১৯৭৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর একটি চলচিত্র কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়। তারপর ১৯৮০ সালের ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় শিলান্যাস। প্রথমে ভাবা হয়েছিল খরচ হবে এক কোটি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার কাছাকাছি। শেষে খরচ গিয়ে দাঁড়ায় দু-কোটি দশ লক্ষ টাকার ওপরে। এটি গড়ে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পিডব্লুডি বিভাগের তত্ত্বাবধানে। এর আয়তন বিশ হাজার বর্গফুট। ১৯৮৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর সত্যজিৎ রায় পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন ও ভবনটির নাম রাখেন ‘নন্দন’। সত্যজিৎ রায় ছিলেন শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ছাত্র। রবীন্দ্রনাথ কলাভবনের বাড়িটির নামও ‘নন্দন’ রেখেছিলেন। তাই সত্যজিতের নাম-করণে চমকলাগানো মৌলিকতার বদলে যেন সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল শান্তিনিকেতনের স্মৃতিমেদুরতা এবং রবীন্দ্রপ্রণাম।
অতীত খুঁজলে জানা যায়, রবীন্দ্রসদনের পূর্বদিকে থাকা বিশাল পুকুর বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল এই আর্ট ফিল্ম সেন্টার তথা নন্দন। এটি তৈরি করতে লেগেছিল পাঁচ বছর। যিনি এটি বানিয়েছিলেন তাঁর নাম অমিতাভ সেনগুপ্ত। তৎকালীন সময়ে স্থপতি হিসেবে অমিতাভবাবুর খ্যাতি ছিল ভারতজোড়া। নন্দন জিজাইনের পেছনে আছে সারা দেশে দুশোর বেশি পেক্ষাগৃহ তৈরির অভিজ্ঞতা — একথা জানিয়েছিলেন অমিতাভ সেনগুপ্ত স্বয়ং। কলকাতার কাছাকাছি আরও যে তিনটি সিনেমাগৃহ তিনি তৈরি করেছিলেন, সেগুলি হলো চেতনা, চন্দন ও বৈশালী। যদিও তিনটিই আজ শহর কলকাতা থেকে অবলুপ্ত।

প্রতিটি মৌলিক স্থাপত্যের পিছনে বীজমন্ত্রের মতো থাকে একটি কেন্দ্রীয় ভাবনার প্রেরণা। নন্দন-এর বিন্যাস ও শৈলীর পিছনে মূল স্থাপত্য ভাবনাটি কী? অমিতাভবাবু জানিয়েছিলেন, “জল, জলই আমাকে, আমার ডিজাইনকে প্রেরণা দিয়েছে।” জল? পাঠকের মনে নিশ্চই প্রশ্ন জাগছে এই ইঁট, কাঠ পাথরের সঙ্গে জলের সম্পর্ক কোথায়? তার উত্তরও দিয়েছেন অমিতাভবাবু। তাঁর কথায় নিচু থেকে দেখলে কিছু বোঝা যায় না। যদি হেলিকাপ্টারে করে বাড়িটির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া যায়, দেখা যাবে বাড়িটাকে মনে হচ্ছে একটা বিশাল মাছের মতো, জলের মধ্যে এঁকেবেঁকে সাঁতার কাটছে। ফিল্মকে যেমন মুভমেন্ট ছাড়া, গতি ছাড়া ভাবা যায় না, জলকেও তাই। নন্দন-এর ডিজাইনে সেন্ট্রাল আইডিয়াটা হলো, দ্য আইডিয়া অফ মুভমেন্ট।
নন্দনের সিঁড়ির আইডায়াটাও ভীষণ পাওয়ারফুল। সমস্ত বাড়িটাকে যেন সিঁড়িটাই ধরে রেখেছে। অমিতাভ সেনগুপ্তের মতে এটি হলো ‘পিয়ানো কি’ স্টেয়ারকেস। পিয়ানোর চাবির মতো সিঁড়ির ধাপ, একটি সাদা, একটি কালো। শুধু দেখতে সুন্দরের জন্য এটা করা হয়নি। সাদাকালো ধাপ পাশাপাশি থাকলে দেখার সুবিধা হয়। এ-ছাড়া ‘পিয়ানো কি’ ডিজাইন থেকে সঙ্গীতের যে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক রয়েছে। চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীত ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

অমিতাভ সেনগুপ্ত
তৎকালীন সময়ে নন্দন-এর সমস্ত ডিজাইনটাই সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশনিং-এর কথা ভেবে করা হয়েছিল। নন্দনের তলায় যে জল দেখা যায়, যার ওপরে নন্দন যেন ফুলের মতো ভেসে থাকে, ওই জলই কাজে লাগানো হয়েছিল এয়ারকন্ডিশনিং-এর জন্য। এর ডিজাইনে বাতাস ও সূর্যের আলোকেও পর্যাপ্ত ভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, সূচনা পর্বে একতলায় ছিল প্রদর্শনী কক্ষ ও ফিল্ম লাইব্রেরি গড়ে তোলার ব্যবস্থা। নন্দনের উদ্বোধনী সন্ধ্যায় মৃণাল সেন এই প্রদর্শনী কক্ষেই বাংলা চলচ্চিত্রের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, “নন্দন এত বিরাট ও এত সুন্দর যে আমার ভয় করছে, একে আমরা ঠিকমত রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারব তো?” সাড়ে তিন দশক পার করে আজ বলাই যায়, বর্তমান তৃণমূল সরকার জ্যোতি বসুর দুঃশ্চিন্তাকে অমূলক প্রমাণ করেছে। দিনে দিনে নন্দনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফিল্ম ফ্যেস্টিভেল থেকে শুরু করে সারা বছর একাধিক মেলা ও উৎসব হবার কারণে নন্দন আজ বিশ্ব ইতিহাসে পরিচিত স্থান। যে কোনো শিল্পপ্রেমী মানুষের কাছে নন্দন মন্দির সম। ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক পরিষেবা ও পুরনো নস্টালজিয়ার মধ্যে এক সুদৃঢ় যোগসূত্র নির্মাণ করতে পেরেছে বাঙালির অহংকারের নন্দন।