নিউটাউনের ইকোপার্কে ভোরবেলায় পা রাখলেই চোখে পড়বে বিজেপির এক প্রথম সারির নেতার প্রাতঃভ্রমণের দৃশ্য। সঙ্গে শরীরচর্চাও। এই সময়ই সেখানে একই কারণে আসা বহু মানুষের সঙ্গে রীতিমত গল্পগুজব শুরু করে দেন তিনি। গুরুগম্ভীর আলাপ-আলোচনা করেন সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। মন দিয়ে শোনেন নানা সমস্যার কথা। মাঝেমধ্যেই মিডিয়াও হাজির হয়ে যায় সেখানে। বিভিন্ন মন্তব্য করে সচেতনভাবেই ঝড় তোলেন বিতর্কের। ভোরের আলোয় আয়োজিত হয় রবীন্দ্র-নজরুল প্রণাম অনুষ্ঠান। চলে বিজয়া-দীপাবলির মিষ্টিমুখের পালাও। মাঝে একবার গলফ মাঠেও নাকি দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এসবই আসলে ইমেজ-বিল্ডিং। পাবলিক রিলেশনস বা জনসংযোগের নিত্যনতুন কৌশল। গেরুয়া নেতার এই ভাবমূর্তি গড়ার নেপথ্য কারিগর এক পোড়খাওয়া সাংবাদিক। মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর নিত্যনতুন পথ বাতলে দিতেন সেই সাংবাদিকই।
এবার আসছি আরও এক নেতার গল্পে। একসময় নিঃস্বার্থভাবে তাঁরও ইমেজ-বিল্ডারের ভূমিকা নিয়েছিলেন এক সুপরিচিত সাংবাদিক। বাংলায় শাসকদলের জন্মমুহূর্ত থেকেই ওই নেতা ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সেনাপতি। সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে একসময় তাঁকে দেওয়া হয়েছিল দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ। জোটরাজনীতির দৌলতে কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বও পেয়েছিলেন। অবশ্য খুবই সামান্য সময়ের জন্য। কিন্তু এত সুখ সইল না তাঁর কপালে। আচমকাই করে ফেললেন দলবদল। যোগ দিলেন কেন্দ্রের শাসকদলে। সম্পূর্ণ নতুন আদর্শ, নতুন পরিবেশ। অথচ গুরুত্বপূর্ণ পদ। জনসভায় কী বলবেন, কেমন করে সাংবাদিকদের বোঝাবেন দলের কথা, নীতি-কর্মসূচির কথা— কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। লোকসভা নির্বাচনটা ভালোয় ভালোয় পার করা গেলেও বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। এদিকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে কোভিডের চোখরাঙানি। সেই দলবদলু দুঁদে নেতা শেষপর্যন্ত মনের কথা খুলে বললেন স্নেহের এক সাংবাদিককে। বেরিয়ে গেল সমাধানের রাস্তা। দলের জাতীয়পর্যায়ের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে শুরু করে মুখোমুখি একান্ত বৈঠকে তাঁর বক্তব্য কী হবে তা গুছিয়ে সহজভাষায় লিখে দিতেন সেই সাংবাদিকই। সাংবাদিক সম্মেলনের ক্ষেত্রেও তা-ই। এমনকী একবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকের ঘন্টাখানেক আগেও কলকাতায় সেই সাংবাদিককে ফোন করে সংক্ষেপে বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির কৌশলটা দ্রুত লিখে পাঠিয়ে দিতে বললেন তিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কৃষ্ণনগরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় তিনি যে লিখিত ভাষণটি পড়ে ব্যাপক হাততালি কুড়োলেন, সেটাও কিন্তু ওই সাংবাদিকেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু কি তাই? পাঁচতারা হোটেলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উপরে আলোচনাসভায় তথ্যসমৃদ্ধ লিখিত ভাষণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সামনে পাঠ করার জন্য লিখে দিতে হয়েছিল মানুষের মন নিয়ে কিছুটা গবেষণা করা ওই সাংবাদিককেই। দলের সাংগঠনিক সভায় বা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কর্মীদের জন্য ‘মোটিভেশনাল টক’এর কারিগর সেই প্রতিবেদকই। এবং এ সবকিছুই ওই সাংবাদিক করেছিলেন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। কোনওকিছুর বিনিময়ে নয়। সেই নেতার অনুরোধেই। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েও রাজনৈতিক সমীকরণ অনুকূলে না থাকায় ওই নেতা অবশ্য সক্রিয় রাজনীতি থেকে পরে কিছুটা দূরে চলে যান। সম্ভবত মানসিক এবং শারীরিক কারণেই। প্রশ্ন ওঠে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও।

কিন্তু উপরের দু’টি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ার জন্য কীভাবে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিচ্ছেন। জনসংযোগ বিশেষজ্ঞদের হাত ধরেই তাঁরা আরও নিবিড় করে তুলছেন জনসংযোগ। পৌঁছতে চাইছেন রাজনৈতিক লক্ষ্যে, পার হতে চাইছেন নির্বাচনী বৈতরণী। শুধু নেতা বা নেত্রীরা নন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এখন পেশাদার জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ বা এই ধরনের সংস্থার সাহায্য নেওয়ার প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে। বেড়ে চলেছে নির্ভরশীলতা। বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষা করে মানুষের মনের খবর জানার চেষ্টা করছেন, নির্বাচনী হাওয়া বুঝতে চাইছেন এবং সেইমতো স্ট্র্যাটেজি ঠিক করছে্ন সংশ্লিষ্ট দল বা নেতার জন্য। প্রেস কনফারেন্স, প্রেস রিলিজ-সহ প্রচার-কৌশলের যাবতীয় পরিকল্পনা এবং তার রূপায়ণের দায়িত্বও বর্তাচ্ছে এই ধরণের বিশেষজ্ঞ সংস্থার উপরে। নেতা-নেত্রী, জনপ্রতিনিধি বা প্রার্থীদের কোথায় কোন ধরণের পোশাক পরতে হবে তা নিয়েও পরামর্শ দিচ্ছেন জনসংযোগ বিশেষজ্ঞরা। তৈরি করে দিচ্ছেন নির্বাচনী ইস্তাহার, ভাষণের খসড়া। প্রচারের ফ্লেক্স-ব্যানার-হোর্ডিং। মিডিয়া রিলেশনস এবং ওপিনিয়ন লিডার তৈরি— এই দু’টো কাজও তাঁরা করছেন নিখুঁত পেশাদারি দক্ষতার সঙ্গে। পুরো বিষয়টার মধ্যেই এখন কর্পোরেট রিলেশনসের স্পষ্ট প্রতিফলন।
কথা হচ্ছিল রাজ্যসভার সাংসদ বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. শান্তনু সেনের সঙ্গে। তাঁর মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। এখন ইন্টারনেট-সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে রাজনৈতিক প্রচারে, জনসংযোগে। অনেক সময়ই হার মানাচ্ছে খবরের কাগজ বা টিভিকে। সেই কারণেই দক্ষ পেশাদারদের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। ভবিষ্যতে আরও জরুরি হবে এর প্রয়োজনীয়তা। তবে আমি মনে করি এসব সত্ত্বেও মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের কোনও বিকল্প নেই। মুখোমুখি কথা বলার মূল্যই আলাদা।
রাজ্যের মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীর কথায়, গত একদশক ধরেই দেশের রাজনীতিতে পাবলিক রিলেশনস এজেন্সির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, এখানে বিশেষজ্ঞরা আছেন। তাঁরা নিয়মিত গবেষণা করেন। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে স্থির করেন ভাবমূর্তি গড়ার কৌশল। দল, নেতৃত্ব বা প্রার্থীর প্রচার কৌশল। একটা নয়, দেশজুড়ে কাজ করছে এইধরনের অনেকগুলো এজেন্সি। কিন্তু একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সর্বাধিক জননেত্রীর ভাবমূর্তি গড়তে কিন্তু কোনও বিশেষজ্ঞ এজন্সির দরকার হয় না। মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।
মজার বিষয়, একই এজেন্সিকে হয়তো দেখা যাচ্ছে একএক সময়ে বা এক এক নির্বাচনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন দলের হয়ে কাজ করছে। যে এজেন্সি লোকসভা নির্বাচনে একটা দলের পক্ষে কাজ করেছে, সেই এজেন্সিই হয়তো পরে কোনও রাজ্যে তার কোনও কট্টর বিরোধীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য। এমনকী অনেক সময় কোনও দলের গুরুত্বপূর্ণ গোপন সাংগঠনিক বৈঠকেও এজেন্সির কর্তার উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। একেই বলে পেশাদারিত্ব। অবশ্য এজেন্সির প্রাণপুরুষ নিজেই সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন, এমন ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে আমাদের দেশ।
আবার প্রয়াত নেতা অজিত পাঁজা সারাবছর ধরেই এই জনসংযোগ অভিযান চালানোর জন্য তৈরি করেছিলেন একটি নিজস্ব টিম। গিরিশ পার্কে তাঁর বাড়িতেই ছিল এর কন্ট্রোলরুম। কেউ কোনও বিশেষ সমস্যা নিয়ে বা বিশেষ কাজের জন্য তাঁর কাছে গেলে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন তিনি এবং জনসংযোগ-কর্মীরা। পরে সংশ্লিষ্ট সাহায্যপ্রার্থীকে তাঁর বাড়ি থেকে ফোন করে জানতে চাওয়া হত, কাজটা ঠিকঠাক হয়েছে কিনা। নির্বাচনের মুখে নয়, বছরভর তাঁর জনসংযোগের ধারা ছিল এমনই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের মতো উন্নত দেশে পাবলিক রিলেশনস এজেন্সি এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের উপরে রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল আমাদের দেশের অনেক আগেই। এব্যাপারে তারা এগিয়ে রয়েছে অন্তত ৩০ বছর। নির্বাচন ঘোষণা এবং নির্বাচনের মধ্য সময়ের ব্যবধান যেহেতু খুবই অল্প, তাই সমীক্ষা থেকে প্রচার- সমস্ত কাজটাই সেরে ফেলতে হত অত্যন্ত দ্রুত। আর সেই কাজটা সফলভাবে করার জন্যই ডাক পড়ত বিশেষজ্ঞ এজেন্সিগুলোর। সেই ধারাই এখন বিশ্বজুড়ে। বিবর্তনের হাত ধরে কর্মকাণ্ডে এখন অত্যাধুনিকতার ছোঁয়া।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের সময় দেখা যায়, কোনও কোনও প্রার্থী ব্যক্তিগত বা দলগতভাবে জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেছেন। এই ধরণের বিশেষজ্ঞদের প্রথম কাজই হল বিরুদ্ধ প্রার্থী এবং তাঁর দলের অবস্থা যাচাই করা। সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে খোলামেলা কথাবার্তা বলে তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন ভোটারদের চোখে বিরোধী প্রার্থী বা প্রার্থীদের এবং অবশ্যই দলের ভাবমূর্তি ঠিক কেমন- কাজের লোক, নাকি অকাজের। বিগত বছরগুলোতে পারফরম্যান্স কেমন,কী কী দোষত্রুটি, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার কেমন করেন, মানুষ কি ক্ষুব্ধ, নাকি খুশি, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে মানুষের প্রত্যাশা কী – এইসব খুঁটিয়ে জেনে নিজের ক্লায়েন্ট প্রার্থীর নির্বাচনী রণকৌশল স্থির করেন জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ। নির্বাচনী কেন্দ্রের ভৌগলিক অবস্থা, এলাকার মানুষের পেশা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলোও খতিয়ে দেখেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকটা মার্কেট সার্ভের মতো। মূলত এরই উপর ভিত্তি করে স্থির করা হয় প্রচারের রূপরেখা। প্রার্থীরা ভোট চাইতে গিয়ে কী বলবেন ভোটারদের, কেমন করে সামাল দেবেন অপ্রিয় প্রশ্ন, অস্বস্তিকর পরিস্থিতি- বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটাও।
ভারতেও গত এক দশকে নির্বাচনী লড়াইতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এইধরণের বিশেষজ্ঞ বা এজেন্সির ভূমিকা। এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্যের অঙ্কটাই এখনও পর্যন্ত চোখে পড়ছে বেশি। সেই কারণে বাড়ছে পেশাদার বিশেষজ্ঞ এবং এজেন্সির সংখ্যা। নিঃসন্দেহে এক ভিন্নমাত্রা পাচ্ছে ভারতের ভোটযুদ্ধ।