The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
এগার
ক্রুসেডের জট খুলল
এন্টিওকে রোগে ভুগে গণমৃত্যু, নেতাদের থেকে পথে তীব্র বঞ্চনা সহ্য করা, অসংখ্য সাথীর প্রাণ যাওয়া, সুদীর্ঘ কষ্টদায়ক যাত্রাপথ পেরোনোর যন্ত্রণা, বহু যুদ্ধ অভিজ্ঞ সেনার নরখাদক হয়ে ওঠার মত দুর্বিসহ সমস্যা সফলভাবে পিছনে ফেলে ক্রুসেড বাহিনী ১০৯৯-এর ৭ জুন শহরবাসীদের হর্ষধ্বনি, আনন্দাশ্রু এবং হর্ষউল্লাসের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ যাত্রা শেষে জেরুজালেম শহরে পোঁছল। জনৈক পঞ্জিকাকার লিখছেন জেরুজালেমে পা রাখা বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যর চোখ খুশির অশ্রু ঝরে পড়ছে (১)।
জেরুজালেম শহরে অনেক কিছু কাজ করা বাকি ছিল। শহরের নিরাপত্তা বিধান করছিল আকাশ ছোঁয়া দেওয়াল, ক্রুসেডে আসা পশ্চিমি নাইটদের আগমনের দিকে মাসের পর মাস চেয়ে থাকা বিশাল যোদ্ধা শত্রুপক্ষ। ক্রুসেডারেরা যখন বৈঠক করছেন কীভাবে শহরের নিরাপত্তা ভাঙ্গা যাবে সে সময় পেট পাতলা রোগে ভোগা টানক্রেড অসুস্থ অবস্থায় একটা গুহায় শরীর সারাবার জন্যে ঢুকে পড়ে সে আবিষ্কার করে অবরোধ ভাঙার যন্ত্র সহ নানান অস্ত্রশস্ত্র, অতীতে কোনও অবরোধকারী সেখানে ছেড়ে রেখে গয়েছে। গুহায় নানান যুদ্ধ রসদ আবিষ্কারে সেনাদের মনে দৃঢ় ধারণা হল সর্বশক্তিমান ক্রুসেডারদের সঙ্গেই আছেন (২)। জেনোয়া থেকে ছটা নৌকোয় দড়ি, হাতুড়ি, পেরেক, কুঠার এবং ছোট কুঠার পৌঁছনোর আগেই ক্রুসেডারেরা নানান জিনিসপত্র যোগাড় করে ফেলেছে (৩)। যদিও পণ্যগুলি আনতে ৫০ মাইল রুক্ষ্ম এলাকা ঘুরে যেতে হত, কিন্তু এই জিনিসগুলি পৌঁছনো আদতে সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ, যে ঘটনা অত্যাবশ্যকভাবে ব্যর্থতাকে সাফল্যে পরিণত করে (৪)।
পশ্চিমি নাইটেরা জেরুজালেম শহরে পৌঁছনোর আগেই বেশ কয়েকটা ভয়ঙ্ক সেনার আক্রমন সফলভাবে রুখে দিলেও জেরুজালেম শহর রক্ষা করা বাহিনী ক্রুসেডারদের খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছিল না। তাদের মনে হচ্ছিল পশ্চিমি বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করে নিশ্চিতভাবে পরাজিত করা খুব একটা কঠিন কাজ হওয়ার কথা নয়। এন্টিওকের মতই জেরুজালেম শহরের নিরাপত্তার বলয় খুবই আঁটোসাঁটো ছিল। আক্রমনকারীরা বিপুল সংখ্যায় জেরুজালেমে পৌঁছল। তবুও বাস্তবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দেশগুলির দিকে যাত্রা করা দু’বছর আগের বিপুলাকার বাহিনী রাস্তায় যুদ্ধ, মন্বন্তর, মারীভোগ, দলছুট ইত্যাদি সামলে পূর্বের গন্তব্যে পৌঁছলে দেখা গেল শুরুর আর শেষ সময়ের বাহিনীর আকারে বহরে আসমানজমিন ফারাক হয়ে গিয়েছে। একটা হিসেবে বলছে জেরুজালেমে পৌঁছনো ক্রুসেডিয় বাহিনীটি, পশ্চিম থেকে যাত্রা করা মূল বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ (৫)। পবিত্র শহরের বাসিন্দারা বুঝতে পারছিল ক্রুসেডারেরা শহরের বাইরে কী দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছে। এখানে খাদ্য সমস্যা ছিল না। চাত্রেসের ফুলচের লিখলেন, ‘আমাদের সেনারা মাংস বা রুটির অভাব বোধ করছিল না, অঞ্চলটা শুকনো, জলবিজীন, কোনও ছোট জলপ্রপবাহও নেই, ফলে সেনা থেকে পশু প্রত্যেকে জলের অভাবে কষ্ট পাচ্ছিল (৬)’।
জেরুজালেমের পোক্ত দেওয়াল শুধু বন্ধ ছিল না, আশেপাশের জলাধারগুলিতেও বিষ দেওয়া হয়েছিল শহর আক্রমনের আশংকায়। সব থেকে কাছের স্থানীয় জলের সূত্র পেতে যেতে হত বারো মাইল দূরে। ষাঁড় আর বলদের চামড়া জুড়ে জুড়ে যতটা পারা যায় বড় ভিস্তি তৈরি করে একসঙ্গে অনেক বেশি পরিমান জল বয়ে আনার পরিকল্পনা হল। জন আনার বরাত পড়া মানুষ প্রাণ হাতে করে দূরে যেতেন জল আনতে আর যখন জল শুদ্ধ ফিরে আসতেন পরিবেশের গরমে শিবিরে থাকা সেনাদের তৃষ্ণা মেটাতে নিজেদের মধ্যে প্রায় হাতাহাতি লেগে যেত। এই পরিবেশকে অনেকেই অর্থ রোজগারের সুযোগে ব্যবহার করতে থাকে। জল বিক্রি হত বিপুল মূল্যে। জল সমভাগে ভাগ করা হত না, জল বিক্রি হত উচ্চমূল্যে। যার অর্থ দেওয়ার ইছে ছিল এবং দেওয়ার ক্ষমতা রাখত তারাও সব সময় ভাল জল পেত না — কখোনো কাদা জল, পোকা কিলবিল করা জল পান করতে হত। ফলে বাহিনীতে রোগের প্রকোপ বাড়ল; প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা বলছেন অপরিষ্কার জল পান করে গলা আর পেটের রোগ ছড়িয়ে গেল শিবিরজুড়ে, বহু মানুষের পীড়াদায়ক মৃত্যু ঘটল (৭)।
যারা নির্লজ্জ সাথীদের থেকে জল কিনে পান করতে পারত না, তাদের জন্যে ছিল জেরুজালেমের শহরের দেওয়ালের বাইরে যিশুর সময়ের স্বাভাবিক ঝর্ণার জলে পরিপূর্ণ পুল অব সিলোয়াম। সেখান থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে জল আনতে গিয়ে বহু সেনা মারা পড়েছে, অনেকে ধরা পড়েছে — পরে আর তাদের খবর পাওয়া যায় নি (৯)।
জেরুজালেমের বাসিন্দারা কায়রোর উজির আল ফদালের থেকে বার্তা পাচ্ছিলেন তিনি তাদের উদ্ধার করতে আসছেন; তিনি আর মাত্র পনের দিন দূরের পথে আছেন। ধরা পড়া এক সংবাদবাহকের থেকে অত্যাচার করে এই সংবাদ বার করা হল। এই শত্রুপক্ষ আক্রমনের খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে গেল ক্রুসেড বাহিনীতে। এক পথ বিক্রেতা পায়রা সংবাদ বাহককে মেরে নামিয়ে একটি বার্তা উদ্ধার করা হল, যেখানে নগরের অধিবাসীরা এক্রে এবং কাইসেরার প্রশাসকদের লিখেছে বুদ্ধিহীন, মাথামোটা এবং বিশৃঙ্খল ক্রুসেড বাহিনীর থেকে তাদের উদ্ধার করার জন্যে বাহিনী নিয়ে আসতে, এবং এদের হারানো খুব বড় কাজ নয় (১০)।
পশ্চিমীরা খুব তাড়াতাড়ি শহর দখলের পরিকল্পনা করে। ১০৯৯-এর ৮ জুলাই নাইটেরা ক্রুস নিয়ে খালি পায়ে জেরুজালেমের দেওয়াল ঘিরে একটি মিছিল করে এবং সর্বশক্তিমানের দয়া প্রর্থনা করে। শহররের অধিবাসীরা ক্রুসেডারদের লক্ষ্য করে সাধারণভাবে তীর ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করার কাজ চালাল, যেন তারা শয়তান এবং ছন্নছাড়া পশ্চিমি আক্রমণকারীদের নিয়ে খুব কটা চিন্তিত নয় (১১)।
তবে ক্রুসেডারেরা আর পারমার্থিক সাহায্যর ওপর নির্ভর করছিল না। খুব দ্রুততায় দুটি আক্রমন করার বুরুজ তৈরি হল এবং সেদুটিকে দেওয়ালের কাছাকাছি নিয়ে আসা হল — একটা দক্ষিণে আরেকটা জেরুজালেমের পশ্চিমের দেওয়ালে চারকোণা বিশাল কর্তৃত্বব্যাঞ্জক বুরুজের কাজে। আক্রমনকারীদের এই কাজটা শহরের বাহিনী শান্তভাবে দেখল এবং শহরের নিরাপত্তা সরঞ্জাম আরও সুদৃঢ় করল (১২)। (চলবে)