প্রথমেই বলি, সিন্ধুসভ্যতার লিপির রহস্যভেদ এখনও হয়নি। কারণ এক্ষেত্রে দ্বিভাষিক শিলালিপি বা রসেটা স্টোন পাওয়া যায়নি। যার সাহায্যে মিশরীয় হাইরোগ্লিফিক ও মেসোপোটেমিয়ার কিউনিফর্ম লিপির পাঠোদ্ধার করা গিয়েছিল। অনেক গবেষক অনেক কিছুই দাবি করছেন, কিন্তু সবই নিউটনীয় ভাষ্য সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়ানোর মত। কিছু কিছু পেপার পাবলিশ করা আর সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে গবেষকদের যাবতীয় কারিকুরি।
আমরা জানি, প্রায় ৫,৫০০ বছর আগে ভারতের সিন্ধু উপত্যকায় সিন্ধু সভ্যতার সূচনা হয়েছিল। এই সিন্ধুনদ মিশরের নীলনদের মতোই তার তীরভূমিকে প্লাবিত করে ঐ উপত্যকার মানুষের চাষাবাদের প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছিল। সিন্ধু উপত্যকায় দুটি বড় বড় শহরের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। একটি হলো মহেঞ্জোদারো ও অন্যটি হরপ্পা। পরে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আরো অনেক কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। কলিবঙ্গান, রাখিগড়ি, লোথাল ইত্যাদি স্থানে।
এই জনগোষ্ঠী জ্ঞান, বুদ্ধি এবং দক্ষতার দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। তারা এক সুপরিকল্পিত শহরে বাস করত। জল সরবরাহ, ড্রেন ব্যবস্থা এবং উন্নত মানের রাস্তাঘাট ছিল সেই শহরে। শহরটিতে প্রার্থনাকক্ষের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় সেখানে কোন প্রাসাদ ছিল না। সম্ভবত পুরোহিতরা সিন্ধু সাম্রাজ্য শাসন করতেন।
শস্য ভাণ্ডার বা granary house এই সভ্যতার এক বিশেষ ল্যান্ডমার্ক। দেশের সমস্ত জমি থেকে পাওয়া শস্য ছিল সরকারের। এই কারণেই ঐ সমাজে শস্য মজুত করে রাখার জন্য শস্য ভাণ্ডারগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পৃথিবীর এই অংশে তখনও মুদ্রার উদ্ভাবন হয়নি এবং শস্যকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হতো। যারা ক্ষেতে কাজ করত তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে ঐ শস্যগুলোই দেওয়া হত।
এই শহরে হাজার হাজার বাড়ি ছিল। বাড়িগুলো মাটির ইট দিয়ে তৈরি। বাড়ি তৈরির ধরনে দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে তফাৎ ছিল। দরিদ্রদের ঘরবাড়িগুলো এক-দুই কক্ষ বিশিষ্ট হলেও ধনী পরিবারে বহুকক্ষবিশিষ্ট বড় বড় বাড়ি ছিল। খোলা উঠানের চারপাশে ঘরগুলি তৈরি করা হতো। বড় বড় বাড়িগুলোর নিচতলায় স্নানাগার ও শৌচাগার ছিল। বাথরুম গুলোর বর্জ্য – পদার্থ পাইপের সাহায্যে রাস্তায় অবস্থিত ড্রেনে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা ছিল। সেই যুগে এমন সব আবিষ্কার সত্যিই অসাধারণ। তাদের পয়ঃনিষ্কাশনের এই ব্যবস্থা প্রায় ২০০০ বছর পরে রোমের মানুষেরা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিল। এই রোমানবাসীকে সভ্যতার ধারক এবং বাহক বলা হলেও সিন্ধু সভ্যতার মানুষজন বহু আগেই এই ক্ষেত্রে তাদের অসীম যোগ্যতার ছাপ রেখে গিয়েছিল।
সিন্ধু উপত্যকায় যারা বাস করত তারা সম্ভবত দ্রাবিড় জাতির। প্রথম তুলার ব্যবহার এই জাতিই করেছিল। তারা মেসোপোটেমিয়ার সাথে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত ছিল। তাদের তুলা এবং শস্য মেসোপটেমিয়াতেও বিক্রি হতো।
এছাড়া হাতির দাঁত, সোনা, রুপো, মূল্যবান পাথরও ছিল। সিন্ধুসভ্যতার ভূখণ্ড মেলুহা নামে উল্লিখিত হয়েছে মেসোপটেমিয়ার লিপিতে ও সিলে। মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে মেলুহার বাণিজ্য প্রথমদিকে ইরানের মধ্যে দিয়ে হত বলে মনে করেন সিন্ধুলিপি বিশেষজ্ঞ ইরাবথম মহাদেবন। পরে তা সমুদ্রপথে ডিলমুন তথা বাহারিন বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সিন্ধুসভ্যতা ভূখণ্ড থেকে কিছু ইন্টারপ্রেটার বা অনুবাদক মেসোপটেমিয়ার সুমের, আক্কাড, অ্যাসিরিয়া, ব্যাবিলন প্রভৃতি শহরে গিয়েছিলেন বাণিজ্যদলের সঙ্গে। তাঁরা অনেকেই সেখানে পাকাপাকিভাবে থেকে যান। মনে হয় তাঁরাই প্রোটোদ্রাবিড়ীয় মেলুহা নামটি সুমের নগরে নিয়ে যায়। মেলুহা মানে সুমেরীয় ভাষায় শস্যভাণ্ডার। এটি বর্তমান কন্নড় ভাষার ‘মেল্ল’ থেকে এসেছে বলে আমার অনুমান। মেল্ল মানে প্রাচুর্য, বাহুল্য বা উদ্বৃত্তভাব।
মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা শহরের দূরত্ব কয়েকশো কিলোমিটার হলেও প্রশাসকরা একইভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করতেন। সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শক্তিশালী নেতা, পুলিশ, বিচারক,সরকারি কর্মকর্তারা ছিল। তবে তাদের সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছু জানি না। তাদের লেখা বহু সীল পাওয়া গেলেও তাদের ভাষার(সিন্ধুলিপি) আজও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কথিত আছে মেসোপটেমিয়ার রাজা সার্গন দ্যা গ্রেট(হাম) তাঁর ছেলে মেনেস বা মিজারাইমকে সিন্ধুদেশে পাঠিয়েছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালে। মেনেস ৬০,০০০ দ্রাবিড় সৈন্যের একটি বাহিনীকে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করেন।১০০০ রণতরী নির্মাণ করেন। সেই বাহিনী নিয়ে তিনি আরবের কিয়দংশ অধিকার করেন, মরুভূমির মধ্যে দিয়ে হাজার হাজার সিডার গাছের গুঁড়িকে রোলার হিসেবে ব্যবহার করে রণতরীগুলিকে হড়কে হড়কে নিয়ে যান নীলনদের তীরে। সেখানে সেগুলিকে পুনরায় জলে ভাসান। তারপর ইজিপ্টের একাংশ অধিকার করেন। তাঁর অনেক রণতীর ডুবে যায় নীলনদের বিভিন্ন বাঁকে। সুতরাং মেসোপোটেমিয়ার সঙ্গে দ্রাবিড়জাতির যোগাযোগ বহু প্রাচীন। দ্রাবিড় শব্দ পিল বা পল হাতি বা হাতির দাঁতকে বোঝায়। সুমেরীয় ভাষায় দাঁতকে বলে পীর।
দ্রাবিড় ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে হামার শব্দটি। মানে শস্যভাণ্ডার বা ধানের গোলা। মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় ভাষায় এর প্রচলন থাকতে পারে। কারণ মূলে দ্রাবিড় শব্দটি ছিল হোম্পারম বা হোমরু। মেসোপটেমিয়ার বা ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতেই পারে।
সিন্ধু সভ্যতায় ধাতুর ব্যবহার ছিল। ধাতু ব্যবহার করে তারা নানা রকম গয়না তৈরি করত। সোনা, রূপা, তামা, লাপিস লাজুলি(নীলকান্তমণি), পান্না শ্বেতস্ফটিক ইত্যাদির ব্যবহারও দেখা গিয়েছে। তবে অন্যদিকে অন্যান্য সভ্যতায় এরও প্রায় হাজার বছর আগে ধাতুর ব্যবহার শুরু হয়ে গিয়েছিল। এদের ব্রোঞ্জের তৈরি কয়েকটি হাতিয়ার খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এরা অত্যন্ত দক্ষ শ্রমিক ছিল। কাঠের কাজে তাদের দক্ষতা ছিল অপরিসীম। কিছু কিছু আসবাবপত্র নিখুঁত নকশায় তারা তৈরি করেছিল। আরও ছিল ছোট ছোট খেলনা, যা তাদের নিজেদের হাতের তৈরি।
প্রায় ৩০০০ হাজার বছর আগে এই সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটে । আস্তে আস্তে মন্দির, শস্যভাণ্ডার, বাড়িঘরগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। নতুন করে সেগুলো কেউ আর তৈরি না করায় কিছুটা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। জনশূন্য হয়ে যায় সভ্যতার মূলভূমি। কেউ কেউ বলেন এক মহামারীর কারণে হয়তো এরা হঠাৎ করেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কেউ আবার জলবায়ুকে দায়ী করে। কেউ সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া ও সিন্ধুনদের খাতের পরিবর্তনকেও দায়ী করেন। ভূমিকম্প বা উল্কাপাতের থিওরিও আছে।
বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ববিদ প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সেখানে একটা ঘর খুঁজে পেয়েছিলেন যেখানে পুরুষ, মহিলা এবং শিশুর কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। কীভাবে তারা মারা গেলো তা আমরা জানি না। তবে পৃথিবীর বুক থেকে তাদের জীবনযাত্রা, তাদের অর্জিত জ্ঞান একেবারেই হারিয়ে যায় নি। আজও তাদের ধরনে তৈরি ঠেলাগাড়ি আমরা চলতে দেখি ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অঞ্চলে।
ফিনিশীয় সিন্ধুলিপি বিশেষজ্ঞ আস্কো পারপোলা, ভারতের ইরাবথম মহাদেবন, রোমিলা থাপার, রাজেশ পি এন রাও, শিরিন রত্নাগর, ডি ডি কোসাম্বী, ইরফান হাবিবরা অনেক চেষ্টা করেছেন ও করছেন। কিন্তু সিন্ধুলিপির রহস্যোদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি আজও। শুধু পত্রিকায় হাইপোথিসিস লিখেই যেন সবাই দায়মুক্ত।