দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের মুখে। জার্মানির বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রণনৈতিক কেন্দ্রে আমেরিকিয় সেনা আমলারা তখনও মোতায়েন। হঠাতই খবর হল হেসে রাজপরিবারের কেল্লা থেকে আমেরিকায় সেনা আমলারা গয়না লুঠ করেছেন। সংবাদ পাওয়া মাত্রেই কোর্টমার্শাল আয়োজন করা হল। অভিযোগ প্রমান হওয়ায় অভিযুক্তদের কারাবাসের নির্দেশ দেওয়া হল। লুঠ হওয়া গয়নার অধিকাংশ পাওয়া গেল না; ১৯৪৫-এ ২.৫ মিলিয়ন পাউণ্ডের [আজকের ৩৫ মিলিয়ন] গয়নার মধ্যে মিলল অর্ধেকেরও কম। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বছর ধরে সেনা বাহিনীর সদস্যরা দেশ আক্রমনের পর সম্পদ লুঠের ধনেই পকেট ভরেছে। সেই ধারাবাহিকতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বন্ধ হয় নি।

বছরটা ১৯৪৪। যুদ্ধের পরিণাম জার্মানির অধিকাংশ মানুষ আন্দাজ করতে পারছেন, কেউ কেউ ফুয়রারের আস্তিনে লুকানো মিরাকল তাস খেলার দিকে তাকিয়ে তখনও আশায় বুক বাঁধছেন; তবে অধিকাংশ জনগণ আর্য জার্মান বিজয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। হেসে পরিবারের যুবরাজ এবং রাণী উলফগ্যাং ফ্রাঙ্কফুর্টের উত্তরের ক্রনবার্গের পারিবারিক কেল্লা ছেড়ে ভাগার আগে পারিবারের সমস্ত গয়নাগাটি ৫০০ ক্যারাটের খুচরী হিরে, ১১৬ ক্যারাটের নীলকান্তমণি, মুকুট, টায়ারা, নানান ধরণের নাকছবি, লকেট, চুড়ি এবং আরও অনেক কিছু সীসা আর কাঠের তৈরি সিন্দুকে ভরে সেলারের মধ্যে একটা গোপন কুঠুরি করে তার ভেতরে রেখে যান; রত্নচোরেদের চোখ এড়াতে সেলারে গর্তের সামনে একটা নকল দেওয়ালও তুলে যান।

১৯৪৫-এর এপ্রিলে আমেরিকিয় সেনা বাহিনী কেল্লাটি দখল নিয়ে বাহিনীর কর্তাদের জন্যে কেল্লাকে একটা ক্লাবে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা করে। কেল্লার হেসে পরিবারের মাঠে ১৪টা কুঠি বানাবার দায়িত্ব দেওয়া হয় সেনার উচ্চপদস্থ আমলা হার্টলিকে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে বিসদৃশভাবে উচ্ছেদ করে মাঠের মধ্যে কয়েকটি অস্থায়ী ঘর তৈরি করে বাস করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল কেল্লার নাম হল ক্রুনবার্গ ক্যাসেল কান্ট্রি ক্লাব। হার্টিলেকে দায়িত্ব দেওয়া হল দুর্মূল্যের সময়ে ক্লাবের সদস্যদের জন্যে প্রয়োজনীয় অমিল নানান রসদ জোগাড় করার। এই কাজটা হার্টলে সঁপলেন ক্যাপ্টেন ক্যাথলিন ক্যাটে ন্যাশকে।
ত্রিশোর্ধ ক্যাথলিন জানেন কীভাবে সেনা ক্লাব চালাতে হয়ে। তিনি ক্লাব চালাতে শুরু করেন দৃপ্ত ভঙ্গীতে কেল্লার ২৫টা ঘর দখল করে। মাঝেমধ্যেই কেল্লার বাসিন্দারা পুলিশে জানাচ্ছিলেন, তাদের নানান ছুটকো ছাটকা জিনস খোয়া যাওয়ার এবং ন্যাশ পুলিশ দিয়ে সে সব অভিযোগের তদন্ত করাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে ক্যাথলিনের সঙ্গে ক্লাব ব্যবস্থাপনায় যোগ দিলেন ৩৮ বছরের বিমান বাহিনীর কর্নেল জ্যাক ডুরান্ট। তারা বিয়েও করেন। ডুরান্টের সঙ্গে মিলে ক্যাটে নামবেন এই অসামান্য লুঠ খেলায়, যে খেলার রাশ আর তাদের হাতে থাকবে না।

একদিন বেসমেন্টে কাজ করতে করতে সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ চোখে নকলি দেওয়ালটির অস্তিত্ব আবিষ্কার করে পরিবারের সদস্যদের দিয়ে দেওয়াল ভাঙিয়ে রত্নসম্ভার হাত করলেন। তিনজনের মধ্যে হেসে পরিবারের রত্নপেটিকার রত্ন ভাগ করে নেওয়ার বিস্তৃত পরিকল্পনা ছকা হল। কিন্তু লুঠের সুরক্ষার জন্যে কেল্লা খালি করা জরুরি। তারা খোঁজ করতে শুরু করেন তাড়াতাড়ি কে তাদের এই ধরণের আমেরিকিয় আইনের শলা দিতে পারেন। দায়িত্ব পালনে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন চতুর্থ ব্যক্তি লেফটেনান্ট কর্নেল জেমস বয়েড। তাকে ৮ নভেম্বর গোপনে উড়িয়ে আনা হল তাড়াতাড়ি কেল্লা ছেড়ে দেওয়ার উপায় খুঁজে বার করার শলার জন্যে। রাতের বৈঠকে বয়েডকে সব খুলে বলে লুঠের বখরাদার করা হল। বয়েড জানাল যুদ্ধের পরে সেনারা দামি রত্নরাজি যে লুঠ করবে এটা দস্তুর; এই ধরণের অভিযোগে কর্তারা খুব একটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু চারমূর্তি জানতো লুঠের মালপত্র নিয়ে আইনত জার্মান ছাড়া অসম্ভব। তারা প্রথমে সোনা থেকে দামি রত্নগুলো আলাদা করল যাতে সেগুলো ব্রিটেন আর সুইজারল্যান্ডের ছোট ছোট দোকানে বেচে দেওয়া যায়। পরের দু-মাসে চার জন ৩০ বাক্স গয়না ক্রমশ চোরাইপথে আমেরিকায় নিয়ে যেতে শুরু করে। গয়নাগুলো তারা আয়ারল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, বার্ন, বাসিল আর জুরিখে আলাদা আলাদা করে ছোট ছোট দোকানে বিক্রি করতে থাকে নগদ অর্থের বিনিময়ে। তাদের এত দিনের সাধাসিধেভাবে জীবনধারণের সঙ্গে বর্তমান জীবনের অসামঞ্জস্য অনেকেরই চোখে লেগেছিল, কিন্তু চারজন খুব একটা বোঝে নি। তারা মনে করছিল, তাদের লুঠ আর ধরা পড়বে না।

কিন্তু যে দিন তারা হেসে পরিবারের সদস্যকে ডাকিয়ে ঝুটো দেওয়াল ভেঙ্গেছিল, সে দিনই পরিবারে লুঠের খবর প্রকাশ্যে আসে, অন্তত পরিবারের লোকেদের কাছে সেটা আর গোপন ছিল না। ১০ নভেম্বর পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যাশকে লুঠের তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হলে, ন্যাশ জবাব দেন তারা কেল্লায় ফিরে এলে ঠিক জিনিস ঠিক জায়গায় পেয়ে যাবেন।

১৯৪৬-এ গ্রিসের রাজকন্যা সোফি হ্যানোভারের জর্জ উইলহেলমের বিয়েতে সেই সব রাজকীয় গয়না, বিশেষ করে রাজকন্যার মুকুট পরার সময় এল। দেখা গেল আমেরিকিয় সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে লুঠের অভিযোগ করা হয়েছিল, সেটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তদন্ত শুরু হলে বোঝা গেল অর্ধেকের বেশি রত্ন উদ্ধার করা যাবে না। ডুরান্ট কিছু গয়না আর অর্থ বাড়ির কাছে চার্চের হাতায় মাটির মধ্যে ফলের পাত্রে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সে সব উদ্ধার হল। কোর্টমার্শালে প্রত্যেক অভিযুক্তের কারাদণ্ড হল।
তবে অর্ধেকের বেশি রত্ন উদ্ধার করা গেল না। আজও সেগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।