The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
কিন্তু বাস্তবে আলেক্সিওসের সাফল্য নিশ্চিত করা গেল না। জেরুজালেমের অভিযান বিতর্কের ফলে পশ্চিমের দেশগুলোয় ইতিমধ্যেই তার সম্মান ধুলোয় লুটিয়েছে। ক্রুসেডারদের একটা বড় অংশ এখনও সম্রাটকে শ্রদ্ধা করেন — ফ্লান্ডার্স-এর রবার্ট এবং নরমান্ডির রবার্ট বাড়ি ফেরার সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপল শহরে স্বয়ং সম্রাটের পক্ষ থেকে দুজনকে ভব্য সম্মান অভ্যর্থনা জানানো হয়। তার ফলে তাঁদের মনে বাইজনাটিয়াম সম্বন্ধে সুচারু ধারণা তৈরি হয়েছিল (৩৮)। তাছাড়া মুসলমান শক্তির হাতে যে সব নাইট বন্দী ছিলেন তাদের মুক্তির জন্যে জরিমানা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করলেন সম্রাট এবং ১১০১-এর ব্যর্থ অভিযানে যারা আহত হয়েছিলেন তাদের সুশ্রুষার দায়িত্বও নিলেন তিনি (৩৯)। কিন্তু ক্রুসেডের প্রথম দিককার দুটি লেখা নথিতে সম্রাট সম্বন্ধে খুবই নেতিবাচক ছবি উপস্থিত করা হয়ছে — এই তথ্যটাও চরমতম সত্য।
আলেক্সিওস যে চরম বিষাক্ত চরিত্রের মানুষ, এই ধারণা পশ্চিমিদের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়ার প্রথম দিককার সাহিত্য জেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম। তার মত করে আলেক্সিওসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে লেখক লিখলেন পিটার দ্য হারমিট এবং তার বাহিনী যখন জেরিগরোদে ধ্বংস হচ্ছে চিরররে, সেই সংবাদ সম্রাটের কাছে পৌঁছলে তিনি ব্যাপক আনন্দ করছেন (৪০)। তিনি অত্যন্ত খারাপ আর দুশ্চরিত্রের মানুষ এবং বাহিনীকে তাঁর নির্দেশ দেওয়া ছিল যে কোনও ছুতোয় পশ্চিমের খ্রিষ্টিয়দের অভিযান ধ্বংস করার (৪১)। আলেক্সিওস ‘মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন এবং সারাক্ষণ ক্রোধের প্রভাবে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতেন এবং পরিকল্পনা করতেন কীভাবে ধূর্ততা, চাতুরি এবং জুয়াচুরি করে পশ্চিমি নাইটদের ফাঁদে ফেলা যায়; কিন্তু সর্বশক্তিমানের করুণায় তিনি এবং তার নিয়োজিত মানুষেরা আমাদের ক্ষতি করার সময়, সুযোগ কোনওটাই পায় নি (৪২)’। সম্রাট ছিলেন হদ্দবোকা আর বজ্জাতদের ধাড়ি। নিকাইয়ায় তুর্কিদের বাঁচিয়ে রেখে রেখে, কন্সট্যান্টিনোপলে তাদের রাজার হালে ডেকে পশ্চিমি নাইটদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার ভাবনা তৈরি করার মানুষ। প্রত্যেকটি পদক্ষেপে আলেক্সিওস চেষ্টা করেছেন জেরুজালেম অভিযান বানচাল করার, এই কাজ সফল করতে তাঁর যা কিছু করার ছিল সব কিছু করেছেন (৪৩)।
তুলোসির রেমঁদের বাহিনীর সদস্য আগুলিয়ারের রেমঁদও সম্রাটকে ছেড়ে কথা বলেন নি। তিনি লিখলেন বাহিনী যখন পূর্বের দিকে যাওয়ার জন্যে রাজধানীর দিকে যাছিল, আলেক্সিওস মধ্যস্থদের ঘুষ দিয়ে কন্সট্যান্টিনোপল সম্বন্ধে ভাল ভাল কথা লেখাতেন; তার বন্ধুত্বের ওপর এবং মানুষটার মুখের কথারও ভরসা ছিল না (৪৪)। রেমঁদ বললেন বাস্তবতা হল সম্রাট চরমতম মিথ্যুক প্রকৃতির। নিকাইয়ায় সমস্যায় পড়া ফরাসীদের খাদ্য আর বাসস্থানের এবং ক্রুসেডারদের প্রচুর উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ‘ফরাসীরা তার আন্তরিক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস স্থাপন করল এবং আত্মসমর্পণের জন্যেও তৈরি ছিল। কিন্তু তিনি নিকাইয়ার দখল নিয়ে ফরাসিদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করলেন যে, যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, জনগণ তাঁকে খিস্তি করবে আর বিশ্বাসঘাতক দাগিয়ে দিতে বাধ্য হবে (৪৫)’। বিতর্কটি শুরু হয়েছিল সম্রাটের ক্রুসেডার বাহিনীকে এশিয়া মাইনরের মধ্যে দিয়ে এন্টিওকের দিকে যাত্রা করানোর পরিকল্পনায়; রেমঁদের বক্তব্য ছিল আলেক্সিওস জেনেশুনেই ক্রুসেডারদের এশিয়া মাইনরের মধ্যে দিয়ে যাত্রা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন (৪৬)।
আলেক্সিওসের ওপর অসম্মানজনক, বর্বোরোচিত অসম্মানজনক আক্রমনের প্রেক্ষিতটা আমাদের বুঝতে হবে কন্সট্যান্টিনোপলে ১০৯৬-৯৭তে সম্রাটের শপথ নেওয়ার প্রস্তাবে, যেখানে তিনি ক্রুসেডারদের কাছে ব্যাখ্যা করে বোঝালেন এন্টিওকের মত যে সব শহর ক্রুসেডারেরা নিয়ন্ত্রণ করবেন, সে সব শাসন করার অধিকার কেন বাইজান্টিয়ামের হাতে যাওয়া উচিৎ। ক্রুসেডের প্রথম ঐতিহাসিকের কলমে সম্রাটকে খলনায়ক বানানোর অন্যতম কারন ছিল সম্রাটকে দেওয়া বোহেমোঁর শপথের শর্ত ভঙ্গের সমর্থনের যুক্তি সাজানো। তিনি বললেন বোহেমোঁর শর্ত ভাঙার কারণ হল, ক্রুসেডারা নয়, শপথের শর্ত সম্রাটই ভেঙে ক্রুসেড যাত্রার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। জেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম বলছে সম্রাট নাইটদের নিরাপত্তা বিধান করা এবং ভূমিপথ আর সমুদ্রপথে রসদ পাঠাবার জন্যে প্রতিশ্রুত ছিলেন; তাছাড়া আলেক্সিওস সেনা এবং নৌবাহিনী নিয়ে অভিযানে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন (৪৭)। তিনি এন্টিওকের অবরোধের সময় উপস্থিত না হয়ে নিজের শপথ ভেঙ্গেছেন, এবং তাই ক্রুসেডারদের দেওয়া শর্ত রাখার দায় নেই (৪৮)।
এই যুক্তি যদিও গভীর প্রত্যয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু অভিযোগের অসারতা খালি চোখে বোঝা না যাওয়ার কারন নেই। আলেক্সিওস কন্সট্যান্টিনোপল থেকে অভিযাত্রীদের রসদ পাঠানোর কাজে নজরদারি যেমন করেছেন তেমনি কিবোতোতে নিজে থেকে থেকে নিকাইয়া আক্রমনেও যাতে রসদ পাঠানো হয়, সে ব্যাপারেও নজরদারি করেছেন। পশ্চিমি অভিযাত্রীরা এশিয়া মাইনর পেরোনোর সময়ে রসদ সরবরাহের বিষয়ে অভিযোগ না তোলা থেকে প্রমান হয় রসদ সরবরাহ নিয়ে বাইজান্টিয়ান কর্তৃপক্ষ খুবই বিশদে ভেবেছন এবং সেই ভাবনা বাস্তবে প্রয়োগও করেছেন। ১০৯৮-এর বসন্তে বাহিনী এন্টিওকে পৌঁছলে বাইজান্টিয়ান কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ অবরোধের পরিকল্পনা করে; এই জন্যে আনসেল্মের রিবেমঁ বাড়িতে লিখলেন ভুট্টা, মদ্য, তেল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিই রয়েছে (৪৯)।
১০৯৭-৯৮এর শীতে রসদ কম পড়ে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা; যদি কেউ আন্দাজ করতে পারত, কঠোর কঠিন শীতে খাদ্য জোগাড় করা এবং সে সবকে দুর্গম্য ভূপ্রকৃতি ভেঙ্গে এন্টিওকে পৌঁছে দেওয়া কত দুঃসাধ্য কাজ, তাহলে সে সমস্যাটার ব্যাপ্তিটা আন্দাজ করতে পারত। এবং এই ঘটনার জন্যে আলেক্সিওস আদৌ কতটা দায়ি সে তথ্যটাও আমরা বিচার করে দেখিনি এবং সেটা পরিষ্কারও নয়। এন্টিওক থেকে ব্লোয়িসের স্টিফেন স্ত্রীকে ১০৯৮-এর মার্চে ক্রুসেডার শিবিরের দুরাবস্থার সংবাদ পাঠানোর চিঠিতে কিন্তু সম্রাটকে দায়ি করা নিয়ে বাক্য লেখা নেই (৫০)।
উলটো দিকে টাটিকিওস শিবির থেকে চলে যাওয়ার পরেও সাইপ্রাস, লাওডিকিয়া থেকে ক্রুসেডার শিবিরে নিয়মিত রসদ পৌঁছেছে। যতদূরসম্ভব সিলিসিয়া ইত্যাদি শহরের স্থানীয় সেনানায়ক এবং উত্তর সিরিয়ার ব্ল্যাক মাউন্টেনের গ্রিসিয় মঠ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ঐতিহাসিক কাল থেকেই সুসম্পর্ক রেখে চলছে, আলেক্সিওস তাদের মাধ্যমে রসদ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন (৫১)। জনৈক ক্রুসেড ঐতিহাসিক খোলা মন লিখেছেন আলক্সিওস স্থানীয় মানুষদের উতসাহিত করেন যাতে তারা রাস্তা এবং নৌপথে ক্রুসেডারদের জন্যে খাদ্যসামগ্রী পাঠান (৫২)। এন্টিওকের পতনের পরে বাইজান্টাইন কর্তৃপক্ষ পশ্চিমি সেবার জন্যে জাহাজ ভর্তি রসদ পাঠিয়েছেন এবং একই কাজ করেছেন ১০৯৯-এর আরকা অবরোধের সময় (৫৩)।
আলেক্সিওস হয়ত মনে করেছিলেন দরকষাকষির খেলায় তিনি ক্রুসেডারদের অভিযানে সচল রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। ঠিক যখন সম্রাট এন্টিওকের অবস্থা কতটা খারাপ শোনার ঠিক আগে মন্টিক্যাসিনোর এবটকে ১০৯৮-এর জুনে লেখা একটি চিঠিতে বললেন, ‘আপনার চিঠিতে ফরাসি বাহিনীকে রসদ পাঠানোর যে অনুরোধ পড়লাম তাতে আপনার গভীর চিন্তার পরিচয় পাওয়া গেল। আপনার মহামহিম প্রভুকে আশ্বাস দিয়ে বলবেন আমার ছড়ানো ছিটোনো সাম্রাজ্যের সব অঞ্চল থেকে তাদের সব কিছু বিষয়ে সাহায্যের নির্দেশ দেওয়া আছে; আমি ইতিমধ্যে আমার সামর্থ অনুযায়ী তাদের বন্ধু বা আত্মীয় হিসেবে নয়, পিতা হিসেবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি … সর্বশক্তিমানের করুনায় আশাকরি তারা যে কাজ শুরু করেছে সেই কাজে নিশ্চই সফল হবে এবং যতদিন তাদের উদ্দেশ্য ভাল কাজে নিয়োজিত হবে ততদিওন তারা আরও উন্নতিসাধন করবে (৫৪)’। (চলবে)