প্রয়োজনের মুহূর্তে বামেরা কোথায় ছিল?
২০২০ সালের গ্রীষ্মের প্রাক্কালে, লকডাউন থেকে যখন একের পর এক সংকট উদ্ভূত হচ্ছে, তখন প্রতিটি প্রয়োজনীয় এবং বৃহত্তর ইস্যুতে বামেরা মৌনতা অবলম্বন করছিল। যেভাবে পরিকল্পিত উপায়ে বিপুল বেকারত্ব সৃষ্টি হল, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার একটি দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হলো, সব ধরনের নির্বাচন মুলতুবি করে দেওয়া হলো, মানুষের স্বাধীন চলাচলের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো, কো- ল্যাটারাল ড্যামেজ এর নামে হাজার হাজার মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া হল, রাষ্ট্রের নজরদারি তীব্রতর হল – এসবের কোন একটিরও বিরুদ্ধে, বামেদের মধ্যে ন্যূনতম কোন আওয়াজ উঠল না। এমনকি তাদের মধ্যে কোন মৃদু প্রতিবাদ পর্যন্ত দেখা গেল না। এটাকে কি বলবেন, শুধুই অজ্ঞতা? যদি তাই হয়, তবে সেই ব্যাখ্যার অতীত অপরিসীম অজ্ঞতা প্রথম লকডাউন শুরু হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত, টানা তিন বছর ধরে অদ্ভুতভাবে অটুট রয়েছে। এই সময়কালে বামেদের ব্যর্থতার ছবিটা এতটাই ব্যাপক এবং কলঙ্কিত যে তাকে সময়ের পটচিত্রে হুবহু তুলে ধরা বেশ কঠিন। তবুও তাদের অগৌরবের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়ঃ
২০২০ সালের মে মাসে, দা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার সহ-সম্পাদক লিখেছিলেন: এ্যান্টি-ভ্যাক্সার অর্থাৎ ভ্যাকসিন বিরোধীদের জন্য যা যা আমাদের করার আছে সেটা হচ্ছে: ‘কোন কর্মসংস্থান নয়, কোন স্থানে প্রবেশাধিকার নয়, এমনকি জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার দরজা তাদের জন্য খোলা নয়’। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে দা ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় ভ্যাকসিন অনিচ্ছুকদের বলা হয়েছিল “সমাজের পক্ষে একটি প্রাণঘাতী বোঝা যার দায় নিতে আমরা অপারগ”। এছাড়াও অন্যান্য রুচিশীল পত্রপত্রিকাতে যখন এই জাতীয় অশালীন বাক্যের ফুলঝুরি ফোটানো হচ্ছিল, তখন কিন্তু না কোন বামপন্থী সাংবাদিক বা না কোন সাংবাদিকদের জাতীয় সংগঠনের মুখপাত্র এর বিরোধিতা করেছিল।
কেয়ার হোমগুলির চল্লিশ হাজার কর্মী যারা পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন নিতে অস্বীকার করেছিলেন, তাদের ছাঁটাই করা হয়েছিল। সেই ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের কাজে পুনর্বহাল করার দাবিতে প্রচার অভিযান চলছে। এই কর্মীরা শ্রমিক আন্দোলনে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পাবলিক সার্ভিস ইউনিয়ন সংক্ষেপে ইউনিশন এই প্রচার অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে না। একেবারে তৃণমূল স্তরে শাসকের শ্রমিক বিদ্বেষী নীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে সেখানেও তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে না।
লিথুয়ানিয়া এবং অস্ট্রিয়াতে যখন টিকাহীন সংখ্যালঘুরা নব্য ফ্যাসিবাদীদের কোভিড বিধি নিয়মের চাপে প্রায় সমাজচ্যুত হচ্ছেন, তখন আন্তর্জাতিকতাবাদের গরিমায় উদ্ধত বামেরা গৃহের অন্তরালে থাকা ই শ্রেষ্ঠ পন্থা বলে মেনে নিয়েছিল। ফ্যাসিবাদী এই হামলার বিরুদ্ধে কোন স্বাক্ষর অভিযান, কোন সতর্কবার্তা এমনকি কোন সলিডারিটি হ্যাশট্যাগ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এমনকি শিল্প ক্ষেত্রগুলিতেও যে প্রতিবাদ দৃশ্যমান হচ্ছিল তাতেও বামেদের কোন হেলদোল দেখা যাচ্ছিল না। গ্রীন-পাসের বিরুদ্ধে ইতালিয় বন্দর শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছিলেন তার সম্পর্কে বামপন্থী পত্রিকা মর্নিংস্টার ( যা আগে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ছিল) একটি শব্দ পর্যন্ত খরচ করেনি। জঙ্গিপনার দিক থেকে বন্দর শ্রমিকদের এই আন্দোলনেের প্রভাব ছিল সুবিশাল। ত্রিশতে সহ অন্যান্য বন্দরে এই আন্দোলনের গণভিত্তি ছিল ব্যাপকতর। তবু বামপন্থী পত্রিকাগুলি এই আন্দোলনের খবর ছাপার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত না।
বহু বছর ধরে আমরা দেখে আসছি, কখনো জাতিবিদ্বেষ, কখনো ট্রাম্প, আবার কখনো কোন দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধে অঙ্গীকার দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যখন ভ্যাকসিন নিয়ে বিদ্বেষ ও বিভেদ ছড়ানো শুরু হল তখন কিন্তু এই প্রতিবাদীরা গা ঝারা দিয়ে উঠলেন না।
সমস্যা এটা ছিল না যে লকডাউনের সময় বামেরা প্রতিবাদে সামিল হয়নি। সমস্যাটা ছিল যে তারা প্রতিবাদের জন্য সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া অন্য কোন কিছু বেছে নিচ্ছিল। জর্জ ফ্লয়েড এর মৃত্যুর প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু কোভিড প্রকল্পের বিরোধী তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলির রহস্যজনক মৃত্যু তাদের বিচলিত করেনি।
অন্যদিকে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদে তারা যে আন্দোলনের আঙ্গিক হাজির করেছিল, সেটাই যেন কোভিড কালে তাদের অবস্থানের ইঙ্গিতবাহী হয়ে রইল। শাসকের সামনে নতমস্তক এবং নতজানু।
পুলিশি ব্যবস্থা, নানা ধরনের অপরাধ, আদালতের বিভিন্ন আইন এবং কঠোর সাজা ইত্যাদি নানা বিচিত্র বিষয়ে তারা প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ আইনের নিপীড়নমূলক বিধি নিয়মের বিরুদ্ধে তারা ছিল বিস্ময়কর ভাবে নীরব। এমনকি ট্র্যাক এন্ড ট্রেস নামের নতুন কৌশলে যখন রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা একেবারে ব্যক্তি পরিসরে হামলা শুরু করেছিল তখনও তারা ছিল অদ্ভুত ভাবে মৌন।
বামপন্থী পথের সাথীরা, পথকেই পুনরদখল করার জন্য সোচ্চার হয়েছিল কিন্তু যখন, বিধি- নিয়মের লৌহ কঠিন বেড়াজালে জনতার স্বাধীন চলাচল বিপর্যস্ত হলো, অবৈজ্ঞানিকভাবে স্কুলে শিশুদের বাধ্য করা হলো মুখোশ পরে থাকতে, জাতীয় স্তরের শিক্ষক সংগঠন যখন এই আত্ম-বিধ্বংসী নীতির কথা জোর গলায় প্রচার করতে লাগলো, তখনো বামেরা অদ্ভুতভাবে মৌন রইলো। (চলবে)
খুব ভালো লেখা এবং যথার্থ । ডাক্তার গৌতম দাসের অনুবাদও সাবলীল । ????????????????????????????????????????????????????????⭐????
অসাধারণ অনুবাদ। গ্রাফের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।