একেই কী বলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? ২০২২ সালে সরকার বিরোধী জনগণের বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল শ্রীলঙ্কা। এক বছর আগে বাংলাদেশে ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে যে মহা বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল, তার জেরে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছিল। গত ২৫শে অগাস্ট থেকে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ নতুন শ্রম আইন ও পার্লামেন্টের বিতর্কিত ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নামে। এই সব আন্দোলনের অনুরণনই কী প্রতিধ্বনিত হল নেপালের রাজপথে? ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। গণবিদ্রোহের দাবি মেনে নিয়ে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হল সেনা। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো নেপালও ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, অধিকার আদায়ের দাবি কিন্তু শেষমেশ সরকার বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর বঞ্চনার চিৎকারে জ্বলে ওঠা আগুন ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলের মতো। এক সময়ে স্থিতিশীল দেশ বলে পরিচিত ছিল যে নেপাল এখন সে অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার বহ্নিতে পুড়ছে।
নেপালে ছাত্র-যুবদের এই আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে ঠিকই কিন্তু কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করার কারণেই কী সেখানে এই উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হল? না ঠিক তা নয়। বরং সরকারের দুর্নীতি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের ক্ষোভ গর্জে উঠেছে। বহু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যাদের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। তাই অনেকেই মনে করেন, নেপালের বিক্ষোভ কেবল সামাজিক মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদের বিদ্রোহ নয়, বরং সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের উঠলে ওঠা ক্ষোভ। তবে বহু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তাদের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ছিল। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য, সরকার ব্যাপক দুর্নীতিতে যেমন ডুবে রয়েছে সেই সঙ্গে আর্থিক মন্দার কবলে গোটা দেশ। সরকার যুবকদের কর্মসংস্থান দিতে পারছে না। ওলি সরকার এই পরিস্থিতিতে নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করেছে।
প্রসঙ্গত, নেপালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর প্রায় কোনো সরকারই সেখানকার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। হয়তো সেকারণেই নেপালি জনগণের অনেকেই এখন রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছেন। তবে কী নেপালের মানুষ ফের রাজতন্ত্র্র কায়েম করতে চাইছেন? নেপালের গত কয়েক মাস আগের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যচ্ছে, নেপালের হাজার হাজার মানুষ রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ক্ষমতায় বসার অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মনে করা হয়, ওলিবিরোধীদের বেশিরভাগই ভারতের সমর্থনপুষ্ট। তারা কী এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে? অনেকের ধারণা এইসব কারণেও ওলি সরকার পতনের লক্ষ্যে এই আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করা একটি বড় কারণ হলেও, নেপালের এই বিক্ষোভের পিছনে আরও অনেক দীর্ঘমেয়াদী এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
নেপালে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। এদের অনেকেই ব্যবসা, শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্যএই প্ল্যাটফর্মগুলির উপর নির্ভরশীল। কেবল তাই নয়, নেপালি যুব সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রোজগার করে দিন গুজরান করে।অনেকে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে কেরিয়ারও গড়ছে। ৭০ লাক্ষের বেশি নেপালি তরুণ উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য নেপালের বাইরে। সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞায় তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বড় ধাক্কা লাগে। কিন্তু ওলি সরকারের বক্তব্য, অধিকাংশ সমাজমাধ্যমই নেপালের সরকারি নির্দেশ মানেনি। তাই সরকার বাধ্য হয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের ঘোষণা করে আর এতেই ফুঁসে ওঠে নেপালের তরুণ-যুব সম্প্রদায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, নেপালের এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অস্থিরতারই প্রতিচ্ছবি। অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অচলাবস্থা মানুষের ক্ষোভকে বিদ্রোহে পরিণত করেছে। নেপালের আজকের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ‘হামি নেপাল। যারা ২০১৫ সাল থেকে দুর্নীতির প্রতিবাদ করছে। এবার তাদের ডাকে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়।
তবে নেপালের রাস্তায় নামা তরুণেরা বারংবার বলছেন, ক্ষোভ শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের কারণে নয়। অসন্তোষের অন্যতম কারণ, সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘ অসন্তোষ।প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বক্ল করে দেওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও তা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে দুর্নীতি, স্বৈরাচার এবং নেতৃত্বে জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।অনেক তরুণের বক্তব্য, এই আন্দোলন গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা বলছেন, কথিত ‘জেন জেড বিপ্লব’ আসলে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার ফসল, যেখানে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়তে থাকে সেখানে বিদ্রোহ স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে। নেপাল সরকার গত এক বছর ধরে বিভিন্ন সমাজমাধ্যমগুলিকে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করছে। যদিও তাদের বক্তব্য অন্য কিন্তু সরকার আসলে সমালোচকদের মুখ বন্ধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে চেষ্টা করেছে। তাই সোমবার নেপালে যা ঘটেছে, তা দীর্ঘ দিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নেপালে দীর্ঘ দিন ধরে নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অতীতে তিন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর (মাধব নেপাল, বাবুরাম ভট্টরাই এবং খিলরাজ রেগমি) বিরুদ্ধেও সরকারি জমি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তা নিয়েও দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষোভ জমছিল। ঠিক একইভাবে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়াতে সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুব সমাজ এমনকি সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে সামিল হয়েছে।