রানিগঞ্জের এগারা পঞ্চায়েতের নারায়ণকুড়ি গ্রামে মথুরাচণ্ডী ঘাট লাগোয়া দামোদর নদের পাড়ের কয়লাখনিতে প্রায় দুশ বছর আগে ঠাকুর পরিবারের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভিত তৈরি করা দ্বারকানাথ ঠাকুর মাঝেমধ্যে এসে খনির তদারকি করতেন। ভূগর্ভস্থখনি থেকে কয়লা টেনে তোলার জন্য হলেজঘর, খনিকর্মীদের খনিতে ওঠানামার খনিমুখ, দ্বারকানাথের বসবাসের বাংলো, সংস্থার কাজকর্ম পরিচালনার প্রশাসনিক ভবন, নৌকার মাধ্যমে কয়লা পরিবহণের জন্য নির্মিত জেটির ধ্বংসাবশেষ আজও দ্বারকানাথ ঠাকুরের শিল্প উদ্যমের স্মৃতি ধরে রেখেছে।

উপনিবেশের প্রথম সময়ের বাঙালি উদ্যোগী মেছুয়ার জমিদার দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিটিশ শিল্পপতি তথা ইংরেজ বন্ধু উইলিয়াম কার-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যে কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন তার নাম দিয়েছিলেন কার এন্ড টেগোর কোম্পানি। এই কোম্পানির পরিকল্পনায় ১৮৩৫-এ দামোদর নদের তীরে উল্লিখিত নারায়নকুড়ি গ্রামে একটি কয়লাখনি বানানো হয়। গবেষক ব্লেয়ার বি ক্লিং, দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী পার্টনার ইন এম্পায়ার, দ্য এজ অব এন্টারপ্রাইজ ইন ইস্টার্ন ইন্ডিয়া বইতে খনি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলছেন দ্বারকানাথ এবং তাঁর অংশীদার উইলিয়াম কার ভারতে প্রথম ইওরোপিয় পদ্ধতিতে কয়লা তোলার প্রযুক্তি ব্যবহার করলেন। কুয়ো বানিয়ে দেওয়াল কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাটির গভীর থেকে কয়লা খুঁড়ে বের করার পরিকল্পনা করা হয়। ভূগর্ভের কয়লা তোলার জন্যে খনি থেকে দূরে একটি ঘরে বিশাল কপিকল মতো যন্ত্র বসানো হয়। যন্ত্রের সঙ্গে প্যাঁচানো মোটা লোহার তারের উলটো প্রান্তে সার বেধে জোড়া থাকত একাধিক ডুলি। এতেই কয়লা চাপিয়ে, লোহার তার গুটিয়ে কয়লা উপরে তোলা হত। যে প্রযুক্তিতে ইঁদারা থেকে আজও জল তোলা হয় সেই প্রযুক্তি সেখানে ব্যবহার করলেন দ্বারকানাথ। ভূগর্ভে শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া ও ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্যও একই ডুলি ব্যবহার করা হত। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া ‘হলেজ’ পদ্ধতি। যে ঘরে যন্ত্র বসানো ছিল, সে ঘরের নাম দেওয়া হয় ‘হলেজ ঘর’। পুরো কাজটি বাষ্পীয় যন্ত্রে চলত। এখনও দেশের সমস্ত ভূগর্ভস্থ কয়লাখনিতে দ্বারকানাথের অনুসৃত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হয় – তবে এখন সব কাজ বিদ্যুৎ শক্তিতে সম্পন্ন হয়।

প্রায় ২০০ বছর আগে ভারতবর্ষের শিল্প বিপ্লবের পুরোধাপুরুষ দ্বারকানাথ ঠাকুর সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রানীগঞ্জের কাছে নারায়নকুড়িতে প্রথম গড়ে তুললেন ভারতের প্রথম আধুনিক, ব্রিটিশ পদ্ধতির কয়লাখনি। পরবর্তী কালে দ্বারকানাথ নিজের ব্যবসা নিজে থেকেই উচ্ছন্ন দেওয়ায় এবং তার উত্তরাধিকারীদের ব্যবসা বিষয়ে উৎসাহ না থাকায় কয়লা খনির অগ্রগতি থেমে গিয়েছিল।এই খনিটি বহুকাল বন্ধ হয়েই পড়েছিল। ১৯৪৭এ বঙ্গ-পাঞ্জাব ভাগের পর রাষ্ট্রায়ত্ব ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটে কার-ঠাকুর কোম্পানির ছেড়ে যাওয়া সম্পত্তির মালিক হয়। শুরু হয় নুতন করে কয়লা উত্তোলন। কিন্তু তারা সেই সব প্রাচীন কাঠামোর সংরক্ষণ নিয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহী ছিল না। অযত্নে অবহেলায় পড়ে ছিল দ্বারকানাথ সম্রাজ্যের সেই সব স্মারক, অফিস, বাড়ী, নদী তীরে মাল পরিবহনের জেটি, মেশিন ঘর, হলেজ রুম প্রভৃতি। দ্বারকানাথ ঠাকুর কয়লা খনি এলাকায় যে বাংলো বানিয়েছিলেন, সেখানে তিনি প্রধান অংশীদার উইলিয়াম কারের সঙ্গে কোম্পানির কাজে রাতও কাটিয়েছেন, সেটাও একরকম ধংসস্তুপ হয়েই ছিল।
স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রভাবিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন ২০১৮-র ২৪ মার্চ বিজ্ঞপ্তি জারি করে এলাকাটিকে হেরিটেজ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। হেরিটেজ ঘোষিত হওয়ার পরে প্রস্তাবিত হেরিটেজ কমিটি ও মথুরাচণ্ডী মন্দির কমিটি যৌথ ভাবে বৈঠক করে একগুচ্ছ প্রস্তাব নেয়। গড়ে ওঠে এক শিশু উদ্যান। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত নারায়ণকুড়ির সৌন্দর্যায়নের কাজে হাত দেয় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আসানসোল এন্ড দুর্গাপুর ডেভেলাপমেন্ট অথরিটি বা এডিডিএ। এই অঞ্চলের জন্যে বরাদ্দ করে এক কোটি ৪৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এই অর্থে রানিগঞ্জের এগারা পঞ্চায়েতের নারায়ণকুড়ির সার্বিক উন্নয়ন ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ প্রকল্পের সূচনা করেন এডিডিএ-র চেয়ারম্যান তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়।

তবে বাকি ঐতিহ্য সেই খনিমুখ যেখান থেকে দেশের প্রথম কয়লা উত্তলন হয়েছিল, সেই হলেজ রুম, মাটির নিচে খনিগহ্বরে বিশুদ্ধ হাওয়া পাঠানোর সরঞ্জাম, বাংলোর ভগ্ন দেওয়াল পড়ে থাকল পুরোনো সময়ের সাক্ষী হয়ে। স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের এলাকা উন্নয়নের চেষ্টা থাকলেও এইসব অমুল্য স্মারক সংরক্ষনের কোন ব্যবস্থাই নেয়নি ইসিএল, উপরন্তু চলেছে অনিয়ন্ত্রিত কয়লা তোলা।
যে অঞ্চলটা হয়ে উঠতে পারত বাংলা তথা ভারতের শিল্প বিপ্লবের আইকন ও আন্তর্জাতিক শিল্প ঐতিহ্যের পীঠস্থান, ইসিএলের ঔদাসীন্যে একেবারে ধ্বংস্তুপের আকার নিয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎই গত একমাস ধরে ইসিএল এরতরফে ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ঢেকে থাকা বাংলার ইন্ডাসট্রিয়াল হেরিটেজের পীঠস্থান নারায়নকুড়ি পরিস্কারের তৎপরতা শুরু হয়। তাদের এই উদ্যোগে ছিল না কোনও ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ, ছিল না কোনও গবেষকের চিন্তাভাবনা। বেলচা, কোদাল, সাবল নিয়ে স্থানীয়শ্রমিকদের সাহায্যে তড়িঘড়ি সাফাই অভিযান করা হয়। রং করা হয় হলেজ রুম-সহ অন্য কিছু অংশে। দেওয়া হয় রেলিং।

রাজ্য সরকারের উদ্যোগে সংরক্ষনের একটা বাতাবরণ তৈরী করা হলে ইসিএল-এর অধিকর্তা বি ভিরা রেডডী ৩১ জানুয়ারী সভা করে সংরক্ষণ শুরুর ভাবনা জানান। তিনি জানালেন নারায়ণকুড়িতে সরকার আর কোনও দায় নেবে না, এবার নারায়নকুরির কয়লা উত্তোলনের ভার তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি হাতে। সেই কোম্পানি হাইওয়াল মাইনিং পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ করবে। ইসিএলের এই নুতন ব্যবস্থায় স্থানীয় মানুষজন যারা আজ দীর্ঘদিন এই ঐতিহাসিক স্মারকগুলিকে পরম মমতায় নিজেদের মতন করে বাঁচানোর চেষ্টা করে গিয়েছেন তাদের মনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। স্থানীয়রা আশংকা প্রকাশ করেন আধুনিক প্রযুক্তির মোড়কে তবে কি আমরা হারিয়ে ফেলতে চলেছি বাংলার নবজাগরণের স্মারক নারায়নকুড়ির প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো শিল্পায়নের কাঠামো? অথচ ঐতিহাসিক কিন্তু স্বল্প আলোচিত এলাকা বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এক নুতন সংযোজন হতে পারে।
ইসিএলের নায়ারণকুড়ি খনি বেসরকারিকরণে এলাকার মানুষেরা দ্বারকানাথ ঠাকুরের তৈরি করা শিল্প কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন। ইসিএলের অতিসক্রিয়তার অভিযোগ পেয়ে হেরিটেজ কাঠামো বাঁচাতে পশ্চিমবঙ্গের হেরিটেজ কমিশনের বৈঠকে বিষয়টা নিয়ে ওঠে। হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারপার্সন শুভাপ্রসন্ন জানান এই বিষয়টি অতিগুরুত্বসহকারে হেরিটেজ কমিশনে আলোচিত হয়েছে। তিনি জানান বৈঠকে ঠিক হয়েছে অকুস্থলে হেরিটেজ কমিশন একটি তদন্ত দল পাঠাবে। সেই প্রতিনিধি দল দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাঠামোগুলো যতটা সুরক্ষিত করা যায়, যতটা বাঁচানো যায়, সে সব বিষয় দেখবে। এছাড়াও আগামী দিনের খনন কার্যে যাতে অমূল্য এই স্থাপত্যের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সেটাও এই দলের দেখার বিষয় হবে।