| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৩০১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

‘যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের’ — লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি যে আরশোলার কথাও লিখবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!

প্রবাদে আছে, পিপীলিকার ডানা ওঠে মরিবার তরে। এই পিপীলিকা অবশ্য অন্য গোত্রের। আরশোলার জেনাস, স্পেসিস আলাদা।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরশোলার অর্থ লেখার পর একটি উদাহরণ দিয়েছেন ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’এ। “আরসুল্লা… একখান কাণফোড়া খাতা কাটিয়া ফেলে!”

বাংলা প্রবাদ আছে, আরসোলা আবার পাখি!

আরশোলার যেন অষ্টোত্তর শতনাম! আরশোলা, আরশুলা, আরশুলো, তেলাপোকা, তেলাচোরা, তৈলঙ্গা, তৈলপায়িকা, তৈলপ, তৈলপা, বল্গুলিকা, পরোষ্ণী, অস্রফলা, অস্রপদা, তেলচিট্টা, কর্কটকীট।

সুকুমার রায় সেই ১৯১৮ য় লিখেছেন, ‘ফড়িঙের কটা ঠ্যাং, আরশুলা কি কি খায়।’

জীবনানন্দ দাশ ১৯৩২-এ লিখে গেছেন, ‘ফর ফর করে আরশোলা উড়ছে’।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪১-এ লিখেছেন, ‘রাতে আমাদের সাথী ছারপোকা, মশা আ আরশুলো।’

শামসুর রাহমান ১৯৬৮তে লিখেছেন, ‘মাকড়সা আরশোলাময় অন্ধকার ঘরে বসে।’

রান্নাঘরে এত আরশোলা আসে কোথা থেকে সেটাই একটা রহস্য। হাজারবার ফ্লিট ইত্যাকার স্প্রে ছিটিয়েও এর বংশ নাশ করা যায় না। ধাড়িগুলো মরে গেলেও বাচ্চারা ফিনিক্স পাখির মতো আবার এসে জুড়ে বসে।

সিনেমা-সিরিয়ালে নায়িকার আরশোলায় ভীতি অনেক বাংলা সিনেমাতে দেখা হেছে। সুচিত্রা সেন থেকে অঞ্জনা ভৌমিক, অনেকেই আরশোলা দেখে ভিরমি খেয়েছেন! আরশোলা দেখেছেন কী চিত্তির! রণবীর কাপুর আবার রিয়েল লাইফে আরশোলাকে যমের মতো ভয় পান। যদিও ছেলেদের আরশোলাভীতি তুলনামূলকভাবে কম।

সবচেয়ে বিচিত্র বিষয় হল আরশোলার সংস্কৃত নাম। দেবভাষায় একে বলা হয় ‘কর্কটকীট’। কেউ কেউ অস্রপদাও বলেন।প্রাচীন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে অবশ্য এর আরও কিছু গাম্ভীর্যপূর্ণ নাম পাওয়া গিয়েছে। রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে, মিটসেফের ভেতরে, বসে থাকা এই নগণ্য প্রাণীর এমন রাজকীয় সংস্কৃত নাম ভাবা যায়! বাংলার ‘আরশোলা’ শব্দের উৎস নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে যতই মতভেদ থাকুক না কেন, একটা বিষয়ে সবাই একমত, নাম যাই হোক, তার উড়ন্ত কলেবরের সামনে নামজাদা সেলেব থেকে শুরু করে পাড়ার মস্তান, সবাই কুপোকাত। তাই মাঝে মাঝে ঘরের কোণের সেই ‘কর্কটকীট’ বা ‘তিলচট্টা’কে অন্য নামে ডেকে একপ্রস্থ সম্মান জানানোই যায়!

আরশোলা (Cockroach) শব্দটা শুনলেই অনেক বীরপুরুষদেরও বুক দুরুদুরু করতে শুরু করে। আরশোলা বা ককরোচকে বিভিন্ন ভাষায় কী নামে ডাকা হয়? তিলচট্টা থেকে কর্কটকীট, জেনে নেওয়া যাক আরশোলার নামকরণের মজাদার ও বিচিত্র ইতিহাস।

আরশোলা শব্দটা শুনলেই অনেক বীরপুরুষের বুক দুরুদুরু করতে শুরু করে। বিশেষ করে যখন ডানা মেলে সে সটান উড়ে এসে গায়ে বসতে চায়, তখন ড্রয়িংরুমের সোফার কোনটাই মনে হয় একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রান্নাঘর থেকে বাথরুম, সবচেয়ে দীর্ঘজীবী এই জীবটি কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। কখনও আলমারির ফাঁকে, কখনও বা বইয়ের তাকে এর দেখা মিলবেই। যাকে আমরা ভালোবেসে বা ভয়ে ‘আরশোলা’ বলি, তাকে একটু কর্পোরেট সম্মান দিতে গিয়ে আবার ‘ককরোচ’ বলেও ডাকি। শোনা যায় ককরোচক নাকি চিনাদের কাছে এক মুখরোচক ডিশ!

আরম্ভ করা যাক ইংরেজি ‘ককরোচ’ (Cockroach) দিয়ে। এটি কিন্তু খাঁটি ইংরেজি নয়, এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘কুকারাচা’ (Cucaracha) থেকে। যদিও স্পেনভ্রমণের সময় আরশোলাবাহিনী আমার চোখে পড়েনি। হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি বলয়ে এর নাম শুনলে মনে হবে জিভে জল আনা কোনও স্ট্রিট ফুড, ‘তিলচট্টা’। তেল বা তিল চেটে খায় বলেই বোধহয় এই নামকরণ! উত্তর ভারত কাঁপিয়ে এই নাম এখন পুরো হিট। অন্যদিকে মারাঠিতে তাকে ডাকা হয় ‘ঝুরল’ নামে, যা শুনলে মনে হয় কোনও ধ্রুপদী সঙ্গীতের বন্দীশ চলছে। আর গুজরাটিরা একে ডাকে ‘ভান্দো’ বলে। তা, বাড়িতে উড়ন্ত আরশোলা দেখলে তাকে বন্দনা করার সাধ কারই বা জাগে বলুন! যদিও কেউ কেউ আবার একেবারেই এই জীবটিকে পাত্তা দেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সমগ্রসাহিত্যে আরশোলার উল্লেখই করেননি। মনে হয়, তাঁর রেড-গ্রিন কালার ব্লাইন্ড হওয়াটাই এজন্যে দায়ী। খুবই ম্লান লাগতে প্রাণীটিকে তাঁর। যেমন ইউরোপে ভ্রমণের সময় চেরিফুলের কোনও উল্লেখ নেই তাঁর লেখায়।এখানেও সেই আংশিক বর্ণান্ধতাই দায়ী।

চরম খাদ্যসংকটের সময় আরশোলাবাবাজি এমন সব জিনিস খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে যা অন্য কোনও প্রাণী ভাবতেও পারবে না। যেমন— গাছের ছাল, কাগজ, আঠা, সাবান, চুল, চামড়া, এমনকি কাপড়ের টুকরো! তাদের পেটে এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা এই সমস্ত অদ্ভুত জিনিসকেও হজম করিয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে রূপান্তর করতে পারে।

পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী আছে যাদের দেখলে আমরা হয়তো ভয়ে বা ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিই, কিন্তু তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদেরও রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেয়। এই তালিকায় সবার উপরে রয়েছে — আরশোলা। ডাইনোসররা পৃথিবীতে আসারও প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর আগে থেকে এই গ্রহে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরশোলা। প্রায় ৩২ কোটি (৩২০ মিলিয়ন) বছর ধরে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া একাধিক মহাপ্লাবন, উল্কাপাত, হিমযুগ, নিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফোরণ, মহাপ্রলয়কেও অনায়াসে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে রয়েছে তারা। কিন্তু কীভাবে? কোন জাদুবলে আজ এত বছর ধরে আরশোলা অবিনশ্বর? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে তাদের বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য কিছু শারীরিক ও বিবর্তনের রহস্য।

একটি সাধারণ আরশোলা জল ছাড়া প্রায় এক সপ্তাহ এবং কোনও খাবার ছাড়া এক মাসেরও বেশি সময় অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশে তারা নিজেদের মেটাবলিজম (Metabolism) মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফেলে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে পারে।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটি বৈজ্ঞানিক সত্য। একটি আরশোলার মাথা কেটে ফেলার পরও সে প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে! এর কারণ হল, মানুষের মতো আরশোলা নাক বা মুখ দিয়ে শ্বাস নেয় না। তাদের শরীরের পাশে ছোট ছোট অসংখ্য ছিদ্র থাকে, যা দিয়ে তারা অক্সিজেন গ্রহণ করে। এছাড়া তাদের রক্তচাপ মানুষের মতো নয় এবং তাদের স্নায়ুতন্ত্র পুরো শরীরে ছড়িয়ে থাকে। মাথা কাটার পর মূলত জল খেতে না পারার কারণে শেষ পর্যন্ত জলশূন্যতায় ভুগে তারা মারা যায়।

জনপ্রিয় একটি কথা প্রচলিত আছে — “পৃথিবীতে যদি কখনও পারমাণবিক যুদ্ধ হয়, তবে একমাত্র আরশোলাই বেঁচে থাকবে।” যদিও আধুনিক বিজ্ঞান বলে তারা সম্পূর্ণ অমর নয়, তবে আরশোলার পরমাণু বিকিরণ সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি! তাদের কোষ বিভাজনের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় ক্ষতিকর রেডিয়েশন তাদের ডিএনএ-র সহজে ক্ষতি করতে পারে না।

আরশোলার শরীরের ওপরের শক্ত খোলস বা এক্সোস্কেলিটন (Exoskeleton) অত্যন্ত নমনীয় ও শক্তিশালী। এরা নিজেদের শরীরের উচ্চতাকে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলতে পারে। ফলে মাটির সামান্যতম ফাটল, দেওয়ালের কোণ কিংবা যেকোনো সরু জায়গার ভেতরে এরা নিজেদের চ্যাপ্টা করে লুকিয়ে ফেলতে পারে।

মানুষের তৈরি হিট বা বিভিন্ন ক্ষতিকর পেস্ট কন্ট্রোল কেমিক্যাল (কীটনাশক) দিয়ে আরশোলা মারা এখন দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ আরশোলা খুব দ্রুত নিজেদের জিনে পরিবর্তন আনতে পারে। এক প্রজন্মের ওপর যে বিষ কাজ করে, তার পরের প্রজন্ম সেই বিষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে জন্মায়।

আরশোলা কোনো ‘লিভিং ফসিল’ বা স্থবির প্রাণী নয়, বরং তারা বিবর্তনের অন্যতম সেরা উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতাই তাদের আজ কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রকৃতিতে মানুষ আসার বহু আগে থেকেই তারা ছিল, আর প্রকৃতির নিয়ম বলছে— হয়তো মানুষের বিদায়ের পরও তারা থেকে যাবে!

তারাপদ রায়ের ‘আরশোলা ও নিদারুণ বার্তা’ গল্প থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি না দিলে আরশোলাদের প্রতি অবিচার করা হবে।

“আচার্য মহাশয়ের বাড়ির সদরে তাহার ভ্রাতুস্পুত্রী করতোয়ার সহিত সাক্ষাৎ হইল। আচার্য মহাশয় চিরকুমার। এই বৃদ্ধ বয়সে এই ভ্রাতৃ-কন্যাটি তাঁহার একচ্ছত্র সঙ্গিনী। আমাকে দেখিয়া করতোয়া স্মিতহাস্য করিল, আপনি তাহলে এসে গেলেন! সে আমাকে কয়েকবারই দেখিয়াছে, তাহার জ্যেঠামহাশয়ের এই অনুগ্রাহকটিকে বিশেষ মমতার সঙ্গে দেখে।

আমি প্রশ্ন করিলাম–এবার কী?

মৃদু হাসিয়া করতোয়া জবাব দিল, আরশোলা। ইতিপূর্বে শূকর-দুগ্ধ এবং হজমি মশলা খাইয়া গিয়াছি, আরশোলা শুনিয়া হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। ভাবিলাম তখনই ফিরিয়া যাই। করতোয়া বোধহয় আমার মনোভাব বুঝিতে পারিল, বলিল, ভয় নেই, আসুন। আরশোলা খেতে হবে না।

বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিতে যাইব, এমন সময় আকস্মিক গুলির শব্দে চমকিয়া উঠিলাম। তাকাইয়া দেখি একতলার চিলেকোঠার ছাদে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে মুখ করিয়া আচার্য মহাশয় বন্দুকের আওয়াজ করিতেছেন। কী লক্ষ করিয়া করিতেছেন কিছুই বুঝিতে পারিলাম না।

করতোয়াকে আবার প্রশ্ন করিতে হইল। করতোয়া বলিল, জ্যেঠামশায় পাক্ষিক নিদারুণ বার্তার সম্পাদক নিবারণ সামন্তের বাড়ির দিকে ফঁকা আওয়াজ করছেন। নিদারুণ বার্তায় ওঁর একটা থিসিসের যাচ্ছেতাই সমালোচনা করা হয়েছে। সে যাহোক, ভয়ের কিছু নেই।

একটু পরেই আচার্য মহাশয় নামিয়া আসিলেন, ভীষণ উত্তেজিত। সেই টালিগঞ্জ থানায় প্রথমদিন যেরকম দেখিয়াছিলাম। আমাকে দেখিয়া কিছুটা শান্ত হইলেন। কিছুক্ষণ কুশল প্রশ্নাদি করিয়া ভিতরের ঘরে গিয়া একতাড়া কাগজ লইয়া আসিলেন। তাহার পরে করতোয়াকে ডাকিলেন, করতোয়া মা, এটা একবার পড়ে শোনা তো!

পিতৃব্যের আজ্ঞাতে আমার দিকে তাকাইয়া একটু মুচকি হাসিয়া নিয়া করতোয়া পড়িতে লাগিল। প্রবন্ধটির নাম কেশ-চর্চা এবং আরশোলা। অত দীর্ঘ প্রবন্ধ উদ্ধৃত করিয়া লাভ নাই। সারাংশ এইরকম:

আরশোলাকে কোথাও কোথাও তেলাচুরা বলা হইয়া থাকে। ইহার কারণ এই যে, ইহা মাথা হইতে নিদ্রাকালে তেল শুষিয়া লয়। অনেক সময় চুলও খাইয়া ফেলে। যে স্থানের চুল খায় সেখানে আর চুল গজাইতে চাহে না। ইহা প্রায় সকলেই জানেন।

আরশোলার যখন এবম্বিধ প্রকৃতির পরিচয় মানুষ মাত্রেই জ্ঞাত আছেন, ইহাকে অনায়াসেই মানুষের কাজে নিয়োগ করা যাইতে পারে। রজক, ক্ষৌরকার ইত্যাদি বাবদ প্রত্যেক গৃহস্থেরই এদেশে যথেষ্ট ব্যয় হয়। কিন্তু বিলাত ইত্যাদি দেশে কাপড় কাচিবার যন্ত্র, এমনকী দাড়ি কামাইবার বৈদ্যুতিক যন্ত্র আবিষ্কার হইয়াছে।

আমাদের দরিদ্র দেশের পক্ষে এইগুলি খুবই ব্যয়সাধ্য। সকলের ব্যবহার করিবার আর্থিক যোগ্যতা নাই।

জীব-জন্তুকে শিক্ষিত করিয়া নানাবিধ কার্য সম্পাদন করা যায়। বানর, হাতি, ঘোড়া, কুকুর, এমনকী পাখিও নানা কাজ করিতে পারে। আরশোলাকেও উপযুক্ত ট্রেনিং দিতে পারিলে তাহার দ্বারা কোনও কার্য অসম্ভব নহে। যথাসময়ে মাথায় ছাড়িয়া দিলে উপযুক্ত পরিমাণ চুল খাইয়া লইলেই চুল কাটার কাজ হইয়া যাইবে। প্রথম দিকে শিশুদের মাথায় ছাড়িয়া এবং গায়ে সুতা বাঁধিয়া মাথায় ঠিকমতো চালাইলে পরে ভাল কাজ পাওয়া সম্ভব।

এক-একটি আরশোলা গড়ে নয়মাস বাঁচে, অর্থাৎ একটি সামান্য আরশোলা নয়বার চুল কাটা এবং দুইশত সত্তর বার (যাঁহারা দৈনিক দাড়ি কামান) দাড়ি কামানোর খরচ বাঁচাইতে পারিবে।…

করতোয়া যখন প্রবন্ধটি পাঠ করিতেছিল, প্রত্যেক অংশ শুনিতে শুনিতে আচার্য মহাশয়ের মুখভাব উজ্জ্বল হইয়া উঠিতেছিল। আমার প্রায় কিছুই বলিবার ছিল না। শুধু জানিতে চাহিলাম, এইরূপ ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোনও আরশোলা…

আচার্য মহাশয় আমাকে বাক্য সম্পূর্ণ করিতে দিলেন না। একটি কাঁচের বাক্স বারান্দা হইতে লইয়া আসিলেন। তাহাতে দশ-পনেরোটি আরশোলা এবং একটি প্লেটে অল্প একটু দুধ রহিয়াছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, প্লেটে কী, দুধ?

উপরের ছাদে আরেকটি খাঁচা আনিবার জন্য আচার্য মহাশয় উঠিয়া গিয়াছিলেন, করতোয়া ছিল, সেই জবাব দিল, হ্যা দুধ খেলে ওদের বুদ্ধি হবে। আচার্য মহাশয় ঘরে ঢুকিতে ঢুকিতে করতোয়ার কথা ধরিলেন, দুধ হল স্নেহ পদার্থ, এতে বুদ্ধি হবে। তবে তেলই ওদের খাদ্য, তবে সেটা দিলে মাথার চুলের তেল আর ওরা খেতে চাইবে না।

সন্দেহ নাই, অকাট্য যুক্তি। কিন্তু স্থানীয় পাক্ষিক নিদারুণ বার্তার মুর্থ সম্পাদক নিবারণ সামন্ত আচার্য মহাশয়ের এই গবেষণাকে পাগলামি বলিয়া হাসি-তামাসা করিয়াছে। আজ সকালেই নিদারুণ বার্তার বর্তমান সংখ্যা আচার্য মহাশয়ের হস্তগত হইয়াছে। পাঠ করিয়াই ছাদে উঠিয়া নিবারণ সামন্তের বাড়ির দিকে মুখ করিয়া তিনবার বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করিয়াছেন।

আরশোলার বুদ্ধি এবং নিবারণ সামন্তের বুদ্ধির অভাব বিষয়ে আচার্য মহাশয়ের সঙ্গে সেইদিন সারা দুপুর আলোচনা করিয়া বৈকালে করতোয়ার সঙ্গে গঙ্গাতীরে ভ্রমণ করিয়া সন্ধ্যাবেলা ফিরিয়া আসিলাম। কথা দিয়া আসিলাম, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আবার আসিব। আরশোলা দিয়া চুল কাটাইয়া যাইব। ততদিনে আরশোলাগুলি উপযুক্ত শিক্ষিত হইবে এইরূপ আশা করা গেল।

কিন্তু দুই সপ্তাহ লাগিল না। আচার্য মহাশয় গুরুতর অসুস্থ, করতোয়ার নামে প্রেরিত এক তার পাইয়া সাতদিনের মধ্যে আরেকবার যাইতে হইল।

আচার্য মহাশয়ের বিরূপ সমালোচনা করিবার পর নিবারণ সামন্ত একটু মর্মপীড়ায় ভুগিতেছিলেন। তাহা ছাড়া নিদারুণ বার্তার নয়জন ক্রেতার মধ্যে আচার্য মহাশয় একজন। তাই তিনি একদিন আচার্য মহাশয়ের সঙ্গে একটি আপোস-রফায় আসিবেন ইচ্ছায় একদিন তাঁহার বাড়িতে আসেন। সামন্ত মহাশয় বুদ্ধিমান ব্যক্তির ন্যায় এইবার আরশোলা বিষয়ে যথেষ্ট উৎসাহ প্রদর্শন করিতে থাকেন। সামন্তকে দেখিয়া আচার্য মহাশয় প্রথমে উত্তেজিত হইলেও পরে তাহার আচরণের পরিবর্তন দেখিয়া তাঁহাকে যথেষ্ট সৌজন্য প্রদর্শন করেন। আরশোলাগুলিকে কীভাবে শিক্ষা দেওয়া হইবে তাহা খাঁচা খুলিয়া দেখাইতে যান। কিন্তু ইতিমধ্যে দুধ-ক্ষীর ইত্যাদি স্নেহপদার্থ খাইয়া আরশোলাগুলি যে ভীমরুলের প্রকৃতি ধারণ করিয়াছে, ইহা সামন্ত বা আচার্য মহাশয় কেহই অনুমান করিতে পারেন নাই। খাঁচা খোলামাত্র পনেরোটি দুর্দান্ত আরশোলা তাহাদের দুইজনের উপর ঝাপাইয়া পড়ে। করতোয়া বঁটা লইয়া ছুটিয়া না আসিলে সেইদিনই বোধ হয় এই দুইজনকেই আরশোলার দংশনে প্রাণত্যাগ করিতে হইত।

বর্তমানে সামন্ত ও আচার্য মহাশয় দুইজনেই স্থানীয় হাসপাতালে পাশাপাশি শয্যায় চিকিৎসিত হইতেছেন। দুজনেরই মুখ এত ফুলিয়া গিয়াছে যে প্রথম দর্শনে কে নিবারণ সামন্ত আর কে রুদ্রনারায়ণ আচার্য ঠাহর করা কঠিন।

করতোয়াকেও একটি আরশোলা দংশন করিয়াছিল, তাহার বিশেষ কিছু হয় নাই, শুধু গণ্ডদেশ কিঞ্চিৎ রক্তিম ও স্ফীত হইয়াছে।”

তবে গালে কোন প্রজাতির আরশোলা কামড় বসিয়েছিল, লেখক তা খোলসা করে বলেননি!

আপনার মতামত লিখুন :

3 responses to “যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস”

  1. প্রবীর সামন্ত says:

    আরশোলা যে এক অদ্ভুত প্রাণী তা এই লেখা পড়ে বেশ ভাল বোঝা যায়। তারাপদবাবুর রচনা পাঠের পর আরশোলা যে আরও কিছু সাহস ও শক্তি সঞ্চার করিয়াছে তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না।
    চমৎকার রচনা। অনেক কিছু জানা ও বোঝা গেল।

  2. Prabir Acharya says:

    চমৎকার লেখা, আনন্দ হলো

  3. Asit Kumar Das says:

    আপনাদের অনেক ধন্যবাদ লেখাটি সম্বন্ধে নিজেদের মতামত জানানোর জন্যে। অনুপ্রাণিত হলাম।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev