The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
দশ
ক্রুসেডের আত্মা দখলের লড়াই
রাতের অন্ধকারে সিঁড়ি লাগিয়ে শহরের নিরাপত্তা দেওয়াল বেয়ে পাঁচিলের মাথায় ওঠা বেশ কঠিন কাজ হলেও কাজটা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন ক্রুসেডারেরা; কঠিন কাজটা আরও বেশি কঠিন হয়ে যায় অনেকেই যেমন চাত্রেসের নাইট ফুলচের ইত্যাদি একই সঙ্গে দেওয়াল টপকাতে চাওয়ায় (২৭)। বহু মানুষের ওজনে সিঁড়িটি একবার বাইরের দিকে উলটে পড়ে যায়, বহু মানুষ হতাহত হয়। কিন্তু আক্রমণকারীদের ভাগ্য ভাল সে সময় বিপুল হাওয়ার দরুন কোনও আওয়াজ দেওয়াল ভেদ করে ভেতরে যাচ্ছিল না। আবার নতুন করে সিঁড়ি লাগিয়ে যত বেশি পারা যায় ক্রুসেড সেনা তাড়াতাড়ি দেওয়াল বাইতে থাকে (২৮)। ওপরে জড়ো হয়ে ক্রুসেডারেরা দেওয়াল রক্ষীদের খুন করে গডফ্রে আর ফ্লান্ডারসের রবার্টকে ইঙ্গিত করায় বড় বাহিনী শহরের দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে (২৯)।
দরজা ভেঙ্গে ক্রুসেডারেরা ঘুমিয়ে থাকা এন্টিওক শহরের অক্ষহৃদয়ে ঢুকে যেতে থাকে বাধাহীনভাবে। বোহেমোঁ নিজস্ব পরিকল্পনায় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে দেওয়ালের উচ্চতম স্থানে খুব তাড়াতাড়ি উঠে যায়। সেখান থেকে সে দেখল কীভাবে সারা শহর খ্রিষ্টান বাহিনীর হাতে পতন হচ্ছিল। একই সঙ্গে তিনি সেই স্থানে তার দলের পতাকা তুলে বুঝিয়ে দিলেন শহর যেহেতু তিনি দখল করেছেন, তাই শহরের প্রশাসন তার হাতেই ন্যস্ত হয়েছে; যুদ্ধের মধ্যেও তার লক্ষ্য ছিল নিজের স্বার্থ বুঝে নেওয়া এবং আগামীর পরিকল্পনা নিরূপন করা (৩০)।
সব কিছু ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে থাকে, অন্য দরজাগুলো শহরের অমুসলমান বাসিন্দারা খুলে দিল হাট করে। বন্যার মত ঢুকে আসা বাহিনী দরজা খুলে দেওয়া অমুসলমানদেরও খুন করল, শহরের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা রেহাই পেল না। তীব্র অন্ধকার আর চরম ভয়ের পরিবেশে বন্ধু আর শত্রু ঠাওর করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। এন্টিওকে খ্রিষ্টিয় বাহিনী কয়েক দিন ধরে মারাত্মক হত্যালীলা চালায়। রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহ পরিষ্কারের লোক পাওয়া গেল না। বিপুল গ্রীষ্মে ডাঁই হয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহ পচে কটু গন্ধ বেরতে লাগল। জনৈক প্রত্যক্ষ্যদর্শীর ভাষায়, ‘শহরের প্রত্যেক রাস্তার মৃতদেহ ঢিবি হয়ে পড়ে রইল, দুর্গন্ধে বাড়ি থেকে কেউ বেরোতে পারছিল না, শহরের ছোট রাস্তায় স্তুপীকৃত মৃতদেহ পড়ে থাকায় রাস্তাতেও হাঁটা দায় হয়ে পড়ছিল (৩১)’।
শহরের প্রশাসক ইয়াঘি সিহান ভয়ে পালিয়ে পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। তাকে হঠাত দেখে ফেলে তিনজন খ্রিষ্টিয় সেনা খচ্চরে বেঁধে সিহানের তরবারি দিয়েই, সিহানের মাথা কাটে। তার চুলে ভরা কানওয়ালা বিশাল মাথা শহরে এনে ক্রুসেডারদের উপহার দেয় তারা (৩২)।
আট দিন পরে ৩ জুন ১০৯৮-তে এন্টিওকের পতন ঘটল — যদিও আশ্রয়স্থল, শহরের দুর্গ টুট ছিল, সেখানে লুঠতন্ত্র পৌঁছতে পারে নি। অবরোধ চলার সময় হাজারো ক্রুসডার মারা গিয়েছে, অগণন মানুষ আহত, নিহত হয়েছে; বহু সেনানী বাহিনী ছেড়ে পালিয়েছে, কেউ কেউ বিতশ্রদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবুও অবরোধ শেষ হল ক্রুসেডারদের বিজয়ে। কিন্তু শহরে যারা প্রবেশ করলেন তাদের সেই সাফল্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগের সময় জুটল না – কেরবোঘা তার পরের দিনই বিশাল বাহিনী নিয়ে উপস্থিত।
দামাস্কাস বা আলেপ্পোর প্রশাসকের বাহিনীর তুলনায় বর্তমান বাহিনীর আকার অনেক বড়। তাড়াহুড়ো না করে কেরবোঘা পরিকল্পনা মাফিক বাহিনীকে কাজে লাগালেন — দেওয়ালের বাইরে শিবির ফেলে শহরের মধ্যে বিজীতদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলেন। যখনই বুঝে গেলেন ক্রুসেডারদের বাহিনী ক্লান্ত, অবসন্ন এবং আতঙ্কিত, তিনি বাহিনীকে, শহরের মধ্যের বিজয়ী বাহিনীকে তীব্র আক্রমণ শানানোর নির্দেশ দিলেন।
ক্রুসেডারেরা কেরবোঘার প্রাথমিক আক্রমন রোধ করতে সক্ষম হল। কারবোঘা ঠিক করলেন তিনি শহরকে অবরোধ করে না খাইয়ে মারবেন। অবরোধকারীরা ঘেরাও হয়েল। এন্টিওক থেকে বাইরে খবর পাঠানোর সব সূত্র বন্ধ করে দেওয়া হল। কেরবোঘা আসার আগেই সাহায্য প্রর্থনা করে একটা বাহিনীকে এন্টিওক থেকে বাইজান্টাইন সম্রাটের সমক্ষে পাঠানো হলেও পরের বারে আর ক্রুসেডারেরা এই সুযোগ পেলেন না, তুর্কিরা খুব সহজেই শহর থেকে বহির্বিশ্বের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
কেরবোঘার অবরোধের দ্রুত ফল ফলল। বহুমাসের অবরোধের ফলে শহরে কিছু খাবার ছিল না। জনৈক পঞ্জিকাকার লিখছন ‘আমাদের বাহিনীর সেনারা ঘোড়া, গাধার মাংস একে অপরকে বিক্রি করতে শুরু করল — একটা মোরোগের দাম উঠল ১৫ শিলিং, ডিমের দাম দুই শিলিং, একটা ওয়ালনাট বিক্রি হল এক পেনিতে …দুর্ভিক্ষ এত তীব্র হয়ে উঠল যে সেনারা ডুমুর ফল, আঙ্গুর গাছ, কাঁটা গাছ এবং হাতের কাছে যে গাছ পেল সেদ্ধ করে খেতে শুরু করে। অন্যরা ঘোড়ার, গাধার, উটের, ষাঁড়ের আর মহিষের শুকনো ছাল খেতে লাগল (৩৩)’। খাদ্যের যোগ্য নয় এমন গাছগাছালিও খাওয়া শুরু হল, তার মধ্যে কিছু কিছু বিষাক্ত গাছও ছিল। কেউ কেউ জুতো এবং অন্যান্য চামড়ায় বানানো জিনিস খেল। নিজের ঘোড়ার রক্তও বাদ গেল না (৩৪)। চাত্রেসের ফুলচের বললেন এসব ব্যাভিচারের ফলশ্রুতি – বহু ক্রুসেডারেরা স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে যৌনসংসর্গ করার ফল। সর্বশক্তিমান তাদের অনিয়ন্ত্রিত যৌনতার শাস্তি দিচ্ছেন (৩৫)।
প্রত্যেক পথের বাঁকে এবং দুর্দশায় ক্রুসেডারেরা সর্বশক্তিমানের হস্তক্ষেপের আশা করেছে — এবং তারা সেটা অর্জন করেছে। জনৈক ভদ্রলোক পিটার বার্থেলোমৌ তুলোসির রেমঁদ আর লেপুইএর বিশপকে জানালেন তার স্বপ্নে বেশ করেক মাসধরে সেন্ট এন্ড্রুর আবির্ভাব ঘটেছে, তিনি তাকে জানিয়েছেন যে বর্শা খ্রিষ্টের হৃদয়কমল বিদার করেছিল, সেটি কোথাও লুকোনো রয়েছে। শহর তোলপাড় করে খোঁজ শুরু হল, শেষে একটা অংশ মিলল এন্টিওকের চার্চের মেঝে খোঁড়ার পরে (৩৬)। স্মৃতিবস্তুটি বাহিনীর মনোবল নতুন করে তুঙ্গে তুলে দেয় — যদিও পরের দিকের পঞ্জিকাকারেরা এই স্মৃতিবস্তুটি আদৌ প্রামাণ্য কী না সে বিষয়ে মোটেই একমত হন নি। কিন্তু এই ঘটনা প্রায় ভেঙ্গেপড়া বাহিনীর মনোবল বাড়িয়ে দিল — ‘বাহিনীর পক্ষে এই ভাবে বেশি দিন টিকে থাকা মুশকিল ছিল। তারা ঠিক করল মন্বন্তরে তিলে তিলে অভুক্ত অবস্থায় মরার থেকে যুদ্ধ করে মরাই যথার্থ হবে (৩৭)’।
অভিযাত্রী বাহিনী শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। যদিও রসদ প্রায় শেষ তবুও বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হল ঘোড়াগুলিকে যতটা পারা যায় খাবার দিয়ে চাঙ্গা করে রাখতে। যুদ্ধের আগের দিন ক্রুসেডারেরা শহরে যৌথ মিছিল বার করল, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করল এবং যৌথ শপথ নিল (৩৮)। ১০৯৮-এর ২৮ জুন ক্রুসডারেরা এন্টিওক শহরের চারটি দরজা পার হয়ে অরন্তেস নদীর সেতু পেরিয়ে কেরবোঘার মুখোমুখি হয়। এই আক্রমনে কেরবোঘা চরম বিস্মিত হয়ে যান — তিনি যখন খবর পেলেন ক্রুসেডারেরা তার বাহিনীর দিকে তেড়ে আসছে, তিনি তখন দাবা খেলছিলেন — তাছাড়া খবরটা সত্য কীনা জানতে চেয়ে তিনি আরও কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এই দুরবস্থায় কোনও বাহিনী কীভাবে এত সাহসী হয়ে বোকার মত দুর্ভেদ্য শহর ছেড়ে তার বিশাল বাহিনীকে আক্রমন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে (৩৯)।
এই মুহূর্তে এন্টিওককে অনিরাপদ অবস্থায় ক্রুসেডারেরা ছেড়ে এসেছে আবার অসুস্থ তুলসির রেমঁদের হাতেগোণা বাহিনীর ভরসায়। তার সঙ্গে ২০০ নাইট ছিল। সেই মুহূর্তে শহর আক্রান্ত হলে সেটির পতনও ঘটতে পারত। কিন্তু কেরবোঘা কিছুই করলেন না। স্থানু অবস্থায় অসহায় ক্রুসেডার বাহিনীর আক্রমনের অপেক্ষা করতে লাগলেন (৪০)।
কেরবোঘা যখন সম্বিত ফিরে পেয়ে আক্রমনের নির্দেশ দিলন, ততক্ষণে ক্রুসেডারেরা নিজদের ব্যুহ তৈরি করে ফেলেছে। ক্রুসেডারেরা কোথাও হারে নি, এই সংবাদ কেবোঘার বাহিনীর স্মৃতিতে উদয় হয়ে তীব্র ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল। ক্রুসডারেরা ছোট ছোট দল করে বিপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনীর অক্ষহৃদয়ে ধাক্কা দিতে শুরু করলে কেরবোঘার বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। কেরবোঘার বিশাল বাহিনী দ্রুত মিলিয়ে যেতে শুরু করল; জনৈক প্রত্যক্ষ্যদর্শীর ভাষায় কেরবোঘার বাহিনীর সেনাপতিরা ভীরু হরিণের মত পালাতে লাগল। কেরবোঘার শিবরের প্রত্যেকটি রসদ দখল করা হল। কেরবোঘার বাহিনী এন্টিওক দখলের স্বপ্নে মাতাল হয়ে যে স্থানীয় মহিলাদের নিয়ে মাতম করছিল, তাদের পেটে বর্শা ঢুকিয়ে দেওয়া হল, লিখছেন ফুলচের (৪১)। (চলবে)