বড় রান্নাঘরে দুদিকে দুটো জানালা। মুখোমুখি। জানলার নীচেই দুটি মাটির উনুন মেঝের সঙ্গে গাঁথা। একটি উনুন আঁশ আর একটি অবশ্যই নিরামিষ রান্নার জন্য। বাড়িতে নয় নয় করে তিন চারটি বিধবা মহিলা ছাড়াও এক আধজন পুরুষ মানুষও থাকতেন যাঁরা মাছ মাংস খান না তো বটেই, এমনকি আঁশের কোনোরকম ছোঁয়াও স্পর্শ করেন না। কোনোরকম স্পর্শদোষ যদি ঘটে যায় তবে নিরামিষভোজীরা তো বটেই সর্বোপরি যিনি রান্না করছেন, অর্থাৎ বাড়ির কোনো একজন বধূ, তাঁরও অপরাধবোধে সেদিনের আহার বন্ধ থাকবে। যেহেতু কারণ বা অকারণে তার দোষেই এই আঁশ আর নিরামিষে ঠেকাঠেকি হয়ে গেছে, অতএব পুরো দোষটিই ওই বধূটির।
বড় সংসার। বৃহৎ পরিবার। অনেক লোকজনে ভরা বাড়ি গমগম করে। সব বাড়িতে তো রান্না করার লোক রাখার ক্ষমতা হত না। বাড়িতে অসংখ্য পুত্রবধূরা পালা করে রান্নার, বাটনার, কুটনো কোটার, পরিবেশনের দায়িত্ব ভাগ করে নিত। এই ভাগ নিয়েও যে জটিলতা হত না তা নয়। জটিলতা কুটিলতা সবই চলত আবার গৃহের কাজকর্মও নিখুঁতভাবে পালিত হত। আর অবশ্যই এই আঁশ নিরামিষের স্পর্শদোষ বাঁচিয়ে। ‘হাজারবার হাত ধুতে ধুতে হাতে হাজা ধরে গেল’ এই সংলাপ তখন রান্নাঘরের বধূদের মুখে মুখে ঘুরত। অথচ সঠিক সময়ে হাত ধোয়ার বা পরিষ্কার কাপড়ের ব্যবহার যে অতি প্রয়োজনীয় সেটা বুঝতে কয়েক শতাব্দী কেটে গেল।
সেদিনও ভরা ভর্তি শরীরে ভাতের হাঁড়ি নামাতে গিয়ে ব্যথাটা উঠল। বাড়ির ছোট বউ। প্রথম পোয়াতি। গৃহের কাজকর্ম করলে বাচ্চা প্রসব সুস্থ স্বাভাবিক হয় এই ধারণা তখন প্রচলিত ছিল। সংসারে বয়স্ক মহিলারা যেমন ভাবে নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, পরবর্তী মহিলারাও সেই পথের অনুসারী। ব্যথা উঠতেই বধূটিকে হয় পাশের গোয়ালঘরে (পরিষ্কার করে রাখা) অথবা সিঁড়ির তলার প্রায়ান্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। খবর দেওয়া হল বাড়ির প্রাচীন দাইকে। যদিও ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া নতুন মা হতে যাওয়ার পথে মেয়েটি একবার ডাক্তার ডাকার আবেদন রেখেছিল। কিন্তু সে আবেদন বাড়ির গিন্নিরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন। গোয়ালঘরে বা সিঁড়ির অন্ধকার ঘরে মেঝেয় পাতা বিছানায় শুতে বা অনাগত শিশুটির ঠান্ডা লাগার কথা ভেবে নতুন মা সামান্য প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও তা শাশুড়ি, পিসশাশুড়ির কথা আর হাসির তোড়ে কোথায় ভেসে যেত।
তারপরের গল্প? সংক্ষিপ্ত। বাঁশের চ্যাঁচালি দিয়ে নাড়ি কাটার জন্যই হোক বা পুরোনো ছেঁড়া কাপড়ের কারণেই হোক সদ্য মায়ের জ্বর আসত। আর আসত মৃত্যু। যন্ত্রণাময় নীল মৃত্যু। তাতেও কিন্তু এই প্রথার অদল বদল ঘটত না। কারণ এটাই অন্দরমহলের নিয়ম। সবটাই অতীতের নিয়মের নিগড়ে বাঁধা একটা জবরজং সিস্টেমের অধীনে ক্যাঁচরম্যাচর করতে করতে চলত। আঁশ নিরামিষের ক্ষেত্রে হাত ধোয়াটাও যেমন এই সিস্টেমের একটি অংশ।

একটা মৃত্যু নয়, এরকম শত শত মেয়েদের, সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের নীল মৃত্যু এসে চুম্বন করে যেত সেকালে। কি দেশে কি বিদেশে। কিন্তু কাউকে কাউকে তো এইসব মৃত্যু নাড়িয়ে যেত। এই রকম নাড়া দিয়েছিল তরুণ চিকিৎসক ইগনাৎস (ইগনাজ) সেমেলউইসকে। ১৮৪০ এর দশকের ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালের দুটি প্রসূতি বিভাগ। সেই সময় হাসপাতালে সন্তানের জন্ম মানেই সদ্যজাতদের মৃত্যু। ভিয়েনা হাসপাতালে একটি বিভাগ চিকিৎসক ও মেডিক্যাল ছাত্ররা পরিচালনা করত আর অপরটি ধাত্রীরা। চিকিৎসক বিভাগে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। অন্যদিকে ধাত্রীদের ক্লিনিকে মৃত্যুর হার ছিল মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ। অধিকাংশ নারী হাসপাতালে ভর্তি হবার সময় কাঁদতেন যাতে তাদের চিকিৎসকদের হাতে না পড়তে হয়। কিন্তু এই মৃত্যুর ফারাকের কারণটা কেউ ভেবে দেখেন নি।
এই প্রশ্নই মাথার মধ্যে ধাক্কা মারছিল ইগনাজ সেমেলভাইসের (Ignaz Semmelweis)। একদিন সেমেলভাইসের এক সহকর্মী প্যাথলজিস্ট পোস্টমর্টেম চলাকালীন অসাবধানে হাতের আঙুল কেটে ফেলেন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই মারা গেলেন। সেমেলভাইস লক্ষ্য করলেন প্যাথলজিস্টের মৃত্যুর লক্ষণগুলি সব চাইল্ডবেড ফিভারের মতো। যেভাবে প্রসূতির মৃত্যু ঘটে ঠিক সেভাবেই প্যাথলজিস্টের মৃত্যু ঘটেছে। সেমেলভাইস বুঝলেন যে চিকিৎসকরা মর্গে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করার পরই সরাসরি হাত না ধুয়ে চলে আসতেন প্রসূতি বিভাগে। এর-ফলে চিকিৎসকরাই সংক্রমণের বাহক হয়ে উঠেছিলেন।
এই সংক্রমণ ঠেকাতে সেমেলভাইস ১৮৪৭ সালে এক নতুন নির্দেশ জারি করলেন। সব চিকিৎসকরাই ক্লোরিন-চুন বা ক্লোরিনেটেড লাইমের দ্রবণে হাত ধুয়ে তবে রোগী দেখতে যাবেন। এই নির্দেশ কার্যকর হতেই মৃত্যুর হার অবিশ্বাস্যভাবে নেমে এল এক থেকে দুই শতাংশে। শুধু এই নিয়ম মেনে যেখানে শত শত মা সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেতেন, হঠাৎ করেই সেই সংখ্যা প্রায় শূন্যে এসে দাঁড়াল।
১৮১৮ সালের ১লা জুলাই এই মহান চিকিৎসকের জন্ম হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে। যাঁর একটি হাত ধোয়ার নির্দেশ মেনে প্রসূতির মৃত্যুর হার শূন্যে এসে দাঁড়াল সেই নির্দেশ কিন্তু অন্যান্য চিকিৎসকদের কাছে অপমানজনক হয়ে দাঁড়াল। তাঁরা সেমেলভাইসের বিরোধিতা করতে শুরু করলেন। তাঁদের বক্তব্যে যথেষ্ট জোর ছিল — যে চিকিৎসকরা রোগীদের প্রাণ ফিরিয়ে দেন, তারাই সংক্রমণ ঘটিয়ে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছেন এটা হতেই পারে না। ফলে তীব্র বিরোধিতা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেমেলভাইসের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ আর হাসাহাসি শুরু হল। সেমেলভাইসের সমস্ত কথা হাস্যকর বলে তাঁরা উড়িয়ে দেন। একঘরে হয়ে পড়েন সেমেলভাইস। তিনি চিঠি লিখে সহকর্মীদের ‘খুনী’ বলেও অভিহিত করেন। অত্যন্ত মানসিক চাপে তিনি নিজের মানসিক স্থিতি হারিয়ে ফেলেন। তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয় একটি মানসিক হাসপাতালে। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই একটা ক্ষতের সংক্রমণের কারণে সেই নীল মৃত্যু এই মহান চিকিৎসকের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪৭ বছর (১৮৬৫)।
হতাশ সেমেলভাইস মাতাল অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের সতীর্থদের ‘কসাই, জানোয়ার, অশিক্ষিত গন্ডমূর্খের দল’ বলে গালাগালি করতেন। কতটা হতাশাগ্রস্ত হলে একজন চিকিৎসকের মানসিক অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষ এমনই বিধিলিপি নিয়ে এই পৃথিবীতে আসেন যাঁরা নিজেদের জীবৎকালে সম্মান পান না। বরং তাঁদের পাগল প্রমাণ করা হয় যাতে তাঁরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সেমেলভাইসের মৃত্যুর পরেও তাঁর এই হাত ধোয়ার তত্ত্ব দীর্ঘ দিন অবহেলিত হয়ে রয়ে যায়। পরবর্তীকালে লুই পাস্তুরের ‘জার্ম থিয়োরি’ এবং জোসেফ লিস্টারের অ্যান্টিসেপটিক পদ্ধতি ধীরে ধীরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন পথের সন্ধান দেয়। গোটা বিশ্ব তখন বুঝতে পারে যে ইগনাজ সেমেলভাইস ঠিক পথের সন্ধানই দিয়েছিলেন যদিও তিনি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে এটি প্রমাণ করতে পারেন নি।
আমাদের দেশের যে মা সেসময় গোয়ালঘরে সন্তানের জন্ম দিতে অল্প হলেও কিছু প্রতিবাদের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর কথাও যেমন হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপরিচ্ছন্ন ছেঁড়া কাপড় থেকেও যে সংক্রমণ ঘটে তখন কেউ সেটা মানতে চাইতেন না। কোভিড-১৯ নামের এক অতিমারি এসেও আমাদের সকলকে এই হাত ধোয়ার গুরুত্ব বুঝতে বাধ্য করেছে। তখন হয়ত নিজেদের অজ্ঞাতসারে আমরা তাঁকেই শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলাম। সেই পাগল বলে দেগে দেওয়া মানুষটি, যিনি বারবার মানুষকে সচেতন করেছিলেন। যিনি মায়েদের এবং সদ্যজাতদের মৃত্যু রুখে দিতেও সফল হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যুগে সতীর্থরা যে মানুষটিকে সফলতার রাস্তায় হাঁটতে না দিয়ে এক অন্ধকার নীল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন — তাঁর নাম ইগনাজ সেমেলভাইস (Ignaz Semmelweis)। এক নিঃসঙ্গ পথপ্রদর্শক।