The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
ততদিনে চতুর্থ হেনরি, আরবানের উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় পাসকালের প্রতি প্রকাশ্য অনুগত্য স্বীকার করেছেন (৭৯)। পোপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জার্মান সম্রাট হেনরি প্রথম ক্রুসেডে অংশ নিতে পারেন নি — জেরুজালেমের পতনের পর তিনি ১১০২-এর শীতে সেখানে সোলেম মাসএ অংশ নেওয়ারও ঘোষণা করেন (৮০)। তাছাড়া পশ্চিমি চার্চের সঙ্গে সমস্ত দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নিতে তার ধর্মপিতা, ক্লুনির এবট, হিউকে আগামী বছরের শুরুতে রোমের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করা যায় কী না আর জেরুজালেম থেকে নাইটেরা ফিরে এলে তাদের কীভাবে কাজে লাগানোও যায় সে বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করার জন্যে চিঠি লিখলেন (৮১)।
হেনরির অনুশোচনামূলক উদ্যম সত্ত্বেও সফল ক্রুসেড থেকে জাত বিপুল বিস্তৃত ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব পোপ প্রয়োগ করতে শুরুলেন — ১১০২তে তিনি ধর্মবিরোধী কথা বলার জন্যে অভিযুক্ত ছিলেন এবং এর ফলে জেরুজালেম থেকে প্রত্যাগতরা তাঁকে আক্রমন করবেন এমন কথাও বলা হল (৮২)। পোপের আকাশ ছোঁয়া ক্ষমতার একটা প্রমান হল বছরের গোড়াতেই জার্মান সম্রাট হেনরি, এক প্রবীনতম সমর্থক পয়েন্টিফের সামনে স্বীকার করতে বাধ্য হন, তিনিই চার্চে বিভেদ আনার জন্যে দায়ি এবং সেই আত্মশোচনায় তিনি সেই ফাটল জোড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে নিজেকে নিয়োগ করবেন (৮৩)।
১১২২-এ কনকর্ডেন্ট অব ওয়ার্মস এবং তার পরের বছর ল্যাটারান কাউন্সিল আয়োজন করে পোপ আর জার্মান রাজার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, যে দ্বন্দ্ব ইতিহাসে ইনভেস্টিচিওর ক্রাইসিস নামে পরিচিত, অবশেষে প্রশমিত হল। ক্রুসেড অভিযান ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রজন্মের লেখকদের হাতেই পোপ দ্বিতীয় আরবানের পুনর্বাসন ঘটল এবং ক্রুসেড অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি যথোপযুক্ত সম্মানে পুনর্বাসিত হলেন। অস্বীকার করার উপায় নেই প্রথম ক্রুসেডেএ বিজয়ে রোমস্থ পোপের বিজয় সাধিত হল।
কিন্তু যে মানুষটা আরবানকে অনুরোধ কররেছিলেন অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাক দিতে, প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোসের জন্যেও ক্রুসেড অভিযান অসামান্য সফলতার সূত্র। ক্রুসেড অভিযান বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ভাগ্য মহাকাব্যিকাকারে আবর্তিত হল। ১০৯৫-তে দুর্দশাগ্রস্ত বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের এশিয়া মাইনর নিয়ে সব কটি নীতি চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় — সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেছিল। রাজধানীর উত্তরের অঞ্চলগুলোতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল, সার্ব আর কুমানেরা সাম্রাজ্যকে নিয়মিত ধাক্কা দিতে দিতে সেনাবাহিনী ব্যবহার ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। কন্সট্যান্টিনোপলের পতন তখন প্রায় সময়ের অপেক্ষা; সার্বিক বিদ্রোহ উদ্যম, ক্ষমতাচ্যুতি আর মৃত্যুর হুমকি বাস্তবায়িত হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সম্রাট ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে ক্রুসেডের ডাক দিতে পোপকে অনুরোধ করলেন।
বারো বছর পরে ঘটনাক্রমের চলন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। নিকাইয়া সাম্রাজ্যের অধিকারে এসেছে। এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূল আর গভীরের গুরুত্বপূর্ণ নদী উপত্যকাগুলি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে করে। তুর্কি বিশ্বের সমস্ত বিরোধিতা শান্ত, কিলিজ আরসালানের সঙ্গে ১০৯৮ থেকে নতুন করে শান্তির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে (৮৪)। সিলিসিয়া এবং দক্ষিণ আনাতোলিয়ার উপকূলের প্রায় সব কটা বন্দর উদ্ধার করা হয়েছে। ১০৯৭-তে কন্সট্যান্টিনোপলে যাওয়ার পথে তুলোসির রেমঁদের প্রভাবে সার্ব গোষ্ঠীগুলো শান্ত। সাম্রাজ্যর গুরুত্বপূর্ণ শহরমালার মধ্যে শীর্ষ মুকুট এন্টিওক খ্রিষ্টিয়দের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং শহরের ওপর বাইজান্টাইনদের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়েছে।
ডায়াবলিসের চুক্তির পরেও, সম্রাট জানেন ট্রানকারড-সমস্যা সাম্রাজ্যের গলায় সাময়িক কাঁটা হয়ে থাকবে। জেরুজালেমের অভিজ্ঞ ক্রুসেডার স্পষ্ট বুঝলেন, তাদের প্রতি মুসলমান সাম্রাজ্যের বৈরিতার অবসান হবে না। ফলে বাইজান্টিয়ামের আলেক্সিওস তাদের গুরুত্বপূর্ণ জোটসঙ্গী হিসেবে স্বীকৃত দিলেন। পূর্বে যে সব নাইট বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তারা জানত নিজেদের সুরক্ষার জন্যে আলেক্সিওসের হাত ধরে রাখা কতটা জরুরি। সেজন্যে চাত্রেসের ফুলচের যিনি এডেসার বল্ডউইনের বৌলিয়ন আর জেরুজালেমের চ্যাপলেইন ছিলেন, তার পঞ্জিকায় আবেগের ঘনঘটা তৈরি করেন নি, বরং তিনি ক্রুসেড নিয়ে যে পঞ্জিকা লিখেছেন তার বয়ানের আঙ্গিক অনেকটাই সম্রাটের পক্ষে যায়; আমরা দেখেছি ১০৯৮-তে পোপকে এন্টিওক থেকে চিঠি পাঠানোর সময় কিন্তু, বিতর্কিত শেষ স্তবক যেখানে আলেক্সিওসের প্রতি অভিযোগ করা হয়েছিল ক্রুসেড অভিযানের সামনে বাধা খাড়া করার, তিনি কিন্তু সেটা চিঠিতে উল্লেখ করেন নি। পশ্চিমে তার বন্ধুদের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফুলচের বুঝতে পারছিলেন ভবিষ্যতে যে মানুষটার সমর্থন প্রতিপদে জরুরি হবে, তাকে অনাবশ্যক রাগানোর যুক্তি নেই (৮৫)। অন্যরাও বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য এবং সার্বিকভাবে আলেক্সিওস সম্বন্ধে তাদের মনোভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থেকেছেন এবং তাদের সাথীরা যে বিষাক্ত মানসিকতায় সম্রাটকে আক্রমণ করছেন, সেই প্রবণতায় যোগ দেওয়া থেকে তাঁরা নিজেদের বিরত রেখেছেন (৮৬)।
আলেক্সিওস পূর্ব দেশের ঘটনাক্রমের দিকে গভীর নজরদারি করছিলেন। ১১০৫-এর তুলোসির রেমঁদের প্রয়াণের পরে ত্রিপোলিতে দূত পাঠিয়ে প্রয়াত নেতার উত্তরাধিকারীকে, তার সাম্রাজ্যের আনুগত্য এবং সমর্থন জানিয়েছেন, দ্বাদশ শতক থেকেই রেমঁদ ত্রিপোলিকে ঘাঁটি তৈরি করে রাজত্ব করেছেন (৮৭)। তিন বছর পরে তুলোসির বেট্রান্ড কন্সট্যান্টিনোপলে এসে সম্রাটের সামনে শপথ নেন, এক দশক আগে ক্রুসেড নেতাদের সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করেছিলেন, তার সঙ্গেও ঠিক তেমনি ব্যবহার করলেন, তাকে সম্বর্ধনা আর বিপুল উপহারে ভরিয়ে দিলেন এবং সম্রাট সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গ করার জন্যে সময় বারকরলেন (৮৮)।
ক্রুসেড থেকে বাইজান্টিয়াম যে সাফল্য আদায় করল, সেটিকে নানাভাবে পরিমাপ করা যেতে পারে। আলেক্সিওসের নিজের ভাবমূর্তি জোরদার করার পাশাপাশি তাঁর নেতৃত্বে দ্বাদশ শতকে তীব্র, আত্মবিশ্বাসী, এবং সামরিকবাদী নতুন সাম্রাজ্যের আবির্ভাব ঘটালেন। ১০৮১-তে যে অর্থনীতি পতনের তীব্র ভূকম্পন শোনা যাছিল তারস্বরে, তার বিকাশ ঘটল, নতুন মুদ্রা আসল, ইতালিয় শহর রাষ্ট্রগুলো সঙ্গে এবং ক্রুসেডের ফলে ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেল। সেনাবাহিনীতে ব্যয় কমল। ক্রুসেড বাহিনী তার এলাকার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পরে তিনি প্রতি বছর কোনও না কোনও সময় যুদ্ধক্ষেত্রেই কাটিয়ছেন, কিন্তু তিনি আর বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন নি। ১১০৭-এ জমির মালিকানাভিত্তিক নথি নির্ভর করে রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজালেন — এতে রাষ্ট্রের পক্ষে রাজস্ব পাওয়ার একটা পরিষ্কার ছবি তৈরি হয়। সাম্রাজ্যে স্থায়িত্ব এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেল। (চলবে)