The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
সংকটে ইওরোপ
রোমের সঙ্গে চলতে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধানে নতুন করে পথ খোঁজার আলাপচারিতার উদ্যমের ফলে প্রথম ক্রুসেড শুরু হওয়ার ঠিক আগে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে রোমের সম্পর্ক পুনর্নিমানের গুরুত্বপূর্ণ পথ খুলে গেল। গ্রিক আর ল্যাটিন আচার/প্রথাগুলো নিয়ে পূর্বের চার্চ বিষয়ে যে ভুল ধারণাগুলো উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেই ধারণাগুলো প্রশমিত করতে, প্রথার পার্থক্যগুলো উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে কমিয়ে দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় নথি তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হল প্রবীন বাইজান্টান ক্ল্যারিক থিওফাইল্যাক্ট হেপাইসটসকে। তিনি লিখলেন বিদ্বেষ তৈরি হওয়া অধিকাংশ প্রথা, শাস্ত্র বচনের পার্থক্য খুবই মামুলি আকারের, জরুরি কিছুই নয়। সমীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া ল্যাটিন যাজক থিওফাইল্যাক্ট হেপাইসটস হাতে কলমে দেখলেন পার্থক্যগুলো হল উপবাস রবিবারের না শনিবারে হওয়া উচিৎ কী না; লেন্টের সময় ভুল করে উপবাস পালন করা হয়; তারা অর্থোডক্স পুরোহিতদের বিপরীতে মনে করত আঙুলে অঙ্গুরীয় পরার প্রয়োজনীয়তা নেই; তারা চুল, দাড়ি দুটোই কাটত; গির্জায় বিধবদ্ধ উপাসনার (liturgy) সময় তারা কালো কাপড় না পরে গোলাপি আংরাখা পরত; প্রথামত নতজানু হত না; গ্রিক সন্ন্যাসীরা কঠোরভাবে নিরামশাষী ছিলেন কিন্তু ল্যাটিন সন্ন্যাসীরা শুয়োরের চর্বি সহ নানান ধরণের মাংস সেবন করতেন ইত্যাদি। তিনি সমীক্ষাপত্রে মন্তব্য করলেন এই সব প্রথা বিষয়ক পার্থক্য খুব সহজে সামলানো যায়, যেমন ইউখারিস্টে ব্যবহৃত খামি বা খামি ছাড়া রুটি বিতর্ক ইত্যাদি সহজেই সমাধান করা যায় (২৫)। শাস্ত্রে filioque ঢোকানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেটা সমাধানে আলাপ আলোচনা চলুক; এতদসত্ত্বেও বললেন যারা এই ধারাটিকে মান্যতা দিয়েছেন, তাদের অবশ্যই নরকের আগুনে জন্ম হয়েছে (২৬)। তবে তিনি আশা করলেন ধারাটি বিলুপ্ত করা সম্ভব (২৭)।
দুপক্ষের অবস্থান বদলের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কন্সট্যান্টিনোপল এবং রোমের মধ্যে তৈরি হওয়া ধর্মীয় দূরত্ব দূর করার পাশাপাশি রাজনৈতিক এবং সামরিক জোট তৈরি করা। এই সম্পর্ক তৈড়ির উদ্যমই প্রথম ক্রুসেডের ভিত্তিস্থাপন করল আর কয়েক বছরের মধ্যে পোপের বাইজান্টিয়াম মুক্তির অভিযানে নাইটদের ডাক দেওয়ার সমঝোতা সূত্র হিসেবে চিহ্নিত হল।
কন্সট্যান্টিনোপলের সদর্থক ইঙ্গিতে রোমক পোপতন্ত্রে নিজের নড়বড়ে অবস্থান জোরদার করতে উৎসাহী আরবান সাড়া দিয়ে দ্রুত দক্ষিণ অঞ্চলে গেলেন তাঁর অন্যতম প্রভাবশালী সমর্থক সিসিলির কাউন্ট অব রজার্স-এর সঙ্গে পরামর্শ করতে এবং বাইজান্টিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত উদ্যম বিষয়ে তাকে অবহিত আর রাজি করাতে। অন্য দিকে বেশ কিছুকাল ধরে চতুর্থ হেনরির ইতালির রোম বিষয়ে আগ্রাসী মনোভাবে রজার বেজায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১০৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে জার্মান সম্রাটের সমর্থকদের একাংশ চতুর্থ হেনরিকে প্রথমে কন্সট্যান্টিনোপল এবং পরে জেরুজালেম অভিযান করে সেখানে মহান করোনেশন উৎসব আয়োজন করতে এবং নিজের অর্থ ব্যয়ে নরমানদের টক্কর দিতে জেরুজালেম অভিযানকালে পথের মধ্যে পড়া দুই খ্রিষ্টিয় জনপদ, আপুলিয়া আর কালাব্রিয়া দখল করার অনুরোধ করছিলেন (২৮)। সম্পর্ক শোধরানোর উদ্দেশ্যে আলেক্সিওসের সম্মেলন ডাকার প্রস্তাবে রজারের প্রতিক্রিয়া ছিল সদর্থক। তিনি বললেন পোপের এই সম্মেলনে যোগদান করা আবশ্যিক, এতদিন ধরে যে দ্বন্দ্ব এবং বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তাকে খুব তাড়াতাড়ি মেটানো উচিত (২৯)।
আরবান তার একনিষ্ঠ সমর্থকের থেকে পাশে থাকার বার্তাটাই শুনতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন ঘটমান বর্তমানের উদ্যমগুলোর ফলে আরবান হয়ে উঠবেন পশ্চিম আর পূর্বের চার্চ ব্যবস্থাকে একসূত্রে গাঁথার প্রধান পথিকৃৎ। তৃতীয় ক্লেমেন্টের সঙ্গে তার যে দ্বন্দ্ব চলছিল, নতুন এই ঘটনাক্রমের ফলে সেই দ্বন্দ্বক্ষেত্রে আরবানের বিজয়গাথা লেখা হচ্ছিল — ক্লেমেন্ট এই বাস্তবটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন। ক্লেমেন্ট দেখলেন দক্ষিণ ইতালির চার্চের প্রধান পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে আরবান যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই গোঁড়া কঠোর বাইজান্টাইন ক্লারিক কালাব্রিয়ার বাসিল নিয়মিত কন্সট্যান্টিনোপলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বাসিল ১০৮৯-এর বসন্তের মেলফির কাউন্সিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রস্তাব উঠল তিনি যদি পোপের কর্তৃত্ব স্বীকার করেন তাহলে তাকে রেজ্জিওর ক্ষমতায় বসানো হবে। কিন্তু তার দুই সহকর্মী কাজটা পাওয়ায় তিনি রাগে ফেটে পড়েন (৩০)। তিনি মনে করতেন আরবান অযোগ্য পোপ, ঠিক তার পূর্বসূরী ‘তিনবারের দুর্ভাগ্যপীড়িত’ তৃতীয় গ্রেগরির মত। তিনি কন্সট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ককে লিখে জানালেন পোপকে যখন খ্রিষ্টিয় শাস্ত্র সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ভিতু নেকড়ের মত পালিয়ে বেড়ান। পাষণ্ড পোপ চার্চের উচ্চচপদগুলি রজতমুদ্রার বিনিময়ে নিলামে তুলছেন (৩১)।
বাসিলের ব্যক্তিগত অসূয়ার ফলে কাউন্সিল অব মেলফি আয়োজন করা যে রোম এবং কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে সম্পর্ক শোধরানোর ক্ষেত্রে একটা বড় পদক্ষেপ, এই তথ্যটা প্রায় ঢাকা পড়ে গেল। আর বিক্ষুব্ধ বাসিল বুঝলেন না, তার সহকর্মীদের রোজান্নো আর সান্তা সেভারনিয়ায় পদ পাওয়া হয়ত দক্ষিণ ইতালি বিষয়ে রোম আর বাইজান্টিয়ামের মধ্যে সম্পর্ক শোধরাবার নতুন উদ্যমের ঐটিহাসিক অংশ হতে পারত (৩২)।
বাসিল ঘটনাক্রম নিয়ন্ত্রণের লাগাম নিজের হাতে তুলে নিলেন। কন্সট্যান্টিনোপল দ্বন্দ্ব সমাধানে উদ্যোগী, এই বার্তাটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তৃতীয় ক্লিমেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তার বার্তা পেয়েই, বাসিল রোমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে যে উদ্যম নিয়েছিলেন, সেটি উল্লেখ করে এন্টিপোপ তাতে ত্বরিত উত্তর দিলেন, ‘কন্সট্যান্টিনোপল থেকে আমাদের পবিত্র ভ্রাতা যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, সেটি আমায় প্রেরণ করুন। আমরা এই বিষয়ে আমাদের মনোভাব তাদেরকে জানাব; তার জানা দরকার প্রত্যেকটি বিষয় আমরা যত্ন নিয়ে তৈরি করছি — আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় শান্তি এবং ঐক্য আহ্বান করছি (৩৩)’। ক্লেমেন্ট, বাসিলকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানালেন তার ক্ষোভ শীঘ্র নিরসন করা হবে (৩৪)। সমস্যা হল, ক্লিমেন্ট কন্সট্যান্টিনোপলের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেও খুব একটা সফল হলেন না। তিনি গ্রিক চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যোগ নিয়ে কিয়েভের বাইজান্টাইন-জাত মেট্রোপলিটন বা আর্চবিশপকে লিখলেন। কিন্তু এ যাত্রাতেও তার উদ্যোগের ফল ফলল না। আলেক্সিওস বুঝলেন জার্মান মদদপুষ্টদের সহায়তা আরবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা অনেক বেশি কাজের হতে পারে (৩৫)।
চার্চের আভ্যন্তরীণ লড়াইএর ফলে একটা বিষোয় পরিষ্কার হল, দক্ষিণ ইতালি অঞ্চলে আরবানের প্রভাব তখনও অব্যাহত ছিল। মাথায় রাখতে হবে আন্না কোমনেনে সূত্রে আমরা জানতে পারছি ইতালির এই অঞ্চলে শতাব্দর পর শতাব্দজুড়ে বাইজান্টাইন নিয়ন্ত্রণ ধাক্কা লেগেছিল ১০৫০ এবং ১০৬০-এর দশকে নরমানদের ক্ষমতা বিস্তারের সূত্র ধরে। কোমনেনে নরমানদের ইতালিয় অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করছেন দেহে গ্যাংগ্রিনের ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে ‘ঠিক যেভাবে গ্যাংগ্রিন একবার মনুষ্য দেহাংশে কামড় বসালে সারাদেহকে দূষিত না করে থামে না (৩৬)’। ১০৭১-এ নরমানদের হাতে বারির পতনের সঙ্গে আপুলিয়া আর ক্যাব্রিয়ার শাসনের পতন ঘটালেও, এই প্রদেশে গ্রিকভাষীরা কিন্তু কন্সট্যান্টিনোপলকেই তাদের ধর্মীয় নেতা মেনে এসেছে। রোম-কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে যে শান্তি আলোচনা আয়োজনের যুগ আরম্ভ হয়েছিল, তাতে এই গ্রিসিয় সূত্রটা নতুন করে উজ্জীবিত হল। নরমান বিজয়ের পরে উইল, সেল, চার্টার ইত্যাদির মত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে নরমান ডিউকের নাম উল্লিখিত হত তারিখ উল্লেখের জন্যে। কিন্তু ১০৯০-এর শুরুর সময় থেকে নথিপত্রগুলিতে আলেক্সিওসের নাম এবং সাম্রাজ্যের বছর উল্লিখিত হতে শুরু করল; এর থেকে একটা বিষয় বোঝা যায় যে সাধারণ মানুষ সম্রাট আলেক্সিওসের নেতৃত্বই আশা করছে (৩৭)। বাইজান্টিয়ামের পুনর্বাসন আরও একধাপ এগিয়ে গেল ১০৮১ থেকে আরবান আলেক্সিওসের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় (৩৮)। (চলবে)