The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যকে চার-চারবার হারানো যে দাবি বোহেমোঁ করছেন, সেটা স্রেফ অতিকথাও নয় মিথ্যাচার। এপিরাসে যে তিনবার ১০৮১-৮৩, ১-৮৪-৮৫, ১১০৭-০৮ যুদ্ধে বোহেমোঁ অংশ নিয়েছেন সব কটা যুদ্ধতেই তিনি চরম ব্যর্থ; আর ক্রুসেডের অভিযানকে কী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বোহেমোঁ পক্ষীয় জয় বলা যায় — বিশেষ করে ডায়াবলিসে বোহেমোর চরমতম আত্মসমর্পণের পরেও তাঁর বিজয়ী নায়ক হিসেবে আজও জনমানসে থেকে যাওয়াটা শুধু আশ্চর্যের নয়, অনৈতিহাসিকও বটে। সে যুগের সব ঐতিহাসিক প্রমান, সত্য বিবেচনা করা সমস্যার। কানোসায় উৎকীর্ণ লিপি প্রমান করে না সেযুগের ইতিহাস শুধুই সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা হয়েছিল। বোহেমোঁর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শেষ অভিযানের ‘সাফল্যের’ স্মৃতিতে ফ্রান্সের লোরি অঞ্চলের এক সন্তর কবিতা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে — ‘এন্টিওকের নায়ক শুধু যে আলেক্সিওসের বাহিনীর সঙ্গে ঘা খাওয়া কোণঠাসা বন্য শুকরের মতই লড়েন নি, তার বিরুদ্ধে পাঠানো সাম্রাজ্যের বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করেন’। সমস্যা হল কবিতায় উল্লিখিত এই যুদ্ধ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিজয়ের জয়গান করলেও, ঘটনাটা উল্টো ছিল — যুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে বোহেমোঁ সাম্রাজ্যকে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য হন, সম্রাট সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে কারন তিনি নরমান প্রাধান্য অস্বীকার করেন। কবিতায় বলা হয়েছে বোহেমোঁর নির্দেশে সম্রাট শপথবাক্য পাঠ করলেন (৭৫)। আমাদের স্বীকার করতে হবে ঐতিহাসিক বোহেমোঁর ‘সাফল্য’ নিয়ে নরমান জনগণের স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় (৭৬)।
বছরের পর বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচারে প্রথম ক্রুসেডে অংশ নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণতম ঐতিহাসিক চরিত্র সম্রাট আর বোহেমোঁর ভূমিকা আর খ্যাতির উলটপুরাণই ঘটায়নি, আরও বড় আশ্চর্যের হল এই ইতিহাসে পোপের ভূমিকাও প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েগেছে। প্রথম ক্রুসেডারদের জেরুজালেম যাত্রার ভূমিকা এবং ভিত্তি তৈরি করতে পোপ দ্বিতীয় আরবানের কেন্দ্রিয় এবং নির্ণায়ক ভূমিকা অবিসংবাদী এবং এর ঐতিহাসিক নথি আজও বর্তমান। ইওরোপিয় নাইটদের তিনি সক্রিয় করেছেন, জনসভায়, সিনোডে তাঁর উদ্দীপনাময় বক্তব্যে হাজারো মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্রুস কাঁধে নিয়ে আর অস্ত্র হাতে তুলে পবিত্র ভূমির পানে যাত্রা শুরু করে। পোপের ঐতিহাসিক ভূমিকা ১০৯৮-তে এন্টিওক শহর পতনের পর চিঠি লিখে সশ্রদ্ধায় স্বীকার করেছেন ক্রুসেডে যাওয়া নেতৃত্ব (৭৭)।
অথচ প্রথম ক্রুসেডের এই ধরণের বর্ণনায় আরবান আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত। জেস্টা ফ্রাঙ্কোরাম অথবা অগুলিয়ারের রেমঁদের হিস্টোরিয়া ফ্রাঙ্কোরাম পাঠে বিন্দুমাত্র বোঝাই যায় না প্রথম ক্রুসেড রচনা করার সামগ্রিক কল্পনা রচনা, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এবং সেই বিপুল বিশাল বাস্তবে রূপায়িত করায় দ্বিতীয় আরবানের বিন্দুমাত্র কোনও ভূমিকা রয়েছে। তুলোসির কাউন্টের সঙ্গে ক্রুসডের উদ্দেশ্যে জেরুজালেমে যাত্রা করা রেমঁদের লেখায় কোথাও পোপের কথা বলা হচ্ছে না। যে যাত্রা মধ্যযুগের ইওরোপকে চিরতরে বদলে দেবে সেই যাত্রা উদ্যমের সলতে পাকানোর জন্যে ক্লেরমঁতে আরবানের উদ্দীপনাময় বক্তৃতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উল্লেখও নেই। সেযুগে বিপুল প্রভাব ফেলা সাহিত্য ইতিহাস বাখান উদ্যম, জেস্টা ফ্রাঙ্কোরামেও প্রথম ক্রুসেড ঘটিয়ে তোলার উদ্দেশ্য আয়োজিত ক্লেরমঁর ঘটনার উল্লেখ অনুপস্থিত। লেখক শুধু লিখছেন পোপ আল্পসের উত্তর অঞ্চলে গিয়ে জনগণকে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে পূর্বের অঞ্চলে যেতে উৎসাহ দিলেন — কিন্তু তিনি যে ক্রুসেড অভিযানের স্রষ্টা এই ধরণের আলোচনা সেই ইতিহাস বইতে উল্লিখিত হয় না। শুধু উল্লেখ করেছেন তিনি ‘সমগ্র ফরাসি ভূমিতে মানুষের হৃদয় মথিত করলেন’। তবে লেখক তাঁকে সম্পূর্ণ বর্জন করেন নি, পোপকে তিনি ক্রুসডের ঘটনার উতসারক হিসেবে চিহ্নিত না করলেও উৎসাহদাতা হিসেবে মেনেছেন (৭৮)।
পোপের ভূমিকা স্বীকার এবং ক্লেরমঁ ঘটনার প্রেক্ষিত উল্লেখ করে জেরুজালেম দখলের বহু বছর পরে রবার্ট দ্য মঙ্ক, ডোলের বাল্ড্রিক এবং নজেন্টের গুইবার্ট ক্রুসেডের গুরুত্বকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন, পোপ আরবানের মূল অনুঘটকীয় ভূমিকা উল্লেখ করেন, এবং ক্রুসেড যাত্রা নিয়ে তার উদ্যম ইত্যাদি বর্ণনা করেন এবং তাঁরাই পোপকে প্রথম ক্রুসেডের অক্ষহৃদয়ে বসানোর ইতিহাসকার। উদ্দেশ্যপূর্ণ হোক বা নাই হোক, ক্রুসডের প্রথম যুগের ইতিহাসে আলেক্সিওসের অনুপস্থিতির বয়ান যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, সেই শূণ্যতাকে অপনোদন করতেদ, পোপ দ্বিতীয় আরবান যে নাইটদের উদ্বুদ্ধ করে ক্রুসেড অভিযানে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন, এবং পূর্বের ইতিহাসে সেই অবদানের যথোচিত বর্ণনা আর কৃতির অভাবটি পূর্ণ করলেন তিন লেখক — রবার্ট দ্য মঙ্ক, ডোলের বাল্ড্রিক এবং নজেন্টের গুইবার্ট।
এমন নয় যে আরবানকে জেরুজালেম মুক্ত করার কৃতিত্ব দেওয়া উচিৎ নয় বা পূর্বের চার্চের নিরাপত্তা রক্ষায় তিনি যে বিপুল ভূমিকা নিয়েছিলেন তার কোনও প্রভাব পড়ে নি। যদিও তিনি ১০৯৯-এর জুলাইতে প্রয়াত হওয়ায় পবিত্র শহরের পতনের সংবাদ শুনে যেতে পারেন নি, কয়েক সপ্তাহ পরে জেরুজালেমের পতন ঘটে — অততাড়াতাড়ি ইওরোপে সে সুসংবাদ সংবাদ পৌঁছনো যায় নি। তাছাড়া তিনি বেঁচে থাকতে থাকতে চার্চের একত্রীভবনও দেখে যেতে পারেন নি। ১০৯৮-তে বারিতে কাউন্সিলে গ্রিক চার্চের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির আলাপআলোচনা শুরু হলেও তার ইচ্ছে অনুযায়ী ঘটনাক্রম গড়ায় নি। কিন্তু পশ্চিম ইওরোপে তিনি যেভাবে ক্রুসেডের পৃষ্ঠপোষণা করেছেন সে ক্রিয়া অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে এবং পশ্চিমি বিশ্বে এই সময়ের পর থেকে পোপের ভূমিকার পরিবর্তন ঘটে গেল।
আরবান এবং অন্যান্য বিশপকে রোম থেকে বহিষ্কার করায় ১০৮৮-তে তিনি টেরানসিয়ায় পোপ নির্বাচিত হন। ১০৯০-এর দশকে পোপ ক্লেমেন্ট, সে সময়ের ইওরোপের সব থেকে ক্ষমতাশালী জার্মানির চতুর্থ হেনরির সহায়তায় আরবানকে নিয়মিত পরাজিত করায় ইওরোপে আরবানের অবস্থা খুব নড়বড়ে হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রথম ক্রুসেদের সফলতা আরবানের হারানো ক্ষমতা অনেকটা তাঁর পক্ষে ঢলে পড়তে থাকে — ক্রমশঃ তৃতীয় ক্লেমেন্ট অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। এন্টিপোপের ভাগ্যের ফের এমন হয় যে তাকে বাদ দিয়েই উত্তরসূরীকে ১১০০-এ মধ্য রাত্রে নির্বাচিত করা হয়। (চলবে)