The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
এগার
ক্রুসেডের জট খুলল
প্রায় প্রত্যেকটা সূত্র থেকেই জেরুজালেম শহর দখলের পরের সময়ে খ্রিষ্টিয় বাহিনীর জনগণের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়ার মোটামুটি কাছাকাছি বর্ণনা পাচ্ছি। আতঙ্কিত এক মুসলমান লেখক লিখছেন শুধু আল-আকসা মসজিদের সঙ্গে জুড়ে থাকা কম করে ৭০ হাজার ইমাম, জ্ঞানী আর পবিত্র মানুষকে হত্যা করা হয় (২১)। খ্রিষ্টকে ক্রুসে দেওয়ার ঐতিহাসিক অপরাধে ইহুদিদের ওপরেও খ্রিষ্টিয় গণহত্যার গিলোটিন নেমে আসে। ক্রুসেডারেরা এই ঐতিহাসিক শহরে প্রবেশ করে আনন্দও প্রকাশ করে নি, অন্যদের সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় হিসেব নিকাশ চুকোবার কথাও ভাবেনি, তারা শহরের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছে শুধুই গণহত্যার ভয়াবহ পরিবেশ (২২)।
ব্যতিক্রমী ছিলেন মাত্র কয়েকজন। শহরে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে এই মানুষেরা পবিত্র সেপুলচারে গিয়েছিলেন সর্বশক্তিমানকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। কিন্তু সেনাদলের অধিকাংশ সদস্যের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য আলাদা ছিল। তাদের অনেকেরই সম্পদ লুঠের ক্ষিদে বহুদিন অবদি মরে নি। ক্রুসেডারেরা খবর পাচ্ছিল যে শহরের মুসলমানেরা দামি বস্তু গিলে ফেলছে। চাত্রেসের ফুলচের লিখছেন, ‘আপনারা অবাক হবেন কী না জানি না আমাদের সাধারণতম সেনা আর পদাতিকেরা যখন দেখল লুঠ থেকে বাঁচতে সারাসিনেরা জীবিত অবস্থায় নিজেদের সম্পদ গিলে নিচ্ছে, তারা নাগরিকদের তলপেট চিরে সেগুলি বার করল, কিছু দিন পরে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই উড়িয়ে দেখতে লাগল সোনার ছাড়া অন্য কোনও দামি বস্তু তারা মৃতদের পেট থেকে বের হয় কী না (২৩)’।
জেরুজালেম শহরের দখলদারেরা যে যত পারে শহরের নাগরিকের সম্পত্তি দখল নিয়েছে। অধিকাংশ ক্রুসেডার অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান, তাদের জীবিকাও খুব সাধারণ, তারা হঠাৎ খ্রিষ্টিয় জগতের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহরে ঢুকে হঠাৎ বিশাল বিশাল বাড়ি দখল করে ধনী হল (২৪)। দু’দিন ধরে ধারাবাহিক রক্তপাতের পরে বাহিনীর নেতারা ঠিক করল শহরে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা দেহগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কয়েক দিন পর বাহিনীর সদস্যদের নররক্তপানের ইচ্ছে কমতে শুরু করলে ক্রুসেডারেরা শহরের বাসিন্দাদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করা শুরু করে। জনৈক ইহুদি লেখক ইসলামি আক্রমণকারীদের থেকে ক্রুসেডাদের পছন্দ করল কারন তাদের নতুন প্রভুরা অন্তত নাগরিকদের খেতে, পান করতে দিয়েছিল (২৫)।
শেষ অবদি জেরুজালেম খ্রিষ্টিয় হাতে ন্যস্ত হল। এই অভিযাত্রা আদতে অকল্পনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিপুল সংখ্যক মানুষের একজোট হওয়া এবং তাদের পবিত্র শহরে যাত্রা ব্যবস্থাপনার উদ্যম যার ফলে হাজার হাজার মানুষ ইওরোপের মাটি মাড়িয়ে তীব্রতম বাধা বিপত্তি এড়িয়ে এশিয়া মাইনরে পৌঁছে তাদের উদ্দেশ্য সফল করল। বিশাল বাহিনীর জন্যে নিয়মিত খাদ্য আর জল সরবরাহ করে চলা সব থেকে কঠিন কাজ ছিল। তাদর জন্ম অঞ্চলের তুলনায় অভিযান করা এলাকার ভূপ্রকৃতি এবং পরিবেশ খুবই কষ্টদায়ক এবং উত্তপ্ত ছিল। ক্রুসেডারেরা বহু নিরাপদ শহর আর দুর্গ দখল করেছে। তাদের অর্জনও খুব কম ছিল না, খ্রিষ্ট বিশ্বের তিনটে প্রধান শহর নিকাইয়া, এন্টিওক এবং জেরুজালেমের পতন ঘটিয়েছে মাত্র দু’বছরের মধ্যে।
তৃতীয় এবং শেষ বিজয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এই শহর মুক্ত করতেই তারা ইওরোপ থেকে রওনা হয়েছিল ১০৯৬-তে। জেরুজালেম দখল একট অভূতপূর্ব ঘটনা — সংকল্প, দৃঢ়চেতা এবং জেদের মিলন ঘটিয়েছিল ক্রুসেডারেরা। প্রত্যেকেই খুব খারাপ সময় দেখেছে, আতঙ্ক আর ভয়ের পরিবেশে বাস করেছে — অনেকেই শেষ অবদি আসতে পারল না, কেউ কেউ দল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল — তবুও যারা শহরে আসতে পারল, তাদের কাছে এটা খুবই আনন্দের সময় হয়ে উঠল।
শহর পতনের সময় উপস্থিত থাকা অগুইলারের রেমঁদ লিখলেন ‘শহরের পতনের পরের আনন্দিত উপহারটি ছিল তীর্থযাত্রীদের পবিত্র সেপুলচারে হাত জড়ো করে, আনন্দিত স্বরে নতুন গান গেয়ে সর্বশক্তিমানের প্রতি উপাসনায় অংশগ্রহন করা’। ‘বিজয়ী এবং জয়োল্লাসিত সর্বশক্তিমানের প্রতি তারা যে স্তব করছিল তার প্রকৃতি ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য ইতিহাস লেখকদের কাছে ছিল না। নতুন দিন, নতুন এবং চিরস্থায়ী আনন্দ এবং আমাদের ভালবাসা আর পরিশ্রমের ফসল ফলানোর ফলে নতুন ভাষা আর গান তৈরি হল। আমি নিশ্চিত, এই দিনটি শত শত বছর ধরে উদযাপিত হবে, আমাদের দুঃখ ভুলিয়ে দেবে, পরিশ্রমকে আনন্দ এবং উল্লাসে রূপান্তরিত করবে। আমি আরও বলছি, এই দিনে সমস্ত পাগানবাদ সমাপ্ত হবে, খ্রিষ্টধর্ম পালিত হবে এবং আমাদের বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধার করবে। ‘এই দিন সর্বশক্তিমানের হাতে জন্ম নিয়েছে; আমরা আনন্দ এবং উল্লাস করি’, এবং সমিচীনভাবে এই দিনটা সর্বশক্তিমান আমাদের দেখতে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আশীর্বাদ করেছেন (২৫)’।
জেরুজালেম দখল করেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যায় নি; শহরে প্রবেশের পর ক্রুসেডারদের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং দুরূহ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছিল — শহরের প্রশাসন কীভাবে চলবে; স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে এবং মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে রাখা হবে; তারা বাইজান্টাইন এবং আলেক্সিওদের ওপর ভরসা করবে কী না; নতুন বিজিত শহরে নতুন প্রশাসক কীভাবে জোগাড় হবে; ভবিষ্যতে কী ধরণের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে তাদের; শহর দখলটা ক্ষণমাত্র সাফল্য যাতে না হয়, সেই বিষয়টা পশ্চিমিদের নিশ্চয় করতে হবে, কিন্তু তার ভিত্তি হবে স্থায়ী খ্রিষ্ট শাসন।
তর্কের খুব বেশি সময় ছিল না। জেরুজালেম এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে শীঘ্র নিরাপত্তার আয়োজন করা জরুরি ছিল, শহরে যখন লুঠ চলছিল, খবর আসছিল কায়রো থেকে বিপুল বিশাল বাহিনী শহরের পানে ধেয়ে আসছে। প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল বিজয়ী নেতৃত্বর পক্ষ থেকে দলের মধ্যে সব থেকে ধনী, সব থেকে উপযুক্ত এবং সব থেকে নিষ্ঠাবানকে শহরের রাজা হিসেবে তুলে ধরা হবে। রাজা নির্ভর সরকার তৈরি করার সিদ্ধান্ত নাইটদের সব থেকে চেনা রাজনৈতিক কাঠামো, যে কাঠ্যামোটা তারা জানত, বুঝত। কিন্তু ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার রাশ তুলে দেওয়ার আরও একটা গোপন এবং নির্দিষ্ট কারন ছিল। মাথায় রাখতে হবে এন্টিওক দখলের পরে যৌথনেতৃত্বের মধ্যে বিশাল বিভেদের ফাটল তৈরি হয়, তার জন্যে বাহিনীকে বহু সমস্যা পোয়াতে হয়েছে, জেরুজালেম প্রশাসনকে সেই যৌথনেতৃত্বের ব্যবস্থা থেকে বেরোনো দরকার ছিল। প্রসাসন চালানোর কাজে তুলোসির রেমঁদ সব থেকে দক্ষ মানুষ বিবেচিত হলেন। আবারও ক্রুসেডারদের আশাকে নিরাশায় পরিণত করে রেমঁদ ডাক প্রত্যাখ্যান করলেন; তার নিষ্ঠাবান বক্তব্য রাজা উপাধি সর্বশক্তিমানের পুত্রের জন্যের নির্ধারিত — বিশেষ করে এই শহরের জন্যে তো বটেই। এই বিনয় খুবই সম্মানজনক বিষয়, কিন্তু ক্রুসেডারদের সে সময়ের জন্যে বাস্তবিক প্রয়োজন ছিল একজন কর্তৃত্বসম্পন্ন নেতৃত্ব। রেমঁদ অস্বীকার করার পরে এই দায়িত্ব পালন করার জন্য কেই বা থাকতে পারেন? (চলবে)