খ্যাতিমান মানুষের জীবনযাপন, ঘরোয়া কথা, বিশ্বাস-উপলব্ধি, সৃজনকর্ম—এসব বিষয়ে প্রায় সকলেরই কমবেশি কৌতূহল থাকে। সাহিত্যসেবীও এর বাইরে নয়। এসব কথা ব্যক্তির আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা, তাঁর রোজনামচা কিংবা খুব কাছের মানুষের স্মৃতিচারণ থেকে অনেকখানিই জানতে পারা যায়। তবে এমন কিছু বিষয় থাকে যা স্পর্শকাতর বা গোপনীয় বা একান্ত ব্যক্তিগত—সেইসব তথ্য জানার সুযোগ সঙ্গতকারণেই সীমিত।
দুই
আমাদের হাতে আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের পাঁচ বিশিষ্ট স্রষ্টার পাঁচটি চিঠি আছে, যার ভেতর দিয়ে তাঁদের ঘরোয়া জীবন ও লেখালেখির বিষয়ে বেশ কৌতূহল-জাগানো অজানা খবরের সন্ধান মেলে। সেই কীর্তিমান পাঁচ কথাশিল্পী হলেন : তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮) ও আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯-১৯৯৫)। এই পাঁচজনই বাংলা কথাসাহিত্যের প্রধান রূপকারদের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। এঁরা খ্যাতিমান ও সুপরিচিত। তবুও পাঠকদের পুনঃস্মরণের জন্যে সংক্ষেপে এঁদের পরিচিতি এখানে পেশ করা হলো।
তিন
উপন্যাস ও ছোটগল্প—কথাসাহিত্যের এই দুই অঙ্গনেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনায়াস গমনাগমন। তবে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শীর্ষ ঔপন্যাসিক হিসেবেই মূলত চিহ্নিত। জন্মভূমি রাঢ়বঙ্গের জীবন, জনপদ ও সংস্কৃতি তাঁর লেখায় অসামান্য নৈপুণ্যে উঠে এসেছে। ছিলেন সামন্ত-পরিবারের সন্তান। তাই কখনো কখনো ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের প্রতি তাঁর একটি সূক্ষ্ম সহানুভূতি নজর এড়িয়ে যায় না। তবে গ্রামীণ অবক্ষয় এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে উঠতি পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব তাঁর গল্প-উপন্যাসে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। গ্রামীণ জীবন তাঁর গল্প-উপন্যাসে প্রাধান্য পেলেও নগরজীবনের ক্লেদ-গ্লানি-সংকট এবং সেইসঙ্গে মারী-মন্বন্তর, যুদ্ধ-দাঙ্গা, রাজনীতি-দেশভাগের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও উপেক্ষিত হয়নি। লোকায়ত জীবন—বিশেষ করে নিম্নবর্গের বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী, হাড়ি-ডোম, বেদে-বেদেনি, পটুয়া-হরকরা, মালাকার-লাঠিয়াল, কবিয়াল-যাত্রার নটনটী তাঁর কথাসাহিত্যে আপন গৌরব ও সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে স্থান করে নিয়েছে। একসময় তারাশঙ্কর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এ-কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। বিধানসভা ও রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে এক যুগেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘গণদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘কবি’, ‘জলসাঘর’, ‘পঞ্চগ্রাম’, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘আরোগ্য নিকেতন’ তাঁর প্রাতিস্বিক উপন্যাস। জ্ঞানপীঠ পুরস্কারসহ সাহিত্যজীবনে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। ১৯৭১ সালে কলকাতায় গঠিত বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতির তিনি ছিলেন সভাপতি।
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ‘কল্লোল-কালিকলম’-যুগের এক বিশিষ্ট কথাশিল্পী। ঔপন্যাসিক, গল্পকার, পত্রিকা-সম্পাদক ও চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সহপাঠী ও বাল্যবন্ধু। নজরুলের সঙ্গ-সান্নিধ্য তাঁকে নানাভাবে প্রভাবিত ও উপকৃত করেছিল। নজরুল সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণা ‘আমার বন্ধু নজরুল’ ও ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বে শ্রমজীবী মানুষ—বিশেষ করে কয়লাখনি-শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর উপন্যাস-উপাখ্যান সেকালে পাঠকসমাজের সশ্রদ্ধ মনোযোগ আকর্ষণ করে। অন্ত্যজশ্রেণির জীবনকথাও সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে। সূচনাপর্বে জীবনঘনিষ্ঠ যে সাহিত্য রচনা করে বাংলা কথাসাহিত্যে এক নতুন ধারার সংযোজন করেছিলেন, সেই পথে তাঁর যাত্রা অব্যাহত থাকেনি। পরে তিনি জনপ্রিয় ধারার লেখক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। চলচ্চিত্রও যে তাঁর সাহিত্যচর্চার অনেকখানি অন্তরায় হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর সম্পাদিত ‘কালিকলম’ পত্রিকা আধুনিক সাহিত্যান্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখপত্র হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। প্রায় দু’শো উপন্যাস তিনি লিখলেও বক্তব্য-বিষয় ও শিল্পমানের দিক দিয়ে বিশিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এমন সংখ্যা কমই— এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য : ‘কয়লাকুঠির দেশ’, ‘মহাযুদ্ধের ইতিহাস’, ‘হোমানল’, ‘বসুন্ধরা’, ‘ঝড়ো হাওয়া’, ‘বানভাসি’, ‘কাঁকনতলার মেয়ে’, ‘মাটির ঘর’ এবং আরও কিছু উপন্যাস। যে জীবনবাদী লেখক তাঁর প্রথম পর্বে গল্প-উপন্যাসে মুটে-মজুর, কুলি-কামিন, খনিশ্রমিক-কিষান, ভিখিরি-ভবঘুরে, সাঁওতাল-বাউড়ি নিম্নশ্রেণির জীবন-রূপায়ণে সফল-আত্মনিয়োগ করেছিলেন, পরে তাঁর গোত্রান্তর হলো—ছিন্ন হলো গভীর জীবনবীক্ষার সুতো।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-প্রেমেন্দ্র মিত্র-বুদ্ধদেব বসু—এঁরা ছিলেন ‘কল্লোল যুগে’র ত্রয়ী (trio)। চলনে-বলনে-চিন্তনে-লিখনে এই সব্যসাচী ‘ত্রয়ী’ ছিলেন আধুনিকতার উপাসক। প্রসঙ্গের বৈচিত্র্য, প্রকরণের অভিনবত্ব ও নিরীক্ষার বৈশিষ্ট্য অন্যদের থেকে এঁদের আলাদা করেছিল। উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও জীবনী—অচিন্ত্যকুমারের লেখনী চলেছে মূলত এই কয়টি ধারায়। ‘বেদে’—অন্ত্যজশ্রেণির জীবন নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আলোড়ন তুলেছিল। এতকাল উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল উচ্চবিত্ত, নিদেনপক্ষে মধ্যবিত্তের জীবন। এবারে তা নেমে এল আরও নিচে—একেবারে অন্ত্যজ নিম্নবর্গের অন্দরে। ছোটগল্পে আরও কিছুকাল তাঁর এই বিষয়-চেতনার অনুবর্তন চলল। কিন্তু আখেরে লেখক বাসা বাঁধলেন মধ্যবিত্তের রোমান্টিক ভাবালুতার আঙিনায়। মধ্যবিত্তের নাগরিক অস্তিত্বের সংকট, তার প্রেম ও প্রবঞ্চনা—স্বপ্ন ও বাস্তবতা—কুটিলতা ও সহমর্মিতা এসব মিলেমিশে মানুষের বিচিত্র প্রবণতা ও স্বভাবকে প্রকাশ করেছে। তিরিশ বছর আগেপিছে প্রকাশিত তাঁর ‘কাকজ্যোত্স্না’ ও ‘প্রথম কদম ফুল’ উপন্যাস দুটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। তাঁর ছোটগল্পের বইয়ের মধ্যে ‘টুটা-ফুটা’, ‘কাঠ খড় কেরোসিন’, ‘চাষাভূষা’, ‘হাড়ি মুচি ডোম’ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। শুরুর কালে কবি হিসেবে তিনি বেশ মনোযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু কবিতায় তাঁর তেমন সিদ্ধি এল না, অপর দুই বন্ধুর তুলনায়। অথচ ‘অমাবস্যা’, ‘প্রিয়া ও পৃথিবী’ কিংবা ‘নীল আকাশ’ তাঁকে যথার্থ কবি হিসেবে চিনে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। আসলে সৃজনশীল গদ্যরচনাই ছিল তাঁর সাহিত্যভুবনে বিচরণের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। স্বাদু গদ্যে স্মৃতিচর্চার অসাধারণ নিদর্শন যে ‘কল্লোল যুগ’, সেকথা কী করে ভোলা যায়! পঞ্চাশ-ষাটের দশকে এসে অচিন্ত্যকুমার তাঁর লেখার বিষয়ধারা বদলালেন। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে অনবদ্য আলাপচারী গদ্যে একের পর এক জীবনী লিখে যেতে লাগলেন—শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা দেবী, বিবেকানন্দ, গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও আরও অনেকের। এসব ছকে-বাঁধা জীবনী নয়, একে হয়তো বলা চলে উপন্যাস ও জীবনীর এক মিশ্ররূপ। ‘বেদে’ বা ‘কাঠ খড় কেরোসিন’-এর অচিন্ত্যকুমার মধ্যজীবনে অনেক সরে এসেছিলেন—চোখে-দেখা রক্তমাংসের মানুষ ধীরে ধীরে তাঁর চোখে আবছা হয়ে এসেছিল, লেখার ভেতর দিয়ে শরণ নিয়েছিলেন প্রিয় ধর্মীয় মানুষের। এই পর্বে ‘কল্লোল’-এর অন্যতম ঋত্বিকের চেনা মানুষ নিয়ে লেখা সবচেয়ে স্মরণীয় বই বন্ধু নজরুলের স্মৃতি-জীবনী—‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’।
প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘কল্লোল’ কালের এক বহুমাত্রিক সাহিত্যব্যক্তিত্ব। গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গোয়েন্দা ও কল্পকাহিনির লেখক, সাময়িকপত্র-সম্পাদক, চলচ্চিত্র পরিচালক— নানা পরিচয়ে তিনি চিহ্নিত। সাহিত্যজীবনের সূচনাপর্বে সমাজঘনিষ্ঠ বস্তুতান্ত্রিক কাহিনি-নির্মাণে অসামান্য কুশলতা দেখান। প্রথম উপন্যাস ‘পাঁক’ সেই সমাজ ও শিল্পবোধেরই পরিচয় বহন করে। তাঁর গল্প ও উপন্যাসে বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন, সংগ্রাম, সংশয়, টানাপোড়েন, প্রণয়, অনুরাগ, অবিশ্বাসের বিচিত্র অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ বা ‘সংসার সীমান্তে’ বাংলা শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পের বইয়ের মধ্যে আছে : ‘পঞ্চশর’, ‘বেনামী বন্দর’, ‘পুতুল ও প্রতিমা’, ‘মৃত্তিকা’, ‘মহানগর’, ‘ধূলিধূসর’, ‘জলপায়রা’, ‘সংসার সীমান্তে’। ‘পাঁক’-এর পর তিনি সমাজ ও মানবমনের বিচিত্র গতিপ্রকৃতি নিয়ে লিখেছিলেন এইসব উপন্যাস : ‘মিছিল’, ‘আগামীকাল’, ‘উপনয়ন’, ‘সাহসিকা’, ‘প্রতিধ্বনি ফেরে’, ‘মনুদ্বাদশ’, ‘অমলতাস’, ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’, ‘দ্বিতীয় জীবন’, ‘সূর্য যেখানে নীল’। রহস্য ও কল্পকাহিনির ঘনাদা, পরাশর বর্মা, মামাবাবু প্রভৃতি চরিত্রের স্রষ্টা। কবি হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা কম নয়। তাঁর কবিতায় সংগ্রাম-জীবন-প্রেম-প্রকৃতি এক হয়ে মিশে গেছে। প্রথম কবিতার বই ‘প্রথমা’র প্রকাশকাল ১৯৩২। অন্যান্য কবিতার বই : ‘সম্রাট’, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘সাগর থেকে ফেরা’, ‘হরিণ চিতা চিল’ ‘কখনো মেঘ’, ‘অথবা কিন্নর’, ‘নদীর নিকটে’। সম্পাদনা করেন ‘রংমশাল’, ‘কালিকলম’, ‘নবশক্তি’, পক্ষিরাজ’ এইসব পত্র-পত্রিকা। আশ্বিন ১৩৪২-এ বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর যুগ্ম-সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ‘কবিতা’ পত্রিকা। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক পুরস্কার-সম্মাননা-স্বীকৃতি লাভ করেন—তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য :সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্রপুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার, সাম্মানিক ডি.লিট.—বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, দেশিকোত্তম—বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
আধুনিক বাঙালি নারী-লেখকদের মধ্যে আশাপূর্ণা দেবী মনে-মেজাজে-ভাবে-কল্পনায় স্বভাবতই স্বতন্ত্র। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর আসন আজও সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত—প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ তাঁর হয়নি। চিরকাল যাপন করেছেন ঘরোয়া জীবন—বহির্জগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের অভিজ্ঞতা অল্পই ছিল। কিন্তু তাঁর গল্প-উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জীবনের যে ছবি ফুটে উঠেছে তা বিস্ময়কর। নারীজীবনের সীমাবদ্ধতা-নিগ্রহ-গ্লানির বিষয় অবশ্য তাঁর চেনা-জগত্ থেকেই আহরণ করেছেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়। তাঁর শ্রেষ্ঠ ও স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ ও ‘বকুলকথা’ উপন্যাস—এই ট্রিলজি নারীর অবরুদ্ধ জীবনের বেদনা ও নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক মহান শৈল্পিক দলিল। তাঁর উল্লেখ করার মতো গল্প-উপন্যাসের নাম : ‘নিলয়-নিবাস’, ‘দিব্যহাসিনীর দিনলিপি’, সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক’, ‘দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে’, ‘চিত্রকল্প’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘এই তো সেদিন’, ‘মনের মুখ’, ‘নষ্টকোষ্ঠী’, ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাস’, ‘নেপথ্য নায়িকা’, ‘লঘু ত্রিপদী’, ‘শৃঙ্খলিতা’, ‘সুখের চাবি’, ‘বালির নিচে ঢেউ’, ‘বলয়গ্রাস’, ‘নির্জন পৃথিবী’, ‘ছাড়পত্র’, ‘প্রথম লগ্ন’, উত্তরলিপি’, ‘আলোর স্বাক্ষর, ‘একটি সন্ধ্যা একটি সকাল’, ‘উত্তরণ’, ‘প্রেম ও প্রয়োজন’ ‘উন্মোচন’, ‘বহিরঙ্গ’, ‘আবহসংগীত’। রহস্যকাহিনি ও ছোটদের জন্যে তাঁর লেখাও যথেষ্ট জনপ্রিয়। এ-বিষয়ে উল্লেখ করা যায় এই বইগুলোর কথা : ‘গজ উকিলের হত্যারহস্য’, ‘অলয় আদিত্যের ইচ্ছাপত্র রহস্য’, ‘ভুতুড়ে কুকুর’, ‘মজারু মামা’, ‘রাজকুমারের পোশাকে’। সাহিত্যচর্চার জন্যে পেয়েছেন রবীন্দ্রপুরস্কার, জগত্তারিণী স্বর্ণপদক—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য অকাদেমির ফেলোশিপ, দেশিকোত্তম—বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।
চার
তারাশঙ্কর-শৈলজানন্দ-অচিন্ত্যকুমার-প্রেমেন্দ্র-আশাপূর্ণা—এই পাঁচ বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিকের কাছে রণজিত্কুমার সেন লিখিত ছ’টি প্রশ্ন পেশ করে তাঁদের জবাব জানতে চান। তাঁরা চিঠিতে এই প্রশ্নাবলির জবাব দেন। প্রাবন্ধিক-কথাশিল্পী-নাট্যকার-গীতিকার-সাময়িকপত্রসেবী অনুজপ্রতিম রণজিত্কুমারের সঙ্গে যে উত্তরদাতাদের স্নেহ-শ্রদ্ধার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল তা তাঁদের চিঠি থেকেই বেশ বোঝা যায়। প্রশ্নগুলোর জবাব নিয়ে রণজিত্কুমারের হয়তো কোনো লেখার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক তা আর বোধহয় হয়ে ওঠেনি। ক্রমানুসারে প্রশ্নগুলো ছিল এইরকম : ১. কখন লেখেন? ২. পুজো-অর্চনা করেন কি না? ৩. কোনো নেশায় কি আসক্ত? ৪. লেখায় কাটাকুটি হয় কি না? ৫. লেখার সময় কি নির্জনতার পরিবেশ প্রয়োজন হয়? ৬. লেখা শেষ হওয়ার পর মানসিক অনুভূতি কেমন হয়?
প্রথম প্রশ্নের জবাবে তারাশঙ্কর জানান, ১৯৫২ সালের আগে দিনেরাতে সমানে লিখতেন। আর এখন সকাল-সন্ধ্যে লিখতে বসেন। শৈলজানন্দের জবাব, তিনি মূলত সকালবেলায় লেখেন। তবে কখনো কখনো বিকেলে ও সন্ধ্যায়ও লিখতে বসতে হয়, সেক্ষেত্রে ‘কিন্তু লেখায় মন বসে না’। অচিন্ত্যকুমার সকাল ন’টায় লিখতে বা পড়তে বসেন। দুপুরে স্নানাহারের পর আবার লেখার কাজ শুরু করেন। সন্ধ্যে থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত একটানা লিখে চলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখালেখির বাঁধাধরা কোনো সময় নেই—‘সকাল বিকেল দুপুর যেকোনো সময়ই’ লিখে থাকেন। এ-বিষয়ে আশাপূর্ণার সাফ জবাব, সময় পেলেই তিনি লেখেন তা সে ‘দিনে রাত্রে সকালে সন্ধ্যায় যখন হোক’।
পুজো-অর্চনার প্রশ্নে তারাশঙ্কর যে জবাব দেন তাতে তাঁকে মোটামুটি নিষ্ঠ ধার্মিক বলেই ধরা যায়—‘ট্রেনে মোটরে প্লেনেও ইষ্ট স্মরণ নিয়মিত ক’রে যাই’। শৈলজানন্দের পুজো-আহ্নিকের নির্ধারিত সময় নেই, তিনি নিজেই ‘সান্নিধ্য সাধনা’ বলে একটি ‘অভিনব পদ্ধতি’ আবিষ্কার করে তা অনুসরণ করেন। অচিন্ত্যকুমার পুজো-আহ্নিক কিছু করেন না, তবে ‘সবসময়ে নামে থাকতে চেষ্টা’ করেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনে কখনোই ‘পুজো-আহ্নিক জাতীয় কিছু’ করেননি—স্পষ্ট করেই বলেছেন তিনি : ‘লেখা ত বটেই, যখন যা করি তাই আমার পুজো’। আর এ-বিষয়ে আশাপূর্ণার স্পষ্ট অথচ সংক্ষিপ্ততম জবাব—‘না’।
এর পরের প্রশ্ন ছিল কোনো নেশায় আসক্ত কি না এ-বিষয়ে। তারাশঙ্কর ষোলো বছর বয়সে ধূমপান শুরু করেছিলেন, কবুল করেছেন : ‘১৯৬৫ সালের আগে আমি একজন অতি আসক্ত ধূমপায়ী ছিলাম’। শৈলজানন্দও নিত্য ধূমপায়ী, তবে পরে সিগারেট ত্যাগ করে ধরেন বিড়ি। অচিন্ত্যকুমারের নিজের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘হেভি স্মোকার’, অবশ্য রবীন্দ্রপ্রয়াণের (১৯৪১) পর সিগারেট একেবারে ছেড়ে দেন। তবে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর ধূমপান-ত্যাগের কী সম্পর্ক তা ঠিক বোঝা গেল না। তাঁর নেশার মধ্যে শেষপর্যন্ত টিকে থাকে চা। নস্যি ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের একমাত্র নেশা, তা ছাড়ার পর আর ফিরে আসেনি। আশাপূর্ণার কোনো নেশাতেই আসক্ত হওয়ার ইতিহাস নেই।
লেখায় কাটাকুটি হয় কি না এ-বিষয়ে তারাশঙ্কর প্রশ্নকর্তাকেই তাঁর প্রেরিত চিঠি দেখে বিচার করতে বলেছেন। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন : ‘তবে প্রথম লিখতে বসেই কাটাকুটো হলে কাগজ ফেলে দিই’। শৈলজানন্দের লেখা স্পষ্ট-পরিষ্কার, তাঁর বক্তব্য :‘লেখায় কাটাকুটি আমার খুব কম হয়’। অচিন্ত্যকুমারেরও ‘লেখায় কাটাকুটি কম থাকে’, কিন্তু বেশি রদবদলের প্রয়োজন হলে পুরো পাতাটাই বাতিল করে দেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ব্যাপারটা আবার মিশ্র : ‘কাটাকুটি কখনো খুব হয়, কখনো একেবারেই হয় না’—এই তাঁর বক্তব্য। আশাপূর্ণার পক্ষ থেকে এই প্রশ্নের জবাব খুব স্পষ্ট হয়নি। এ-বিষয়ে তিনি তাঁর পাণ্ডুলিপির কম্পোজিটারকে দোহাই মেনেছেন এবং সেইসঙ্গে এ-কথাও জানিয়েছেন : ‘কখনোই কোনো লেখা দুবার লিখি না’।
লেখার সময় নির্জনতা প্রয়োজন হয় কি না সে প্রশ্নের জবাবে তারাশঙ্কর বলেন, নির্জনতার প্রয়োজন আছে, হলে মন্দ হয় না, ‘কিন্তু বহুজনের মধ্যেও চিন্তামগ্নতার মধ্যে একটি নির্জনতার সৃষ্টি ক’রে নেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেছে’। পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে শৈলজানন্দ সংগতভাবেই উল্লেখ করেছেন : ‘লেখার সময় নির্জনতা চাই, কিন্তু পাচ্ছি কোথায়?’ অচিন্ত্যকুমার নির্জনতাকামী, পেয়েছেনও সেই পরিবেশ—তাই তিনি বলতে পারেন : ‘আমি নির্জনে লিখি—ঈশ্বর আমাকে নির্জনে রেখেছেন’। শুরুটার জন্যে খানিক কোলাহলমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন—তবে ‘মন একবার বসে গেলে ভিড়ের মধ্যে লিখতে খুব আটকায় না’—এই মন্তব্য প্রেমেন্দ্র মিত্রের। আর জনবহুল পারিবারিক পরিবেশে লেখার জন্যে নির্জনতা পাওয়া ভারি দুষ্কর—তাই সখেদে আশাপূর্ণা বলেন : ‘চাই কিন্তু পাই কই?’
শেষ প্রশ্ন ছিল কোনো লেখা সমাপ্তির পর মানসিক অবস্থা কেমন হয়! এ-সম্পর্কে তারাশঙ্কর বলেছেন, লেখার ভালো-মন্দের ওপর মানসিক অবস্থার হেরফের হয়—ভালো হলে ‘মন উচ্ছ্বসিত হয় উল্লাসে ভ’রে ওঠে’ আর ‘মন খারাপ’ হয় লেখা মন্দ হলে। শৈলজানন্দের খুঁতখুঁতে স্বভাবের কারণে লেখা শেষ হলে এর ভালো-মন্দ নিয়ে তাঁর মনে দ্বন্দ্ব জাগে। পরের লেখা আরও ভালো করে লেখার সংকল্প করেন। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, যে-লেখা তাঁর মনঃপূত হয়নি অথচ সেই লেখাটিই উচ্চপ্রশংসিত হয়েছে। কোনো লেখা শেষ হলে মনে বিশেষ আনন্দ জাগে এই ভেবে যে আরও একটি নতুন লেখায় হাত দেওয়া যাবে— এই অনুভূতি অচিন্ত্যকুমারের। লেখা শেষ হলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নিজেকে নির্ভার মনে হয়, ‘একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস’ ছেড়ে চেষ্টা করেন লেখাটাকে মন থেকে মুছে ফেলতে। আশাপূর্ণা একটু রসিয়ে বলেছেন, লেখা শেষ হওয়ার পর মানসিক অবস্থা হয়—‘বাঁচলাম বাবা’। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন এইভাবে : ‘প্রেরণার স্বাদ ভুলে গেছি, অবিরত তাগাদাই মিটিয়ে চলেছি’।
প্রিয় পাঠক! পাঁচ কথাশিল্পীর অন্তরঙ্গ ব্যক্তিগত প্রতিবেদন এই পত্রগুচ্ছ। এর ভেতরে তাঁদের শিল্পলোকের অন্দর ও অন্তরমহলের নিখাদ খবরের সুলুক মিলবে। এই পাঁচ স্মরণীয় লেখকের কেউই আর আজ আমাদের মাঝে নেই—তবে ভিন্ন অর্থে তাঁরা আছেন, তাঁদের সৃষ্টিকর্মে। আর পঞ্চাশ বছর আগে লেখা এই পত্রালির ভেতর দিয়ে আমরা তাঁদের সান্নিধ্য অনুভব করতে পারব—তাঁদের কথার স্পর্শে পুলকিত হওয়ার সুযোগ মিলবে। তাই কোনোরূপ সংস্কার-সংশোধন ছাড়াই চিঠিগুলো অবিকল মুদ্রিত হলো।
চিঠি : ১
তারাশঙ্কর, ফোন : ৫০-৫৫৯৩
টালাপার্ক এ্যাভেন্যু, কলিকাতা-২
স্নেহ ও প্রীতিভাজনেষু
রণজিত তোমার পোস্টকার্ড পেয়েছি। তোমার প্রশ্নগুলির জবাব যথাসাধ্য দিলাম। আমার জীবনে পরিবর্তন ঘটেছে বারবার। তার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালির ধারাও বদলেছে—সুতরাং উত্তরগুলিকে দুই সময়বৃত্তের গণ্ডীর মধ্যে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে দিলাম।
আমার ভালবাসা নাও।
ইতি
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯৫২ সালে[র] আগে
১। কখন লিখি?—সকালে উঠে চিরকালই ছাত্রের মত পড়তে লিখতে বসি[।] কিন্তু ১৯৫২ সালে[র] আগে তার সঙ্গে এও অভ্যাস ছিল যে লেখা আরম্ভ করে দিনরাত্রিই লিখছি। জলসাঘর লিখেছিলাম ১৯৩৩ সালের মার্চ্চ মাসে। লাভপুর থেকে গল্পটা মনে মনে খসড়া করতে করতে কলকাতায় এসে সন্ধ্যে বেলা ৮টা নাগাদ লিখতে বসলাম—রাত্রি ৯টা পর্য্যন্ত লিখে ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে উঠে আবার বসলাম এবং বেলা চারটে নাগাদ শেষ করে বঙ্গশ্রী আপিসে গিয়ে দিয়ে এলাম। ১৯৪১ সালে বাসা করি। সে বার পুজোর সময় গল্প লিখেছিলাম ১০টারও বেশী[,] দিনরাত্রিই লিখেছি তখন। খাওয়া স্নান করাও সময় মত হ’ত না।
২। ১৯৫২/৫৩ সালের পর অভ্যাস পাল্টেছে। ভোরে এখনও উঠি, বেশী ভোরে উঠি। সকালেই সেই ছাত্রের মত বসি লেখার আসনে। ১২টা পর্য্যন্ত লিখে উঠি। আবার সন্ধ্যে বেলা বসি।
তবে লেখাটা সব সময়ই মনের মধ্যে ঘোরে। অনেক সময় স্বপ্নও দেখি। যা লিখছি—তাই স্বপ্ন দেখি। সঙ্গতি রাখা স্বপ্ন নয়। তবে দু একটা ক্ষেত্রে সঙ্গতি রেখেও গল্পটা স্বপ্নে ঘটেছে এবং গল্পেও ঠিক তাই রেখেছি।
৩। ১৯৬৫ সালের আগে আমি একজন অতি আসক্ত ধূমপায়ী ছিলাম। ১৬ বছর বয়স থেকেই ধরেছিলাম। ১৯৪১/৪২ সাল নাগাদ এটা বাড়তে আসন শেষ করে উঠে বেরিয়ে আসি— ৫।।টা পৌনে ছ-টা। ছটাও হয় কোন কোন দিন। শীতকালে এটা দাঁড়ায় পৌনে সাতটা— সাতটা। লেখার সঙ্গে পূজার কোন সম্পর্ক নেই। পূজার সঙ্গে সম্পর্ক নিত্যকর্ম্মের। ট্রেনে মোটরে প্লেনেও ইষ্ট স্মরণ নিয়মিত ক’রে যাই। তখন অবশ্য যৌগিক আসনগুলি বাদ পড়ে।
৪। লেখায় কাটাকুটি বেশী বা কম সেটা তুমি আমার এই পত্রের কাটাকুটি দেখে ঠিক করে নিয়ো। ওটা এ্যাসেস করবে তুমি। আমার লেখার কাটাকুটাকেও যেভাবে লালকালি দিয়ে রঙ ক’রে দিই তাও দিলাম। তবে প্রথম লিখতে বসেই কাটাকুটো হলে কাগজ ফেলে দিই। এবং দু পৃষ্ঠা চার পৃষ্ঠা প্রায়ই বাতিল ক’রে দি। অনেক সময় শেষ পৃষ্ঠাটা নতুন ক’রে লিখে মনে মনে লেখার সুতোয় পাক দিয়ে জুড়ে নিয়ে এগিয়ে চলি। গণদেবতা পঞ্চগ্রাম প্রায় ১০০০ পৃষ্ঠার বই। এর প্রথম ৮০ পৃষ্ঠা ছাড়া বাকীটা পুরো দুবার লেখা। প্রায় বইই তাই। প্রথম প্রকাশের সময় যা থাকে— দ্বিতীয় বা গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় তাকে নতুন ক’রে লিখি। এও এক রকমের কাটাকুটি।
৫। লেখার সময় লোকজন আসে। অভ্যাস বশে বিঘ্ন কিছু হয় না। কলম রেখে কথা-বার্ত্তা বলে নি। তারপর আবার কলম নিয়ে বসি। ব্যাঘাত কিছু হয় না। অনেক সময় ফাউন্টেন পেন খুলে রাখলে যেমন নিবের মুখের কালী শুকিয়ে যায়, তেমনি ভাবেই লেখার খেই হারিয়ে যায় বা ধারার মুখটা শুকিয়ে যায় তখন ফাউন্টেন ঝেড়ে নেওয়ার মত, মনকে ঝাঁকি দিতে হয়। আগে সিগারেট খেতাম চা খেতাম। বাগান করার শখ ছিল, এখনও আছে—উঠে গিয়ে বাগানে কিছুটা কাজ ক’রে আসি—বা রাস্তায় একটু দাঁড়িয়ে থাকি। আবার লেখাটাকে মনের মধ্যে জাগিয়ে নিয়ে ফিরে এসে আসনে বসি। নির্জ্জনতা প্রয়োজন হয় না একথা বলব না। হলে ভাল হয় কিন্তু বহুজনের মধ্যেও চিন্তামগ্নতার মধ্যে একটি নির্জ্জনতার সৃষ্টি ক’রে নেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে আসন ছাড়া লিখাতে অসুবিধা হয়। বাইরে গিয়ে লেখা ঠিক আমার হয় না।
৬। লেখা শেষ হলে লেখাটির সার্থকতা অসার্থকতার উপর মানসিক অবস্থার তারতম্য হয়। লেখা ভাল হয়েছে বা মন্দ হয়েছে এ সম্পর্কে ভুল খুব কমই হয়। লেখা ভাল হলে মন উচ্ছ্বসিত হয় উল্লাসে ভ’রে ওঠে। খারাপ হ’লে মন খারাপ হয়ে পড়ে।
আশা করি এতেই তোমার প্রয়োজন মিটবে।
ইতি
শুভার্থী
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
পুঃ— এই চিঠিখানি সম্পূর্ণ বা অংশ-বিশেষ আমার উক্তি বা লেখা হিসাবে উদ্ধৃত করতে পারবে না। এর থেকে নিয়ে তুমি তোমার উক্তি হিসেবে যা লিখবার লিখো। কারণ আমার সম্পর্কে আমার লেখা ছাপা না-হওয়াই উচিত্।
৫/৭/৬৮
শ্রীযুক্ত রণজিৎ কুমার সেন
২৪/এন গরচা ফার্ষ্ট লেন, কলিকাতা—১৯
24/N Garcha First Lane, Calcutta- 19.
চিঠি : ২
শৈলজানন্দ, PHONE : 50-5436
137-1, INDRA BISWAS ROAD, CALCUTTA-37
৮/৭/৬৮
কল্যাণীয়েষু,
চিঠি পেয়েছি। তোমার প্রশ্নের জবাব লিখে দিলাম।
১। আমি লিখি সকাল বেলায়। চেষ্টা করেও দুপুরে কখনও লিখতে পারিনি। কাজের চাপ পড়লে বিকেলে এবং সন্ধ্যায় লিখতে বসি বটে, কিন্তু লেখায় মন বসে না।
২। আমি প্রত্যহ ঘুম থেকে উঠি ভোর পাঁচটায়। প্রাতঃকৃত্য সারতে দাঁত মাজতে আধ ঘণ্টা। তারপর কয়েকখানা বিস্কুট আর চা খেয়ে লিখতে বসি। পূজো-আহ্নিকের কোনও নির্দিষ্ট সময় আমার নেই। (লেখা উচিত নয় তবু লিখছি। পূজো-আহ্নিকের কথা জানতে চেয়েছ তাই জানাচ্ছি। কিছুদিন থেকে আমি একটি অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেছি।— ‘সান্নিধ্য সাধনা’। খুব শক্ত। কিন্তু আনন্দের। এর কোনও নির্দিষ্ট সময়ের দরকার নেই। সব সময়ই এর সময়।)
৩। লিখতে বসে আগে খুব সিগারেট খেতাম। ব্লাড প্রেসার খুব বেশি, ডাক্তার তাই বারণ করেছেন। সিগারেটের কাগজটা ভাল নয়, আর তামাকটাও নাকি পুরোপুরি তামাক নয়। তাই বিড়ি খাই।
৪। লেখায় কাটাকুটি আমার খুব কম হয়। এখন যদি-বা একটু-আধটু হয়, আগে তাও হতো না।
৫। লিখতে আমার খুব ভাল লাগে। খুব ভাল কাগজ আর ভাল কলম হাতে পেলে লেখার নেশায় আমি মশগুল হয়ে থাকতে পারি। লেখায় আমার কখনও বিরক্তি আসে না। বাধা পেলে খারাপ লাগে। ধরো, লিখছি, এমন সময় টেলিফোনের রিং বেজে উঠলো, নয়ত কোনও লোক এলো দেখা করতে— এগুলোকে এড়াতেও পারি না, ভালও লাগে না।
লেখার সময় নির্জনতা চাই, কিন্তু পাচ্ছি কোথায়?
৬। লিখে আমি যে-আনন্দ পাই সে-আনন্দ কোথাও পাই না। কিন্তু লেখা শেষ হলেই মনে হয়—এ-লেখাটা তেমন ভাল হলো না। এর পরের লেখাটা ভাল করে লিখবো। আবার এমনও হয়েছে যে-লেখা নিজে ভেবেছি ভাল হয়নি—সেই লেখার জন্যে অজস্র সুখ্যাতি পেয়েছি।
শুভাকাঙ্ক্ষী
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
শ্রীরণজিৎ কুমার সেন
স্নেহাস্পদেষু—
চিঠি : ৩
ঔং
২৩ রজনী সেন রোড, কলকাতা-২৬
৩/৭/৬৮
ভাই রণজিৎ,
তোমার হাতের লেখাটি কী সুন্দর!
তোমার প্রশ্নগুলির উত্তর পোস্টকার্ডে হবে না বুঝে খামে লিখছি—বিস্তৃতি মার্জনা কোরো।
১. কখন লিখি? নিচে পড়ার ঘরে সকাল নটায় টেবলে বসি—হয় লিখি নয় পড়ি। এমনি পড়া ছাড়াও আমাকে যে সব জীবনী লিখতে হয় (ইদানি[ং] যেমন ‘গৌরাঙ্গ পরিজন’ ও ‘ভাগবতী তনু’) তার জন্যে আমাকে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করতে হয়। বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত কাজ করি। তারপরে স্নানাহার সারি। আহারান্তে আবার টেবিলে লেখা নিয়ে বসি। দুপুরে আমি শুই না বা ঘুমুই না। যেমন আগে কর্মজীবনে কোর্টে যেতাম তেমনি সরাসরি আবার কাজে হাজির হই। বিকেল সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ ছুটি নিয়ে উপরে চলে যাই ও সন্ধে পর্যন্ত বিশ্রাম করি। তারপর সভা থাকলে বেরুই, নয়তো কোথাও একটু একা-একা ঘুরে আসি। ফিরে এসে আবার লেখা নিয়ে বসি, রাত এগারোটায় উঠে পড়ি। মাঝখানে খেয়ে নিতে আধঘণ্টাটাক সময় যায়। এগারোটায় উপরে গিয়ে এক ঘণ্টা পড়ি। বারোটা বেজে যাবার পর শুতে যাই।
আমি একসঙ্গে অনেক রকম লেখা লিখি। এখন যেমন একসঙ্গে ‘গৌরাঙ্গ-পরিজন’ (অমৃত), ‘ভাগবতী তনু (মাসিক বসুমতী), ‘বন্যাকন্যা’ (গল্পভারতী) ও ‘বীরেশ্বর বিবেকানন্দ’ (৩য় খণ্ড) লিখছি। ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’ (নজরুলজীবনী) সম্প্রতি স্থগিত আছে। তারপর ‘আইন-আদালত’ নিয়ে বইটাও শুরু করবার মুখে। আমি লেখার জন্যে কোন মুডের প্রতীক্ষা করি না। লেখা আমার কাছে উপাসনা। লেখা ও লেখার ভাবনা ছাড়া আমার মুহূর্ত নেই। ভগবত্ প্রসঙ্গে চলে আসার পর পত্রসংখ্যাই বা কত বেড়ে গেছে! পত্রের উত্তর দিতে কী আনন্দ, কী আনন্দ বন্ধুতার সম্প্রসারে! আমিই লিখেছিলাম ‘লেখনী সুখের খনি!’ মিথ্যে লিখিনি।
সাতাশ-আটাশ বছরের চাকরিতে একঘর বা কেবল শুধু রায় লিখেছি। তার উপরেও আমার বইয়ের টাইটেল প্রায় একশো হয়েছে। একেকটা টাইটেল আবার তিন-চার খণ্ড করে। এ আমি লিখছি নিজের কোনো কৃতিত্ব জাহির করতে নয়, শুধু ঈশ্বরের কৃপাশক্তিকেও স্বীকৃতি জানাতে। আমার লেখার মূল্য কিছু আছে কি নেই তা মুহূর্তের জন্যেও ভাবিনা—আমি যে একটা লেখার টানা চাকরিতে থেকেও আরেক লেখা লিখেছি, লিখতে পেরেছি, এখনো লিখছি—এতেই আমি কৃতার্থ।
২. লিখতে বসার আগে বা পরে কোনো পুজো আহ্নিক ইত্যাদি কিছু করি না। সব সময়ে নামে থাকতে চেষ্টা করি। স্মরণ মননই আমার একমাত্র অবলম্বন।
৩. ১৯৪১-এ রবীন্দ্রনাথের তিরোভাবের পর সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি—আর খাইনি। তার আগে হেভি স্মোকার ছিলাম। চা সকালে বিকেলে দুকাপ খাই—অসাময়িক বাড়তি এক-আধ কাপ কখনো-কখনো এখানে-ওখানে জোটে। আর কোনো নেশা নেই। দরকার হয় না।
৪. আমি দ্রুত লিখতে পারি না, ধীরে ধীরে ভেবে-ভেবে লিখি, তাই আমার লেখায় কাটাকুটি কম থাকে। যদি বেশি পরিবর্তনের দরকার মনে করি তবে গোটা পৃষ্ঠাটাই ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে লিখতে বসি।
৫. আমি নির্জনে লিখি—ঈশ্বর আমাকে নির্জনে রেখেছেন। আমার কোনো দলবল নেই, চেলাচামুণ্ডা বা ভলানটিয়ার নেই। আমার কাছে কেউ আড্ডা দিতে আসে না, পাছে ঠাকুরের কথা বলে বসি বোধহয় সেই ভয়ে। আড্ডা না দিয়ে যে সময় বাঁচে তা আবার সভায় ব্যয় হয়ে যায়। (আমার আবার তিন ঠাকুর : গৌরাঙ্গ ঠাকুর, রামকৃষ্ণ ঠাকুর আর রবি ঠাকুর!)
৬. লেখা শেষ হলে আরামের চেয়েও বেশি—আনন্দ হয়, আরেকটা লেখা ধরতে পারব বলে। আয়ু এত কম, শরীর এত অশক্ত—আর বিষয় এত বিশাল!
তোমার লেখা কোথায় ও কবে ছাপা হবে যেন জানতে চাই।
তোমার সর্বগত মঙ্গল প্রার্থনা করি ইতি।
তোমার
অচিন্ত্যদা
চিঠি : ৪
৫৭ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীট, কলকাতা-৬
৩/৭/৬৮
প্রীতিভাজনেষু,
এইমাত্র চিঠি পেলাম। সংক্ষেপে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি।
১। লেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকাল বিকেল দুপুর যে কোন সময়ই লিখি। রাত দশটা এগারটার পর আজকাল একেবারেই লিখি না। রাত্রে লেখাই কমিয়ে দিয়েছি। আসলে আমি লিখিই কম।
২। পুজো আহ্নিক জাতীয় কিছু জীবনে কখনোই করিনি। লেখা ত বটেই, যখন যা করি তাই আমার পুজো।
৩। এককালে নস্যি নিতাম। ছেড়ে দিয়েছি। কোনো কিছুই ব্যবহার করি না।
৪। কাটাকুটি কখনো খুব হয়, কখনো একেবারেই হয় না। কখন কি রকম হবে আগে থাকতে জানা যায় না।
৫। মন একবার বসে গেলে ভিড়ের মধ্যেও লিখতে খুব আটকায় না। আরম্ভটা অনেক সময়ে গোলমালের মধ্যে হতে চায় না।
৬। শেষ হ’লে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ি আর চেষ্টা করি লেখাটা মন থেকে একেবারে মুছে ফেলার। কখনো কখনো লেখাটার রেশ দুচার দিন মনের মধ্যে থেকে যায়।
আশা করি এ উত্তরে তোমার কাজ হবে।
প্রীতি ও শুভেচ্ছা জেনো। ইতি
প্রীতিমুগ্ধ
প্রেমেন্দ্র মিত্র
চিঠি : ৫
আশাপূর্ণা দেবী ফোন : ৪৬-৩৯০৮
ফ্ল্যাট নং ২৮, ব্লক নং ৩, ২৮/১/এ, গড়িয়াহাট রোড, কলিকাতা-১৯।
৯/৭/৬৮
প্রীতিভাজনেষু,
আপনার পত্র পেয়েছি। লেখকদের লেখাকালীন মুড্ সম্পর্কে লেখার কি সত্যিই কোনো দরকার আছে? পত্র পেয়ে প্রশ্নটা মনে আসছে। অবশ্য আপনি যখন দরকার মনে করেছেন তখন— আপনার দরকার অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
আপনার প্রশ্নের ক্রমিক সংখ্যামত উত্তর বসালাম—
১। নির্দ্দিষ্ট কোনো সময় নির্ধারিত করা সম্ভব হয় না। সময় পেলেই লিখি। দিনে রাত্রে সকালে সন্ধ্যায় যখন হোক।
২। না।
৩। আদৌ না। কাগজকলম ব্যতীত অন্য কিছু প্রয়োজন হয় না।
৪। সেটা আমার বইয়ের কম্পোজিটারই ভাল বলতে পারবে। কারণ কখনোই কোনো লেখা দুবার লিখি না। পাণ্ডুলিপি থাকে না।
৫। প্রথম প্রশ্নটির অর্থ (লেখা সম্পর্কে কি মনে হয়) ঠিক বুঝতে পারলাম না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর— চাই কিন্তু পাই কই?
৬। মানসিক অবস্থা? বাঁচলাম বাবা!
শেষ উত্তরটি হয়তো আপনাকে হাসির খোরাক দিল, কিন্তু সত্যি কথা। প্রেরণার লেখার স্বাদ ভুলে গেছি, অবিরত তাগাদাই মিটিয়ে চলেছি। বলতে পারেন বেশী লিখি কেন? তার উত্তর হচ্ছে—অনুরোধ এড়াতে পারার অক্ষমতা। আশা করি কুশলে আছেন।
প্রীতি নমস্কারান্তে—
আশাপূর্ণা দেবী
শ্রীরণজিৎ কুমার সেন