‘শ্রীরাম দিলেন হনুমান জগতে
হনুমান দিয়ে গেলেন টুপি মাথে মাথে।
আমাদের লাইফ-এ হনুমানের পজিটিভ কন্ট্রিবিউসান কী?
কেন? শ্রীরামচন্দ্র। রামজীর জন্যই হনুমানজী ফেমাস।
নো। ওই অবদানটা না থাকলে উত্তর ভারতের প্রবল শীতে কী হতো? তলার দিকে যা হয় হোক, মাথাটা ঢুকিয়ে দাও হনুমানের কোলে।’….সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।

অবশেষে ডিসেম্বরের শেষে মিললো কনকনে ঠান্ডার পরশ। উত্তরে হাওয়ার ভেল্কিতে একধাক্কায় বঙ্গে তাপমাত্রার পারদ নামলো এক অঙ্কের ঘরে। শীতকাতুরে বাঙালির সঙ্গী হয়ে উঠলো ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা সোয়েটার, পায়ে মোজা আর মাথায় হনুমান টুপি। হনুমান টুপি বা মাঙ্কি ক্যাপ শুনে যতই কেতাদুরস্ত মানুষজন হাসুক না কেন, বাঙালি বোঝে এর মাহাত্ম্য। যদিও হনুমান টুপির প্র-প্রপিতামহের নাম ছিলো ব্যালাক্লাভা।
১৮৫৪ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ থেকে ব্যালাক্লাভা নামটি উঠে আসে। ছবি দেখলে বোঝা যাবে ব্যালাক্লাভা আসলে বাংলার আদি-অকৃত্রিম হনুমান টুপি। পতনোন্মুখ তুরস্ক সাম্রাজ্যকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাশিয়া এবং তুরস্কের মধ্যে তিন বছর ধরে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তুরস্ককে সাহায্যের জন্য ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এগিয়ে আসে। ত্রি-মিত্রশক্তি আলমা নদী, বালাক্লাভা এবং ইনকারমান এই তিনটি যুদ্ধে জয়লাভ করে। এর মধ্যে বালাক্লাভার যুদ্ধ হয় ভয়ংকর।

কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে ইউক্রেনীয় উপদ্বীপের প্রবল শীতের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য হস্তনির্মিত বালাক্লাভাগুলি ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। ব্রিটিশ সৈন্যদের এই সাহায্যের প্রয়োজন ছিল, কারণ তাদের নিজস্ব সরবরাহ (উষ্ণ পোশাক, আবহাওয়ারোধী কোর্ট এবং খাবার) সময়মতো পৌঁছাতো না। তাপমাত্রা যখন শূন্যে পৌঁছে যেতো, আধপেটা খেয়ে সৈন্যদের নজরদারি রাখতে হতো শত্রু সেনাদের ওপর। সেইসময় তাদের কাছে মাঙ্কি ক্যাপ হয়ে ওঠে এক অত্যাবশ্যক চাহিদা। কেননা মাথা-কান-নাক-গলা সবটাই কভার হয় এই টুপিতে।
রিচার্ড রাট তার হিস্ট্রি অফ হ্যান্ডনিটিং এর মতে, ‘বালাক্লাভা হেলমেট’ নামটি যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়নি তবে ১৮৮১ সালের অনেক পরে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

অবশ্যি, ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে টুপির মতো দেখতে হাতে বোনা ক্যাপ পোলিশ এবং প্রুশিয়ার সেনাদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই ক্যাপ বা অশ্বারোহী হেলমেটটি পোলিশ ক্যাপের একটি ঐতিহ্যবাহী নকশা থেকে উদ্ভূত। একে বলা হতো উহলান ক্যাপ।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আরো একটি জিনিস প্রত্যক্ষ হয়, নার্সিং ব্যবস্থা। এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ সৈন্যদের তুলনায় রোগে ভুগেই অধিক সৈন্যদের প্রাণনাশ ঘটে। অপ্রতুল চিকিৎসা সেবা ও সৈন্যদের দুরাবস্থার মধ্যেই সেবা করতে এগিয়ে আসেন ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেল। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে নার্সিং ব্যবস্থার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বঙ্গে হনুমান টুপির প্রচলন হলো কী করে, এ বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হয় ক্যালকাটা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী ছিলো। ব্রিটিশরা অনেক বছর এদেশে রাজত্ব চালিয়েছিল, তাদের অনুকরণেই হয়তো এর ব্যবহার। তাছাড়া, বিভিন্ন সাহিত্যিকরা শীতকাতুরে বাঙালিকে দেখিয়েছেন গায়ে শাল এবং মাঙ্কি টুপি পরে।

আর একটি কারণ হলো রঙ। এখন নানারঙের টুপি পাওয়া গেলেও মূলত এগুলি ছিলো বাদামি রঙের বিভিন্ন শেডে। নাক-মুখ ঢাকা এই হনুমান টুপি পরলেই নাকি পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়!
সিনেমা জগতেও এহেন টুপি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যেমন ধরুন, সত্যজিৎ রায়ের ছোট্ট মুকুল যেমন হনুমান টুপি পরেছে আবার ‘হনুমান ডট কম’ সিনেমায় প্রসেনজিৎও ওই টুপি পরেছে। ‘হনুমান ডট কম’-এর পরিচালক গৌরব পাণ্ডের কথায়, “পোশাক মানুষের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের চিহ্ন। মাঙ্কি টুপি সেই বাঙালির প্রতীক, অর্থনৈতিক উদারীকরণের জোয়ার যাকে ছুঁতে পারেনি, যার ইতিহাসে ভাঙন ধরেনি। যে বাঙালি শপিং মলে ব্র্যান্ডেড স্কাল ক্যাপ কিনে পরেন, তাঁর সঙ্গে এই বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানে ফারাক রয়েছে।” মাস্কের ব্যবহার পূর্বে মাঙ্কি ক্যাপ পরে কত যে চুরি-ছিনতাই সিন ক্যামেরা বন্দি হয়েছে, তার ইয়াত্তা নেই।

হিমেল হওয়ায় কুয়াশার চাদরে মোড়া শহর যখন আইসল্যান্ডের থেকে কম নয়, তখন স্বাস্থ্য সচেতন বাঙালির মর্নিং ওয়াকে বেরোতে হনুমান টুপি মাস্ট। যতই ফ্যাশনেবল ব্র্যান্ডের স্কাল ক্যাপ মার্কেটে থাকুক না কেন ভোরের ঠান্ডায় মোটর সাইকেল বা সাইকেল চালানোর জন্য অপরিহার্য মাঙ্কি ক্যাপ ইত্যাদি।
ছোটবেলায় হনুমান টুপি পড়েননি এমন মানুষ আজো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শীতে মায়ের ভালোবাসা আর ভরসার আরেক নাম হনুমান টুপি। তাই বৃদ্ধ থেকে বাচ্ছা, সকল প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকুক হনুমান টুপি বাঙালিয়ানার অঙ্গ, নস্ট্যালজিক হিসেবে।
Bhalo bhalo
Outstanding lekha…apnar lekha theke onek ojana jinis amra jante pari…thanks a lot Rinki
Fantastic.