‘অন্ন সমস্যা যখন তার বীভৎস মূর্তি নিয়ে অতি প্রকটভাবে এ দেশে দেখা দিল এবং বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতীর্ণ হাজার হাজার ডিগ্রীধারী ছাত্র যখন রোজগারের কোন পন্থা খুঁজে না পেয়ে বৎসরের পর বৎসর বেকারের দলকে পুষ্ট করতে লাগল…. এই সময়ে কৃষিকার্য্য বা চাষ আবাদ সম্বন্ধে একটু উপদেশ পেলে ভদ্র কৃষকদের সামান্য উপকার হতে পারে এবং কয়েকটি নূতন জাতীয় বিশেষ আয়কর ফসলের চাষ প্রবর্তন দ্বারা দেশের শিক্ষিত ভদ্র বেকার যুবকগণের দৃষ্টি এদিকে নিবদ্ধ করতে পারলে এই সমস্যার আংশিক সমাধান এবং লুপ্ত কৃষিশিল্পের পুনরুদ্ধার হতে পারে এই আশা করে ‘চাষীর ফসল’ নামক পুস্তকখানি লেখা হয়েছে।’
১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘চাষীর ফসল’ নামের পুস্তকটি, রচয়িতা শ্রী অমরনাথ রায়। ঐ বইটি ছাড়াও আরো বহু কৃষিগ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন, কৃষকদের কৃষিকার্যে শিক্ষিত করা এবং শিক্ষিত যুবকদের কৃষিকার্যে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্য নিয়ে। পরাধীন দেশে এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর মানুষ খুব বেশী ছিলেন না।
কোন সালে অমরনাথ রায়ের জন্ম হয়েছিল জানা যায়নি। ছাত্রাবস্থায় পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। ডানপিটে, ফুটবল প্রিয় অমরনাথ শ্রী অরবিন্দের ভাই বারীন ঘোষের প্রভাবে অনুশীলন সমিতির সদস্য হয়েছিলেন। ক্রমে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু প্রভৃতি নেতা ও বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। রডা কোম্পানীর অস্ত্র লুঠের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বৃটিশ সরকার তাঁকে লক্ষ্ণৌ কারাগারে বন্দী করে রেখেছিল। কারাগারে থাকাকালীন তিনি কৃষিকাজ বিশেষ করে ফুলচাষের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

কারাজীবন থেকে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় ফিরে এসে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনভাবে কিছু করার কথা ভাবতে শুরু করলেন। এমন কিছু, যাতে দেশের মানুষের জন্যও কিছু করা যায়। দেশে তখন অন্নসমস্যা প্রকট, অনভিজ্ঞ কৃষকেরা আধুনিক কৃষিব্যবস্থা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অমরনাথ আধুনিক কৃষিপদ্ধতি নিয়ে চর্চা শুরু করে দিলেন, যাতে দেশের কৃষিসমস্যার কিছু সমাধান করা যায়। পাশাপাশি শুরু করলেন ফুল এবং বৃক্ষ পালনের স্বাধীন ব্যবসা। উত্তর কলকাতায় রামধন মিত্র লেনের পৈতৃক বাড়ি সংলগ্ন ছোট বাগানটিতে ১৯১৭ সালে স্থাপন করলেন তাঁর নার্সারি। যাত্রা শুরু হলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘গ্লোব নার্সারি’র ।
কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতার গুণে ‘গ্লোব নার্সারি’ নার্সারির জগতে প্রতিষ্ঠা পেল। রামধন মিত্র লেনের ছোট বাগান থেকে উল্টোডাঙায় আরো বড়ো জমিতে নার্সারির কলেবর বৃদ্ধি পেল। এরপর বর্তমান কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে গৌরীপুরে ১২০ একর জমিতে উঠে এলো তাঁর গ্লোব নার্সারি। কিন্তু ১৯৩৯ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বৃটিশ সরকার ঐ জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই অপ্রত্যাশিত বাধায় হতোদ্যম না হয়ে তিনি তাঁর নার্সারি উঠিয়ে নিয়ে গেলেন ইছামতী নদীর তীরে ‘টাকি’তে। সেখানে নতুন করে নব কলেবরে যাত্রা শুরু করল গ্লোব নার্সারি। নিষ্ঠাবান এবং অনুরাগী এক দল কর্মীদের সহযোগিতায় নার্সারির সঙ্গে যুক্ত হলো মাছচাষ, মৌমাছিপালন, ডেয়ারি, পোলট্রি প্রভৃতি।

দেশের সীমানা ডিঙিয়ে গ্লোব নার্সারির খ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল অন্যান্য দেশে। ক্রেতা ছিল ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ড, ইজরায়েল প্রভৃতি দেশেও। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অনেক পুরস্কারও পেয়েছিল গ্লোব নার্সারি। তার মধ্যে ছিল ১৯৫৬ সালে পাওয়া নিউ ইয়র্ক ফ্লাওয়ার শো’তে বিশেষ পুরস্কার।
অমরনাথ নিছক ব্যবসায়িক মনোভাব নিয়ে ব্যবসা করতে চাননি। চাষীদের মধ্যে থেকে তাদের সমস্যা বুঝে সাহায্য করার ব্যাপারে বরাবর সচেষ্ট ছিলেন। ক্ষেতে জলসেচ, বাঙলার মাটিতে গমচাষ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। চাষিদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য তিনি স্কুল করে দিয়েছিলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। আরেকটা ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। তাঁর কর্মচারিদের মধ্যে যেন কোন সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ না থাকে। গ্লোব নার্সারির সোনালি দিনগুলোতে প্রায় তিন হাজার লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
দরদী, দেশপ্রেমী, কর্মযোগী অমরনাথ রায় বাঙালীর মনের খাতা থেকে মুছে গেছেন। বাঙালী চরিতাভিধান গ্রন্থেও তাঁর স্থান হয় নি। বাঙলার এক সন্তানের শিল্পোদ্যোগ ও সহৃদয় সমাজমনস্কতার কাহিনী বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা রয়ে গেছে।
তথ্যঋণ : Heritage Retailers of Calcutta : Ashish J Sanyal, গ্লোব নার্সারি ওয়েবসাইট