শেষে। বিশাল বাহিনীকে বাইজান্টাইনিয় সেনানায়ক জেরুজালেমের দিকে সোজা রাস্তা ধরে মধ্য আনাতোলিয়া হয়ে নিয়ে না গিয়ে অনেক দক্ষিণের দিকে এন্টিওক-ইন-পিসিডা হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। যেহেতু জন ডাউকাস বাহিনী নিয়ে আক্রমনে গিয়েছেন, তিনি তাকে সাহায্য করতে উপকূল অঞ্চল আর দীর্ঘ পশ্চাদভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনীর উপস্থিতি চাইলেন (৩৭)। ভাবনাটা ছিল তুর্কিদের খুব তাড়াতাড়ি আত্মসমর্পণে বাধ্য করানো।
তুর্কিদের ওপর প্রভাব ফেলতে ডাউকাস তার বাহিনীর সঙ্গে নিকাইয়ায় গ্রেফতার হওয়া চাকার কন্যাকে সঙ্গে নিয়েছিলন (৩৭)। তাকে সঙ্গে নেওয়ার আরও একটা কারন ছিল তুর্কিদের বোঝানো যে দুর্ভেদ্য নিকাইয়ার পতন ঘটেছে এবং তার চাকার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। বাস্তবতা হল চাকার কন্যাকে বাইজান্টাইনেরা ভালভাবে রেখেছিল একটাই কারনে যে চাকাকে দেখনো সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করলে তার লাভ বই ক্ষতি নেই (৩৮)। (চলবে)