The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বার
প্রথম ক্রুসেডের ফলাফল
১১১৮-য় প্রয়াণের কিছুটা আগে, তাঁর উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় জনকে রাজনৈতিক পথ দেখাতে সম্রাট আলেক্সিওস তাঁর নিজের শাসন সময় সমস্যা কষ্ট ইত্যাদি বর্ণনা করে একটি অনিন্দ্য সুন্দর কবিতা উপহার দিয়ে যান। কবিতা শুরু হয়েছে সম্রাট আলেক্সিওসের সিংহাসনে আরোহনের সময়ের দুর্যোগ এবং উত্তাল সময়ের বিশদ বর্ণনা বাখানে। তিনি লিখলেন ‘পশ্চিম থেকে দলে দলে ঘোড়সওয়ার সেনা এসে’ মহান শাসকের সামনে হাত পা মুড়ে বসে নত মস্তক হল; তারা চলে যাওয়ার পরেই পত্তন ঘটল মহান শাসন ব্যবস্থার। তাঁর বক্তব্য যদি দ্বিতীয় জন তার বাবার সাম্রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক, সামরিক দক্ষতা তার শাসন কাজে লাগাতে পারে তাহলে তার সময়ে উদ্ভুত নানা সমস্যার সমাধান সে নিজেই করতে পারবে। আলেক্সিওস তাঁর উত্তরাধিকারীর উদ্দেশ্যে বললেন প্রজাদের অর্থ এবং উপহার দিতে হবে ‘হাতে হাতে আর ভদ্রভাবে’। নতুন সম্রাটকে, সারাক্ষণ হাঁ করে থাকা পশ্চিমিদের মুখের মধ্যে (ওপেনড জ) সোনায় তৈরি নানা দামি উপহার দ্রব্য নির্বিঘ্নে, কোনও প্রশ্ন না তুলে ভরে দিয়ে যেতে হবে সারাক্ষণ। নানা মানুষ, প্রতিষ্ঠানকে উপহার দেওয়ার উৎসব আয়োজন করতে জন’কে উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা আর কাঠামো তৈরি করতে হবে; তাঁর উত্তরাধিকারী সম্রাটকে সম্পদের বন্ধ ঘরের ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, সেখানে আগে থেকেই ‘প্রচুর সম্পদ’ ভরে রাখত হবে যাতে ‘কিছু দিন আগেও যে সব যাযাবর জাতি, রাষ্ট্র আমাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করত, তাদের সম্পদ চাহিদা নিমেষের মধ্যে পূর্ণ করা যায়’। নতুন সম্রাট কন্সট্যন্টিনোপলকে ‘সোনার ঝর্ণা’ হিসেবে তৈরি করুক, যেখান থেকে উপহার এবং উপঢৌকন হাত খুলে বিতরণ করা যায়। তিনি যতদিন এই কাজটা সফলভাবে সমাধা করতে পেরেছেন, ততদিন তার সাম্রাজ্য স্থিতিশীল থেকেছে। আলেক্সিওস নিজের নীতি এবং সাফল্য অনুসরণকরে এই সাম্রাজ্যিক বিশ্বনীতি পুত্রের হাতে দিয়ে তুলে দিয়ে গেলেন (৮০)।
কবিতা থেকে পরিষ্কার কী বলিষ্ঠভাবে সম্রাট, ক্রুসেডের সময়ে নড়বড়ে শাসন অবস্থান থেকে নিজের উত্তোরণ নিজেই ঘটিয়েছিলেন। আমরা দেখেছি কোন পরিকল্পনায় নিজের রাজত্বের পরে সময়টিকে পশ্চিমিদের ব্যবহার করে নিজের ভাগ্যকে সুধরেছেন আর তাঁর সাধের সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল বিপদমুক্ত করেছেন। চতুর্থ হেনরির পরে তার কনিষ্ঠ পুত্র পঞ্চম হেনরি ১১১১-য় রোমে অভিযান করে দ্বিতীয় পাসকালকে বন্দী করেন। আলেক্সিওস মন্টিক্যাসিনোয় দৌত্য পাঠিয়ে পোপের প্রতি তার সহানুভূতি জানালেন। তিনি রোম অভিযানের প্রস্তাব দিলেন। আগামী দিনে রোমকে নানান আগ্রাসন থেকে নিরাপদ রাখার জন্যে তিনি এবং তার পুত্র সাম্রাজ্যের মুকুটটি রোমে পাঠানোর প্রস্তাব তুললেন (৯০)। ক্রুসেডের পরে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবস্থান এতই দৃঢ় হয়েছিল যে তিনি রোমও দখল করার পরিকল্পনা ছকতে শুরু করেন।
প্রথম ক্রুসেডের পর থেকেই পশ্চিমিরা বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য এবং তার সম্রাটকে নিয়ে ক্রমাগত বিভ্রান্তিকর কুরুচিকর, অনৃত তথ্য ইওরোপজুড়ে ছড়িয়েছে, দ্বিতীয় ক্রুসেড ১১৪৬-৪৭-এ এশিয়া মাইনরে বিপদে পড়লে, আলেক্সিওসের চরিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হল। জার্মান এবং ফরাসি বাহিনী বিপদে পড়ায় একই রকমভাবে কোনও এক বেঁড়ে ব্যাটাকে খুঁজে নিয়ে সর্বশক্তিমানের পশ্চিমি সেবকদের তৈরি করা সমস্ত ব্যর্থতা আর দোষের ভাগ সেই মানুষটার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যম শুরু হল। তাদের ব্যর্থতার সমস্ত দোষ চাপানো হল কন্সট্যান্টিনোপলের সম্রাট, আলক্সিওসের নাতি, প্রথম ম্যানুয়ল কোমনেনোসের ওপর এবং সমগ্র ইওরোপ তার বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে তাঁর ঠাকুর্দার মতই বিষোদ্গার করে। তার ঠাকুর্দার ওপর পশ্চিমের নেতারা যে অভিযোগ ছুঁড়ে দিয়েছিল, একই অভিযোগ — বিশ্বাসঘাতকতা, দুমুখো ব্যবহার, ইসলামের প্রতি সহানুভূতি এবং খ্রিষ্টদের প্রতি বেইমানি নিয়ে তাকেও চরমভাবে বিদ্ধ করা হল। আবারও নতুন করে বাইজান্টাইনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ক্রুসেডের ডাক দেওয়া হল। এরপর থেকে আর সম্রাটের সম্মান উদ্ধার করা যায় নি (৯১)।
বাবার বিরুদ্ধে ক্রমাগত সর্বাত্মক অপপ্রচারের মুখে দাঁড়িয়ে আন্না কোমনেনে সিদ্ধান্ত নিলেন তার পিতার সম্মান পুনরুদ্ধারের এবং তাঁর অর্জন লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার। কিন্তু তার সমস্যা হল আলেক্সিওসের রাজত্বের উচিৎ, তথ্যমূলক উপাত্ত খুঁজে পাওয়া। এক দিকে তার পিতা সাম্রাজ্যকে হারের মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছেন, অন্যদিকে তিনি যে সব বীজ বপন করে গিয়েছিলেন সেগুলি নিত্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। ফলে সম্রাট কন্যা আলক্সিয়াদ লিখেছেন ফুলেল, পরস্পরবিরোধী এবং সান্ধ্য ভাষায়। প্রথম আলেক্সিয়াদ পাঠককে বিষয়চ্যুত করেছে, তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে ভুলপথে চালনা করেছে।
আন্নার লেখার মধ্যেই আপাত সম্পর্কহীন ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাক্য এবং সময়ক্রমকে গুছিয়ে তোলার পর থেকেই বইটার মানে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ১০৯০-এর মাঝামাঝি সময় থেকে বাইজন্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসোন্মুখ হয়ে কাঁপছিল। পূর্ব এলাকার সম্রাটের অনুসৃত সমস্ত রাজনৈতিক সামরিক দৌত্য নীতি ব্যর্থ হয় এবং একইসঙ্গে কন্সট্যান্টিনোপলের উত্তরের অঞ্চলে নতুন করে চাপ তৈরি হয় এবং বিপুল ব্যর্থতা কনস্ট্যান্টিনোপলকে পেড়ে ফেলে। সাম্রাজ্যের আর্থিক সমস্যা চূড়ান্ত আকার ধারণ করলে পূর্ব দেশগুলোয় নতুন করে যুদ্ধে যাওয়ার মত সামর্থ না থাকায় তার নেতৃত্বে অভিজাতদের ভরসা টলে যেতে থাকে এবং সামগ্রিক বাইজান্টিয়াম অভিজাত সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে মাঠে অবতীর্ণ হয়।
আন্না কোমনেনে লিখছেন পশ্চিমি নাইটদের ঝামেলা সামলানো যতটা সহজ ‘নিজের প্রজার বিদ্রোহ সামলানো ততটাই কঠিন — তিনি নিজেকে রক্ষা করতে তাদের চিহ্নিত করে হত্যা কররেন। কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে যে সমস্যার ঘুর্ণিপাক তৈরি হচ্ছিল, সেটি কে বর্ণনা করবে? তাই তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করলেন (৯২)’।
কন্যা লিখছেন, সম্রাট কাণ্ডারীর মত একের পর এক তীব্র ঢেউএর মধ্যে দিয়ে তার নৌকোটাকে বেয়ে নিয়ে চলছিলেন। একটা ঢেউ সফলভাবে পেরিয়ে গেলে আরও একটা তীব্র ঢেউ তার দিক ধেয়ে আসছিল — ‘দুঃখের শেষ ছিল না, এবং তিনি যখন শেষ নিশ্বাস ছাড়ছেন, শেষ বারের মত চোখ বন্ধ করছেন, তখনও দুর্দশা তাকে ছেড়ে যায় নি (৯৩)’। একের পর এক আক্রমনকে আলেক্সিওস অসামান্য দক্ষতায় সামলেছেন।
প্রথম ক্রুসেডের কাহিনী এর আগে বহুবার বলা হয়েছে। বোহেমোঁ, বৌলিয়নের গডফ্রে, তুলোসির রেমঁদের অর্জনের কথা এর আগে বহুবার গীত হয়ে, এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে ছড়িয়ছে। কলড্রনের বল্ডউইন এবং মন্টমার্লের আরকার্ড যারা ফিরতে পারেন নি, তাদের নাম ভবিষ্যতের জন্যে তোলা থেকেছে এবং তাদের নাম বার বার স্মরণ করা হয়েছে কারন তারা পবিত্র শহর বীরের মত এবং স্বার্থবিহীনভাবে জেরুজালেম মুক্ত করতে অভিযান করেছেন।
বহু অনামা নাইট প্রথম ক্রুসেডকে সফল করে বিখ্যাত হয়েছেন। তবুও আবদুল কাশেম, চাকা, বুরসুক, টগরতক, নিকেফোরোস ডায়োজেনিসের নাম বার বার উঠে আসা উচিত ইওরোপের চরিত্র চিরতরে বদলে দেওয়ার জন্যে। তারা বাইজান্টিয়ামকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদের জন্যেই সম্রাট পশ্চিমের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছেন। যে আক্রমন, অবরোধ, বিদ্রোহে এই মানুষেরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার ফলে জেরুজালেমে পশ্চিমের নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়, যেটা আবার ৪৫০ বছর পরে মুসলমান শক্তির হাতে চলে যাবে।
এদের মধ্যে একটাই মানুষ নিজ দক্ষতা আর চরিত্রে আলাদা হয়ে ওঠেন। আলেক্সিওস কোমনেনে ধারাবাহিক প্রথম ক্রুসেডের শৃংখলার প্রথম সলতেটা জ্বালিয়েছিলেন এবং বিশ্বক ক্রুসেড নামক ঘটনা উপহার দিয়েছিলেন। পূর্বের ডাকে ইওরোপের ভৌগোলিক, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং কৃষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গী বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মধ্যযুগের বিবর্তন ঘটেছে। দুর্যোগের সময়ের ৯০০ বছর পেরিয়ে এসে আলেক্সিওস প্রথম ক্রুসেডের অক্ষহৃদয়ে আরেকবার উপনীত হলেন। (চলবে)