“আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি, পুজোর সময় এলো কাছে…” ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে কাঁসর ঘন্টার মিলিত ধ্বনি জানান দেয় মায়ের আগমণ। বিষন্ন শরতে নিয়নের সন্ধ্যায় ঢাকের বোলে “কোমর দোলে খুশীতে নাচে মন”। শারদ নৈবেদ্যে ঢাকের পাগলা বিট ছাড়া উৎসবের আমেজে রঙ ধরে না আজো এ প্রজন্মের কাছে। ঢাকি তার কাঁধে ঢাক ঝুলিয়ে বাজাতে বাজাতে নৃত্য করে আর তার পাগলা ছন্দটিতে মাটির টান অনুভব করে শ্রোতারা।
পুজোয় দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা থেকে আরম্ভ করে দশমীর দিনে ঘট বিসর্জন পর্যন্ত- প্রতিটি ক্ষণে ঢাকের বোল হয় আলাদা। ঢাকের আসল কেরামতি বিসর্জনের দিন। ঘট বিসর্জনের বাজনা হলো ‘তিন কাঠি’। প্রতিমা চলে বিসর্জনের ঘাটের দিকে আর সামনের দিকে সব ঢাকিরা একসাথে বাজিয়ে চলে তুমুল লয় আর তালের বাদ্যি।

ঢাকের ইতিহাস প্রায় ৩ হাজার বছর পুরনো। তবে এই ঢাকের ধ্বনি কখন যে শারদ নৈবেদ্যে প্রবেশ করলো তার ইতিহাস পরস্পরবিরোধী। শোনা যায় কলকাতায় প্রথম কাশিম বাজারের রাজা হরিনাথের দূর্গা পূজায় বেজেছিলো ঢাক। ১৬১০ সালে কলকাতার বরিশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার দূর্গা পূজার আয়োজন করে। পলাশী যুদ্ধে জয়লাভের জন্য শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দূর্গা পূজার মধ্যে দিয়ে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। পুজোতে ঢাক বাজিয়েছিলো নদীয়ার ঢাকিরা।
সংস্কৃত শব্দ ঢক্কা থেকে ঢাক শব্দটির উৎপত্তি। একদা যুদ্ধের সময় সৈন্যদের মধ্যে অদম্য সাহস সঞ্চার করতে ঢাক বাজানো হতো। মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের যুদ্ধারম্ভে মহারথীগণের শঙ্খধ্বনির সঙ্গে বেজেছিল প্রবল ডঙ্কা ধ্বনি। বাংলার প্রাচীন ঢাক হলো জয় ঢাক। এছাড়া বাওতিঢাক, বৌঢাক, বীরঢাক, মেঠোঢাক বাজে বঙ্গের বুকে। প্রতিটি ঢাকের বাদ্যি কিন্ত ভিন্ন ভিন্ন।
সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লাল সেনের আমলে দূর্গাপুজাতে রাঢ় বাংলায় ঢাকের বাদ্যি বেজেছিল। গড় জঙ্গলের গোপন ডেরায় থাকার সময় শত্রু বিনাশের উদ্দেশ্যে তিনি শক্তি পুজা করেন। দেবী আরাধনার জন্য জয়ঢাক বেজেছিল। বাঙলার অতীতের কণ্টক দ্বীপ আজকের কাটোয়াতে জয়ঢাক নির্মাণের সুবিখ্যাত শিল্পীরা থাকেন। শোনা যায় কলকাতার ঢাকুরিয়া কিম্বা কসবা তে ঢাক তৈরির প্রধান কেন্দ্র ছিল।

ঢাক বানাতে সময় লেগে যায় প্রায় মাস দুয়েক। আমগাছের মতো মোটা গুঁড়ি চেঁছে কেটে প্রথমে তৈরি করা হয় খোল। কাঠে ঘুন যাতে না ধরে তার জন্য খোলকে ঘষে ঘষে মসৃণ করে মাখানো হতো তেল, চোনা, লঙ্কা, মরিচ ইত্যাদি। এরপর বাঁশের ছিলা কেটে পাকিয়ে, বাঁকিয়ে বানানো হয় চাক। চাক হলো ঢাকের ফ্রেম বা রিং যাতে চামড়া লাগানো হয়। ছাগলের চামড়া কেটে শুকিয়ে নেওয়া হয়। একে বলে তালা। এই তালা গোল করে কেটে দড়ি লাগিয়ে চাকের সঙ্গে টান টান করে বেঁধে দেওয়া হয় রোদে। এরপর শুকিয়ে যাওয়া তালা বাঁধা চাক ঢাকের খোলে লাগানো হয়। একে বলে ঢাক ছাওয়া। ঘরেতে ঢাক ছাওয়ার স্থানে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মা লক্ষ্মীর পা আঁকা হয়।

এই ঢাকের আওয়াজের জন্য কাঠগড়ায় পর্যন্ত উঠতে হয়েছিল জানবাজারের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রানী রাসমণিকে। সেবার এক সপ্তমীর ভোরে জানবাজারের রানি রাসমণি বাড়ির কলাবৌ গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। বাজনদারেরা হাত খুলে বাজাচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। রানির থেকে ভালই বায়না পেয়েছে তারা। কোথাও কোনও খামতি থাকার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। জানবাজার থেকে গঙ্গার ঘাট অবধি রাস্তায় শোভাযাত্রা। শুরু হয়েছিল তিথি মেনেই। এদিকে এলাকায় বসবাসকারী এক সাহেবের তখনও বিছানা ছাড়ার সময় হয়নি। তিনি অসময়ের এই অহেতুক কোলাহলের কারণ বুঝতে পারলেন না। কাঁচা ঘুম ভেঙে লালমুখো সাহেবের মুখ আরও লাল হয়ে উঠল। সাহেব তৎক্ষণাৎ পেয়াদা পাঠালেন এই হই-হট্টগোল আর কান-ঝালাপালা করা আওয়াজ বন্ধ করার জন্য। উলটে তারা সাহেবের পেয়াদার সামনেই আরও জোরে জোরে বাজাতে লাগল। পেয়াদা এসব গিয়ে সাহেবকে জানাল। সাহেব রাগে অপমানে তখনই ঠিক করলেন মামলা করবেন রানির নামে। খবর যেমন সাহেবের কাছে গেল, তেমন গেল রানির কাছেও। প্রীতিরাম দাসের পুত্রবধূ শূদ্রাণী ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরাক্রম অতুলনীয়। তিনি সব শুনে বললেন, “করতে দাও মামলা। তারপর দেখছি।” যথাসময়ে মামলা আদালতে উঠল। ইংরেজের আমলে, ইংরেজ সাহেবের আনা মামলা এক নেটিভ নারীর বিরুদ্ধে। ফলে যা হওয়ার তাই হল। মামলায় হেরে রানিকে জরিমানা গুনতে হয়েছিল ৫০ টাকা। তখনকার দিন যার মূল্য মোটেও কম ছিল না। কিন্তু বাজনা-বাদ্যি-সহ নিষ্ঠাভরে দুর্গাপুজো হবে না। সাহেবের ভয়ে সেদিন বাজনা থামাননি রানিমা। এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব।

সেই কোন আমল থেকে গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে ঢাক। শুধু দূর্গা পূজাতেই নয়, প্রাচীনকালে বলিদানের অনুষ্ঠানে, সতিদাহের সময় নারীর কান্না দুঃখ শোকের আর্তনাদ ঢাকতে উচ্চস্বরে বাজানো হতো ঢাক। শিকারের সময় জীবজন্তু তাড়াতে, ঘোষণা আর সতর্কবাণীর জন্য বাজানো হতো ঢাক। জমিদারি প্রথা উঠে গেলে বাউড়ি, বাগদি, ভল্লা, রুইদাসের বাহুবলী মানুষগুলি বেঁচে থাকার তাগিদে চলে আসেন অন্য পেশায়। বর্তমানে পুরুষ ঢাকিদের পাশাপাশি সমান তালে ঢাকের বোল তোলেন মহিলা ঢাকিরাও। এদের চাহিদা তুলনায় বেশি। রাজনীতির ময়দানে ঢাকের ‘চড়াম চড়াম’ ধ্বনির গুরুত্ব লক্ষ্যনীয়। রুপোলি পর্দায় এদের গরিমা অক্ষুণ্ন আছে। ঢাকের ধ্বনি আমাদের হাসি কান্নার অনুভূতিগুলিকে জাগিয়ে তোলে। তাই আজো ঢাকের কাঠিতেই পুজোর পদ শব্দ শোনা যায়।
তথ্য ঋণ : সম্পর্কিত বই, সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েব সাইট।
প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই খুবই সুন্দর লেখা উপহার দেওয়ার জন্য। মনোরঞ্জন হোলো বেশ। অনেক নুতন নুতন তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেলো যা আগে জানতাম না।
ঢাকের তালে তালে ছোটো বেলাতে অনেক নেছেছি, পুজোর সময় ছেঁড়াফাটা তালিমারা জামাকাপড় পড়ে।
লজ্জার কোনো বালাই ছিলো না।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ????
শারদ শুভেচ্ছা জানাই ❤️
তথ্য সমৃদ্ধ চমৎকার লেখা। খুব ভালো লাগল।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ????