আজ থেকে ২০০০ বছর আগে, অযোধ্যা রাজকন্যার কোরিয় দেশে একটি অভূতপূর্ব বিবাহ যাত্রার গল্প বলব। গল্পটিতে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ জ্ঞানচর্চার ইতিহাস। সেটি ক্রমশ প্রকাশ্য। তার আগে বিবাহযাত্রার ঘটনা।
৪৮ খ্রিষ্টাব্দে অযোধ্যার এক রাজা-রাণী স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে জানলেন, তাদের কন্যার বিবাহ নির্দিষ্ট হয়ে আছে সুদূর কোরিয় দেশের এক রাজপুত্রের সঙ্গে। আদেশ হল তাদের কন্যাকে সে দেশে অপেক্ষমান এক রাজপুত্রকে বিবাহ করতে সমুদ্র পথে রওনা হতে হবে। ঠিক একই সময়ে কোরিয় দেশে আকাশজাত রাজা কিম সুরোও একই প্রত্যাদেশ পান–এক ভারতবর্ষীয় কন্যা আসছেন তাঁকে বিবাহের উদ্দেশ্যে। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী অযোধ্যার রাজকন্যা সুরি রত্ন বা শ্রীরত্ন পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কোরিয় দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। মাথায় রাখতে হবে তিনি এমন সময় কোরিয়া পৌঁছলেন, যখন বৌদ্ধপন্থও কোরিয়া পৌঁছায় নি। কোরিয়ায় বৌদ্ধপন্থ গিয়েছে শ্রীরত্নের কোরিয়ায় পদার্পণের ৩৫০ বছর পর।
ভারতবর্ষীয় রাজকন্যা শ্রীরত্ন, কোরিয় লব্জে সুরিরত্ন কোরিয়া পৌঁছলে, কোরিয় রাজপুত্র কিম সুরোর সঙ্গে তার বিবাহ সম্পন্ন হল। তারা দীর্ঘ সময় ধরে রাজত্ব করলেন। তাদের সুনাম ছড়িয়ে গেল। সন্তানদের কেউ কেউ আজও মায়ের উপাধি বহন করেচলেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ৫০-৬০ লক্ষ ‘কিম’ জনসমষ্টি আজও মনে করেন তারা সুরিরত্নের উত্তরাধিকারী। অধিকাংশ ভারতীয় এই ইতিহাস মনে না রাখলেও কোরিয় জনগণ সেই স্মৃতি আজও স্মৃতিতে সযত্নে রেখে দিয়েছেন। তারা রাজা সুরো আর রাণী সুরির বিবাহের দিন স্মরণ করতে ফাল্গুণ চৈত্র মাসে অযোধ্যায় তীর্থযাত্রায় আসেন। গোষ্ঠী অধিপতিরা অযোধ্যায় রাণীর একটি স্মৃতিস্তম্ভও বানিয়ে দিয়েছেন।

এই সাধারণ, চমকহীন গল্প বিশ্লেষণের দুটি অংশ একটা ভারত-কোরিয়া দৌত্য, অন্যটি পূর্ব ভারতের দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ইতিহাস আলোচনা। আমাদের আজকের আলোচ্য অংশ দ্বিতীয়টি। আমরা ধরেই নিতে পারি রাজকন্যা পূর্ব উপকূলের কোনও এক সমুদ্র বন্দর থেকে সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। অযোধ্যা কিন্তু পূর্ব উপকূল থেকে বহুদূরে অবস্থিত, অন্তত ৫০০ ক্রোশ। তাসত্ত্বেও ষোড়শী রাজকন্যা এবং প্রত্যাদেশ পাওয়া তার পিতামাতা সমুদ্র যাত্রায় পরান্মুখ হন নি। আমরা যেন ভুলে না যাই, রাজকন্যা যে দেশে যাচ্ছেন সেটাও পূর্ব ভারতের আকছার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্র যাত্রা করা নাবিকদের কাছে খুব চেনা দেশ নয়– অঞ্চলটা পূর্ব এশিয়া। প্রতিবছর পূর্ব উপকূলের নাবিকেরা ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া বা চম্পা পর্যন্ত যেতেন বাণিজ্য বা দৌত্য অথবা যুদ্ধ যাত্রায়। কিন্তু কোরিয়ায় যে তারা নিয়মিত যেতেন এমন ইতিহাস খুব একটা সহজলভ্য নয়। তবুও রাজারানী সেই প্রত্যাদেশ মান্য করলেন। মনে হয় ভারতবর্ষে তখন সমুদ্র যাত্রা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। ফলে রাজ্যবেষ্টিত অযোধ্যা রাজ কিন্তু মেয়েকে দীর্ঘ তিন মাসের সমুদ্র যাত্রায় কোরিয়া পাঠাতে দুবার ভাবেন নি।
আমরা কল্পনা করতে পারি, সুরি রত্ন আর তার সঙ্গীরা বঙ্গোপসাগরের পুরী বা তাম্রলিপ্ত থেকে রওনা হয়ে দক্ষিণ এবং উত্তর চীন সমুদ্র হয়ে দীর্ঘ তিন মাসের সমুদ্র পথ পেরিয়ে পৌছলেন কোরিয়ায় এবং সেখানে সাদর উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন। দু’হাজার বছর আগে অজানা পথে সমুদ্র যাত্রা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল না। অথবা ‘দুহাজার বছর আগে খুব সাধারণ ঘটনা ছিল না’ ভাবাটা হয়ত আজ ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকিয় মেকলের উত্তরাধিকার বহনের মানসিকতা। মেকলে আর ট্রেভলয়নের তৈরি করা পশ্চিমি বিশ্ব-ইতিহাস প্রযুক্তির বিকাশের একরৈখিক ভাবনা গাঁথা মনে তাই মনে হচ্ছে। তখন হয়ত বণিক-নাবিকরা শূদ্র সমাজ বিকশিত কলন আর মহাকাশ বিদ্যাচর্চা করতেন অবলীলায় – তাদের কাছে সমুদ্র যাত্রা ছিল জলবত্তরলং।

কোরিয়ায় রাণী সুরি রত্নের একটি সমাধি রয়েছে। এটি ভারতীয় এবড়োখেবড়ো পাথরে তৈরি। পাথরটির নাম সমুদ্র দেবতাকে শান্ত করা পাথর। সেই পাথরগুলি আশ্চর্য কন্যা শ্রীরত্ন নিজে বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ধারণা তার যাত্রাপথ সুরক্ষার জন্যও নাবিকেরা বিশাল বিশাল পাথর বহন করেছিলেন। তাছাড়া সেগুলি তাঁর দেশের স্মৃতিচিহ্নও বটে। সেগুলি জাহাজের খোলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যাতে সমুদ্রপথে তীব্র ঝড়ঝঞ্ঝায় জাহাজ উলটে না যায়। ততদিনে নাবিকদের দীর্ঘ দিনের সমুদ্রযাত্রায় জাহাজের খোল ভারি করার অভিজ্ঞতাটি হয়ে গিয়েছিল। ঠিক যেমন করে ডাচেরা বাঙলার সোরা, পাটনার সরকার সারণ থেকে জাহাজের খোল ভারি করে নিয়ে যেতেন এই ঘটনার প্রায় দেড় হাজার বছর পরে ভারতবর্ষীয় নাবিকদের দেখান রাস্তায়। অর্থাৎ গল্পগুলি নতুন করে আমাদের আলোচনায় আনা দরকার। দরকার এই জন্যই যে দীর্ঘদিন ধরে দেশিয় জ্ঞানচর্চা নিয়ে ইতিহাস রচনায় ভদ্রলোকিয় ঔপনিবেশিক অবহেলা থেকে বেরোনো আর নিজেদের ঐতিহ্যকে সুকঠিন এক ভিত্তিভূমিতে দাঁড় করানো। আমরা নিজেদের ইতিহাসে ফিরতে চাই। সুরি রত্নের ইতিহাস আলোচনা সেপথে আমাদের এগিয়ে দেয়।
সঙ্গে তিনটে ছবি দিলাম। প্রথম দুটি রাণীর কোরিয় স্মৃতিস্তম্ভ— তার বহন করে নিয়ে যাওয়া এবড়োখেবড়ো সমুদ্র দেবতাকে শান্ত করা পাথরে তৈরি আর শেষেরটি রাণীর নামে যে গোষ্ঠীটি রয়েছে তাদের গণেশ লাঞ্ছিত কূলকেতু উল্টো স্বস্তিকা চিহ্ন।
সূত্র এন পার্থসারথীর শ্রীরত্ন কিম সুরো, দ্য লেজেন্ড অব এন ইন্ডিয়ান প্রিন্সেস ইন কোরিয়া