The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
নয়
শত্রুর সঙ্গে প্রথম মোলাকাত
ক্রুসেডারেরা এন্টিওক শহরের আশেপাশের অঞ্চলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার ফলে একটা অতিরিক্ত অর্জন করল এন্টিওকের বন্দর অঞ্চল, সেন্ট সিমনককে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ায়। তারা সেন্ট সিমনককে ব্যবহার করল নতুন করে দখল হওয়া শহর সাইপ্রাসের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে। সাইপ্রাসে সম্প্রতি আলেক্সিওসের অনুগত আমলা, অঞ্চল প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তাঁর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব হল, অভিযাত্রী নাইটদের বাহিনীতে রসদ সরবরাহের বিষয়টা দেখাশোনা করার (৭১)। ইতিমধ্যে টারসোস এবং অন্য উপকূলীয় শহর দখলে আসায় সাইপ্রাস বা অন্য কোনও অঞ্চলের সামুদ্র ভিত্তিক যোগাযোগের সমস্যা দূর হয়ে গেল।
ক্রুসেডারেরা এবারে এন্টিওক শহরের কার্যকর অবরোধ তৈরি করার জন্যে বিশদ পরিকল্পনা ফাঁদল। শুরুর অবরোধে শহরে খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশ ছোঁয়া হলেও, শহরের আকারের বিশালতার জন্যে এন্টিওককে পুরোপুরি তার সন্নিহিত অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। এন্টিওককে শুধু বাইরের অঞ্চল থেকে বিছিন্ন করলেই তাদের উদ্দেশ্য, শহর দখলের উদ্দেশ্য সফল হবে না, সে তথ্যটা অবরোধকারীরা ক্রমশ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিলেন। জনৈক মুসলমান পঞ্জিকাকার লিখছেন, ‘তেল, নুন এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশ ছুঁল। বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে হঠাতই উধাও হয় যেতে শুরু করল; কিন্তু অধিকাংশ পণ্য চোরাপথে এত পরিমানে শহরে ঢুকতে শুরু করল যে কিছু দিনের মধ্যেই দাম স্বাভাবিক হয়ে প্রজাদের নাগালের মধ্যে চলে এল (৭২)’।
অবরোধে কাজ না হওয়া আক্রমনকারীর জন্যে জরুরি সমস্যা তো বটেই; অন্য আরও একটা বড় সমস্যা দেখা দিল, অবরোধ তৈরি করা আক্রমণকারী বাহিনীকে উপযুক্ত খাবারদাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। বিপুল একটা ক্ষেত্রফলওয়ালা শহরে অবরোধ তৈরি করার একটা সমস্যা হল, এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে বিপুল পরিমান খাদ্যদ্রব্য প্রয়োজন ছিল। শুধু একটা ঘোড়াকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে দৈনিক পাঁচ থেকে দশ গ্যালন জল, ভাল পরিমান খড় এবং বিশাল ঘাস জমি থাকা জরুরি ছিল। শহর অবরোধকারীদের বাহিনীতে কত ঘোড়া ছিল সংখ্যাটা আজ আন্দাজ করা মুশকিল, কিন্তু বেশ কয়েক হাজার তো হবেই। অধিকাংশ অভিজাত বেশ কয়েকটা ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গে। শুধু ঘোড়ার খাদ্য সরবরাহ করার খরচই ছিল আকাশ ছোঁয়া, তাদের সওয়ারিদের দৈনন্দিনের ভরপেট ভরপোষণের কথা ছেড়েই দিচ্ছি।
এন্টিওক শহর অবরোধকরা বাহিনীর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রসদ শেষ হয়ে গেল। বাহিনী যে সময়ে অবরোধ শুরু করেছিল, অঞ্চলের জমি তখন ফসলে ভর্তি হল, কিছু দিন যেতে না যেতেই ফসল উঠে জমি ন্যাড়া হয়ে গেল। বছর ঘোরার আগেই অবস্থা দুর্বসহ হয়ে উঠল। চাত্রেসের ফুলচের লিখলেন, ‘মাঠের যতটুকু বিন পড়েছিল সেগুলোই বাহিনীর লোকেরা কুড়িয়ে বাড়িয়ে খেতে শুরু করল, নুন ছাড়া শাকপাতা এমন কী কাঁটা গাছও রান্নার উপকরণ হয়ে উঠতে থাকে; যথেষ্ট আগুন জ্বালাবার কাঠের অভাবে আধ সেদ্ধ, আসেদ্ধ খাবার সেবনের দরুন শরীরে বহু উপসর্গ দেখা দিল। সঙ্গে থাকা ঘোড়া, গাধা, উট, কুকুর এমন কী ইঁদুরও খেতে শুরু করল বাহিনীর সদস্যরা। গরীবেরা পশুর চামড়াও খেল আর জমির উর্বরতা আনার জন্যে যে সব বীজ ইত্যাদি গুদামে রাখা ছিল, সেসবও দখল নিয়ে ক্ষুণ্নিবৃত্তি করতে লাগল (৭৩)’।
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাহিনীর সেনারা খাদ্যের খোঁজে বা অন্য কিছুর জন্যে শিবির ছাড়তে শুরু করল জীবনের ওপর বিপক্ষ বাহিনীর থেকে নেমে আসা প্রাণঘাতের আশংকা মাথায় নিয়েই। লুক্সেম্বুর্গের এবেলার্দ, খুবই উচ্চবংশীয় যুবা, রাজপরিবারের নীল রক্তের নাইট ‘তিনি উচ্চবংশীয় সুন্দরী মহিলাদের সঙ্গে পাশের আপেল বাগানে জুয়া খেলছিলেন, তাকে ঘিরে ধরে মাথা কেটে ফেলল তুর্কি সেনা; তার সঙ্গীদেরও শিরোচ্ছেদ করা হল। দুজনের কাটা মাথা ক্রুসেডারদের শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হল ট্রফি হিসেবে (৭৪)’। তাছাড়া এন্টিওকের প্যাট্রিয়ার্ক অক্সাইটের জন’কে ফাঁসি দিয়ে পায়ে লোহার দণ্ড বেঁধে হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ করে পশ্চিমি বাহিনীর নজরের আওতায় সুরক্ষা দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিয়ে, তুর্কিরা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দেয় (৭৫)।
খাওয়ারের অভাবের পিছন পিছন এল মারিতে গণহারে মৃত্যুর আশংকা। এডেসার জনৈক পঞ্জিকাকার লিখছেন ২০ শতাংশ পশ্চিমি সেনা এন্টিওকের দেওয়ালের বাইরেই ক্ষুধায় আর রোগাক্রান্ত হয়ে যুদ্ধ না করেই প্রাণ দিল (৭৬)। তাঁবুগুলি ঘণ করে পাতায় রোগ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগছিল না; রোগের পাশাপাশি সেনারা অপুষ্টিতে ভুগতে শুরু করল। জল বাহিত রোগ টাইফাস এবং কলেরার জীবানু দ্রুত বাহিনীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিপুল বর্ষায় সামরিক দলের বাসস্থানের ছাদ তাঁবু ধ্বংস হয়ে গেল – সবে মিলে বাহিনীর মনোবল তলানিতে ঠেকল (৭৭)।
প্রতিবেশী দামস্কাসের আমীর ডুকাকের বাহিনী ১০৯৭-এর বড় দিনের পরেই শিবিরের কাছাকাছি চলে আসায় অবস্থা আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। অভিযাত্রীদের ভাগ্য ভাল ছিল, আমীরের বাহিনীর খুবই কাছে বোহেমোঁ আর ফ্লান্ডারসের রবার্টের অগ্রসর বাহিনী চলে আসায় তারা তুর্কি বাহিনীর মহড়া নেওয়ার জন্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সংখ্যায় কম হলেও প্রথম দিকে সামনে থাকা বোহেমোঁ বিপক্ষের বিপুল আক্রমন সহ্য করার পরে পশ্চিমি বাহিনী যৌথভাবে পালটা আঘাত করতে করতে যুদ্ধে ক্রমাগত সফল হতে থাকে এবং নিয়মিত শত্রুর ব্যুহ ভেদ করে বাহিনীর অক্ষহৃদয়ে ঢুকে যেতে থাকে(৭৮)। ক্রুসেডারদের লড়াই দেওয়ার ক্ষমতা দেখে বিশাল তুর্কি বাহিনীর যুদ্ধ করার মনোবল ভেঙ্গে গেল। ডুকাকের এন্টিওক অভিযানের পরিকল্পনা ছিল, এক সপ্তাহের মধ্যেই পৌঁছে পশ্চিমি বাহিনীকে ধ্বংস করা। কিন্তু বোহেমোঁ আর রবার্টের ছোট বাহিনীর পালটা মার দামাস্কাসের প্রশাসক এবং তার সাথীদের ওপর বিশাল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অবাক ডুকাক আর এন্টিওকের দিকে না গিয়ে দামাস্কাস ফিররে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এন্টিওকে এই প্রথম প্রথম মুসলমান সামরিক বাহিনীর প্রবল আক্রমন ক্রুসেডারেরা সফলভাবে রুখে দিল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ এল না, এক মাস যেতে না যেতেই ১০৯৮-এর বছরের শুরুতে খবর এল আলেপ্পোর প্রশাসক রিদওয়ান বিশাল বাহিনী নিয়ে দ্রুত আক্রমণে আসেছে। নেতৃত্বের বৈঠকে ঠিক হল ৭০০ নাইটের একটি বাহিনী আলেপ্পোর বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে অগ্রসর হবে, বাকিরা তাদের মত করে এন্টিওকে অবরোধ চালিয়ে যাবে।
৮ ফেব্রুয়ারি ১০৯৮-তে বোহেমোঁ, ফ্লান্ডারদের রবার্ট, ব্লোয়িসের স্টিফেনের নেতৃত্বে বাহিনী শিবির ছেড়ে আলেপ্পোর বাহিনীর মুখোমুখি হতে এগিয়ে গেল (৭৯)। ডুকাকের যুদ্ধের রণনীতি অনুযায়ী বিশাল তুর্কি বাহিনী পশ্চিমি নাইটদের ঘিরে ধরে। বোহেমোঁ দৃঢ়ভাবে তার ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে তীব্র স্বরে কাছাকাছি থাকা বাহিনীকে বলতে থাকে, ‘তীব্র ভাবে আক্রমন কর, নির্ভীকের মত আক্রমন কর, সর্বশক্তিমান আর পবিত্র সেপুলচারের জন্যে লড়াই কর, সত্য তোমার পাশে আছে, তোমরা জান এটা শরীরের যুদ্ধ নয়, আত্মার, মনের যুদ্ধ! সাহসী হও এবং খ্রিষ্টের কাজে জিতে এস। সর্বশক্তিমান তোমাদের সহায়ক হোন (৮০)’!
বোহেমোঁর দৃঢ় সংকল্পে অন্যান্যরা উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠে পালটা মার দিত শুরু করায় বিপক্ষ হতচকিত হয়ে পড়ল। বোহেমোর পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ক্রুসেডারদের যুদ্ধের রণনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পশ্চিমি ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একাংশ প্রথমের দিকে উদয় হয় নি, দূরে ঠিক সময়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে অপেক্ষা করছিল। তারা উপযুক্ত সময়ে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নজরে রেখে, প্রয়োজনীয় ব্যুহ রচনা করে যুদ্ধে প্রবেশ করল। এর ফলে তুর্কিরা ছোট ছোট বাহিনীতে ভেঙ্গে গেল। ক্রুসেডারদের প্রতিআক্রমনে রিদওয়ানের বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দ্বিতীয়বারেও ক্রুসেডারেরা আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক জয় ছিনিয়ে আনল।
যে সব সেনায়ক দূর থেকে সাফল্য উপভোগ করছিলেন বোহেমোঁর তাদের অনেকেই নতুন করে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হলেন। তুলোসির রেমঁদ খারাপ শরীরে যুদ্ধে যেতে পারেন নি এবং তিনি এন্টিওকে অবরোধ করা সেনানায়কদের ওপরে যুদ্ধের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাইজান্টিয়ামের টাটিকোইসও দামাস্কাস বা আলেপ্পোর প্রশাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন নি। বোহেমোঁই অন্যদের ক্রমাগত সফল্ভাবে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী জানাচ্ছে, ‘বোহেমোঁ সব দিকে ক্রুসের চিহ্ন এঁকে নিরাপত্তা বিধান ক’রে তুর্কিদের বিরুদ্ধে গুহায় তিন চার দিন অভুক্ত থাকা সিংহের মত রক্তের সন্ধানে এক ঝাঁক ভেড়ার পালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তার আক্রমন এতই তীব্র ছিল যে শত্রুকে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই খুঁজে নিতে হল এবং তারা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে গেল দিগ্বিদিক (৮১)’। এখান থেকে শুরু হল ব্যক্তিপুজা, এবং যত দিন গেল ব্যক্তিপুজা আরও বেশি করে তার ডালপালা ছড়াবে অভিযাত্রী বাহিনীতে (৮২)।
পর পর তিনবার কিলিজ আসলান, ডুকাক এবং সব শেষে রিদওয়ানের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের বাহিনীকে ধ্বংসের মুখ থেকে তুলে নিয়ে এল যোগ্য নেতৃত্ব। প্রত্যেক সময় বিশাল শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে সমস্ত দুর্ভাগ্য জয় করে নিজেদের ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাতে সমর্থ হল ক্রুসেডার বাহিনী। নিকাইয়া, দামাস্কাস বা আলেপ্পোর প্রশাসকেরা হয়ত ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু ক্রুসেডারদের সামনে তখনও হুমকি হিসেবে রয়েছেন বাগদাদের সুলতান অথবা কায়রোর উজির এবং অন্য স্থানীয় প্রশাসক, আর তাদের সঙ্গে জুড়ে ছিলেন বহু স্থানীয় প্রশাসকও, যারা অভিযাত্রী বাহিনীর সামনে মূর্ত বিপদ হয়ে উঠবেন। কিন্তু এখন অভিযাত্রীদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ঠিকই, কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার আগে কী তারা এন্টিওকের অভেদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙ্গতে পারবে? (চলবে)