The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
দশ
ক্রুসেডের আত্মা দখলের লড়াই
রিদওয়ান বাহিনীর আক্রমন ক্রুসেডারেরা সফলভাবে রুখে দিলেও, তখনও শত্রুর চোখের সামনে তাদের নিরাপত্তা প্রায় উদোম হয়েছিল। যত অবরোধের দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, পশ্চিমী সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা আরও বেশি ভঙ্গুর হচ্ছে কখনও বিশাল বাহিনীর মারীর প্রকোপে মৃত্যু ঘটছে, কখনও বা সেনারা অসুস্থতা সূত্রে বিছানায় বহুকাল পড়ে থাকছে। ১০৯৮-এর প্রথম পাদে আন্টিওক দখল নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে বিপুল বিতর্ক মারাত্মক আকার ধারণ করলে, অভিযাত্রী দলের মধ্যে বিভেদ, দ্বন্দ্ব তুঙ্গে ওঠে। সচেতনভাবে অভিযাত্রীদের পূর্ব আর পশ্চিমের স্বার্থ তুল্যমূল্য করে রক্ষার প্রচেষ্টার গলদ উঠে এল। একই বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে একদিকে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের হারানো এলাকা দখল করার উদ্যম আবার অন্য দিকে সেই একই বাহিনীর খ্রিষ্টিয় ক্রুসেড সফল করার দায় — দুটো একই সঙ্গে মিলেমিশে এন্টিওকের দেওয়ালের বাইরে যে চরম বিশৃংখলতার বিষক্রিয়া তৈরি করল, তাতে যেমন বাহিনীর সেনাদের যুদ্ধকরার নৈতিকতায় আঘাত এল, তেমনি নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের দ্বন্দ্বে অভিযান প্রক্রিয়া ধ্বংস হতে বসল।
এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে লেপুইএর আধিমির প্রস্তাব দিলেন নাইটেরা তিনদিন উপোস করার পরে শহরের দেওয়ালজুড়ে হাঁটবেন। যৌথ উপাসনা এবং ধর্ম সঙ্গীত নিয়মিত গাইতে হবে এবং প্রত্যেকেই যদি দাড়ি কাটেন তাহলে ভাগ্য ফিরলেও ফিরতে পারে (১)। তিনি বললেন ক্রুসডারদের অধিকাংশই ক্রুস গলায় ঝোলান নি অথবা পরিধানে চিহ্ন হিসেবে ক্রুস অঙ্কন করেন নি (২)। বিশপ বললেন এইসব কাজ করতে পারলে ভাগ্য খুলবে, শিবিরেও রোগভোগ কমবে।
সেনাবাহিনীর নৈতিক জোর প্রায় ধ্বংস হতে বসেছে, বিভিন্ন পদের সেনা বাহিনী ছেড়ে পালাচ্ছে। পালানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে কোনও সমঝোতার পথে না গিয়ে ক্রুসেডার ব্যক্তি পলাতককে নেতৃত্ব কঠিন সাজা দিচ্ছেন। পিটার দ্য হারমিট, ছুতোর ওয়াল্টার আর গ্রান্টমেসনিলের উইলিয়াম পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে টানক্রেড তাদের চরম সাজা দিল, ওয়াল্টারকে বাহিনীর সক্কলের সামলে অসম্মান করে বোহেমোঁর তাঁবুর মেঝেয় জঞ্জালের মত ফেলে রাখা হল (৩)। জনৈক পঞ্জিকাকার লিখলেন যারা অবরোধ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তাদের নর্দমায় ফেলে রাখা হোক (৪)। নেতৃত্ব বুঝতে পারছিল ক্রুসেড শিবিরের নৈতিক অবস্থান প্রায় তলায় তলিয়ে গিয়েছে, সেনারা আর জেতার আশা করছে না; এই প্রেক্ষিতে নেতৃত্বরা এক যোগে পরস্পরকে সাহায্য করা এবং এন্টিওক দখল না হওয়া পর্যন্ত না পালানোর শপথ নিলেন (৫)।
এই ধরণের শপথ নেওয়া আদতে সর্বোচ্চ নেতাদের একযোগে ঘণবদ্ধ হয়ে টিকে থাকার বাহানা ছিলমাত্র; ইতিমধ্যে নেতাদের অনেকেই অবরোধ নিয়ে ভুল সুরে গান গাইতে আরম্ভ করেছেন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, বোহেমোঁ অবরোধের মাঝেই দল ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া শুরু করলেন, অভিযোগ তারই বাহিনী প্রচুর সেনা যেমন যুদ্ধে মারা গিয়েছে, তেমনি সে যেহেতু অন্য নেতা নাইটেদের মত অতটা ধনী নয় তাই খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার বাহিনী ঠিক মত খাওয়ার পাচ্ছে না (৬)। অন্যান্যরা অতটা সরাসরি বিরোধ করছিলেন না। ব্লয়িসের স্টিফেন বললেন টারসোস ফিরবেন, কারন তার পেট খারাপ; তার পক্ষে খুব বেশিদিন এই পরিবেশে থাকা সম্ভব হবে না। নরমান্ডির রবার্টও জানালেন তিনি এই অবস্থা থেকে খুব তাড়াতাড়ি এশিয়া মাইনরের দক্ষিণের উপকূলের কোনও ভাল পরিবেশে ১০৯৭-এর বড় দিনের মধ্যে চলে যেতে চান (৮)। তাকে বাহিনীতে ধরে রাখার খুব চেষ্টা হলেও, কিন্তু সে সময়ের এক পঞ্জিকাকার সূত্রে জানা যাচ্ছে তার বড় দুর্বলতা ছিল সুখাদ্যপ্রিয়তা, তীব্র আলস্য আর চরম কামুকতা। এই তিনটে জরুরি কাজ সারার জন্যে তিনি অবরোধ ছেড়ে নিজের রাজ্য নর্মান্ডিতে ফিরে যান (৯)।
সে সময়েসব থকে বড় সমস্যা দেখা গেল ক্রুসেডিয় বাহিনীর রসদ জোগাড় আর সরবরাহ। ১০৯৭-তে বাইজান্টাইনের সমর্থিত বাহিনী টারসোস দখল করে। তাছাড়া দক্ষিণ উপকূলে তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ বন্দরটি লাওডিকিয়া, সম্রাটের বাহিনী দখলে আসে। এবারে আলেক্সিওস এন্টিওকে অবরোধ করা ক্রুসেড বাহিনীর রসদ সরবরাহের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে লাওডিকিয়াকে বেছে নিয়ে রসদ রাখার তার কাঠামো তৈরি করলেন। এই অঞ্চলে মদ্য, শস্য এবং বিপুল পরিমানে পশুর দলকে সাইপ্রাস থকে পাঠানোর পরিকল্পনা রূপায়নের ভার দিলেন (১০) ১০৯৮ থেকে লাওডিকিয়ার শাসনভার গ্রহণ করা ইউম্যাথিওস ফিলোকালসকে (১১)।
তবুও পাঠানো রসদের ওপরে হঠাতই জলদস্যুদের আক্রমন ধেয়ে আসার ভয় কাটে নি। দেখাগেল শীতকালজুড়ে হাজার হাজার মানুষ আর ঘোড়া দলের প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করে উঠতে পারছে না সাইপ্রাস প্রশাসন। এর দুটো সমাধানের চিন্তা করা হল, হয় রসদ সরবরাহের পরিমান বিপুল পরিমানে বাড়ানো, নয়ত অবরোধ করা বাহিনীগুলোয় সেনার পরিমান বিপুল পরিমানে বাড়ানো যাতে অবরোধ খুব তাড়াতাড়ি শেষ করা যায়। লুক্কার ব্রুনো পূর্ব দেশের খবর তার এলাকার লোকের কাছ থেকে পেয়ে লিখছেন এন্টিওক শহর ক্রুসেডারেরা ঘিরে রয়েছে ঠিকই কিন্তু সেখানকার ‘অবস্থা খুব ভাল কিছু নয়’ (১২)।
টাটিকিওস এই সব সমস্যা সাধান করতে চরম ব্যর্থ হলেন। বাইজান্টাইন সেনাপতি এন্টিওক অবদি ক্রুসেডারদের বাহিনীকে পথ দেখিয়ে এনেছেন। এতক্ষণ অবদি ক্রুসেডে আসা বাহিনী এবং সম্রাটের মধ্যে সমঝোতা ঠিকঠাকভাবে রূপায়িত হচ্ছিল। সমস্যা হল ১০৯৮-এর শেষে ‘বিপুল পরিমান জাহাজ ভর্তি ভুট্টা, বার্লি, মদ, মাংস, গম আরও প্রচুর রসদের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁবুতে তার সব কিছু ফেলে সেই যে ক্রুসেড বাহিনী টাটিকিওস ছেড়েছেন, আর ফিরে আসেন নি (১৩)।
টাটিকিওসের অভিযাত্রী দল ছেড়ে চলে যাওয়া, ক্রুসেডে আসা বাহিনীর ওপরে চরম ধাক্কা নেমে আসা — পরে বোঝা গেল তার সম্রাট এবং তিনি ক্রুসেডারদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের এন্টিওকে ছেড়ে রেখে পালিয়েছেন। জনৈক পঞ্জিকাকার লিখছেন, ‘সে তো পালিয়ে গেল …প্রচুর রসদ জোগাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখল না আর এন্টিওকে ফিরেও এল না (১৪)’। অবরোধের অন্যতম অংশিদার আগুলিয়ারের রেমঁদের ভাষায় টাটিকিওস পালিয়ে গেল ‘সর্বশক্তমানের অভিশাপ মাথায় নিয়ে; তার কাপুরুষোচিত [না ফির আসার] কাজে, সে নিজেকে এবং বাহিনীকে চরম লজ্জার মধ্যে ফেলেদিল (১৫)’। জেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম লিখছে, ‘সে বরাবরের জন্যে মিথ্যুক, এবং তার চরিত্র সবসময় তাই থাকবে (১৬)’।
কিন্তু টাটিকিওস সম্বন্ধে যে বিচার ক্রুসেডারেরা করছে সেটা খুব যুক্তিযুক্ত নয়। ১০৯৮-এর ৪ মার্চ টাটিকিওস শিবির ছেড়ে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেন্ট সিমন বন্দর থেকে কয়েক জাহাজ বোঝাই বিশাল পরিমান খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং অন্যান্য জিনিস এসে পৌঁছেছে যা এন্টিওকের কঠোর নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যাবে। আলেক্সিওস লাওডিকিয়ায় একটা ইংরেজ বাহিনী তৈরি করেছেন যাত তারা এন্টিওকে জরুরি রসদ বয়ে আনতে পারে (১৭)। টাটিকিওস প্রতিশ্রুতি মত সব কিছু রসদই পাঠিয়েছে।
এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ক্রুসেড নেতৃত্ব এবং তাদের পঞ্জিকাকারেরা স্বীকার করেন নি কারন ক্রুসেডিয় বাহিনীর অভিযানে বাইজান্টিয়ানদের ভূমিকা কী হবে সে বিষয়ে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেই ধোঁয়াশা ছিল। টাটিকিওস এন্টিওকের অবরোধ শিবির ছেড়ে যাওয়ার সময় তার ভূমিকা কাকে কখন কীভাবে হস্তান্তর করে দিয়ে যাবে সে সম্বন্ধে কন্সট্যান্টিনোপলে আলেক্সিওসের সামনে শপথ নেওয়ার সময় বিষয়টা পরিষ্কার হয় নি। এই বিষয়টা পশ্চিমি নেতৃত্বের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি করে। তারা বুঝতে পারছিল না বাইজান্টাইন কর্তৃপক্ষ কী তাদের ওপরে বিশ্বাস হারিয়েছে? তাহলে এত ক্ষতিস্বীকার করে এন্টিওক অবরোধ করা হল কেন (১৮)? এন্টিওকে প্রচুর খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ছিল; এবং এটি সেন্ট পিটারের ভূমি। ক্রুসেডারের কাছে এন্টিওক দখলের থেকে জেরুজালেম মুক্ত করা অনেক বেশি জরুরি কাজ; তাহলে এন্টিওকের এই অবরোধ ফেলে রেখে জেরুজালেমের দিকে রওনা হতে অসুবিধে কোথায়? (চলবে)