The First Crusade – The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
জেরুজালেম এবং শহর কনস্টান্টিনোপলের উদ্বেগী খবরগুলো নিয়ে আমরা সকলেই শংকায় আছি, নাম করেই বলি পারসিক জাতিরা বিদেশি এবং সর্বশক্তিমান তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন… [তারা] খ্রিষ্টিয়দের বাসভূমি আক্রমন করছে, খ্রিষ্টিয়দের জবাই করছে, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করছে, লুঠ করছে, [ফলে খ্রিষ্টিয়] লোকসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে — রেইমের রবার্ট
কন্সট্যান্টিনোপলিয় সম্রাটের দূত দল চার্চের সম্মেলনে [সিনোড] উপস্থিত হয়ে মহান হুজুর পোপ এবং খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের কায়মনোবাক্যে অনুরোধ করলেন, আপনারা পবিত্র গির্জাগুলির জন্যে প্রতিরক্ষা বিধান করুন, বিধর্মীদের [অত্যাচারের] হাত থেকে বিশ্বাসীদের রক্ষা করুন; পূর্বদেশিয় গির্জাগুলি প্রায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে, কনস্টান্টিনোপলের অজেয় দেওয়াল পর্যন্ত বিরাট বিশাল ভূমি আজ কাফেরদের-কবলে; মহান হুজুর পোপ আমজনগণকে এই সেবায় যোগদান করার আহ্বান জানিয়ে বললেন সর্বশক্তিমানের ইচ্ছায় শপথের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুণ, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে [যুদ্ধ] অভিযানে অংশ নিয়ে সম্রাট আর ঈশ্বর বিশ্বাসীদের সক্রিয় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন — কন্সট্যান্সের বারনোল্ড
প্রান্ত অঞ্চলগুলো থেকে কেল্ট জাতির উদ্দীপ্ত জনগণ ঘোড়া, যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধ উপকরণ জড়ো করে দলবদ্ধ হয়ে একজোট হল। চূড়ান্ত উৎসাহ এবং উদ্দীপনায় প্রত্যেকটি রাজপথ ভরে গেল যোদ্ধাদের রণউদ্যমের চিৎকারে। নাইটদের পাশাপাশি হাতে গদা আর হাতে ক্রুশ নিয়ে এল তটভূমির বালি আর স্বর্গের তারার সংখ্যা ছাপিয়ে যাওয়া বিপুল বিশাল অসামারিক জনগণ …ঠিক যেমন করে উপনদী নানান দিক থেকে একে নদীতে মেশে, সেই জনস্রোত আমাদের সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সফল করতে — আন্না কোমনেনে।
মোদ্দা কথা, সম্রাট হলেন ব্রিশ্চিক, তার মুখ দেখে হয়ত ভয় লাগে না, কিন্তু লেজের ঝাপটা থেকে বাঁচতে দূরে থেকো —উইলিয়ামজ অব টায়রে।



মুখবন্ধ এবং স্বীকৃতি
শীতের দেশের হতভাগ্য স্নাতক শ্রেণীর পড়ুয়ারা জানে সকাল ৯টায় গ্রাজুয়েশনের ক্লাসে হাজির হয়ে ইতিহাসের পাঠ নেওয়া কী বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। সক্কাল সক্কাল নিজেকে বিছানা থেকে টেনে তুলে, বিরস বদনে চরম ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ক্লাসে জবুথবু হয়ে বসা সহপাঠীদের মত আমারও প্রত্যেক দিন মনে হত কলেজের মাস্টারমশাইরা আমাদের ওপর অন্যায় অবিচারের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। ১৯৯২ বছরভোর কুয়াশামোড়া ভোরে আমাকে কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের খাড়াই খাড়াই সিঁড়ি বেয়ে আমারই বেছে নেওয়া বিষয় ‘বাইজান্টিয়াম এবং তার প্রতিবেশিরা ৮০০-১২০০’ শীর্ষক ক্লাসে যোগ দিতে পৌঁছতে হয়েছে দেহের প্রতিটি কণা ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে। ক্লাস শুরুর আগে তিন-তিনটে এসপ্রেসো কফি ভর্তি কাপ মাস্ট ছিল। কিন্তু ক্লাসে ঢোকার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমার ঘুমন্ত ন্যাতানো শিরদাঁড়া তলতা বাঁশের মত সোজা হয়ে উঠত কোন জাদুবলে জানি না। কোনও একটা ঘোরের মধ্যে শুনতাম দয়ামায়াহীন স্তেপ অঞ্চলের পেচেনেগ যাযাবরদের জীবনযাত্রার নানান টুকুরোটাকরা তথ্য-তত্ত্ব। সেই গ্রাজুয়েশনের ক্লাসেই প্রথম বারের জন্যে জানলাম পেচনেগেরা কয়েক দানা গোলমরিচ, টকটকে লাল রঙা রেশম কাপড় আর একটুকরো মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি চামড়ার পণ্যের জন্যে জান লড়িয়ে দিতে পিছপা হয় না; ক্লাসে বসে অবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম কীভাবে পাগান বুগলার নেতারা নবম শতাব্দতে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে; সেই ক্লাসেই প্রথম শুনলাম প্রাচ্যের নতুন রোম — বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপলের সম্বন্ধে হাজারো বাখান।
প্রথম দিনের স্যরের বক্তৃতাই আমায় ঠেলে পাঠিয়ে দিল সেই কোন কালের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আর তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বাস্তবতা বুঝতে। সেই ঘোর থেকে আজও বার হতে পারি নি। বাইজান্টিয়াম আর তার প্রতিবেশীদের আরও ভালভাবে জানতে, বুঝতে ক্রমশঃ নিজেকে জায়মান করে তুলছি। অনেক দিন পর্যন্ত মোটামুটি প্রায় ঠিকঠাক মানিয়ে নিতে অসুবিধে হয় নি — মানে আমি পড়াশোনা আমার মত করে চালিয়ে নিতে পারছিলাম কোনও রকমে। সমস্যা খাড়া হল স্নাতকোত্তর পাঠের পরের গবেষণার বিষয় বাছতে গিয়ে। বুঝতে পারছিলাম না, কোন বিষয়টা বেছে নেব। দোনোমনায় ভুগছিলাম। সে সময় হঠাতই বিদ্যুৎচমকের মত সম্রাট প্রথম আলেক্সিওস কোমনিনোর রাজত্বকাল আমার নজরে উঠে এল। সম্রাটকে নিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম বিপুল তথ্যের সম্পদে এবং সেই সময়টার বাস্তবতাতেও। যত বিষয়ের ভেতরে ঢুকতে চাইছি, চোখের সামনে তত বেশি অনুত্তর নানা প্রশ্নের ভিড় বাড়ছে। বুঝলাম এই সময়টাই আমার বাহক হবে। গবেষণায় মাথা ঢুকিয়ে ফেলার পরে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, একাদশ শতকের শেষ এবং দ্বাদশ শতকের শুরুর সময়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হৃদিঅক্ষে আমায় ঢুকতে হলে অবশ্যই আমায় বুঝতে হবে সেই সমকালের লেখা সাহিত্যকৃতি; বিশদে জানতে হবে আলেক্সিয়াদ (মধ্যযুগের ১১৪৮-এর দিকের সাহিত্য, সম্রাট আলেক্সিওসের কন্যা আন্নার লেখাপত্র — অনুবাদক), জানতে বুঝতে হবে দক্ষিণ ইতালির ল্যাটিন এবং গ্রিক সাহিত্যিক সূত্র, জানাশোনায় ঢুকিয়ে নিতে হবে ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস, মধ্যযুগের পোপেদের ইতিহাস, পবিত্র ভূমিতে ল্যাটিন উপনিবেশ তৈরির প্রচেষ্টার… মত হাজারো টুকরোটাকরা বিষয়। চরম বিরক্তি নিয়ে, বিরস বদনে ভোরের প্রথম ক্লাসের বক্তৃতা শুনতে যাওয়া আমার মত এক বেমনোযোগী ছাত্র বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বিষয়ে এতই রসসিক্ত হয়ে পড়ল যে, সেই ছাত্রটি সে রসের টান আজও এড়াতে পারে নি; মধ্যযুগের ধর্ম যুদ্ধ যেমন আমায় ঘোরের মধ্যে ফেলে উত্তেজির করেছে, তেমনি আবার সেই অসামান্য বিষয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, খুব বেশি দূর যেতে না পারার অক্ষমতায় অধিকাংশ সময় চরম অসহায় বোধ করেছি; কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, মধ্যযুগের ঘটে যাওয়া প্রায় প্রত্যেকটা ঘটনা, সে সময়ের সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম আমায় আজও তীব্রভাবে চাগিয়ে রাখে। (চলবে)