The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
দশ
ক্রুসেডের আত্মা দখলের লড়াই
ইতিমধ্যে এন্টিওকেও খুব একটা নতুন ঘটনা আর ঘটে নি। শহর দখলের পর কয়েক মাস ধরে বোহেমোঁ তাঁর পরিকল্পিত শয়তানি ছকে বর্বরতার খেলায় তার মত করে রেমঁদকে উত্তেজিত করে তুলতে থাকেন; উদ্দেশ্য রেমঁদ যাতে ভুল পদক্ষেপও নিতে বাধ্য হয়। তুলোসির কাউন্ট মাররাট আন-নুমান অবদি অভিযান করলেন। বোহেমোঁ দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে তাকে শহর দখল নিতে বাধা দিলেন এবং শহরের একটা বড় অংশ নিজের দখলে নিলেন। শহরে দীর্ঘ বিরক্তিকর সমস্যাজনক অবরোধের পর পতন ঘটলে বোহেমোঁ দ্রুত গিয়ে এন্টিওককে বাঁচাবার জন্যে মাররাটের একাংশ নিজে দখল নিয়ে রেমঁদের হাতে শহরের প্রশাসনের একাংশ তুলে দিতে অস্বীকার করলেন। ছাড়া যুদ্ধ ছেড়ে শুরু হল মুখোমুখি লড়াই।
দুই যুযুধান ক্রুসেডারের মধ্যে সব ধরণের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা বিফল হল। এন্টিওকে সেণ্ট পিটারের ব্যাসিলিকায় রেমঁদ আবার বললেন তিনি আলেক্সিওসের কাছে যে শপথ নিয়ছিলেন সেটি কারোর ইচ্ছায় ধ্বংস করতে দেবেন না। উত্তরে বোহেমোঁ এন্টিওক দখলের আগে নেতৃত্বের মধ্যেকার চুক্তি দেখিয়ে বললেন এই চুক্তিকেও তাহলে আমাদের যথোপযুক্ত মান্যতা দিতে হবে। তুলোসির কাউন্ট আবার জোর দিয়ে বললেন ‘আমরা সর্বশক্তিমানের ক্রুসের সামনে, কাঁটার মুকুটের সামনে এবং অন্য পবিত্র স্মৃতিবস্তুর সামনে আর সম্রাটের সম্মতিতে শপথ নিয়েছি যে আমরা বিজিত কোনও শহর, দুর্গ এবং কোনও অঞ্চল আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখব না (৬৫)’। তিনি এই সঙ্ক্রান্ত দ্বন্দ্ব বিচারের ভার সঙ্গী বিশেষ করে ফ্লান্ডারসের রবার্ট, বাউলিয়নের গডফ্রে এবং নরমান্ডির রবার্টের হাতে তুলে দিলেন একটিই শর্তে বোহেমোঁকে ক্রুসেড দলের সঙ্গে জেরুজলেম অভিযানে সঙ্গী হতে হবে। তিনি সমঝোতা করতে ইছুক, তবে তাঁর প্রস্তাব শহর কার দখলে থাকবে সে বিষয়টি জেরুজালেম বিজয়ের পরে সমাধান করা উচিৎ, আগে মূল উদ্দেশ্য পূরণে সবাইকে একজোট হওয়া (৬৬)।
শর্তটা অনেকের কাছেই বেশ যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হল — বিচারকেরা দুপক্ষের বক্তব্য শুনলেন। একপক্ষের বক্তব্য সম্রাটের কাছে শপথ ছিল পরিষ্কার এবং বিষয়ভিত্তিক; অথচ অন্যপক্ষের যুক্তি আলেক্সিওস তার দেওয়া শপথ রাখছে না, তাদেরও চুক্তি মান্যতা দেওয়ার কী বাধ্যবাধকতা। বাহিনী যতই ধৈর্য হারাচ্ছে, বোহেমোঁ ততই একগুঁয়ে হয়ে মনে করছে তার পক্ষে এন্টিওকের শাসন ব্যবস্থা নিজের হাত থেকাই সমস্যা সমাধানের একমাত্র ভাল উপায়। শেষ অবদি সমস্ত উদ্যম ব্যর্থ হয়ে তার জেদই বজায় রইল। ১০৯৯-এর শুরুতে তুলোসির রেমঁদ, বোহেমোঁর দাবির বিরোধিতায় ঠিক করলেন তাকে ছাড়াই যাত্রা ক্রুসেড শুরু হবে।
বোহেমোঁ একগুঁয়েমি দেখিয়ে তুলোসির কাউন্টের সঙ্গে জেরুজালেমে না যাওয়ার জন্যে দরদাম করার উদাহরণ দেখে অন্য নেতারাও ধনী তুলোসির কাউন্টের সঙ্গে জেরুজালেম অভিযানে শহর ছেড়ে রওনা যাওয়ার জন্যে অর্থ হাত বদলের শর্ত দিল — গডফ্রে আর নরমান্ডির রবার্ট পেল দশ হাজার সলিডি, ফ্লান্ডারসের রবার্ট পেল ছয় হাজার আর টানকারড পেল পাঁচ হাজার। নেতারা বুঝিয়ে দিল রেমঁদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে জেরুজালেমে পৌঁছনোর দাম তাদের পেতেই হবে। যে ঐশী নৈতিকতা আর যুথবদ্ধতার শপথ অবলম্বন করে ক্রুসেড বাহিনীর যাত্রা শুরু করেছিল, সেই পথটি হঠাৎ বেকার হয়ে গেল এন্টিওকের বিজয়ের ফলে; এন্টিওক শহর বিজয় নাইটদের উদ্বুদ্ধ করল ঐশী লাভের বদলে আর্থিক লাভের প্রগতিশীল পন্থা আবিষ্কার করতে — পবিত্র ভূমির দিকে যাওয়ার পুরোনো শপথ ছেঁটে ফেলে শুরুতেই যাত্রার জন্যে দাদন নিয়ে নেওয়া হল; এন্টিওক দখলের পরে ক্রুসেডারদের জেরুজালেম যাত্রার শর্তাধীন সিদ্ধান্ত নতুন এক মাত্রা অর্জন করল মুদ্রারাক্ষসের উপস্থিতিতে (৬৭)।
জেরুজালেমের যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছুই সমস্যা দেখা দল। মাররাত শহর ১০৯৮-এর শীতে দখলের পরে বিশাল মন্বন্তরের মুখোমুখি হতে হল ক্রুসেডারদের, এবং সে মন্বন্তর এক বছর আগে, এন্টিওক অবরোধের সময় ঘটে যাওয়া আকালের থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াল বাহিনীর নেতৃত্বের সামনে। স্রুসেড বাহিনীর অভুক্ত এবং বল হারিয়ে ফেলা সেনারা খাওয়ার নিয়ে বহু নিষিদ্ধ প্রথা হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে চুরে গেল; ক্রুসেডারেরা খাদ্য জোগাড়ের জন্যে এতই মরিয়া হয়ে উঠল যে শেষ পর্যন্ত মৃত মুসলমানের নিতম্ব কেটে খেতে শুরু করে। এবং খিদের জ্বালা এতই বেড়ে চলে যে, রান্না করা মনুষের মাংস সেদ্ধ হওয়ার আগেই রান্নার কড়া থেকে আসেদ্ধ তুলে খেতে শুরু করে (৬৮)।
জেরুজালেমে যাওয়ার পথে বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া স্থানীয় শাসকেরা আগেই শুনেছিল পশ্চিমীরা ডুকাক, রিদওয়ান আর কেরবোঘার সঙ্গে তীব্রভাবে অসম যুদ্ধে যুদ্ধে জিতেছে, মাররাত শহরে তারা বিপুল সব ভীতিপ্রদ ঘটনা ঘটিয়েছে, যেমন অভিযোগ উঠেছিল স্থানীয় মানুষেরা পশ্চিমিদের লুণ্ঠনের ভয়ে সোনার মুদ্রা/সম্পদ গিলে ফেলেছিল দেখে ক্রুসেড অভিযাত্রীরা তুর্কিদের পেট চিরে এই সব সম্পদ বার করে। সেইসব ভীতিপ্রদ ঘটনা স্মরণে রেখে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পশ্চিমীদের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রস্তাব দিতে থাকে। শাইজার, হোমস, জাবালা এবং ত্রিপোলির শাসকেরা ক্রুসেডারদের আশীর্বাদ পেতে এবং তাদের শহরকে আক্রমন থেকে বাঁচার জন্যে তুলসির রেমঁদকে দামি উপহার পাঠাল (৬৯)।
রাস্তায় গতি কমতে শুরু করল বাহিনী আরকা শহরে পৌঁছে তিনমাস অবরোধ করতে শুরু করায়। অবরোধ চলাকালীন আলেক্সিওস জানতে পারলন, ক্রুসেডারেরা এন্টিওকে বেঁচে আছেন – তাদের প্রতি তার মনোভাব পাল্টে গেল। দূত পাঠিয়ে অভিযোগ করলেন ক্রুসেড বাহিনী শপথ ভঙ্গ করে এন্টিওক এবং বাইজান্টাইনের নানান এলাকা দখলে রেখেছে, শর্ত অনুযায়ী সে সব শহর সাম্রাজ্যের হাতে তুলে দেয় নি। দূত পশ্চিমি নেতাদের বললেন সম্রাট ২৪ জুন ১০৯৯-তে বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে প্রস্তুত, ক্রুসেডারেরা যেন তার আগমনের জন্যে অপেক্ষা করেন। এই বাইজান্টানিয় প্রস্তাবে বাহিনীতে বিতর্ক শুরু হল সম্রাটকে আদৌ আমন্ত্রণ জানানো হবে কী হবে না; মতদ্বৈধ থেকেই গেল — এক দল সম্রাটের আসার প্রস্তাবে উতফুল্ল হয়ে মনে করছিল সম্রাট যোগ দিলে জেরুজালেম যাত্রা করা বাহিনীর জোর বাড়বে বই কমবে না এবং অন্যদল বাইজান্টাইনদের সঙ্গে কোনও রকম সমঝোতাতেই রাজি ছিল না। সম্রাটের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমান উপহারের প্রস্তাবেও বিরোধী পক্ষ অপেক্ষা করতে রাজি হল না (৭০)।
হয়ত জেরুজালেমে পৌঁছে যাওয়ার তাড়ার একটা বড় কারন ছিল আলেক্সিওসের ক্রুসেড বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব। তারা নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে তার জন্যে অপেক্ষা না করে জেরুজালেমে রওনা হয়ে যায়। আঠের মাসের মধ্যে ক্রুসেডের উদ্দেশ্য লক্ষ্য এবং চরিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে বাহিনীর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অচেনা রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে হঠাত বোঝা যাচ্ছিল ক্রুসেডের অভীষ্ট আবার ফিরে এসেছে। (চলবে)