The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
যাত্রা শুরু করা বাহিনীর বিপুল অংশই তীর্থযাত্রা শেষে পূণ্য সঞ্চয় করে বাড়ি ফিরতে পারলেন না। ক্রুসেড অভিযানে যাওয়া বাহিনীর কত সেনা মারা গেলেন, সে অঙ্ক কষা খুবই সমস্যার, তবে যে সংখ্যায় মানুষ রওনা হয়েছিলেন জেরুজালেম তীর্থে পৌঁছনোর উদ্দেশ্যে, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশই জেরুজালেমে পৌঁছনোর আগে মারা গিয়েছেন, কেউ যুদ্ধ করতে গিয়ে মারাগেছেন, কেউ রোগেভুগে মারাগেছেন, কেউ বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে স্থানীয় অঞ্চলে থিতু হয়েছেন — মোটামুটি যাত্রা করা বাহিনীর তিনের চার অংশ যাত্রার উদ্দেশ্যপূরণ করতে পারেন নি (৯)। যারা বিদেশ বিভুঁইতে পড়ে রইলেন, তাদের বাড়ির লোকেরা জানলেন না সে সব মানুষের ভাগ্য কী হল — এই তথ্য থেকে মনে হয় অধিকাংশের প্রাণ গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ হাইনাউলতের বল্ডউইনের স্ত্রী জানলেন, তাঁর স্বামী ১০৯৮-তে ভারমান্ডয়িসের সঙ্গে ছিলেন সম্রাটের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় পর্যন্ত, তার পরে খোঁজ পাওয়া যায় নি। কেউ বললেন তিনি যুদ্ধে মারা গিয়ছেন, কারোর বক্তব্য তিনি ধরা পড়েছেন কিন্তু বেঁচে আছেন। স্ত্রী ইডা প্রচুর খোঁজ খবর করে, তদন্ত চালিয়ে সংবাদ না পেয়ে স্বামীর খোঁজে পবিত্র ভূমির দিকে রওনা হলেন। ইডার গল্প এরকম হাজারো হৃদয়ভাঙ্গা গল্পের একটা গল্প মাত্র (১০)।
ফিরে আসাদের মধ্যে ভাগ্যবান হলেন বোহেমোঁ, তিনি অন্য সাথীর তুলনায় ইওরোপে মাথা উঁচু করে বেঁচে রইলেন। ক্রুসেডে তাঁর কাজকর্মের খতিয়ান, বিশেষ করে যুদ্ধগুলোয় তাঁর শৌর্য আর বীরত্ব গাথায় বোহেমোঁর প্রতি গণজণের সম্মান প্রতিমাপুজোর পর্যায়ে পৌঁছল। যারা ক্রুসডে অভিযানে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বোহেমোঁ আলাদা মর্যাদা লাভ করলেন। কিলিজ আরসালান, ডাকুক, রিদওয়ান এবং কেরবোগার বিরুদ্ধে অসামান্য বিজয় রচনা করার কৃতিওয়ালা নাইট, ইতালিতে ফেরার আগেই কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এন্টিওক আর জেরুজালেমের পতনের পরে এবং দানিশমন্দদের হাতে তার বন্দী হওয়া, কারাগার থেকে সাথী ক্রুসডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আপ্রাণ উদ্যম, কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্যে শাসক-কন্যার সঙ্গে প্রেমাভিনয় (১১) অথবা তুর্কিদের দেওয়া ‘খ্রিষ্টিয়দের ছোট ঈশ্বর’ উপাধি ইত্যাদি তাঁকে শুধু প্রখ্যাতিই দিল না, তাঁর নামে ইওরোপের দেশে দেশে নানান গাথা, গল্প কথা, গান চারিয়ে গেল (১২)।
তার নাম প্রায়উপাসনার পর্যায়ে পৌঁছে গেল ‘গেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম এট এলিওরাম হিরোসোলিমিশেনোরাম’ — ‘ফরাসী এবং অন্যান্য যারা জেরুজালেমে পৌঁছেগিয়েছিল তাদের অর্জন বর্ণন’ বইটি ইওরোপের দেশে দেশে, প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ায়। আপাতদৃষ্টিতে বইটা ১০৯৬-তে দক্ষিণ ইতালি থেকে পূর্বের দিকে অভিযাত্রী বাহিনীর সঙ্গে যাওয়া অনামা এক সদস্যের লেখা। এন্টিওক ঘটনার পরে তিনি তুলোসির রেমঁদের দলে যোগ দেন। বইটি দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে খুবই বিখ্যাত হয়। এর মুখ্য চরিত্র কিন্তু বোহেমোঁ (১৩)।
বোহেমোঁ ১১০৫-এর শেষে ক্রুসেডে যাত্রার জন্যে বাহিনী তৈরির উদ্যমে নিজেকে কফিনে পুরে ইওরোপে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন, তখন আর তিনি প্রথম সফল ক্রুসেড অভিযাত্রী দলের শুধুমাত্র একজন বিখ্যাত সদস্য নন, তার সঙ্গী সাথী প্রত্যেকের প্রখ্যাতি ছাড়িয়ে তিনি একাই সমগ্র ইওরোপে অবিসংবাদী নায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠান করেছেন। বোহেমোঁর খ্যাতি ইওরোপের সাধারণ মানুষের কাছে নিত্য স্মরণীয় হয়ে উঠল। সাথী, সঙ্গীদের খ্যাতি ছাড়িয়ে তাঁর কৃতির প্রতিটি বিন্দু চর্চিত হতে লাগল ইওরোপজুড়ে। এই প্রখ্যাতিতে যে আবশ্যিকভাবে প্রভুত পরিমান চোনা রয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কারন নেই; মাথায় রাখতে হবে তিনি জেরুজালেম পতনের সময় শহরে ঢোকা নাইটদের সঙ্গে ছিলেন না, এন্টিওক হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি জেরুজালেম দখল যুদ্ধে অংশ নেন নি। আরো খারাপ হল, তিনি জেরুজালেমে পৌঁছনোর ক্রুসেড শপথ সম্পূর্ণ করলেন ১০৯৯-এর শীতে; বৌলিয়নের বল্ডউইনের সঙ্গে যৌথভাবে দক্ষিণের দিকের রাস্তা ধরে তিনি জেরুজালেমে পৌঁছলেন এই বিষয়টা নিশ্চিত করতে আলেক্সিওসের প্রধান প্রতিনিধি তার অবর্তমানে এন্টিওকে পৌঁছতে না পারেন (১৪)। কিন্তু এত সব ঘটনা তার সৌভাগ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি।
ইতালি বল্ডউইনকে আরবানের উত্তরাধিকারী পোপ দ্বিতীয় পাস্কাল বরণ করলেন। পোপকে লেখা চিঠিতে নিজেকে ‘এন্টিওকের রাজা’ হিসেবে পরিচয় করালেন। তিনি এই অভিজাত্যময় উপাধি ইতালিতে আখছার ব্যবহার করবেন (১৫)। তখনও অবিবাহিত, বোহেমোঁ ইওরোপের অভিজাত মহলে সব থেকে আকর্ষণীয় সম্ভাব্য জামাই — মধ্যযুগের প্রথম সময়ের নাইটদের যে সব গুণ থাকা দরকার ছিল সুদর্শনতা, সাহসিকতা, দুঃসাহসিক অভিযাত্রা এবং নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব, সব কটা তার জনমনহরনী চরিত্রের সঙ্গে সাজুজ্যপূর্ণ হয়ে উঠল।
জমিদার, রাজপরিবারের সম্ভাব্য মহিলা উত্তরাধিকারীরা তাকে বিবাহ করতে সারি বাঁধলেন। রাজা প্রথম ফিলিপের কন্যা, ফ্রান্সের কন্সট্যান্স, যার পক্ষে বোহেমোঁর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা সম্ভব ছিল না, তিনি তখন শপ্যাঁ-এর কাউন্ট ট্রয়েজের বাগদত্তা, হঠাৎ দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন বোহেমোঁর মহিষী হতে চেয়ে। বোহেমোঁ নামের এতই জাদু ছড়িয়ে ছিল ইওরোপজুড়ে যে কন্সট্যান্স শপ্যাঁ-এর কাউন্টকে ‘অনুপযুক্ত সাথী’ ঘোষণা করে প্রখ্যাততমর হাত ধরতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন — কাউন্টের ভাগ্যে এই দোষারোপ কেন জুটল সে তথ্য পরিষ্কার হয় নি কোনও দিনই (১৬)। কন্সট্যান্সের পিতা, অভিযানে অংশ নিতে না পারায় ব্যর্থতার গ্লানি মুছতে তিনি সম্ভাব্য ক্রুসেডার জামাইএর প্রখ্যাতির আলোয় উদ্ভাসিত হতে উদগ্রীব হলেন এবং জুটিকে রাজকীয় আশীর্বাদে ধন্য করলেন।
তার প্রজন্মের সব থেকে ক্ষমতাশালী মহিলাকে বিয়ে করার প্রস্তাবে বোহেমোঁ দুবার ভাবেন নি। কন্সট্যান্সের পিতা পিতামহ ছিলেন ফ্রান্সের রাজবংশ, কিয়েভের রানী, হল্যান্ড আর স্যাক্সনির কাউন্টেস পরিবার উদ্ভুত। ১১০৬-এর বসন্তে চাত্রেস ক্যাথিড্রালে ফ্রান্সজুড়ে বিখ্যাতরা এবং এশিয়া মাইনর এবং সিরিয়ায় তার সঙ্গে যুদ্ধ করা সাথীদের উপস্থিতিতে এবং উপস্থিত না থাকতে পারা বহু বিখ্যাত’র দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় (১৭)।
রাজপরিবারে বোহেমোঁর বিবাহের পরে তাকে থামানো মুশকিল ছিল — বিয়ের আগে থেকেই নতুন করে পূর্ব দেশ অভিযানের বাহিনী তৈরির উদ্যম নিয়েছিলেন। অভিযানের জন্যে পোপের আশীর্বাদ আনিয়েছেন, একইসঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে আর আরও বড় বাহিনী তৈরি করার প্রচারাভিযানের জন্যে সেন্ট পিটারের ব্যানারও পেয়েছেন (১৮)। জনৈক লেখক বলছেন পোপ এবং পোপের সঙ্গীসাথীরা পোপের পাঠানো দূতের থেকে পূর্বদেশে ক্রুসেড বাহিনীর দুর্দশার পিছনে আলক্সিওসের অবস্থানে বিক্ষুব্ধ হয়ে বোহেমোঁর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বিরোধিতা আর আক্রমনের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানালন (১৯)। যদিও শোনা যায় পোপ দ্বিতীয় পাস্কাল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আক্রমনের বোহেমোঁর উদ্যমের সরাসরি বিরোধিতা করেন – কিন্তু পবিত্র ভূমিকে সাহায্য করার এই বিশাল উদ্যমে তিনি একা পিছনে পড়ে থাকতে চান নি। মাথায় রাখতে হবে গ্রিক চার্চ, বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য অথবা আলেক্সিওসের প্রতি পোপের সক্রিয় বিরুদ্ধতা ছিল না, বোহেমোঁকে পোপের সাহায্য প্রচেষ্টা এই দৃষ্টিতে দেখা দরকার (২০)।
উল্টোদিকে বোহেমোঁ তাঁর আক্রমণের উচ্চাশা দ্বর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করতে করতে জনগণকে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাকের তীব্রতা বাড়িয়ে চললেন। ১১০৫-০৬ বছর জুড়ে তিনি ফ্রান্সজুড়ে ক্রুসেড যাত্রা সফল করার প্রচারাভিযান চালান। বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি জানান আগের অভিযানে নিকাইয়া, এন্টিওক এবং জেরুজালেম দখল যুদ্ধে ক্রুসেড বাহিনী যে সফলতা পেয়েছে, তাঁর পরিকল্পিত অভিযান, আগের অভিযানের থেকেও বড়, দর্শনীয় বিজয় লাভ করবে (২১)। নতুন রাজকীয় সমর্থন সঙ্গী করে তিনি দক্ষিণ ইতালিতে ১১০৭-এর মধ্যে বিশাল বাহিনী তৈরি করলেন এবং বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে দিয়ে আক্রমন পরিকল্পনা সফল করার সামরিক সাজসজ্জা শুরু করলেন।
তার সময়ের বিখ্যাত পঞ্জিকাকার অর্ডারিক ভাইটালিস লিখছেন বোহেমোর ডাক শুনে বিশ্বের চতুর্দিক থেকে মানুষেরা বহ্নিপতঙ্গের মত নতুন ক্রুসেড অভিযানে অংশ নিতে এলেন। প্রত্যেকের উদ্দেশ্য শুধু আলেক্সিওসের সাম্রাজ্য দখলই নয়, তাকে হত্যাকরাও ছিল (২২)। বোহেমোঁ, আলেক্সিওসের বিরুদ্ধে প্রচারে ব্যাপক সফল হলেন। চার্চ সম্মেলনে জড়ো হওয়া মানুষেরা অবাক বিষ্ময়ে তার গল্পের টানে শুনলেন পূর্ব দেশে খ্রিষ্টিয়দের ওপর বর্বদের অত্যাচারের লোমহর্ষক কাহিনী। উপস্থাপনা শেষ করে তিনি কাঁধে ক্রুস নিয়ে পূর্ব দেশ এবং জেরুজালেম যাত্রার আহ্বান জানালেন। তাঁর বক্তব্য শেষ হল অভিযাত্রী বাহিনীকে কন্সট্যান্টিনোপল দখলের ডাক দিয়ে (২৩)। পোপকে পাঠানো চিঠিতে তিনি দীর্ঘ তালিকা দিয়ে লিখলেন অর্থোডক্স চার্চের অন্য খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীর ওপর বিপুল অত্যাচার নামিয়ে আনার তথাকথিত মর্মন্তুদ কাহিনী (২৪)। (চলবে)