The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
এগার
ক্রুসেডের জট খুলল
জুলাই মাসের তীব্র গরমের মাঝে শত্রুপক্ষের থেকে কয়েক কদম এগিয়ে থাকতে নতুন এক সুচতুর রণণীতি তৈরি করল ক্রুসেড যাত্রায় আসা পশ্চিমি বাহিনীর নেতৃত্ব। শহরের দেওয়ালে চৌকোণা বুরুজের সামনের তৈরি ক্রুসেড বাহিনী নিজেদের তৈরি প্রতিস্পর্ধী বুরুজটি ৯ জুলাই রাতে ভেঙ্গে ফেলে শহরের উত্তরের দিকে সমতল জমিওয়ালা দুর্বল দেয়ালের গায়ে বুরুজ তৈরি করারর পরিকল্পনা করল (১৩)। এই রণনীতি পরিবর্তনে শুরু হল জেরুলেম শহরের ওপর নতুন করে প্রবল আক্রমণের প্রক্রিয়া। বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য খোঁড়া পরিখা দ্রুত ভরিয়ে ফেলা হল; দেওয়ালের বাইরে কাটা ট্রেঞ্চ বুজিয়ে দেওয়া হল সমতল করে। আরও বেশি নিরাপত্তা দেওয়া হল পাথর ছোঁড়া যন্ত্রগুলোকে; একইসঙ্গে তীরান্দাজ বাহিনীকেও নিরাপদ এবং রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সরিয়ে এনে শহর আক্রমণের জন্য নতুন করে সাজানো হল তাদের। জেরুজালেমের বিশাল নিরাপদ দেওয়ালের নিরাপত্তা বলয় ভাঙারও পরিকল্পনায় যে বিশাল যন্ত্র তৈরি করা হয়েছিল, সেটিকে সরিয়ে আনার জন্যে সময় আর শ্রমের অপচয় বিবেচনা করে সেটিকে পুড়িয়ে ফেলা হল। নতুন রণনীতিতে বুরুজের ওপর নিরাপত্তার জন্যে মোতায়েন বাহিনীর ছোঁড়া আগুন তীর থেকে বাঁচার জন্যে নিরাপত্তা ছাউনি তৈরি করার সময় থেকেই বুরুজের তলায় রাস্তা তৈরির বাহিনী দেওয়ালে সিঁধ কাটতে শুরু করে। আরেকটা দল দেওয়াল বেয়ে উঠে দেওয়ালের ওপরে থাকা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে নতুন জায়গা দখল নিল (১৪)। এই মুহূর্তে দুপক্ষেরই মনে হল জেরুজালেম শহরের নিরাপত্তা বেড়াজাল ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
উত্তরপ্রান্তের দেওয়ালে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার তীব্র প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ দিকের দেওয়ালেও একইভাবে নিরাপত্তা বলয় তৈরির সাজসজ্জা পুরোদমে চলাচ্ছিল ক্রুসেডার বাহিনী। সেখানেও একটা বুরুজ তৈরি করা হল। নেতারা জানতেন রণনৈতিকভাবে দক্ষিণ অঞ্চলে তৈরি বুরুজের গুরুত্ব অনেক বেশি কিন্তু আক্রমণের কার্যকারিতা কম; বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল এই বিশাল কাঠামো দেখলে শত্রুপক্ষ সেই অঞ্চলে বেশি বেশি করে সেনা মোতায়েন করবে, সেই সুযোগে শহরের উত্তর দিকের দুর্বল প্রতিরক্ষায় আঘাত এবং আক্রমন জোরদার করে সেই অঞ্চলের নিরাপত্তা ভেঙে ফেলার চেষ্টা চলাবে বাহিনীর সেনারা। যে পনেরটা আগুন আর পাথর ছোঁড়ার যন্ত্র তৈরি করেছিল জেরুজালেম কর্তৃপক্ষ তার ন’টাই বসানো ছিল শহরের দক্ষিণ অঞ্চল বাঁচাবার জন্যে। দক্ষিণের দেওয়ালের বাইরে ক্রমশ ভীতিপ্রদ আক্রমণ শানিয়ে তুলছিল ক্রুসেডারেরা, কিন্তু পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকটা বুরুজ জ্বালিয়ে দেওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হল ক্রুসেডারদের। তেল, রজন, পিচ আর চুলে আগুন ধরানো বল খ্রিষ্ট সেনাবাহিনীর ওপর ক্রমাগত ছুঁড়ছিল জেরুজালেমের সেনা দল। এই সময় তাদের দক্ষিণ অঞ্চলটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ আঁটোসাঁটো দেখাচ্ছিল। এই অঞ্চলে তুলোসির রেঁমদ বাহিনী নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র লড়ে বড়সড় ফাঁকফোঁকর তৈরি করলেও শত্রুপক্ষের আক্রমন এতই জোরালো ছিল যে, তুলোসির রেঁমদের বাহিনীকে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি সহ্য করতে হল। জেরুজালেম সেনার আক্রমণে দক্ষিণের এলাকায় এমনই ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে শুরু করছিল যে রেমঁদ যখন নিজের বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার ভাবনা ভাবছেন, হঠাৎ খবর আসে উত্তর অঞ্চলে ক্রুসেড বাহিনী তীব্র আক্রমণে উত্তরের দেওয়াল ধ্বসিয়ে শহরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
জেরুজালেমের আঁটসাঁটো নিরাপত্তা নিমেষেই ভেঙ্গে পড়ল তাসের ঘরের মত। শহরের নিরাপত্তায় থাকা সেনানায়ক ইফতিকারউদৌলা নিজের আর পরিবারের সুরক্ষায় পশ্চিমী বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করলেন নিরাপদ বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে তিনি শহরের মধ্যেকার দুর্গের চাবিকাঠি পশ্চিমি বাহিনীর হাতে তুলে দেবেন। বাহিনীর মনে হচ্ছিল চুক্তির বাহানায় তার হয়ত উদ্দেশ্য ছিল যতদিন কায়রোর উজির বাহিনী নিয়ে আক্রমণে না আসছেন ততদিন যতটা পারা যায় শহর হস্তান্তর আটকানো। চুক্তিতে বলা হল তার পরিবার এবং বাছা বাছা কিছু মানুষকে নিরপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে ক্রুসডার বাহিনী (১৫)। কিন্তু মুসলমান সেনানায়কের দুশ্চিন্তা ছিল মাররাত আন-নুমান শহরের পতনের পরে সেখানকার প্রশাসকের সঙ্গে বোহেমোঁর এই ধরণের একটা চুক্তি হয়েছিল ১০৯৯-এর বসন্তে, কিন্তু তিনি শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সে চুক্তি মান্য করা হয়নি (১৬)।
ক্রুসেডারদের কবলে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ১০৯৯-এর ১৫ জুলাই। কীভাবে পশ্চিমিরা শহরে প্রবেশ করেছে সে বিষয়ে ল্যাটিন সূত্র কোনও রকম রাখাঢাক রাখে নি — ‘বিধর্মীদের দয়া দেখিয়ে শয়ে শয়ে মানুষের মাথা কেটে ফেলা হল, বুরুজ থেকে তীরান্দাজদের নিশানা পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হল, বহু অধিবাসীকে অনেক্ষণ অত্যাচার করে আগুণে পুড়িয়ে মারা হল। কাটা মাথার স্তুপ গজিয়ে উঠল এখানে সেখানে, বাড়ির উঠোন রাস্তায় কাটা হাত পা ছড়িয়ে থাকল বহু দিন, সাধারণ মানুষ আর নাইটদের শহরজুড়ে যাতায়াত করতে হচ্ছিল মৃতদেহের স্তুপ মাড়িয়ে’ (১৭)’।
গণহত্যা এত বিশাল হয়েছিল যে বহু পশ্চিমি প্রত্যক্ষ্যদর্শীও শিউরে উঠেছেন — ‘সারা শহরের নানান জায়গা মৃতদেহে ভরে উঠছে, যারা শেষ অবদি বেঁচেছিলেন, মৃতদেহের স্তুপ তাদের দরজার পাশ থেকে সরিয়ে শহরের বাইরে রাখছিলেন এবং সেটি একটি বাড়ির সমান স্তুপের আকার ধারণ করে। পাগানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এমন গণহত্যার কথা এর আগে আর কেউ শোনেনি। শহুরেরা পিরামিডের মত ঢিবি করে মৃতদেহ পোড়াতে শুরু করল, কত মানুষের দেহ তারা পুড়িয়েছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই’ (১৮)’।
সে সময় উপস্থিত না থাকা জনৈক লেখক আতঙ্কিত হয়ে লিখছেন, ‘আপনি যদি সেখানে থাকতেন তাহলে আপনার গোড়ালি মৃতদের থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তে ডুবে যেত। আমি আর কী বলব! কাউকে তারা বেঁচে থাকতে দেয় নি। মহিলা শিশুদেরও ছাড়ে নি তারা (১৯)’। জেরুজালেমের হত্যালীলা যেমন নাটকীয় তেমনি নারকীয়ও বটে। অধিকাংশ বিজয়ী পক্ষের লেখক পূর্বলক্ষ্মণযুক্ত ভাষা আর অলঙ্কার ব্যবহার করলেন উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে — তারা বুক অব রেভেলেশনে নির্দিষ্ট রেফারেন্স পয়েন্ট তুলে বললেন খ্রিষ্টিয় বাহিনী পৌরাণিক প্রফেসিকে সফলভাবে প্রযুক্ত করল (২০)। (চলবে)