The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
আরবান যখন ক্লেরমঁতে বক্তৃতা দিচ্ছেন, সেই সময়ে তুর্কেরা, কয়েক শতাব্দ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আনাতোলিয়ার প্রদেশগুলির প্রশাসনিক এবং সামরিক বাহিনীকে তছনছ করছে, খ্রিষ্টিয়দের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কিছু শহর দখল করছে — যেমন এফিসাস। শহরটা সেন্ট জন দ্য এভানজেলিস্টের জন্মস্থান, প্রখ্যাত চার্চ কাউন্সিল আয়োজিত হওয়া নিকাইয়া শহর বা সন্ত পিটারের নিজের অঞ্চল এন্টিওক শহর। এই শহরগুলি তুর্কিদের হাতে পতন ঘটে ক্রুসেডারেরা আসার আগের বছরে। ফলে পোপ যে ১০৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্বাঞ্চলের চার্চ উদ্ধার করতে উপস্থিত জনগণের প্রতি জ্বালাময়ী আর উদ্দীপনাময় বক্তৃতা দেবেন আর লিখিত বাণী ছড়ানোর ব্যবস্থা করবেন দ্রুত লয়ে, সেটা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ফলে প্রথম ক্রুসেডের গোড়াপত্তন ক্লেরমঁর পাহাড়ের সানুদেশেও হয়নি, অথবা রোমের ভ্যাটিকানেও হয়নি। আমাদের এটার শেকট খুঁজতে হবে এশিয়া মাইনরের কন্সট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্যে ঘটেচলা বিশদ ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে। সমস্যা হল সেই প্রাচীন কাল থেকে ক্রুসেড অভিযান বর্ণনায় শুধুই পশ্চিমিদের তৈরি বয়ান ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু ১০৯৬-তে যেসব নাইট বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে অভিযানে অংশ নিচ্ছে, সেই অভিযান আদতে ভূমধ্যসাগরের তীরে ঘনিয়ে ওঠা সঙ্কটের প্রতিক্রিয়া ছিলমাত্র। প্রতিরক্ষা বলয় ঢিলে হওয়া, গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হওয়া একই সঙ্গে বিদ্রোহের বেশ কয়েকটা প্রচেষ্টা মিলে মিশে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল দ্রুতলয়ে। তারই প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোস বাধ্য হয়ে পশ্চিমের দিকে সাহায্য চাওয়ার জন্যে যে আবেদন করবেন, সেই আবেদনক্রমে দ্বিতীয় পোপ আরবান সক্রিয়ভাবে অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় হয়ে উঠলে ক্রুসেড অভিযানের পরবর্তী ঘটনাগুলি ঘটতে থাকে।
প্রথম অধ্যায়
সংকটে ইওরোপ
ইওরোপে মধ্যযুগ সূচিত হল প্রথম ক্রুসেড উদ্যমের ফলে। এর উপজাত ক্রিয়া হিসেবে ইওরোপ জুড়ে খ্রিষ্টিয় উপাসনা নির্ভর, সর্বশক্তিমানের প্রতিনিধি হিসেবে দূর দেশে যুদ্ধ চালানো নাইটদের নতুন ধরণের চরিত্র বিকাশ হল। ক্রুসেড অভিযান, মনুষ্য আচারআচরণকে প্রভাবিত করা উপাসনা এবং সেবা দেওয়ার অন্যতম ব্যক্তিত্বের গুণাবলী হিসেবে স্বীকৃত হয়ে কবিতা, গল্প, গান, গদ্য এবং শিল্পে প্রতিফলিত হল দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে। দার্শনিকস্তরে সর্বশক্তিমানের জন্যে লড়ই করা নৈষ্ঠিক আত্মনিবেদনী নাইটের ধারণা তৈরি হল এই সময়েই। দূর দেশে অভিযান নিশ্চিত করল পোপের এবার থেকে শুধুই ধর্মীয় নেতা হয়েই তার ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখবেন না, তিনি সার্বিকভাবে জনগণের নেতা হিসেবে অশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে ইওরোপে আবির্ভূত হবেন। এর ফলে পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলি যৌথভাবে এমন একটা নীতিকাঠামো নির্ধারণ করবে যেখানে চার্চের নিরাপত্তাই শুধু কাম্য হল না, বাধ্যতামূলকও দাবি হয়ে উঠল। সংস্কার পূর্ববর্তী সময় অবদি ইওরোপের চলার পথের দিকচিহ্ন আর কাঠামোগুলো চালনাকরার রূপরেখা নির্দিষ্ট করে দিল প্রথম ক্রুসেড।
হাস্যকর হল, ক্রুসেডের আয়োজন ঘটল কিন্তু দ্বন্দ্ব আর বিভেদের উপজাত ফল হিসেবে। আমরা আলোচনা করছি একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইওরোপের পরিবেশ নিয়ে। সে সময় ইওরোপ চরম অশান্তি এবং সংকটের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। এই সময়ে ইওরোপিয় মহাদেশজুড়ে নিয়মিতভাবে বিজয় এবং উত্থানের ঘটনা ঘটে চলেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আক্রমণ রুখতে না পেরে ইংলন্ড নরম্যানদের উপনিবেশে রূপান্তরিত হয়েছে। আপুলিয়া, ক্যালাব্রিয়া এবং সিসিলিও নরম্যান্ডির অভিবাসী, প্রথমে ভাড়াটে খুনে এবং পরে ভাগ্যসন্ধানীদের হাতে পতিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। যারা দক্ষিণের দিকে ভাগ্যপরিবর্তনের জন্যে আসতে চাইছে, তারা জানত একমাত্র দক্ষিণই তাদের বাঁচানোর জন্যে উপযোগী ভূমিকা নিতে পারে। স্পেন পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছে, তিন শতাব্দ ধরে উপদ্বীপে শহরের পর শহর দখল রাখার পর মুসলমান দখলদারেরা উচ্ছেদের মখোমুখি দাঁড়িয়ে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহের ধাক্কায় আরেক ধরণের পরিবর্তনের মুখোমুখি জার্মানিও। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিমের সীমান্তে নিরন্তর আঘাত হেনে তাকে তীব্র চাপের মুখে রেখে দিয়েছে আগ্রাসী প্রতিবেশীরা।
একাদশ শতকে পোপ এবং ইওরোপের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে হিংসক দ্বন্দ্বে বেশ কিছু শাসকের সঙ্গে চার্চ কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় (excommunication)। আবার হয়ত কিছু কিছু সময় বাধ্য হয়ে সীমাবদ্ধভাবে যোগাযোগ শুরু করা হলেও ক্রমশ ইওরোপিয় সম্রাটদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে থাকল। সে সময়ের ইওরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নায়ক জার্মানির চতুর্দশ হেনরি, ফ্রান্সের প্রথম ফিলিপ, ইংলন্ডের রাজা হ্যারল্ড, বাইজান্টাইনের সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোস এবং নর্মান ডিউক রবার্ট গিসকার্ডকে পোপেরা অন্তত একবার না একবার চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন, যাতে অধর্মীয় সংগঠনগুলির ওপরে চার্চের নিরবিচ্ছিন্ন কঠোর কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
চার্চও একইভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একাদশ শতকের শেষের দিকে ইওরোপজুড়ে একের পর এক পোপ নিজের দখলে থাকা পুরোহিত গোষ্ঠীর নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ কর একে অপরের বিরুদ্ধে আইনি বৈধতা দাবি করে নিজেদের সেন্ট পিটারের অনুগামী চার্চ প্রধান হিসেবে দাবি করতে থাকেন। আর ছিল বাইজান্টাইন চার্চ, যা ইওরোপিয় চার্চের প্রথা আর শিক্ষার বাইরে এবং পোপের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে। তবে ইওরোপজুড়ে চার্চের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিষবৎ যুক্তি উঠে আসছিল পোপ সপ্তম গ্রেগরি এবং ইওরোপের সব থেকে ক্ষমতাবান রাজনীতিক জার্মানির চতুর্দশ হেনরি মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে বিষিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, উৎপন্ন বিতর্ক এবং ঘটনাবলী ঘিরে। হেনরির পূর্বসূরীরা উত্তর ইতালিতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিলেন এবং ৯৬০-এ এই পরিবার রোমের সম্রাট হয়। এর ফলে তারা পোপ ব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি কায়েম করতে শুরু করেন এবং পোপ নির্বাচনে নিজেদের মাথা গলানোর অধিকার কায়েম করেন। ষষ্ঠ গ্রেগরি এবং চতুর্দশ হেনরি ১০৭৩-এর এপ্রিলে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নিতে একটা বৈঠকের পরিকল্পনা করল। গ্রেগরি ছিলেন ‘ধর্মীয় নেতা, জ্ঞানের ধার্মিক এবং অধার্মিক জ্ঞান চর্চার পরম বিশারদ… সাম্য এবং ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক, পরামর্শ দেওয়ায় অগ্রণী… সম্মানিত, বিনয়ী, শান্ত, পবিত্র এবং অতিথিবৎসল’ (১)। পোপের নির্বচন সম্পন্ন হলে সম্রাটের পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তায় পোপ খুবই প্রীত হলেন। তিনি এক অনুগামীকে লিখলেন, ‘তিনি আমায় মধুরতর বাক্য এবং নমনীয়তায় সম্বোধন করেছেন, আমার মনে হয়, তিনি বা তার পূর্বজ কেউই এর আগে রোমিয় ধার্মিকদের প্রতি এই ভাষায় কথা বলেন নি’ (২)।
সম্পর্ক বিষিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। নির্বাচনের আগেই পোপ প্রগতিশীলতার মূর্ত প্রতীক হয়ে চার্চের সংস্কার এবং রোমের ক্ষমতা কার্যকরভাবে কেন্দ্রিকরণ নিয়ে খুবই বলিষ্ঠ মত প্রকাশ করতে লাগলেন। পোপ সব থেকে বেশি চিন্তায় ছিলেন চার্চের শীর্ষপদে নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে, কারন এধরণের বহু নির্বাচনকে একপ্রকার সঙ্গঠিত দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকার বেশি কিছু বলা যায় না। বেশ কিছু যাজক শীর্ষপদগুলো রজতমুদ্রা ব্যয় করে, প্রভাব এবং কর্তৃত্ব খাটিয়ে দখল করে নিত এবং ক্ষমতাশালী শাসকেরা প্রভাব খাটিয়ে অধীনস্থ যাজকদের ক্ষমতাতন্ত্রে আরোহনযোগ্য পদগুলি উপহার দিত (৩)।
ধার্মিক পদগুলি প্রভাব খাটিয়ে বা মুদ্রারাক্ষস দিয়ে কেনার বিরুদ্ধে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেছিলেন গ্রেগরি। তার প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, একমাত্র তিনিই যে কোনও পদে নিয়োগ করার অধিকারী, অন্য কেউ নয়। তার এই বার্তাই হেনরির সঙ্গে দ্বন্দ্বপর্বের সূচনা ঘটায় কারন হেনরি জার্মান চার্চে পোপের হস্তক্ষেপের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। ১০৭৬-এর মধ্যে দুই ক্ষমতাবানের মধ্যের সম্পর্ক এতই বিষিয়ে যায় যে পোপ হেনরির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চ্ছিন্ন করার (excommunication) বার্তা দিলেন, ‘সর্বশক্তিমান পরম পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার পক্ষ থেকে, আপনার ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি, আমি রাজা হেনরি, সম্রাট হেনরির পুত্রর ক্ষমতা অস্বীকার করছি, যিনি অশ্রুতপূর্ব অহংকারে, জার্মান এবং ইতালির সরকারকে নিয়ে চার্চের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, এবং আমি গৃহীত শপথের বাঁধনে আবদ্ধ সমস্ত খ্রিষ্টিধর্মীদের কাছে আহ্বান পেশ করে জানাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হোন এবং আমি সক্কলকে তাঁর রাজসিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার আহ্বান জানাচ্ছি (৪)’। (চলবে)