The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
সংকটে ইওরোপ
একাদশ শতকের মাঝখানে এসে দুই চার্চ, রোম আর কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে সম্পর্কটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। ১০৫৪-তে পোপ নবম লিও ইতালিতে স্বার্থ খোঁজার কাজে মিশন পাঠিয়েছিলেন, অন্যদিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যর আপুলিয়া এবং ক্যালাব্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। সমঝোতার আলোচনা শুরু হল খুবই খারাপ ভঙ্গীমায়, দুপক্ষই নিজেদের মধ্যে মিলের জায়গাগুলো না খুঁজে, নিজেদের মধ্যে অমিলগুলো কোথায় সেটা খুঁজতে লাগল। আলোচনা প্রায় ভেঙ্গে যেতে বসল গ্রিক এবং ল্যাটিন পদ্ধতিতে ইউখারিস্ট অর্থাৎ যিশুর শেষ নৈশ ভোজন (দ্য লাস্ট সাপার) উৎসব কীভাবে উদযাপিত করা যাবে সেই আচার বিতর্ক সূত্র ধরে। যিশুর দেহ হিসেবে খামি দিয়ে তৈরি রুটি না কী খামি ছাড়া তৈরি রুটি ব্যবহার করা ধর্ম অনুমোদিত, তাই নিয়ে বিতর্ক চলল। সব থেকে গুরুত্বের ছিল শাস্ত্রের filioque ধারাটি, এটি বলে পবিত্র আত্মা শুধু পিতার দেহ থেকেই উৎপন্ন হয় না, এটা পুত্র থেকেও হয় (Most important of all, however, was the addition of the so-called filioque clause to the Creed, by which it was claimed that the Holy Spirit proceeded not just from the Father, but also from the Son)। ষষ্ঠ শতকে স্পেনের চার্চ কাউন্সিল বৈঠকে এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যদিও তাতে বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন না, এবং filioque ধারাটি ব্যবহারের জন্যে পোপও নিন্দা করেছিলেন। বিতর্কিত filioque ধারাটি ক্রমশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এমন একটি বিশ্বে যেখানে প্রথা নিয়ন্ত্রণ খুব সহজ ছিল না। একাদশ শতকের শুরুর সময়ে এটি এত বেশি ব্যবহার করা শুরু হয় যে এটি খ্রিষ্টিয় শাস্ত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। রোম এই ধারাটি গ্রহন করায় পূর্ব দেশগুলি, ভূমধ্যসাগরীয় চার্চ বিশেষ করে কন্সটান্টিনোপল এর তীব্র নিন্দা করে।
চার্চের দৌত্য দল বাইজান্টাইন রাজধানীতে পৌঁছনোয় অবিশ্বাসের ঘটনাক্রম তুঙ্গে উঠল। ১০৫৪-র ১৬ জুলাই সিলভা ক্যান্ডিডার কার্ডিনাল হুমবার্ট এবং রোমের অন্যান্য দূত কনস্টান্টিনোপলের হাগিয়া সোফিয়া চার্চে প্রবেশ করলের ইউখারিস্ট পরব পালন করতে। তারা উপাসনায় না বসে, সোজা হেঁটে চার্চের বেদীর সম্মুখে পৌঁছে পুরোহিত এবং উপস্থিত মানুষদের সামনে বেদীতে একটা নথি রেখেদিলেন। এই মুহূর্তে নাটক তুঙ্গে পৌঁছল। আশ্চর্যের নয়, নথিতে লেখা ছিল কন্সট্যান্টিনোপলের চার্চ প্রধান তার কাজে দক্ষ নন এবং তিনি নানা ভুল বিশ্বাস প্রচার করছেন এবং শিক্ষা প্রদানে ভুল পথ অবলম্বন করছেন। তিনি পাষণ্ডদের মত নরকে দুর্দশা ভোগ করবেন, ফলে তার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। চার্চ প্রধানকে চিরন্তন অভিশাপে আভূষিত করা হল, ‘যতক্ষণ না তারা অনুশোচনা প্রকাশ করছেন, ততক্ষণ তারা শয়তান আর তার দূতেদের সঙ্গে দুর্দশাভোগ করবেন। আমেন আমেন আমেন।’ নাটকীয়ভাবে হুমবার্ট ঘুরে দাঁড়িয়ে চার্চ ছেড়ে চলে যান, হাগিয়া সোফিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে জুতোর ধুলো ঝেড়ে আবার উপস্থিত অভ্যাগতদের দিকে ঘুরে বললেন, ‘সর্বশক্তিমান এই সব অনাচার দেখবেন এবং বিচার করবেন (১৬)।’
এটাই ছিল রোম আর কন্সট্যান্টিনোপল চার্চের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের চূড়ান্ততম মুহূর্ত, একে বলা হল মহান অনৈক্যের দিন। পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যেকার শত্রুতা মোটামুটি প্রাতিষ্ঠানিক, স্থায়ী চেহারা নিল। উদাহরণস্বরূপ নতুন সম্রাট রোমের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না করা সত্ত্বেও ১০৭৮-এ সপ্তম গ্রেগরি, তৃতীয় নিকেফোরোস বোটানিয়াসিসকে বার্তা পাঠালেন; তিন বছর পরে প্রথম আলেক্সিওস কোমনেনোস নিকেফোরোসকে পদচ্যুত করায় পোপ একইভাবে সম্রাটকে বার্তা পাঠাবেন (১৭)। একই সময়ে পোপ শুধু বাইজান্টিয়াম আক্রমনের পরিকল্পনা মঞ্জুর করলেন না, তিনি ব্যানার দিয়ে নির্দেশ পাঠান সাম্রাজ্যের সেনাকে আক্রমন করার জন্যে। তিনি আরও অগ্রসর হয়ে এই আক্রমন পরিকল্পনার নেতা রবার্ট গিসকার্ডকে উত্তেজিত করেন কন্সট্যান্টিনোপলের সিংহাসন দখল করতে। তিনি গিসকার্ডকে সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। যদিও নরম্যান নেতা গিসকার্ডকে পোপের স্বীকৃতি দেওয়ার বা না দেওয়ার বাস্তবিক মানে ছিল না, একইভাবে সিংহাসন দখল করার সুযোগও ছিল না (১৮)।
চলতে থাকা দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আরবান যে ক্লেরমঁতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাক দিলেন সেটা তাকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার জীবন দেবে। সে সময়ের নানান সূত্র থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি, ১০৯৫-এ শেষের সময় থেকে ১০৯৬-এর শুরুর সময় অবদি এশিয়া মাইনরে খ্রিষ্টিয় জনগণের ওপরে যে অত্যাচার চলছিল এবং পূর্বের চার্চের ওপর যে আঘাত আসছিল, সেসব ঘটনা পোপ খুব সচেতনভাবে নজরে রাখছিলেন — অর্থাৎ চার্চ গ্রিসিয় প্রথা অবলম্বন করছিল (১৯)। কিন্তু রোম আর কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তনটা কীকরে ঘটল? এর কারনটা লুকিয়ে আছে একাদশ শতকের শেষের দিকে সার্বিকভাবে চার্চ নিয়ন্ত্রণের লড়াই বিশেষ করে পশ্চিমের ক্ষমতাকেন্দ্রে আরবানের দুর্বল অবস্থার জন্যে।
আরবান, পোপ পদে নির্বাচিত হওয়ার মুহূর্তে জানতেন তাঁকে ইতিমধ্যেই তৃতীয় ক্লিমেন্ট আর ক্লিমেন্টের ক্ষমতার খুঁটি চতুর্থ হেনরি রণকৌশলে পরাজিত করেছেন; ফলে বাধ্য হয়ে যেখানে সম্ভব ছিল, সে সব জায়গায় নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যম নিলেন। তার প্রথম পদক্ষেপ হল কন্সট্যান্টিনোপলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। ১০৮৮-এ নির্বাচনের পরে পোপ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে একটা ছোট প্রতিনিধি দল পাঠালেন তিন দশক আগে যে সব বিষয় নিয়ে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার দিকে গিয়েছিল, সে সব বিষয় কার্যকরী সমাধানে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে। সম্রাট তাদের আমন্ত্রণ জানালে, জনৈক পর্যবেক্ষকের ভাষায় দুপক্ষের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তার মধ্যে ছিল গ্রিক আচারে ব্যবহার্য খামি দিয়ে তৈরি রুটি, কন্সট্যান্টিনোপলের পবিত্র diptychs, যেখানে জীবিত মৃত বিশপদের নাম লিখিত আছে, সেখান থেকে পোপের নাম বাদ দেওয়া — এসব ছিল চার্চের খুব সাধারণ বিষয় (২০)।
সম্রাটের বড় মেয়ের লিখিত ইতিহাস সূত্রে জানতে পারছি, সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস ছিলেন খুবই সাধারণ স্পার্টান জীবনযাত্রা পছন্দ করা এবং বিশ্বাস বিষয়ে ঐকান্তিক আগ্রহের সেনাপতি। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে মধ্যরাত অবদি পবিত্র শাস্ত্র অধ্যয়নে লিপ্ত থাকতেন (২১)। তিনি পোপের দূতেদের ভাষ্য শুনলেন এবং অভিযোগ বিবেচনার জন্যে একটি সম্মেলন (synod) আয়োজনের নির্দেশ দিলেন। সেই চার্চ সম্মেলনে, ঠিক হল ল্যাটিন চার্চসম্মত আচার আচরণ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে পশ্চিমীদের শহুরে উপাসনায় যে সব সমস্যা ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে সে সব বিষয় আলোচিত হবে। এছাড়া সম্রাটের পৌরোহিত্যে একটি বৈঠক আয়োজন করা হয়, যেখানে কন্সটিনোপল এবং এন্টিওকের প্যাট্রিয়ার্ক, ২ জন আর্চ বিশপ, ১৮ জন বিশপকে বলা হয় diptychs থেকে পোপের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে নথিপত্র উপস্থাপন করতে। যখন জনানো হল, এরকম কোনও লিখিত নির্দেশ নেই, এবং পোপের নাম নথিবদ্ধ করার কোনও শাস্ত্রীয় ভিত্তিও নেই, তখন নির্দেশ দেওয়া হল, প্রথা অনুযায়ী নতুন করে শুরু কর (২২)।
এলেক্সিওস সমস্যা সমাধানে আরও দূরে গেলেন। দূতদের মার্ফত সম্রাট পোপকে অনুরোধ পাঠালেন, সুপ্রাচীন চার্চে বহুকাল ধরে স্বার্থ বিরোধী যে সব দ্বন্দ্ব চলে আসছে, সেগুলি দূর করতে তিনি স্বয়ং কন্সট্যান্টিলোপলে পদার্পণ করুন। লিখিত নথিতে সাম্রাজ্যের স্বর্ণ পাঞ্জা অঙ্কন করে তিনি মন্তব্য করেন, গ্রিক এবং ল্যাটিন ক্লার্জিদের নিয়ে মূলগত বিভেদগুলি দূর করতে বিশেষ সম্মেলন আয়োজন করা দরকার। তাঁর করণীয় হিসেবে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, সর্বশক্তিমানের চার্চের ঐক্য তৈরি করতে সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত তিনি পালন করবেন (২৩)।
কন্সট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক তৃতীয় নিকোলাস গ্রামাটিকোস ১০৮৯-এ আলাদা চিঠিতে পোপকে আনন্দ প্রকাশ করে লিখলেন তিনি খুবই খুশি হয়েছেন আরবান এই যাজকীয় দ্বন্দ্ব দূর করতে আগ্রহী হওয়ায়। নিকোলাস নরম ভাষা ব্যবহার করেছিলেন এটা মনে করে যে প্যাট্রিয়ার্ক ব্যক্তিগতভাবে ল্যাটিন খ্রিষ্ট-ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে রেখেছেন। নিকোলাস আরও মনে করতেন, পোপের ধারণা ছিল কন্সট্যান্টিনোপলে পশ্চিমি প্রথা মেনেচলা চার্চগুলি বন্ধ হয়ে যাবে। বাস্তবে কন্সট্যান্টিনোপলে যতজন পশ্চিমা ছিলেন, তারা ল্যাটিন প্রথাতেই উপাসনা করতেন। নিকোলাস লিখলেন, ‘আমরা হৃদয় থেকে চার্চ একতার বিষয়ে প্রার্থনা করছি (২৪)’। (চলবে)